17/08/2026
মুজিবকে পাকিস্তান বন্দী করেছিলো, খুনও করতে পারতো, তাদের জন্যে এটাই স্বাভাবিক ছিলো; তবে তাদের মতো মগজহীনেরাও হয়তো বুঝতে পেরেছিলো যে বন্দী মুজিবের থেকে নিহত বা শহিদ ( শহিদ শব্দটি আমার পছন্দ নয়, এর বাঙলা কি হতে পারে নিহত-অমর?) মুজিব হবেন অনেক বেশি জীবন্ত ও শক্তিশালী। তারা বুঝেছিলো বন্দী মুজিবকে হয়তো দমন বা প্রতারণা করা যাবে, কিন্তু শহিদ মুজিবকে দমন বা প্রতারণা করা যাবে না; তখন তিনি হয়ে উঠবেন অপরাজিত, অজেয়, অদম্য।
মুজিবকে কখনো আমি কাছে থেকে দেখি নি, বাসনাও কখনো হয় নি, আমি বীরপুজারী নই,- বেশ দূর থেকে কয়েকবার তাঁকে দেখেছি, তাঁর স্তবও কখনো করি নি; রাজনীতিক মহাপুরুষদের প্রতি আমি বিশেষ আকর্ষণ/শ্রদ্ধা বোধ করি না। মুজিব যে বন্দী হয়েছিলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময়টি ভরে কারারুদ্ধ ছিলেন পাকিস্তানে, একে তাঁর শত্রুরা দীর্ঘকাল ধরে নিন্দা করে আসছে; তারা খুব অশ্লীলভাবে ব্যাপারটিকে নিজেদের স্বার্থে ব্যাখ্যা করে সুখ পায়। মুশিকছানারা নিন্দা করে সিংহের।
আমাদের শোচনীয় দেশে সব ধরণের ব্যাখ্যাই সম্ভব, মিথ্যে এখানে খুবই শক্তিমান, অনেকটা আমাদের মায়ের বুলি, এবং নির্লজ্জভাবে তা প্রচার করা যায়। মুজিব যদি ধরা না দিয়ে পালিয়ে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধ করতেন, কোনো ভাঙা বেতারকেন্দ্র থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করতেন, তাহলে কি আমাদের মুক্তিযুদ্ধ আরো তীব্র, আরো সফল হতো? তাহলে কি তিনি মুজিব হতেন? তাহলে তো তিনি হতেন মেজর জিয়া। মুজিব পালিয়ে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণা দিলে মুক্তিযুদ্ধ হতো না, তিনি মুজিব হতেন না, হতেন সামান্য ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’, এবং আমরা একটি বিশাল রাজনীতিক ভাবপ্রতিমাকে হারাতাম, মুক্তিযুদ্ধে আমরা এতো অনুপ্রেরণা বোধ করতাম না। যোদ্ধা মুজিবের থেকে বন্দী মুজিব ছিলেন অনেক শক্তিশালী ও প্রেরণাদায়ক, তিনি তখন হয়ে উঠেছিলেন মহানায়ক, ঘোষকের অনেক ওপরে যাঁর স্থান।
মুক্তিযুধের সময়টি ভরে তিনিই ছিলেন নিয়ন্ত্রক ও প্রেরণা, তিনিই ছিলেন, এক অর্থে, মুক্তিযুদ্ধ। পাকিস্তানের কারাগারে তিনই হয়তো মুক্তিযুদ্ধের কথা জানতেনও না, পাকিস্তানিরা তাঁকে তা জানতে দেয় নি, মুক্তিযুদ্ধের রূপ কী তা হয়তো তিনই কল্পনাও করতে পারেন নি, কিন্তু সমগ্র বাঙালির রূপ ধরে তিনিই করে চলেছিলেন মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধে প্রতিটি বাঙালি ও মুক্তিযোদ্ধাই ছিলো মুজিবের দ্বিতীয় স্বত্তা।
মুজিবের বন্দীত্ব মুক্তিযুদ্ধ ঘোষণার থেকে অনেক বড়ো ঘটনা। ঘোষণা করে ঘোষক হওয়া যায়, মুজিব হওয়া যায় না।
আমরা কি এই বাঙলাদেশ চেয়েছিলাম-- হুমায়ুন আজাদ।