08/05/2026
দ্বিতীয় বিয়ে ও ইনসাফ
দ্বিতীয় বিয়ের প্রশ্নে এলেই একদল মুসলিম পশ্চিমা সভ্যতা ও নাস্তিকদের সাথে সূর মিলিয়ে ইনসাফ ইনসাফ বলে চিৎকার শুরু করেন এবং ইনসাফ সম্ভব না হওয়ার দোহাই তুলেন। তবে কি আল্লাহ তাআলা দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ বিয়ের বিধান না বোঝে দিয়েছেন? এই বিধানে নারীর হক নষ্ট হবে সেটি মহান আল্লাহ বোঝেননি? এটাই তো পশ্চিমাদের প্রশ্ন।
একজন আলেম সারা জীবন পড়লেন, (فعل الحاكم لا يخلو عن الحكمة) এবং আল্লাহ সর্বোচ্চ হাকিম, তারপরও তিনি কিভাবে এই অভিযোগ তুলতে পারেন?
আপনি আর্থিকভাবে দুর্বল, আপনি শারিরিকভাবে দুর্বল, আপনি মানসিকভাবে দুর্বল, আপনি স্ত্রীর কাছে দুর্বল, ইনসাফ করার ক্ষেত্রে আপনি অপরাগ; সেটি আপনার ব্যাপার। তাই বলে একটি কুরআনী বিধান, সকল নাবীর সুন্নাহ, খলীফাদের সুন্নাহ, সাহাবাদের সুন্নাহ; এমন বিধান নিয়ে আপত্তি কেন? যিনি এই বিধান পালন করবেন, এটি তার ব্যাপার। আপনি তাকে সরাসরি ইনসাফের নসীহত করতে পারেন।
অনেক আগে আমার এক আত্মীয়ার বিয়েতে মহর ৮ তুলা থেকে নামিয়ে ৭ তুলার আলোচনা চলছিলো, অজুহাত হিসেবে বলা হলো, ৮ তুলা হলে যাকাত চলে আসবে, প্রতি বছর যাকাত দেওয়া সম্ভব হবে না। কনের পিতার পক্ষ থেকে এই অজুহাতে আমি অবাক হলাম এবং আমি আপত্তি করে বললাম, ছেলে পক্ষ যেখাতে ৮ তুলা দিতে রাজী, সেখানে এই অজুহাত কেন? এটা তো ভাল। যাকাত আসবে, যাকাত দিবে, গরীবের সহযোগিতা হবে, টাকা না থাকলে এই ৮ তুলা থেকেই যাকাত দিবে, প্রতি বছর এই স্বর্ণ থেকে যাকাত দিলে যখন স্বর্ণ সাড়ে সাত তুলার নিচে চলে আসবে, তখন তো আর যাকাত দিতে হবে না।
ইনসাফের অজুহাতে দ্বিতীয় বিয়েতে সামগ্রিক আপত্তি কিছুটা এমন। যেমন বাঙ্গালীরা যথাযথ যাকাত দেয় না বলে আপনি বললেন, ধনী হলে যাকাত আসবে, যাকাত দেওয়া কঠিন, তাই ধনী হওয়া যাবে না। তাছাড়া আল্লাহ তো ধনী হতে উৎসাহিত করেননি। ধনী হওয়া বৈধ, কিন্তু যাকাত দেওয়া ফরয, অতএব বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যাকাতের ভয়ে ধনী হওয়া এড়িয়ে যাওয়া করণীয়। সৌদি আরবে যেহেতু সরকারী ব্যবস্থাপনায় যাকাত নেওয়া হয়, সেখানে এই বিধান পালন সহজ, সুতরাং সৌদির মানুষ ধনী হলে সমস্যা নেই।
এবার আসি মূল মাসআলায়। ইসলাম বলুন আর যেকোনো ধর্ম বা ধর্মহীনতা বলুন, ইনসাফ বা সুবিচার এমন একটি নীতি, যা সকলের কাছেই জরুরী এবং সর্বক্ষেত্রে জরুরী। কেবল দ্বিতীয় বিয়ের সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই। এক বিয়ে বলুন আর চার বিয়ে বলুন, সর্বক্ষেত্রে ইনসাফ জরুরী। যারা এক বিয়ে করেছেন, তাদের স্ত্রীদের থেকে জরীপ নিয়ে বলুন, কত পার্সেন্ট ইনসাফ করতেছেন? তাই বলে কি পশ্চিমাদের মত এক বিয়েরও বিরোধিতা করে লিভ টুগেদার উত্তম হওয়ার আওয়ায তুলবেন?
বিয়ের বিষয় বাদ দিয়ে অন্যান্য সকল ক্ষেত্রে বাংলাদেশে ইনসাফ কায়েম হয়ে গেছে? যেখানে নিরপরাধ জেলে থাকে বা ফাঁসিতে ঝুলে, আর অপরাধি খোলা মাঠে রাজত্ব করে বেড়ায় সেখানে ইনসাফের প্রশ্ন কেবল দ্বিতীয় বিয়েতে কেন?
যেখানে দ্বীনের কেন্দ্র মাদরাসার ক্ষেত্রে হাজারো না-ইনসাফির প্রশ্ন রয়েছে। ৭০-৮০% মুহতামিম নাকি ইনসাফ করেন না; সেখানে ইনসাফের প্রশ্ন কেবল দ্বিতীয় বিয়েতে কেন?
এক কথায়, ইনসাফ একটি জরুরী সামগ্রিক বিধান, যা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে জরুরী। বাবা-মা সন্তানের প্রতি, সন্তান বাবা-মার প্রতি, স্বামী স্ত্রীর প্রতি, স্ত্রী স্বামীর প্রতি, ভাই বোনের প্রতি এবং বোন ভাইয়ের প্রতি, রাষ্ট্র নাগরিকদের প্রতি, নাগরিকরা রাষ্ট্রের প্রতি, প্রতিবেশির প্রতি, এমনকি একজন মানুষ তার প্রতিটি অঙ্গের প্রতিও ইনসাফ করা জরুরী। দ্বিতীয় বিয়ের সাথে এর একক কোনো সম্পর্ক নেই। তাহলে আমাদের চেচামেচি কেবল এই একটি বিষয়ে কেন? যিনি এক বিয়ে করে ইনসাফ করছেন না বা অন্যান্য সেক্টর যেখানে অনেক বড় আকারে ইনসাফ পদদলীত হচ্ছে, সেক্ষেত্রে ইনসাফের আওয়ায উঠে না কেন? আওয়াজ উঠবে কী করে? কারণ যিনি দ্বিতীয় বিয়েতে না-ইনসাফির আপত্তি তুলছেন তিনি তার সেক্টরে অনেক বড় জালিম।
তবে দ্বিতীয় একটি মাত্র মাসআলা প্রথম বিয়ে থেকে স্বতন্ত্র, আর সেটি হলো সমতা। এটি কোনো কঠিন কাজ নয়। একেবারে সহজ। পালাক্রমে শয়ন কোনো কঠিন কাজ নয়। দুজনকে একই মূল্যের শাড়ি প্রদান কোনো কঠিন কাজ নয়। ভ্রমনে যেতে লটারি দিয়ে পালাক্রমে একবার একজনকে এবং আরেকবা অন্যজনকে নেওয়া কোনো কঠিন কাজ নয়। পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসেব করে ব্যবসায়িক পণ্যের যাকাত দেওয়া তো এর চেয়ে অনেক গুণ কঠিন৷
আর এ জন্যই মহান আল্লাহ চার পর্যন্ত বিয়ের অনুমতি দিয়েছেন। নাবী ও খলীফাগণ আমলের মাধ্যমে এর প্রতি উৎসাহিত করেছেন। আর সমাজকে ব্যভিচার মুক্ত এবং প্রতিটি নারীকে একটি ঘর দিতে হলে বাস্তবতার নিরিখে একাধিক বিয়ে কেবল বৈধই নয়, বরং জরুরীও বটে। বাকী যেসব সভ্যতায় বিয়ে ছাড়া শারিরিক সম্পর্ক আপত্তির বিষয় নয়, পতিতালয় একটি বৈধ ব্যবসা ও নারীর অধিকার, সেখানকার কথা ভিন্ন।