14/07/2020
"সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই।"
"মানবধর্মই বড় ধর্ম।"
"মানুষের জন্য ধর্ম, ধর্মের জন্য মানুষ নয়।"
উপরের এই কথাগুলো প্রায়ই অনেকে বলে থাকেন। অনেক মুসলিম ভাইও অবলীলায় এই বাক্যগুলোর স্বার্থক প্রয়োগ ঘটান। এই বাক্য তিনটি অর্থের দিক দিয়ে একই, তফাতটা শুধু প্রকাশভঙ্গীতে। তবে বাক্যটির রচয়িতারা সবচেয়ে মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছে শেষ বাক্যটিতে। শুনতে বড় চমৎকার লাগে, বলাও যায় জোর গলায়। তা না হয় বললেন। কিন্তু যা বলছেন বুঝে বলছেন তো?
"মানুষের জন্য ধর্ম, ধর্মের জন্য মানুষ নয়" - এই বাক্যটা দিয়ে আসলে কি বোঝানো হচ্ছে? যা বোঝানো হচ্ছে সেটাই কি এর আসল অর্থ? মজার ব্যাপার হল আমাদের তথাকথিত বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায় ও তাদের একান্ত বাধ্যগত ছাত্রসমাজ বরাবরই "মুখে এক আর মনে আরেক" নীতি অবলম্বন করলেও এরকম কিছু বাক্য তাদেরকে সুযোগ করে দেয় মুখ আর মনকে এক থাকার। এটা এমন এক বাক্য যে বাক্যটার আসল ও প্রায়োগিক অর্থ একই। তবে এখানেও আছে টুইস্ট! আমজনতা এই বাক্যটার প্রয়োগ ঘটায় নিতান্তই নিরীহ ভাবে এবং অবশ্যই আগপিছ না ভেবে। সেক্যুলাংগারদের সফলতাটা এখানেই।
কি বোঝাচ্ছে এই বাক্যটা?
খুব সহজ ও সাধারণ ভাষায়, ধর্মের যা কিছু মানবতার সাথে, মনুষ্যত্বের সাথে, মানুষের জীবনপ্রণালীর সাথে সাংঘর্ষিক সেটা স্ট্রিক্টলি বাদ।
ধর্ম ততক্ষণই মানা যাবে যতক্ষণ না সেটা মানুষের ব্যক্তিস্বাধীনতায় কোন রকম হস্তক্ষেপ করছে। যখনই এরকম কিছু ঘটবে, যখনই ইচ্ছা-আকাঙ্খার উপর ধর্মকে প্রাধান্য দেওয়ার মত পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে তখন "জাস্ট কিক দ্যা রিলিজিয়ন অ্যান্ড লিভ ইউর লাইফ!"
এটাই হচ্ছে এই বাক্যের ইনার মিনিং। সিমিলার মিনিং এর এরকম আরেকটা বাক্য হল "মাই লাইফ, মাই ডিসিশন"।
[নোটঃ এই মানবতা, মনুষ্যত্ব, জীবনপ্রণালী, ব্যক্তিস্বাধীনতার ডেফিনিশন তাদের নিজস্ব সংজ্ঞামতে।]
আমার আপত্তিটা কোথায়? যখন আপনি বলছেন ধর্মের জন্য মানুষ নয়, মানুষের জন্য ধর্ম তখন আপনি যেটা মিন করছেন সেটা হচ্ছে আপনি যে ধর্ম ফলো করেন সেটা কোন না কোনভাবে আপনার সাথে সাংঘর্ষিক। সোজাভাবে বললে আপনার ধর্ম লাইফ ওরিয়েন্টেড না। আপনি সেটা ততক্ষণ মানবেন যতক্ষণ সেটা আপনার সীমাকে অতিক্রম করে না। কিন্তু যখনই নিজের সীমাকে ডিঙিয়ে ধর্মের সীমানায় প্রবেশ করা লাগে, তখনই কবি সরব - "সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই"!
অন্য ধর্মের কথায় যাব না, আমি আমারটাতেই থাকি। ইসলাম প্রচলিত অর্থে ধর্ম বলতে যা বোঝায় ইসলাম সেই জিনিস নয়। এ হচ্ছে "দ্বীনে ফিতরাত" বা স্বভাবধর্ম। এ দ্বীন কিছু অর্থহীন আচার অনুষ্ঠানের বেড়াজালে সীমাবদ্ধ নয়। এই দ্বীন পরিবেষ্টন করে আছে মানুষের ইহলৌকিক ও পারলৌকিক জীবন। এই দ্বীন এসেছে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এক ও অদ্বিতীয় স্রষ্টার আনুগত্যের বার্তা নিয়ে। এই দ্বীনে এমন একটি বিধানও নেই যা মানুষের প্রকৃতির সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়, মানুষকে বিদ্রোহী হতে প্ররোচনা দেয়। এ হচ্ছে সেই দ্বীন, বিংশ শতাব্দীর শেষার্ধ যে দ্বীনের প্রতি বিনম্র, অনুরক্ত প্রত্যাবর্তনে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ফ্যাসিবাদ, পুঁজিবাদের গোলকধাঁধায় বিভ্রান্ত, ক্লান্ত, বিষাদগ্রস্ত মানবতার জন্য শেষ ও একমাত্র আশ্রয়স্থল।
কেন এই ফেরা? কেন এই দ্বীনের কাছে বিপুল সংখ্যক আদম সন্তানের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ? কেননা এই দ্বীন হচ্ছে ফিতরাতের দ্বীন। এই দ্বীন মানুষের স্বত্বার সাথে সম্পর্কিত দ্বীন। চরমভাবে পচে যাওয়া অন্তর ছাড়া কেউই এই দ্বীনের বিরোধীতা করে না। এই দ্বীন মানুষকে বদলে দেওয়ার জন্য আসেনি। এই দ্বীন এসেছে মানুষকে তার সঠিক ফিতরাতের উপর প্রতিষ্ঠিত করতে, এসেছে তার স্বভাবকে পরিশুদ্ধ করতে।
আর তাইতো অত্যন্ত তেজস্বী ও রাগী উমরকে এই দ্বীন বদলে দিয়ে ভেজা কাঁথা বানিয়ে দেয়নি, বরং তাঁর এই তেজস্বীতার গতিপথ ঘুরিয়ে দিয়েছে সত্যের দিকে। শুধু এতটুকুতেই শেষ হয়ে যায়নি। এই দ্বীনের অনিন্দ্যসুন্দর শিক্ষাগুলো বের করে এনেছে তাঁর হৃদয়ের কোমল, সহনশীল অংশটাকেও।
এই জন্যই যাঁর চাবুককে তরবারির চেয়েও ভয় করা হত, সেই মানুষটির চোখ দিয়ে দরদরিয়ে পানি পড়তে থাকে একজন বিধবা ও তাঁর বাচ্চাদের কষ্টে। আতংকিত হয়ে উঠেন তিনি নিজের দায়িত্বে অবহেলার কথা ভেবে। এই কষ্ট, এই যন্ত্রণা তখনই লাঘব হয় যখন তিনি নিজের কাঁধে করে আটার বস্তা বয়ে পাহাড়ী এলাকায় দৌড়ে গিয়েছেন, নিজ হাতে খাবার তৈরি করে অভুক্ত বাচ্চাগুলোকে খাইয়েছেন।
এই মানুষ শাসন করেছেন অর্ধ পৃথিবী!
এই বিশাল সাম্রাজ্যের শাসনক্ষমতা তাঁকে উদ্ধত করেনি, করেনি দুর্বিনীত। উল্টো তিনি হয়েছেন বিনম্র থেকে বিনম্রতর! একই সাথে ছিলেন আগের চেয়েও বেশি তেজস্বী! এই দ্বীন তাঁকে বদলায় নি, পরিশুদ্ধ করেছে মাত্র। এই দ্বীন বৈচিত্র্যকে ধ্বংস করতে আসেনি, এসেছে এর সাথে মিশে থাকা ময়লাগুলোকে ছেঁকে বের করে দিয়ে এর ভিত্তিকে পরিশুদ্ধতার উপর দাঁড় করাতে। এটা যে ফিতরাতের দ্বীন!
আর তাই "মানুষের জন্য ধর্ম, ধর্মের জন্য মানুষ নয়" - এই বাক্যটা অন্তত ইসলামে অসার।
লিখেছেন - মুহাম্মাদ নাফিস নাওয়ার