08/03/2026
প্রফেসর ড. সৈয়দ মুহাম্মদ নকিব আল আত্তাস রাহিমাহুল্লাহ (১৯৩১-২০২৬)। বিংশ শতাব্দীতে মুসলিম বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদ, দার্শনিক, আলেম, সভ্যতা বিশারদ ও শিক্ষাবিদ। গত শতাব্দীর ইসলামী জ্ঞানের পুনর্জাগরণের অন্যতম নক্ষত্র এবং মুতাফাক্কির তিনি। এই মহান ব্যক্তিত্ব আজ ৮ মার্চ ২০২৬-এ (রোবার, স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬:৪৭ মিনিট) মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে ইন্তিকাল করেছেন। ইন্না-লিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহি রাজিউন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯৪ বছর। সোমবার সকালে কুয়ালালামপুরের বুকিত কিয়ারা কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হবে।
ড. আত্তাস রাহিমাহুল্লাহ সমকালীন মুসলিম বুদ্ধিবৃত্তিক জগতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কিংবদন্তি। জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় তাঁর ছিল অসাধারণ দখল। বিশেষ করে আকিদা, দর্শন, মেটাফিজিক্স, ইতিহাস ও সাহিত্য বিষয়ে তাঁর জ্ঞান ছিল বিস্ময়তুল্য। তাঁর মনীষাচৈতন্য সম্পর্কে সমকালীন যুগের শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদ এবং স্কলাররা মূল্যায়নপূর্বক বক্তব্য রেখেছেন।
ড. আত্তাস রাহিমাহুল্লাহ-এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল জ্ঞানকে উপনিবেশায়নের প্রভাব থেকে মুক্ত করা। তিনি হাকিকতভিত্তিক একটি স্বতন্ত্র জ্ঞানচর্চার ধারা প্রতিষ্ঠা করে জ্ঞানকে প্রয়োগিক করে তুলেছিলেন। তিনি এক্ষেত্রে অগ্রণী এবং পথপ্রদর্শক হিসেবে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। তাঁর চিন্তা ও গবেষণা সমকালীন মুসলিম বুদ্ধিবৃত্তিক জগতে গভীর প্রভাব ফেলেছে এবং ইসলামী জ্ঞানতত্ত্বের পুনর্জাগরণে তিনি রেখে গেছেন অবিস্মরণীয় অবদান। অর্থাৎ, আধুনিক যুগে 'ইসলামাইজেশন অব নলেজ' ধারণার অন্যতম প্রধান প্রবক্তা হিসেবে তিনি বিশ্বজুড়ে সুনাম ও প্রসিদ্ধি লাভ করেন।
ড. আত্তাস রাহিমাহুল্লাহ-এর প্রস্তাবিত জ্ঞানের ইসলামায়ন, ইসলামী দর্শন, আখলাক প্রভৃতি বিষয়ে তাঁর অসামান্য অবদান মুসলিম উম্মাহকে সমৃদ্ধ করেছে দীর্ঘ এক শতক যাবত। শুধু তাই নয়, তাঁর চিন্তাদর্শন আরও শতাব্দীর পর শতাব্দী মুসলিম উম্মাহকে পথ দেখাবে নিঃসন্দেহে।
ড. আত্তাস রাহিমাহুল্লাহ তাঁর জীবদ্দশায় মালে সভ্যতা, ইসলামী ইতিহাস, দর্শন বিষয়ে ৩০টিরও বেশি গ্রন্থ রচনা করেছেন। এছাড়া অসংখ্য অগণিত গবেষণা প্রবন্ধ আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে অতিথি হিসেবে জ্ঞানের ইসলামায়নের ওপর বক্তব্য রেখেছেন। ভালোবাসা অর্জন করেছেন অসংখ্য অগণিত ইসলামিক চিন্তাবিদ এবং স্কলারের। তাঁর প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থসমূহের মাঝে রয়েছে: ১. Islam and Secularism, ২. Historical Fact and fiction, ৩. The Concept of Education in Islam: A Framework for an Islamic Philosophy of Education, ৪. Prolegomena to the Metaphysics of Islam, Islam: The Covenants Fulfilled প্রভৃতি। এসব গ্রন্থে তিনি আধুনিকতা, ধর্মনিরপেক্ষতা, শিক্ষা ও ইসলামী বিশ্বদৃষ্টির সম্পর্ক নিয়ে গভীর বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁর লেখালেখিতে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়—ইসলাম শুধু একটি ধর্মীয় আচারব্যবস্থা নয়, বরং এটি একটি পূর্ণাঙ্গ সভ্যতা ও জ্ঞানব্যবস্থা। তিনি মুসলিম সমাজকে আত্মপরিচয়, জ্ঞানচর্চা ও সভ্যতাগত আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধারের আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর চিন্তাধারা মুসলিম চিন্তাবিদদের জন্য অনুপ্রেরণা ও পথনির্দেশক হয়ে থাকবে।
ড. আত্তাস রাহিমাহুল্লাহ ছিলেন মালয়েশিয়ার একটি রাজপরিবারের সন্তান। ১৯৩১ সালে মালয়েশিয়ার জোহর রাজ্যে এক সম্মানিত মুসলিম পরিবারে তাঁর জন্ম। তাঁর বংশধারা আরব ও মালয় ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিল। পারিবারিক পরিবেশেই তিনি ইসলামী জ্ঞান, আধ্যাত্মিকতা ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হন। সত্যিকার অর্থেই তিনি একটি রাজকীয় জীবন অতিবাহিত করেছেন। একজন সম্ভ্রান্ত মুসলিম হিসেবে তাঁর সম্পৃক্ততা ছিল সুন্দা ও জোহরের রাজপরিবারের সাথে। যৌবনের শুরুতেই তিনি রয়েল স্যান্ডহার্টস মিলিটারি একাডেমি থেকে গ্র্যাজুয়েশন লাভ করেন। এরপর মালয় ইউনিভার্সিটি, ম্যাকগিল ইউনিভার্সিটি ও সোয়াস ইউনিভার্সিটিতেও অধ্যয়ন করেছেন। তিনি লন্ডনের স্কুল অফ ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজ (SOAS) থেকে পিএইচডি (PhD) ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন। তিনি এ.জে. আরবেরি এবং মার্টিন লিংসের তত্ত্বাবধানে 'দ্য মিস্টিসিজম অফ হামজাহ ফানসুরি' (The Mysticism of Hamzah Fansuri) শীর্ষক দুই খণ্ডের থিসিসের উপর এই ডক্টরেট সম্পন্ন করেন। তাঁর গবেষণার মূল ক্ষেত্র ছিল ইসলামী দর্শন, সভ্যতা, ইতিহাস, ভাষা ও শিক্ষাতত্ত্ব। এছাড়া তিনি ধর্মতত্ত্ব ও ম্যাটাফিজিক্স নিয়ে গভীর পাণ্ডিত্য অর্জন করেছেন। যা তাঁকে শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্কলারে পরিণত করেছিল। তিনি জ্ঞানকে কেবল বাহ্যিক বেশভূষায় রূপ দিতে রাজি ছিলেন না; বরং পরিভাষা ও অর্থবহতা এবং বাস্তবিক ও প্রায়োগিক অনুশীলনের মধ্য দিয়ে ইসলামীকরণের চেষ্টা করেছিলেন। তিনি মূলত মুসলিম সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক সংকট নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করেছেন। তাঁর মতে, ঔপনিবেশিক যুগের প্রভাব এবং পাশ্চাত্য চিন্তার একচেটিয়া আধিপত্য মুসলিম সমাজকে নিজেদের জ্ঞানতাত্ত্বিক ভিত্তি থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য তিনি 'ইসলামাইজেশন অব নলেজ' বা জ্ঞানের ইসলামায়নের ধারণা সামনে আনেন। তাঁর দৃষ্টিতে জ্ঞানকে ইসলামী বিশ্বদৃষ্টি, নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিকতার আলোকে পুনর্গঠন করা জরুরি। সে জন্য শিক্ষা ও বুদ্ধিবৃত্তিক পুনর্জাগরণের লক্ষ্যে তিনি ১৯৮৭ সালে মালয়েশিয়ায় জীবন্ত সভ্যতা হিসেবে আন্দালুসিয়ার আলোকে গড়ে তুলেছিলেন ISTAC. তাঁর অনন্য ও অসাধারণ কীর্তি হচ্ছে International Institute of Islamic Thought and Civilization (ISTAC) প্রতিষ্ঠা। এর মাধ্যমে তিনি নিজেকে সভ্যতা বিশারদ হিসেবে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছিলেন। এই প্রতিষ্ঠানটি অল্প সময়ের মধ্যেই ইসলামী দর্শন ও সভ্যতা বিষয়ক গবেষণার একটি আন্তর্জাতিক কেন্দ্র হিসেবে খ্যাতি অর্জন করে। মুসলিম বিশ্বের বহু গবেষক ও চিন্তাবিদ এই প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষা ও অনুপ্রেরণা লাভ করেছেন। এই প্রতিষ্ঠানটি প্রায় চার দশক ধরে ইসলামী চিন্তা, গবেষণা এবং সভ্যতার আলোকায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
ড. আত্তাস রাহিমাহুল্লাহ-এর ইন্তেকালে মুসলিম উম্মাহ একজন মহান দার্শনিক, দূরদর্শী চিন্তাবিদ, আলেম, সভ্যতা বিশারদ, জ্ঞানসাধক, প্রাজ্ঞ বুদ্ধিজীবী ও রাহবারকে হারালো। তাঁর মতো স্কলার আর পৃথিবীতে আসবেন কি না সন্দেহ আছে। তিনি শুধু একজন আলেম নন; বরং ছিলেন এক দূরদর্শী চিন্তাবিদ, যিনি ইসলামী জ্ঞানতত্ত্ব ও শিক্ষার পুনর্গঠনের প্রশ্নে একটি শক্তিশালী ধারার সৃষ্টি করেছিলেন। তাঁর রচনা, চিন্তা ও ইলমি উত্তরাধিকার বহু বছর ধরে জ্ঞান ও হিকমতের পথে চলা মানুষদের আলোকিত করতে থাকবে। তাঁর চিন্তাদর্শন এবং জীবনকর্ম উম্মাহকে যুগের পর যুগ ধরে আলোকিত দিনের বার্তা দেবে। তিনি বেঁচে থাকবেন ইসলামপ্রিয় ইলমে ওহির পিপাসু ব্যক্তিত্বের মাঝে। আল্লাহ তাআলা তাঁকে জান্নাতের উচ্চ মর্যাদা দান করুন, তাঁর সকল খিদমত কবুল করুন এবং তাঁর রেখে যাওয়া জ্ঞানের আন্দোলনকে এগিয়ে নেওয়ার তাওফিক আমাদেরকে দান করুন। আমিন।