08/09/2025
আমীরুল মুমিনীন ফিল হাদীস, হযরত ইমাম আব্দুল্লাহ ইবনু মোবারক রাহি. এর রাতে ঘুম ভেঙে গেল। আজব স্বপ্ন দেখলেন। পেয়ারা হাবীব ﷺ তাকে স্বপ্নে এসে বললেন, "উঠ আব্দুল্লাহ! ইরাকে যাও। সেখানে গিয়ে অগ্নিপূজক বেহরাম কে গিয়ে আমার সালাম বলবে। আর বলবে জান্নাতে সে আমার সাথে থাকবে।"
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনু মোবারক রাহি. এই স্বপ্নের কোন ব্যাখ্যাই দাড় করাতে পারলেন না। আর আকা ﷺ কে স্বপ্নে দেখাও মিথ্যা হতে পারে না। কিন্তু একজন অগ্নিপূজক কিভাবে পেয়ারা নবীজি ﷺ এর সাথে জান্নাতে এক সাথে থাকবে?!
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনু মোবারক রাহি. ভোর হতেই সালাত আদায় করে রওনা হলেন। গন্তব্য ইরাক। অনেক লম্বা সফর করে ইরাকে পৌঁছুলেন। বেহরামের ঠিকানা খুঁজে বের করলেন।
বেহরাম হলো একজন সনামধন্য ব্যবসায়ী। তার গুনের মধ্যে এটা আকর্ষণীয় যে, সে দান করার ক্ষেত্রে জাতপাত দেখে না। সবাইকে দান করে। তবে কট্টর অগ্নিপূজক।
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনু মোবারক রাহি. বেহরামের ঠিকানায় পৌঁছে তাকে বললেন, আমি আব্দুল্লাহ ইবনু মোবারক। উম্মতের খেদমতে ইলম বিতরণ অধমের দায়িত্ব।
বেহরাম বললো, ওহ-হো! আপনি কী মুসলমানদের ইমাম আবৃদুল্লাহ ইবনু মোবারক? ইমাম সাহেব রাহি. বললেন, হ্যাঁ আমিই। এবার বেহরাম নড়েচড়ে বসলো।
"বলুন মুহতারাম, আমার নিকট কেন এসেছেন? "
ইমাম সাহেব রাহি. বললেন, "দেখ বেহরাম, আমি অনেক লম্বা পথ অতিক্রম করে এসেছি। রাসুলুল্লাহ ﷺ এর পয়গাম নিয়ে। গতরাতে আমি স্বপ্ন দেখলাম, রাসুলুল্লাহ ﷺ আমাকে তাড়া দিয়ে বলছেন; যাও! বেহরামকে গিয়ে সুসংবাদ দাও। তাকে আমার সালাম বলবে। আর বলবে জান্নাতে সে আমার সাথে একসাথে থাকবে। হে বেহরাম! তুমি তো একজন অগ্নিপূজক। তুমি এমন কী আমল করো যে অকল্পনীয় ও সুউচ্চ সম্মানের অধিকারী তুমি হয়ে গেলে, রাসুলুল্লাহ ﷺ তোমাকে সালাম জানালেন এবং জান্নাতে একসাথে থাকার সুসংবাদ পৌঁছানোর জন্য আমাকে তাগাদা দিলেন!"
বেহরামের চোখের পানি গড়িয়ে পড়ছে। বলতে চাচ্ছিল না সেই গোপন আমল কী। তবুও ইমাম আব্দুল্লাহ ইবনু মোবারক রাহি. এর কষ্টের দিকে তাকিয়ে বললো, তাহলে শুনুন -
"আমি একরাতে আমার সমস্ত কর্মচারীদের ছুটি দিয়ে ঘরে ঢুকলাম। শরীর ক্লান্ত। শোয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি। ঠিক ঐ সময় আমার ঘরের দরজায় কড়া নাড়লো কেউ। আমি অনেক বিরক্ত হলাম। এতো রাতে দরজায় কে? আমি হাতে হারিকেন নিয়ে আলোটা বাড়িয়ে দরজা খুললাম। দেখি একজন পর্দানশীন মহিলা দরজার বাহিরে দাড়িয়ে। আমি তাকে বললাম, এতো রাতে কী চাই? মহিলাটি বললেন, বেহরাম! আমি তোমার কাছে সাহায্যের জন্য এসেছি। আমার ঘরে আলো জ্বালানোর তেল নেই। আমাকে অল্প কিছু তেল ধার দিবে? বাচ্চাগুলো না খেয়ে আছে। তাদের আলো জ্বেলে কিছু একটা খাওয়ানোর চেষ্টা করবো।"
"আমি মহিলার কথা শুনে চরম রাগান্বিত হলাম। একে তো এতো রাত, তাও আবার সামান্য তেলের জন্য বিরক্ত করতে এসেছে? আমি তাঁকে বললাম, কী আশ্চর্য! সারা দিন তুমি কোথায় ছিলে? আমার দোকানে গেলেই তো দিনের বেলা তেল পেয়ে যেতে। আর তোমার চারপাশে কী কোন প্রতিবেশী নেই, তাদের কাছ থেকে নিতে পারলে না?
মহিলাটি বললেন, বেহরাম! আমি তো একটু তেলই চেয়েছি। তাতে এতো রাগান্বিত হচ্ছ কেন? বেহরাম! তুমি মুসলমানদের নবী মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ ﷺ এর নাম শুনেছ?
আমি বললাম, হ্যাঁ! তাঁকে চেনে না দুনিয়াতে কে আছে? তবে আমি তাঁকে মানি না। আমি আগুনের পূজা করি।
মহিলাটি এবার আমাকে এমন কথা বললেন, যা আমার দুনিয়াকে পাল্টে দিল। তিনি বললেন, হে বেহরাম, আমি একজন সাইয়্যেদা। রাসুলুল্লাহ ﷺ এর আওলাদ। আমার জন্য সদকা, যাকাত হারাম। তুমি একজন সম্ভ্রান্ত দানশীল। তাই তোমার কাছেই এসেছিলাম।
ইমাম সাহেব! এই কথা শোনার পর এতো রাতে আমি তড়িৎ আমার খাদেমদের ডাকলাম। তাদের বললাম, এক্ষুনি এই সম্মানিতা ও তাঁর সন্তানদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করো এবং কাপড়চোপড় যা লাগে নিয়ে আস। আমি অনেকগুলো নগদ পয়সা (দীনার) নিলাম। খাবার ও কাপড়ের সাথে সেগুলো একসাথে করে একটি গাট্টি বানালাম। আমি নিজের মাথায় গাট্টি নিয়ে নিলাম। খাদেমরা জোরাজোরি করছিল, যেন তারা সেগুলো বহন করে নিয়ে যায়। আমি তাদের বাধা দিয়ে বললাম, আগামীকাল এক বছরের খাবারের সমস্ত ব্যবস্থা করে দিবে। আর সম্মানিতাকে বললাম, আপনার ও আপনার পরিবারের সকল দায়িত্ব আজকে থেকে আমার।"
বেহরাম কাঁদছে আর বলছে-
"ইমাম সাহেব! আমি মাথায় বস্তা নিয়ে সম্মানিতার পেছন পেছন গোলামের ন্যায় চলতে শুরু করলাম। এক সময় তাঁর ঘরে পৌঁছুলাম। তাঁর অভুক্ত সন্তানেরা এতো খাবার দেখে খুশিতে আত্মহারা হয়ে গেল। একটি বাচ্চা ছেলে সম্মানিতাকে বললো, মা, এতো খাবার কোথা থেকে এলো। কে ব্যবস্থা করলো? সম্মানিতা বললেন, বেহরাম তোমাদের জন্য এই একরাম করেছে।
ইমাম সাহেব! বাচ্চাটি বললো, যার জন্য আমরা এতো এতো খাবার খাবো তাকে আগে দোয়া করে নেই মা! বাচ্চাটি বললো, হে বেহরাম! আজকে আপনি আমাদের যেভাবে খুশি করলেন, কাল হাশরে আল্লাহ তাআ'লাও যেন আপনাকে খুশি করেন। আমার নানাজী ﷺ এর সাথে যেন আপনি জান্নাতে একসাথে থাকেন সেজন্য আমি নানাজী ﷺ কে সুপারিশ করবে।"
ইমাম আব্দুল্লাহ ইবনু মোবারক রাহি. এর চোখের অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। এবার বেহরাম বললো, হে ইমাম সাহেব! অবশ্যই আপনাদের নবী মুহাম্মাদ ﷺ সত্য নবী। আপনি আমাকে কালেমা পড়িয়ে দিন। আমি মুসলিম হতে চাই।
বেহরাম চিরস্থায়ী জাহান্নাম থেকে মুক্তি পেলেন। সকল মুমিনের যে তামান্না, তাই বেহরামের নসীব হলো। বেহরাম, তাঁর পরিবার ও সকল খাদেম মুসলমান হয়ে গেল।
আমরা দরুদ শরিফ পড়ি। কখনো দরুদ শরিফের উপর আমল করতে দেখেছেন? হ্যাঁ, বেহরাম আমাদের তা দেখিয়ে গেলেন। দরুদ শরিফের উপর এভাবেই আমল করতে হয়। পেয়ারা হাবীব ﷺ ও তাঁর আহলে বাইতের জন্য নিজ জান মাল সবকিছু এভাবেই উৎসর্গ করতে হয়।