05/03/2021
আঙ্গুলের ছাপ উদ্ভাবক খান বাহাদুর কাজী আজিজুল হকঃ
আঙ্গুলের ছাপ (Finger Print) পরীক্ষণ/ সংরক্ষনের মাধ্যমে অপরাধী বা ব্যক্তি সনাক্তকরণ পদ্ধতির উদ্ভাবক।
জন্ম: ১৮৭২, ব্রিটিশ ভারতীয় খুলনা জেলার ফুলতলার পয়োগ্রাম কসবা।
মৃত্যু: ১৯৩৫; অবিভক্ত ভারতের চম্পারানে (বর্তমানে বিহার রাজ্যের একটি জেলা যা উত্তর চম্পারান নামে পরিচিত) কাটে তাঁর জীবনের শেষ দিনগুলো। সেখানেই তিনি ১৯৩৫ সালে মারা যান। বিহারের মতিহারি স্টেশনের অনতিদূরে তাঁর নিজের বাড়ি ‘আজিজ মঞ্জিল’-এর সীমানার মধ্যে তাঁকে সমাহিত করা হয়।
জাতীয়তাঃ ব্রিটিশ ভারতীয়
জাতিসত্তাঃ বাঙালি
নাগরিকত্বঃ ব্রিটিশ ভারত
যে জন্য পরিচিতঃ উদ্ভাবক,
পুরস্কারঃ দ্য ফিঙ্গারপ্রিন্ট সোসাইটি 'কাজী আজিজুল হক অ্যান্ড হেমেন্দ্র বসু পুরস্কার'।
♦জন্মস্থান ও শৈশবকালঃ
কাজী আজিজুল হকের পারিবারিক নাম কাজী সৈয়দ আজিজুল হক। তিনি জন্মেছিলেন ১৮৭২ সালে। তিনি কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজের গণিতের ছাত্র ছিলেন।
আঙুল_ছাপ আবিষ্কারঃ
১৮৯২ সালে তিনি কাজ শুরু করেন কলকাতার রাইটার্স বিল্ডিংয়ে। তখন অ্যানথ্রোপমেট্রি (মানবদেহের আকৃতি) পদ্ধতিতে অপরাধীদের শনাক্ত করার কাজ চলত। গণিতের ছাত্র এবং পুলিশ বিভাগে সদ্য সাব-ইন্সপেক্টর পদে চাকরি পাওয়া আজিজুল হক ছাড়াও ফিঙ্গারপ্রিন্ট নিয়ে এর আগে অনেকেই আগে কাজ করেছেন। কিন্তু এর-
★বাস্তবিক প্রয়োগ কি?
★কিভাবে যাচাই করা যায়?
★কিভাবে ফিঙারপ্রিন্ট দিয়ে ব্যক্তিবিশেষকে আলাদা করা যায়?
সেটাই প্রথম আবিষ্কার করেন কাজী আজিজুল হক ও হেমেন্দ্র বসু।
তৎকালীন ব্রিটিশ শাসনামলে বেঙ্গল পুলিশের আইজি ছিলেন এডওয়ার্ড রিচার্ড হেনরি। তিনি ফিঙ্গারপ্রিন্ট নিয়ে গবেষণার জন্য নিয়োগ করেন দুই বাঙালী প্রতিভাকে, একজন গণিতবিদ কাজী আজিজুল হক, আরেকজন হেমচন্দ্র বোস। কাজী আজিজুল হক ও হেমচন্দ্র বোস ৭,০০০ ফিঙ্গারপ্রিন্ট এর এক বিশাল সংগ্রহ গড়ে তোলেন। অনেক পরিশ্রম করে একটা গাণিতিক সূত্র দাড় করলেন যেটা দিয়ে ফিঙারপ্রিন্ট যাচাইয়ের মাধ্যমে ব্যক্তি মানুষ সনাক্ত করা যায়। আধুনিক #অপরাধবিজ্ঞানের এক বিশাল বড় আবিষ্কার। এই পদ্ধতির নাম হওয়া উচিত ছিলো 'বোস-হক আইডেন্টিফিকেশান সিস্টেম।'
কিন্তু এখান থেকেই ইংরেজদের কৃতঘ্নতার শুরু। পুলিশের আইজি হেনরী সবার কাছে প্রচার করা শুরু করলেন যে এই ফিঙারপ্রিন্ট ডিটেকশন সিস্টেম আবিষ্কার করেছেন তিনি নিজেই। এমনকি কাজী আজিজুল হক আর হেমচন্দ্র বোসকে কোন রকম স্বীকৃতি দিতেই অস্বীকার করলেন। তিনি চুপি চুপি একটা পেপার পাবলিশও করে ফেললেন নিজের নামে। অক্লান্ত চেষ্টার ফলে তারা যে পদ্ধতি উদ্ভাবন বা আবিষ্কার করলেন, তা-ই ‘হেনরি_সিস্টেম’ বা ‘হেনরি পদ্ধতি’ নামে পরিচিত পেলো।
আর এভাবেই বাঙালি কাজী আজিজুল হক ও হেমচন্দ্র বোস কর্তৃক আবিষ্কৃত সিস্টেম এর নাম হয়ে গেল 'হেনরী ক্লাসিফিকেশন সিস্টেম।'
এখানে স্মর্তব্য যে, আবিষ্কারকদের অধিকাংশই কিন্তু পশ্চিমা_বিশ্বের ! এর একটি প্রধান কারণ হলো, সেদেশীয় বিজ্ঞানীরা খুব ভাল করেই জানেন কিভাবে আবিষ্কারকের খাতায় নাম প্রতিষ্ঠা করতে হয়। কোন কোন ক্ষেত্রে কাগজ-কলমে প্রমাণ থাকা সত্বেও বিশাল প্রচারের বদৌলতে বিদেশী বিজ্ঞানীরা তাদের নাম প্রতিষ্ঠা করতে সফল হয়েছেন। আবার দু:খজনক হলেও সত্য ব্যবসায়িক স্বার্থে অনুন্নত দেশের আবিষ্কারকদের কোনঠাসা করে রেখেছে ধনী দেশগুলো।
প্রমাণস্বরুপ ১০০ বছরের বেশী সময় ধরে মার্কনী রেডিও (বেতারযন্ত্র) আবিস্কারের কৃতিত্ব পাচ্ছিলেন। এখন সত্য উন্মোচিত হয়েছে এই যে, স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু রেডিও'র প্রকৃত আবিষ্কর্তা। উইকিপিডিয়াতে রেডিও আবিষ্কারকের প্রথম নামটি স্যার জগদীশ চন্দ্র বসুর। কিন্তু তাকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যেন রেডিও নিয়ব্যবসা_বাণিজ্য না করাটা তার ব্যর্থতা কিংবা #অপরাধ।
তবে কাজের পুরস্কার হিসেবে কাজী আজিজুল হককে দেওয়া হয়েছিলো ‘ #খান_বাহাদুর' উপাধি। পাঁচ হাজার টাকা এবং ছোটখাটো একটা জায়গীরদারি এবং চাকরিতে পদোন্নতি পেয়ে হয়েছিলেন পুলিশের সুপার।
১৯৪৭ সালের দেশ ভাগের পর তাঁর পরিবারের অন্য সদস্যরা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান তথা আজকের বাংলাদেশে চলে আসেন। মরহুম আজিজুল হকের পুত্র আসিরুল হক পুলিশ বিভাগের ডিএসপি হয়েছিলেন। তাঁর দুই বিখ্যাত নাতি ও নাতনি হচ্ছেন যথাক্রমে ইতিহাসের অধ্যাপক সালাহউদ্দিন আহমেদ এবং শহীদ জায়া বেগম মুশতারী শফী।
'হেনরি ক্লাসিফিকেশন সিস্টেম' এখন জগৎ বিখ্যাত, মোবাইলের টাচ স্ক্রীনে, ল্যাপটপ আর কম্পিউটারে, অফিসে ডিজিটাল হাজিরা, ডিজিটাল সিকিউরিটি লক সিস্টেমসহ অপরাধী সনাক্তকরণে বলতে গেলে যত্ত জায়গায় ফিঙ্গারপ্রিন্ট ব্যবহৃত হচ্ছে, তত জায়গায় এই হেনরি ক্লাসিফিকেশন সিস্টেমই ব্যবহার করা হচ্ছে। আবিষ্কার করে গেল দুই বাঙালি সন্তান, আর আবিষ্কারক হচ্ছে ব্রিটিশ হেনরি।
যদিও কিছুদিন আগে ব্রিটেনের 'দ্যা ফিঙ্গারপ্রিন্ট সোসাইটি' চালু করেছে 'Azizul Huque & Hemchandra Bose prize'. ওদিকে যে সিস্টেমের নাম হতে পারত 'হক_বোস সিস্টেম ' তা আজ 'হেনরি ক্লাসিফিকেশন সিস্টেম' নামেই অভিহিত রয়ে গেছে।
আর আড়ালেই থেকে গেছেন আমাদের খান বাহাদুর কাজী আজিজুল হক।
https://i.ibb.co/4p57DgK/Fingureprint-Abiskarok-Ajijul-Haque.jpg