27/07/2025
"তুমি তো লেখাপড়ায় অনেক ভালো। বড় হয়ে নিশ্চয়ই ডাক্তার হবে, ইঞ্জিনিয়ার হবে।”
এই বাক্যটিই যেন আমার বেড়ে ওঠার পথচলায় অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। স্কুল কলেজ জীবনে এবং আশপাশের সবাই আমাকে এই কথাটাই বলে এসেছে একাধিক বার । বাবা-মা দুজনেই শিক্ষক, স্বাভাবিকভাবেই তাদের স্বপ্ন ছিল আমি পড়াশোনায় সেরা হবো আর একদিন সমাজে প্রতিষ্ঠিত কেউ হয়ে উঠব—ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার। কিন্তু আমার মন কথা শুনতো না। ছোটবেলা থেকেই আমি খুঁজে ফিরতাম ভিন্ন কিছু যা এই বাঁধাধরা সাদা এপ্রোন, ইঞ্জিনিয়ারের মেশিনের বাইরে।
আমার স্কুলজীবন শুরু হয় মাদারীপুরের এক সরকারি স্কুলে। মায়ের হাত ধরে প্রথম দিন স্কুলে যাই। বাবা-মার চাপে ছোট থেকেই পড়াশোনায় মনোযোগী ছিলাম। ক্লাস ৫-এ বৃত্তি পাই—এটা ছিল আমার প্রথম বড় সাফল্য।কিন্তু ক্লাস ৬ থেকে আমার পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ কমতে থাকে। ক্লাসে বসে থাকলেও মন থাকত বাইরের জগতে। তারপরও বাবা-মার ইচ্ছায় মাধ্যমিক পর্যায়ে ভর্তি হই মাদারীপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে। সেখানে কিছুটা গুছিয়ে নিই। ক্লাস ৮-এ JSC দিই কিন্তু বৃত্তি পাই না। পাশের বাসার আন্টির কটাক্ষ আজও কানে বাজে। সেখান থেকে একরকম জেদ চেপে যাই। ৯ম-১০ম শ্রেণিতে কষ্ট করে আবার নিজেকে তৈরি করি আর SSC তে ভালো ফল করি।SSC পাশ করার পর আমার ইচ্ছা ছিল কমার্স নিয়ে পড়ার। কারণ সায়েন্স আমার কাছে কঠিন আর আমার ভালো লাগতো না। কিন্তু বাবা-মা শিক্ষক বলেই তাঁরা চাইলেন আমি বিজ্ঞান নিয়েই পড়ি। আমি তাঁদের ইচ্ছা অগ্রাহ্য করতে পারিনি। তাই ভর্তি হই মাদারীপুর সরকারি কলেজে, বিজ্ঞান বিভাগে। এভাবে HSC পাশ করে ঢাকায় অসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য।
এরপর ভাবলাম, নতুনভাবে চেষ্টা করতে হবে। ভর্তি পরীক্ষা দিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম, বরিশালসহ নানা জায়গায়, কিন্তু কোথাও সুযোগ পাই না। ভেঙে পড়ি তবে আমার ইচ্ছাকেও আমি আমার ভেতরে লালন পালন করতে থাকি তখনও। লাস্টলি শুনি আমার নাম সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজে এসেছে। মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভগে।আগে কোনো ধারণাই ছিল না কলেজটা কেমন। গিয়ে দেখি বড় শহরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিন্তু সুযোগ সুবিধা এখানেও কম। বলা ভালো, বিদেশ যাওয়ার স্বপ্ন আমার অনেক পুরোনো। কিন্তু IELTS-এর জন্য প্রস্তুতি নেওয়া আমার জন্য সবচেয়ে কঠিন একটা অধ্যায় ছিল। ইংরেজিতে আমার দুর্বলতা ছিল—স্পিকিং, রাইটিং, এমনকি লিসনিংয়েও। একেকটা রেজাল্ট পেয়ে মনে হতো সব শেষ। কিন্তু আমি হাল ছাড়িনি। নিজের মতো সব করে করে গেছি৷ কল সেন্টারে চাকরি করতাম, সেখান থেকে বেতন পেতাম নিজের খরচ চালাতাম আর রাতে বাড়ি ফিরে পড়তাম। অনার্স এর পড়ার সাথে সাথে IELTS কোর্স করতে থাকি, নিজে নিজে প্র্যাকটিস করি, নিজের ভুলগুলো খুঁজি। ধীরে ধীরে উন্নতি হতে থাকে। এরপর একে একে চেষ্টা করি বেলজিয়াম, নরওয়ে, নেদারল্যান্ডস—সব জায়গা থেকে রিজেকশন পাই। হতাশ হয়েছিলাম কিন্তু থামিনি।
অবশেষে আমার কাঙ্ক্ষিত সুযোগ আসে লন্ডনের University of Bedfordshire তে Sustainable Management নিয়ে মাস্টার্স করার। সেই দিনটা আমার জীবনের সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্তগুলোর একটি। এখানে এসে বুঝলাম—আসলে শিক্ষা মানে মুখস্থ না, মানে হলো বুঝে শেখা। আমি এখানে প্রতিটি ক্লাস উপভোগ করি, শেখার প্রতি আগ্রহ আগের চেয়ে শতগুণ বেড়েছে।আমি মাদারীপুরের এক ছোট স্কুলে পড়েছি ঠিকই, কিন্তু স্বপ্ন সবসময় বড় দেখতাম। যেখানেই পড়েছি না কেন, চেষ্টায় ঘাটতি রাখিনি। আজ আমি লন্ডনে মাস্টার্স শেষ করে জব করি একটা ভালো পজিশনে। নিজেই জীবন কে নিজের মতো করে উপভোগ্য করে তুলেছি। নিজেকে প্রমান করেছি "আমি কোথা থেকে এসেছি সেটা বড় কথা নয়, বরং আমি কতদূর যেতে চাই সেটাই আসল।
ছোট প্রতিষ্ঠানে পড়ো কিন্তু স্বপ্ন দেখো বিশাল। পরিশ্রম করো, সময় নাও, হাল ছেড়ো না। কারণ সাফল্য—সে ধৈর্যবানদের প্রতিদান দিতে কখনোই ভুল করে না।
সর্বশেষ, আমি কোনো উপদেশ দিতে চাই না, শুধু কিছু কথা ভাগ করে নিতে চাই। আমাদের জীবন একটাই, আর আমার দৃষ্টিতে সেটাই সবচেয়ে মূল্যবান। তাই বলবো—জীবনকে সীমাবদ্ধ করে দেখবেন না। এই বিশাল পৃথিবী আমাদের জন্যই সৃষ্টি করেছেন সৃষ্টিকর্তা। শুধু একটি দেশেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখার প্রয়োজন নেই।উন্নত দেশের মানুষের জীবনধারা, তাদের চিন্তাভাবনা ও অভ্যাসগুলো পর্যবেক্ষণ করুন, শিখুন এবং প্রয়োগ করুন নিজের জীবনে। দেখবেন, আপনি ধীরে ধীরে আত্মতৃপ্তি ও উন্নতির পথে এগিয়ে যাচ্ছেন। কারণ তারা অনেক দিক থেকেই আমাদের চেয়ে এগিয়ে আছে—এবং শেখার মতো অনেক কিছুই আছে তাদের কাছে।
নিজের জন্য সর্বোত্তমটিই ভাবুন এবং সেই অনুযায়ী কাজ করুন। সাফল্য ধীরে ধীরে ধরা দেবেই। সবকিছুর ভিত্তি হলো—আপনি কতটা গভীরভাবে কিছু চান এবং সেটির জন্য কতটা আন্তরিকভাবে চেষ্টা করেন।আপনার জীবনের দায়িত্ব একমাত্র আপনারই। তাই নিজেকে ভালোবাসুন, উন্নতির জন্য প্রস্তুত থাকুন, এবং বিশ্বকে দেখার মানসিকতা গড়ে তুলুন।
ধন্যবাদ।