11/03/2026
সাইবেরিয়ার পার্মাফ্রস্টে হিমায়িত পাওয়া ৩২,০০০ বছরের পুরনো বীজ থেকে বিজ্ঞানীরা একটি উদ্ভিদকে পুনরুজ্জীবিত করেছেন। এটি এখন পর্যন্ত জীবিত করা সবচেয়ে প্রাচীন জীবনের অস্তিত্ব।
কলিমা নদীর কাছে পৃথিবীর ১২৪ ফুট নীচে চাপা পড়ে থাকা সাইলিন স্টেনোফিলা উদ্ভিদের বীজ গবেষকরা আবিষ্কার করেছেন। বরফ যুগের কাঠবিড়ালির গর্তের ভেতরে আটকে রেখে, বীজগুলিকে স্থির ১৯°F (-৭°C) তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করা হয়েছিল, যা একটি গভীর হিমাঙ্ক যা কার্যকরভাবে পশমী ম্যামথের যুগ থেকে কোষীয় ক্ষয় রোধ করেছিল। পরিপক্ক বীজগুলি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও, বিজ্ঞানীরা অপরিণত নমুনা থেকে কার্যকর টিস্যু বের করে একটি জীবাণুমুক্ত বৃদ্ধি মাধ্যমে স্থাপন করেছিলেন। ফলাফল ছিল একটি সফল পুনর্জন্ম, যার ফলে উদ্ভিদগুলি কেবল ফুল ফোটেনি বরং তাদের নিজস্ব উর্বর বীজও উৎপাদন করে, যা তাদের আধুনিক বংশধরদের থেকে সূক্ষ্ম বিবর্তনীয় পার্থক্য প্রদর্শন করে।
এই অসাধারণ কৃতিত্ব কেবল ইতিহাসের একটি হারিয়ে যাওয়া অংশকে পুনরুজ্জীবিত করার চেয়েও বেশি কিছু করে; এটি জীববৈচিত্র্যের ভবিষ্যতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নীলনকশা প্রদান করে। বত্রিশ সহস্রাব্দ ধরে এই কোষগুলি কীভাবে টিকে ছিল তা অধ্যয়ন করে, বিশেষজ্ঞরা সোয়ালবার্ড গ্লোবাল সিড ভল্টের মতো আধুনিক বীজ ব্যাংকগুলির স্থায়িত্ব বৃদ্ধি করার আশা করছেন। যেহেতু পারমাফ্রস্ট প্রাচীন বাস্তুতন্ত্রের জীবন্ত টুকরো তৈরি করে চলেছে, আবিষ্কারটি ইঙ্গিত দেয় যে পৃথিবীর হিমায়িত স্তরগুলি কেবল অতীতের কবরস্থান নয়, বরং ভবিষ্যতের বিশ্বব্যাপী বিপর্যয়ের বিরুদ্ধে আমাদের গ্রহের জিনগত ঐতিহ্য সংরক্ষণের জন্য একটি সম্ভাব্য পরীক্ষাগার।
সূত্র: source: Yashina, S., Gubin, S., Maksimovich, S., Yashina, A., Gakhova, E., & Gilichinsky, D. Regeneration of whole fertile plants from 30,000-y-old fruit tissue buried in Siberian permafrost. Proceedings of the National Academy of Sciences.
11/03/2026
৫.৫ টনের সোনা দিয়ে তৈরি বিশ্বের সবচেয়ে দামি বুদ্ধমূর্তি, মূল্য ৯০২ মিলিয়ন ডলার!
থাইল্যান্ডের এক বিস্ময়কর ঐতিহ্য হলো গোল্ডেন বুদ্ধ। স্থানীয়ভাবে যার নাম ফ্রা সুখোথাই ত্রাইমিত। ওজন প্রায় ৫.৫ টন। কিন্তু এই মূর্তি যে স্বর্ণনির্মিত, তা মানুষ আগে জানত না। মূর্তির মূল স্বর্ণের কাঠামো রঙিন কাচ ও অন্যান্য আস্তরণে ঢেকে রাখা ছিল, যেন এর প্রকৃত মূল্য গোপন থাকে। প্রায় ২০০ বছর ধরে এটি সেভাবেই ছিল। তখন এটি একটি তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ প্যাগোডায় অবস্থান করছিল। ১৯৫৫ সালে মূর্তিটি স্থানান্তরের সময় অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটে। উত্তোলনের সময় দড়ি ছিঁড়ে যায়, ফলে মূর্তিটিও মাটিতে পড়ে যায়। সেই সময় প্লাস্টারের কিছু অংশ খসে পড়ে। ভেতর থেকে ঝলমলে সোনার অংশ দেখা যায়। সঙ্গে সঙ্গে কাজ বন্ধ করা হয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু হয়।ধীরে ধীরে সব প্লাস্টার সরানো হয়। তখনই জানা যায়, মূর্তিটি আসলে দশটি অংশে তৈরি, যা নিখুঁতভাবে জোড়া লাগানো। নিচের অংশে একটি চাবিও পাওয়া যায়, যা দিয়ে মূর্তিটি খুলে পরিবহন করা যায় সহজে।
মূর্তিটির উচ্চতা প্রায় ৩ মিটার। কিছু বর্ণনায় বলা হয়, ভিত্তি থেকে শীর্ষ পর্যন্ত উচ্চতা ৩.৯১ মিটার, আর হাঁটু থেকে হাঁটু পর্যন্ত প্রস্থ ৩.১০ মিটার। গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস গোল্ডেন বুদ্ধকে স্বীকৃতি দিয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় সলিড সোনার ভাস্কর্য হিসেবে। ২০২৬ সালের জানুয়ারির স্বর্ণমূল্য হিসেবে ৫.৫ মেট্রিক টন সোনার মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৯০২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার!
৫.৫ টন (৫,৫০০ কেজি) ওজনের এই সোনার বুদ্ধ মূর্তিটি, থাইল্যান্ডের ব্যাংককের ওয়াট ট্রাইমিত উইথায়ারাম ওরাউইহান মন্দিরে অবস্থিত। এটি এই মন্দিরের উপরের তলায় স্থাপিত, যা চায়নাটাউনের কাছে সাম্ফান্থাওং জেলার ইয়াওরাত রোডের শেষে অবস্থিত।
11/03/2026
অনাহার, অপমান আর পতন — মোগল হারেমের শেষ পরিণতি!
শেষ মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের সময় কার্যত বিদ্রোহীদের নেতৃত্ব দিতে বাধ্য হন। পরিস্থিতি এমনই ছিল যে, বিদ্রোহীদের দাবিতে সাড়া না দিলে তাঁর প্রাণনাশের আশঙ্কা ছিল। বিদ্রোহ দমন হলে ইংরেজরা তাঁকে বন্দি করে নৌপথে নির্বাসনে পাঠায় রেঙ্গুন (ইয়াঙ্গুন) নগরে। সেখানে তাঁকে “হিন্দুস্তানের বন্দি” হিসেবে রাখা হয় এবং অবশেষে ১৮৬২ সালের ৭ নভেম্বর তাঁর মৃত্যু ঘটে।
যদিও তিনি ১৮৫৭ সালের ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে মোগল সম্রাট ছিলেন, বাস্তবে তার বহু আগেই ব্রিটিশরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল—তাঁর মৃত্যুর পর আর কাউকে ‘বাদশাহ’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হবে না। ১৫২৬ সালে সাম্রাজ্যের সূচনা থেকে ১৮৫৭ সালের এই অবসান পর্যন্ত দীর্ঘ ৩৩১ বছর ধরে মোগল হারেমের অস্তিত্ব ছিল। কিন্তু বাহাদুর শাহ জাফরের বন্দিত্বের সঙ্গে সঙ্গেই তার আনুষ্ঠানিক পরিসমাপ্তি ঘটে। তবে সত্য এই যে, হারেমের ঐতিহ্য, প্রশাসনিক শক্তি ও জৌলুস বহু আগেই ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছিল।
ঐতিহাসিক কিশোরী সরণ লাল–এর মতে, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং নৈতিক অবক্ষয়—এই তিন কারণেই মোগল হারেমের পতন ঘটে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় কারণ ছিল রাজনৈতিক কর্তৃত্বের অবসান ও অর্থনৈতিক সংকট। সাম্রাজ্যের ক্ষমতা ক্ষীণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অর্থের যোগান বন্ধ হয়ে যায়। ফলে হারেম তার বিলাসিতা, আয়োজন, মর্যাদা—সবই হারাতে থাকে। সমাজের দৃষ্টিতেও হারেমের প্রতি যে বিস্ময়, ভয় ও শ্রদ্ধা ছিল, তা ক্রমশ বিলীন হয়। একই সঙ্গে হারেমের সম্ভ্রান্ত নারীরা সমাজে যে দাতব্য ও সামাজিক দায়িত্ব পালন করতেন, অর্থাভাবের কারণে তা আর সম্ভব হয়নি।
হারেমের অভ্যন্তরে বৈষম্যও ছিল প্রবল। সম্রাটের স্ত্রী, উপপত্নী ও রাজপরিবারের মহিলারা বিলাসবহুল জীবনযাপন করলেও নিম্নপদস্থ নারী কর্মচারীদের জীবন ছিল প্রায় ক্রীতদাসের মতো নিয়ন্ত্রিত ও কষ্টকর। সম্রাট ছিলেন সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী; ফলে কোনও সুন্দরী কর্মচারীকেও তাঁর ব্যক্তিগত ইচ্ছার অধীন হতে হতো।
মোগল হারেমের পূর্ণ জৌলুস টিকে ছিল মূলত শাহ আলম দ্বিতীয়–এর সময় পর্যন্ত। সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বাবর এবং তাঁর উত্তরসূরি হুমায়ুন প্রশাসনিক কাঠামো সুসংগঠিত করার মতো সময় পাননি। প্রকৃতপক্ষে আকবর–এর আমলেই হারেম পূর্ণ বিকাশ লাভ করে। তিনি হারেমের প্রশাসন, নিরাপত্তা, শৃঙ্খলা এবং ব্যয়বিধি সুসংহত করেন। পরবর্তী শাসক জাহাঙ্গীর ও ঔরঙ্গজেব কিছু সংস্কার আনলেও মূল কাঠামো অপরিবর্তিত থাকে।
তবে প্রকৃত সংকট শুরু হয় ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর (১৭০৭) পর। এরপর থেকে মোগল দরবারের কার্যকর ক্ষমতা প্রায় লুপ্ত হয়ে যায়। সম্রাটরা নামমাত্র শাসক—বাস্তবে রাজনৈতিক শক্তি অন্যদের হাতে। দরবারে ইতিহাসলেখন, দলিল সংরক্ষণ, শিল্প ও বিদ্যাচর্চার পৃষ্ঠপোষকতা—সবই ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায়। ফলে ঐ সময়ের হারেম সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্যও ক্রমশ দুর্লভ হয়ে ওঠে।
মোগল সাম্রাজ্যের শেষ যুগে আর্থিক অবস্থা কতটা ভয়াবহ হয়ে উঠেছিল, তার এক মর্মান্তিক চিত্র পাওয়া যায় ইতিহাসবিদ যদুনাথ সরকার-এর বিখ্যাত গ্রন্থ Fall of the Mughal Empire-এ। বিশেষ করে আলমগির দ্বিতীয় সিংহাসনে বসার পর মোগল দরবারের দারিদ্র্য যেন নগ্নভাবে প্রকাশ পায়।
সম্রাট সিংহাসনে বসার মাত্র দেড় মাসের মধ্যেই এমন অবস্থা হয় যে ঈদের দিনে জামা মসজিদ-এ যাওয়ার জন্য তাঁর নিজের কোনও যানবাহন পর্যন্ত ছিল না। একসময় যে রাজবংশ অপরিসীম ঐশ্বর্য ও জাঁকজমকের জন্য বিখ্যাত ছিল, সেই বংশের উত্তরাধিকারীকে এমন অসহায় অবস্থায় দেখা যায়। সম্রাটের জন্মদিনে দরবারের দৃশ্যও ছিল অত্যন্ত করুণ— শাহজাহান-এর বিখ্যাত হীরে-রত্নখচিত সোনার ময়ূর সিংহাসনের বদলে একটি কাঠের মসনদ বানিয়ে তাতে রঙ দিয়ে সোনা-রত্নের ছাপ দেওয়া হয়েছিল।
রাজকোষ ছিল কার্যত শূন্য। আহমদ শাহ বাহাদুর-এর আমল থেকেই সরকারি কর্মচারীদের তিন বছরের বেতন বকেয়া ছিল। নতুন সম্রাটের শাসন শুরু হওয়ার ছয় মাস পরও কেউ একটি দাম মুদ্রাও পায়নি। ক্ষুধার্ত অশ্বারোহী সৈন্যরা তাদের ঘোড়া বিক্রি করে দিচ্ছিল, আর পদাতিক সৈন্যদের গায়ে দেওয়ার মতো পোশাকও ছিল না।
এই চরম দুর্দশার কিছুটা অবসান ঘটে যখন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৮০৩-০৪ সালে মোগল হারেমের ব্যয়ের দায়িত্ব নেয়। প্রথমে তারা মাসে নব্বই হাজার টাকা দেওয়ার চুক্তি করে, পরে সেই ভাতা বাড়তে বাড়তে ১৮৩৩ সালে এক লাখ পঁচিশ হাজার টাকায় পৌঁছায়।
এই ঘটনাগুলো স্পষ্ট করে দেয়— মোগল সাম্রাজ্যের পতন শুধু রাজনৈতিক নয়, অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্তরেও ছিল সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ার ইতিহাস। এইভাবে রাজনৈতিক ক্ষমতার পতন, অর্থনৈতিক সংকট এবং সাংস্কৃতিক পৃষ্ঠপোষকতার অবসানের মধ্য দিয়ে মোগল হারেম ধীরে ধীরে ইতিহাসের অন্তরালে মিলিয়ে যায়—শেষ মোগল সম্রাটের নির্বাসনের সঙ্গে যার আনুষ্ঠানিক পরিসমাপ্তি!
রাজপরিবারের অবস্থাও ছিল সমান করুণ। শাহজাদা শাহ আলম দ্বিতীয় (তখন আলি গৌহর নামে পরিচিত) সরকারি কাজে বের হলে লঙ্গরখানা থেকে তাঁর জন্য এক মগ মাংসের ঝোল আনা হয়। কিন্তু তিনি সেটি নিজে না খেয়ে হারেমের মহিলাদের দিতে বলেন— কারণ হারেমের রান্নাঘরে টানা তিন দিন উনুন জ্বলেনি। এমনকি একসময় কয়েকজন শাহজাদি ক্ষুধার যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে প্রাসাদ ছেড়ে শহরে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু ফটক বন্ধ থাকায় একদিন-একরাত সৈন্যদের আবাসেই কাটাতে হয় তাদের।
অর্থাৎ একসময় যে মোগল হারেম বিলাসিতা ও ঐশ্বর্যের প্রতীক ছিল, সেখানে পর্যন্ত লঙ্গরখানার খাবার দিয়ে ক্ষুধা নিবারণ করতে হচ্ছিল।
13/02/2026
পাকিস্তানের সীমান্তঘেঁষা এই অঞ্চলের ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তাদের ভাষা, সংস্কৃতি ও জীবনধারাকে আলাদা পরিচয়ে টিকিয়ে রেখেছে।
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগ পর্যন্ত অঞ্চলটি পরিচিত ছিল কাফিরিস্তান নামে, যার অর্থ 'অবিশ্বাসীদের ভূমি'। কারণ নুরিস্তানিরা তখন আশপাশের মুসলিম জনগোষ্ঠী থেকে ভিন্ন এক প্রাচীন বহুদেববাদী ধর্ম পালন করতেন।
১৮৯৬ সালে আফগান শাসক আবদুর রহমান খান সামরিক অভিযান চালিয়ে অঞ্চলটি জয় করেন। এর পর স্থানীয় জনগণ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে এবং অঞ্চলটির নাম হয় নুরিস্তান, অর্থাৎ 'আলোর ভূমি'।
আজও নুরিস্তানি সমাজ কৃষিকাজ, পশুপালন এবং শক্তিশালী গোত্রভিত্তিক পারিবারিক কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল। দুর্গম আবহাওয়ার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া তাদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক, বিশেষ করে পুরুষদের স্বতন্ত্র টুপি ও স্তরযুক্ত গরম কাপড়, তাদের পরিচয়ের অংশ হয়ে আছে।
ভাষাগত দিক থেকেও নুরিস্তান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে অন্তত ছয়টি পৃথক নুরিস্তানি ভাষা প্রচলিত, যেগুলো ইন্দো-ইরানীয় ভাষাপরিবারের একটি বিরল শাখার অন্তর্গত। আশ্চর্যের বিষয়, অনেক ক্ষেত্রে পার্শ্ববর্তী উপত্যকার ভাষাও পরস্পরের সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে বোধগম্য নয়।
08/02/2026
ইতাকোয়াতিয়ারা (Itacoatiara) হলো ব্রাজিলের রিও ডি জেনেইরোর নিটেরোই (Niterói) শহরের একটি সুপরিচিত সৈকত এলাকা ।
ইতাকোয়াতিয়ারা নামে পরিচিত এই বিশাল পাথরের ফলকটি প্রায় ১৫০ বর্গমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এবং এটি ৪৬ মিটার লম্বা ও প্রায় ৪ মিটার উঁচু একটি প্রাচীর হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।এর পৃষ্ঠদেশ এমন সব খোদাই করা চিত্রে আবৃত যা আজও ব্যাখ্যার অতীত: ফল, প্রাণী এবং অচেনা আকৃতির চিত্রের পাশাপাশি এতে আকাশগঙ্গা (Milky Way) ) এবং কালপুরুষ নক্ষত্রমণ্ডলের চিত্রও রয়েছে। পণ্ডিতরা এই স্থানটিকে ছয় হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো বলে মনে করেন এবং এই কারণেই এটি সারা বিশ্বের প্রত্নতাত্ত্বিক ও নৃতত্ত্ববিদদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাস্থলে পরিণত হয়েছে।
যদিও অনেক চিহ্নই এখনও পাঠোদ্ধার করা যায়নি, তবে কিছু মোটিফ বৈজ্ঞানিক সম্প্রদায় দ্বারা স্বীকৃত ও গৃহীত হয়েছে। এমন কিছু তত্ত্ব রয়েছে যা ইঙ্গা পাথরের সৃষ্টিকে ফিনিশীয়দের সাথে সম্পর্কিত করে, কিন্তু এই ধারণার সমর্থনে কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ নেই। ব্রাজিলীয় গবেষক গ্যাব্রিয়েল বারালদি, যিনি বছরের পর বছর ধরে এই খোদাইগুলো নিয়ে গবেষণা করেছেন, তিনি বিশ্বাস করেন যে এগুলো একটি অজানা কৌশলের চিহ্ন হতে পারে, যা পাথরের উপর আশ্চর্যজনক নির্ভুলতার সাথে চিহ্ন তৈরি করতে সক্ষম ছিল।
08/02/2026
হাতীদের জন্য সোয়েটার বোনেন হিমাচলের গ্রামের মেয়েরা :
শীতের হাত থেকে রক্ষা করতে ভারতের একটি গ্রামের নারীরা হাতির জন্য বুনেছেন বিশাল আকৃতির সোয়েটার। রঙিন উলের তৈরি সেই সোয়েটার পরিয়েও দেয়া হয়েছে হাতির দৈত্যাকার শরীরে। এই সোয়েটারগুলো মূলত উদ্ধার হওয়া দুর্বল হাতিদের নিউমোনিয়া ও ঠান্ডাজনিত রোগের হাত থেকে বাঁচাতে সাহায্য করে l
ভারতের উত্তরাঞ্চলের শহর মথুরার এসওএস এলিফ্যান্ট কনজার্ভেশন অ্যান্ড কেয়ার সেন্টারের কর্মচারীরা প্রথমে তাদের আশঙ্কার কথা জানান যে, তাপমাত্রা হিমাঙ্কের কাছে নেমে আসতে পারে। এরপরই ঠান্ডার কবলে থেকে হাতিদের বাঁচাতে এগিয়ে আসেন গ্রামের নারীরা।
হাতিদের এই সংরক্ষণ কেন্দ্রে সেই সব হাতিদেরই রাখা হয় যারা আগে মানুষের নিষ্ঠুরতার শিকার হয়েছে।
সোয়েটার পরা হাতিদের প্রকাশিত ছবিতে দেখা যায়, হাতে বোনা সুন্দর নকশার সোয়েটারের সঙ্গে রয়েছে পায়জামাও। পা, পিঠ এবং শরীরের ঘাড়ের কাছাকাছি অংশ আবৃত করছে সে সোয়েটার ও পায়জামা।
07/02/2026
নেপোলিয়ন বোনাপার্ট-
১৭৬৯ সালের ১৫ আগস্ট। ভূমধ্যসাগরের বুকে ছোট্ট পাহাড়ি দ্বীপ কর্সিকার আজাকসিও শহরে জন্ম নিল এক শিশু—যার নাম তখন নাপোলিওনে বুওনাপার্টে। কেউ কল্পনাও করতে পারেনি, এই দরিদ্র অভিজাত পরিবারের সন্তান একদিন ইউরোপের মানচিত্র বদলে দেবে। জন্মের মাত্র এক বছর আগেই কর্সিকা ফরাসি অধিকারে আসে—আর সেই ইতিহাসের স্রোতেই ভেসে উঠবেন ভবিষ্যতের সম্রাট নেপোলিয়ন বোনাপার্ট।
শৈশবে নেপোলিয়ন ছিলেন নীরব, একগুঁয়ে ও আত্মমগ্ন। মূল ভূখণ্ড ফ্রান্সে পড়াশোনার সময় ফরাসি ভাষায় দুর্বলতা এবং কর্সিকান উচ্চারণের জন্য সহপাঠীদের বিদ্রূপ সহ্য করতে হয়েছে তাকে। কিন্তু এই অবহেলাই যেন তার ভেতরে জন্ম দিয়েছিল অদম্য উচ্চাকাঙ্ক্ষা। সামরিক একাডেমিতে গণিত ও আর্টিলারিতে অসাধারণ দক্ষতা তাকে আলাদা করে তুলেছিল। মাত্র ষোল বছর বয়সে সে হয়ে উঠল ফরাসি সেনাবাহিনীর একজন অফিসার।
১৭৮৯ সালে ফরাসি বিপ্লব শুরু হলে ইউরোপ কেঁপে ওঠে। রাজতন্ত্র ভেঙে পড়ে, পুরনো ব্যবস্থা ধ্বংস হয়। এই বিশৃঙ্খলার মধ্যেই নেপোলিয়নের উত্থান। তুলোঁ অবরোধে তার কৌশলী আর্টিলারি ব্যবহারে শত্রু পরাস্ত হয়, আর রাতারাতি সে পরিণত হয় বিপ্লবের নায়কে। অল্প বয়সেই ব্রিগেডিয়ার জেনারেল—ফ্রান্সের ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা।
ইতালিতে অভিযান ছিল তার প্রতিভার প্রকৃত প্রদর্শনী। সংখ্যায় কম, রসদে দুর্বল—তবুও নেপোলিয়নের বাহিনী একের পর এক যুদ্ধে অস্ট্রিয়ান সেনাদের পরাজিত করল। সৈন্যদের উদ্দেশে তার ভাষণ ছিল আগুনের মতো—“সৈনিকেরা, তোমরা অনাহারে আছ, নগ্ন—আমি তোমাদের সম্মান ও গৌরবের পথে নিয়ে যাচ্ছি।” সৈন্যরা তাকে শুধু কমান্ডার নয়, ভাগ্যবিধাতা বলে বিশ্বাস করতে শুরু করল।
১৭৯৮ সালে মিশর অভিযান ছিল একদিকে সাহসী, অন্যদিকে দুর্ভাগ্যের সূচনা। পিরামিডের ছায়ায় মামলুকদের পরাজয় ইতিহাসে লেখা হলো, কিন্তু নীল নদের যুদ্ধে ব্রিটিশ নৌবহর ফরাসি শক্তিকে প্রায় ধ্বংস করে দেয়। তবুও নেপোলিয়ন পরাজয়ের খবর চাপা দিয়ে ফ্রান্সে ফিরে আসে—কারণ তার লক্ষ্য যুদ্ধ নয়, ক্ষমতা।
১৭৯৯ সালের ১৮ ব্রুমায়ার। বন্দুকের আওয়াজ ছাড়াই এক অভ্যুত্থানে পতন ঘটে ডাইরেক্টরির। নেপোলিয়ন হয়ে ওঠে প্রথম কনসাল—ফ্রান্সের কার্যত শাসক। কয়েক বছরের মধ্যেই তিনি আইন, প্রশাসন, শিক্ষা ও অর্থনীতিকে নতুন কাঠামোয় সাজিয়ে তোলেন। নেপোলিয়নিক কোড ইউরোপজুড়ে আইনের মানদণ্ড হয়ে ওঠে। ১৮০৪ সালে, নটরডেম ক্যাথেড্রালে, তিনি নিজ হাতে নিজের মাথায় সম্রাটের মুকুট পরান—ইতিহাসে এক অনন্য দৃশ্য।
সম্রাট নেপোলিয়নের যুদ্ধযাত্রা যেন একের পর এক বজ্রপাত। অস্টারলিটজে রাশিয়া ও অস্ট্রিয়ার সম্মিলিত বাহিনী পরাজিত হয়, ভেঙে পড়ে পবিত্র রোমান সাম্রাজ্য। ইউরোপ জুড়ে তার সাম্রাজ্য বিস্তৃত হয়। ভাই, বন্ধু, আত্মীয়—সবার মাথায় বসে রাজমুকুট। কিন্তু এই সাফল্যের আড়ালেই জমতে থাকে পতনের বীজ।
১৮১২ সালের রাশিয়া অভিযান ছিল নেপোলিয়নের সবচেয়ে মারাত্মক ভুল। বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে মস্কো প্রবেশ করলেও, আগুনে পোড়া শহর ও নির্মম শীত তার সেনাদের নিঃশেষ করে দেয়। যে বাহিনী নিয়ে সে রওনা দিয়েছিল, তার সামান্য অংশই ফিরে আসে। ইউরোপ বুঝে যায়—নেপোলিয়ন অজেয় নন।
পরাজয়ের পর পরাজয়। ১৮১৪ সালে প্যারিস পতন হয়, নেপোলিয়ন সিংহাসন ত্যাগ করে নির্বাসিত হন এলবা দ্বীপে। কিন্তু গল্প এখানেই শেষ নয়। ১৮১৫ সালে, তিনি ফিরে আসেন—“শত দিনের অভিযান” শুরু হয়। জনতা আবারও তাকে বরণ করে নেয়। কিন্তু ভাগ্য এবার নিষ্ঠুর। ওয়াটারলু যুদ্ধে চূড়ান্ত পরাজয় তার ভাগ্য সিল করে দেয়।
শেষ অধ্যায় শুরু হয় সেন্ট হেলেনার নিঃসঙ্গ দ্বীপে। সম্রাট থেকে বন্দি—সময়ের নির্মম পরিহাস। ১৮২১ সালের ৫ মে, মাত্র ৫১ বছর বয়সে, নেপোলিয়ন বোনাপার্ট মৃত্যুবরণ করেন। তিনি চলে গেলেও রেখে গেলেন এক বিশাল উত্তরাধিকার—যুদ্ধ, আইন, সংস্কার ও কিংবদন্তির মিশেলে গড়া এক অমর ইতিহাস।
-Manas Bangla
20/01/2026
আলোর দিকে সাঁতার কাটা :
Ajuluchuks Ugo Okeke
১৯১৭ সালের অক্টোবর মাসে, ইতালীয় অভিবাসীদের নিউইয়র্কে নিয়ে যাওয়া একটি যাত্রীবাহী জাহাজ ভয়াবহ আটলান্টিক ঝড়ের কবলে পড়ে।
সেই জাহাজে ছিলেন আটাশ বছর বয়সী কাঠমিস্ত্রি আন্তোনিও রুসো এবং তার পাঁচ বছরের মেয়ে মারিয়া। আন্তোনিওর স্ত্রী দুই বছর আগে সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মারা যান। দারিদ্র্য থেকে পালিয়ে মেয়েকে এমন এক ভবিষ্যৎ দিতে, যা ইতালি দিতে পারেনি, আমেরিকাই ছিল তার শেষ আশার জায়গা।
রাত ২টায় বিশাল ঢেউ জাহাজের ডেকের উপর আছড়ে পড়ে। তৃতীয় শ্রেণির যাত্রীদের ঘুমানোর নিচের অংশগুলোতে পানি ঢুকে যায়। জাহাজটি হঠাৎ তীব্রভাবে কাত হয়ে পড়ে। করিডোর জুড়ে চিৎকার ছড়িয়ে পড়ে, মানুষ আতঙ্কে সিঁড়ির দিকে ছুটতে থাকে—একে অন্যকে ধাক্কা দিতে দিতে, পিষে ফেলতে ফেলতে। আন্তোনিও তাদের খাট থেকে মারিয়াকে তুলে নেন এবং বাড়তে থাকা পানির ওপরে তাকে তুলে ধরে সামনে এগোতে থাকেন। কিন্তু ভিড় ছিল খুব ঘন, পানি বাড়ছিল খুব দ্রুত, আর জাহাজের ঢাল খুব বেশি খাড়া।
আন্তোনিও ভয়ংকর সত্যটা বুঝে যান—তারা লাইফবোটে পৌঁছাতে পারবে না।
আর মাত্র কয়েক মিনিট সময় ছিল।
এই বিশৃঙ্খলার মাঝেই তিনি একটি ভাঙা জানালার মতো ছিদ্র (পোর্টহোল)-এ পৌঁছান, যা ঝড়ে ভেঙে গিয়েছিল। সেটি কেবল একটি শিশুর যাওয়ার মতোই বড়। তার ওপারে ছিল কালো, বরফশীতল আটলান্টিক মহাসাগর। দূরে তিনি পানির ওপর দিয়ে সার্চলাইটের আলো ঘুরতে দেখলেন—উদ্ধারকারী নৌকা আসছিল।
তিনি মারিয়ার দিকে তাকালেন— মেয়ে ভয়ে কাঁপছে, মায়ের জন্য কাঁদছে, তাকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে আছে। আর তখনই তিনি এমন একটি সিদ্ধান্ত নিলেন, যা তার জীবনকে সংজ্ঞায়িত করে দেবে।
আন্তোনিও তার মেয়েকে সেই ছিদ্র দিয়ে ঠেলে দিলেন।
মারিয়া সমুদ্রে পড়ে গিয়ে চিৎকার করে উঠল। ঝড়ের গর্জন ভেদ করে আন্তোনিও তার দিকে চেঁচিয়ে উঠলেন—
“সাঁতার কাটো, মারিয়া! আলোর দিকে সাঁতার কাটো! জাহাজ আসছে! সাঁতার কাটো!”
তিনি জানতেন, তার মেয়ের বাঁচার একটা সুযোগ আছে।
তিনি জানতেন, তার নিজের বাচার উপায় নেই।
সাত মিনিট পর জাহাজটি ডুবে যায়। ডেকের নিচে আটকে পড়া তৃতীয় শ্রেণির আরও ১১৭ জন যাত্রীর সঙ্গে আন্তোনিও রুসোও ডুবে মারা যান। তার দেহ আর কখনো পাওয়া যায়নি।
পঁয়তাল্লিশ মিনিট পরে মারিয়া রুসোকে পানি থেকে উদ্ধার করা হয়—তীব্র হাইপোথার্মিয়া ও প্রায় ডুবে যাওয়ার অবস্থায়, কিন্তু জীবিত। তাকে কম্বলে মুড়ে একটি হাসপাতাল জাহাজে নেওয়া হয়। সে তখন মাত্র পাঁচ বছরের একটি শিশু—অনাথ, মানসিকভাবে বিধ্বস্ত, এক বিদেশি দেশে, ইংরেজি বলতে অক্ষম।
সে শুধু তার বাবার শেষ কথাগুলোই মনে রেখেছিল—
“আলোর দিকে সাঁতার কাটো।”
মারিয়াকে নিউইয়র্কের একটি অনাথ আশ্রমে রাখা হয়। বহু বছর সে বিশ্বাস করত, তার বাবা হয়তো এখনও বেঁচে আছেন। কেউ তাকে আন্তোনিও রুসোর ভাগ্যের কথা বলতে পারেনি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই আশা রূপ নেয় বিভ্রান্তিতে… তারপর যন্ত্রণায়। সে এমন এক অচিন্তনীয় বিশ্বাসে পৌঁছে যায়—তার বাবা তাকে ফেলে দিয়েছেন, সে ভেবেছিলো সমুদ্রে ছুড়ে দেওয়ার মানে তিনি তাকে বাচাতে চাননি।
এই বিশ্বাস নিয়েই সে পঁচিশ বছর বেঁচে ছিল।
সে ত্রিশ বছর বয়সে গিয়ে সত্য জানতে পারে। ১৯১৭ সালের সেই জাহাজডুবির যাত্রী তালিকা পর্যালোচনা করতে গিয়ে এক গবেষক মৃতদের তালিকায় আন্তোনিও রুসোর নাম খুঁজে পান। তখনই মারিয়া জানতে পারে তার বাবা কী করেছিলেন—
আসলে মেয়ে বাঁচুক বলেই তিনি নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন।
মারিয়া রুসো ২০০৪ সালে, ৯২ বছর বয়সে মারা যান।
১৯৯৫ সালে, ৮৩ বছর বয়সে, জাহাজডুবি নিয়ে এক সাক্ষাৎকারে তিনি তার গল্প বলেন—
“আমি ভেবেছিলাম আমার বাবা আমাকে মেরে ফেলছেন। বুঝতে পারিনি, তিনি আমাকে বাঁচাচ্ছিলেন। বহু বছর ধরে ভেবেছি, তিনি আমাকে ছুড়ে ফেলে দিয়েছেন। আসলে তিনি আমাকে জীবনের দিকে ছুড়ে দিয়েছিলেন।”
মারিয়া পরে বিয়ে করেন। তার চার সন্তান, নয় নাতি-নাতনি এবং ছয় প্রপৌত্র-প্রপৌত্রী হয়—মোট একত্রিশজন উত্তরসূরি, যারা আজ অস্তিত্বশীল শুধুমাত্র একজন মানুষের অন্ধকার আটলান্টিকে নেওয়া অসম্ভব এক সিদ্ধান্তের কারণে।
“আমার জীবনের প্রতিটি জন্মদিন, প্রতিটি ভালো মুহূর্ত আছে, কারণ আমার বাবা নিজেকে নয়—আমাকে বেছে নিয়েছিলেন। প্রতিরাতে আমি সেই জানালার ফাঁকে তার মুখ দেখি। আমি তাকে চিৎকার করতে শুনি—‘আলোর দিকে সাঁতার কাটো’। আটাত্তর বছর ধরে আমি আলোর দিকেই সাঁতার কেটে চলেছি। আশা করি, আমি তাকে গর্বিত করতে পেরেছি।”
বাবা আন্তোনিও রুসো সম্পর্কে তার মেয়ের শেষ কথাগুলো ছিল খুবই সহজ—
“ধন্যবাদ, বাবা। আমাকে জীবনের দিকে ছুড়ে দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ। তি আমো।”
কিছু ভালোবাসার কাজ এক জীবনের গণ্ডি ছাড়িয়ে বহু প্রজন্ম ধরে বেঁচে থাকে।
বাবা মানে সেই মানুষ, যে নিজে ডুবে গিয়েও সন্তানের জন্য আলো খুঁজে দেয়।
বাবা মানে নিঃশব্দ ত্যাগ, যা বুঝতে আমাদের অনেক সময় লেগে যায়।
তার শক্ত হাতটাই শেষ ভরসা, যখন পুরো পৃথিবী অন্ধকার হয়ে আসে।
কিছু বাবা বেঁচে থাকেন না—তবু সারাজীবন আমাদের বাঁচিয়ে রাখেন।
-প্রতীকী ছবি I
20/01/2026
পুরাণে এক ভয়ংকর আকর্ষণীয় নারী লিলিথ।
লিলিথকে পাওয়া যায় ইহুদি মিথলজিতে। আদমকে সৃষ্টির পর ঈশ্বর তার একাকীত্ব দূর করার জন্য প্রথম নারী সৃষ্টি করেন যার নাম লিলিথ, এটাই ইহুদি দর্শন। লিলিথ ছিলো আত্মসম্মানবোধে পরিপূর্ণ এক নারী, সৃষ্টির প্রথম নারী। তার জন্ম সেই মাটি থেকেই, যা থেকে আদমের জন্ম। যার কারণে পরবর্তীতে লিলিথ মেনে নিতে চায় নি আদমের আধিপত্য। লিলিথ’, নামটির মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায় এক ধরণের সারল্য এবং অসাধারণ মাধুর্য। শুনলেই কোনো স্নিগ্ধ ষোড়শীর মুখ ফুটে ওঠে মনে। লিলিথ শব্দটির প্রচলিত অর্থ রাত্রি হলেও ইহুদী শাস্ত্রে লিলিথ চরিত্রকে দেখানো হয় অন্ধকারের পিশাচ রূপে। আর এই লিলিথ হচ্ছে আদমের প্রথম স্ত্রী! শুনতে অদ্ভুত লাগে, তাই না?
বরাবর হাওয়াকে আমরা আদমের সাথে কল্পনা করে এসেছি, সেখানে আদমের ‘প্রথম স্ত্রী’ ব্যাপারটা ধাক্কা দেয়ার মতোই! তত্ব অনুযায়ী, সৃষ্টির পরই লিলিথের সাথে আদমের দ্বন্দ্ব শুরু হয় মূলত সঙ্গমের সময়। নিজেকে শ্রেষ্ঠ দাবী করা আদম লিলিথকে বোঝাতে চায় তার জায়গা উপরে নয়, নীচে। লিলিথ তা মানতে অস্বীকার করে। যে শ্রেষ্ঠতার দাবী আদম করে আসছে, লিলিথ তা উড়িয়ে দেয় এক নিমেষে। যেহেতু একই মাটি থেকে একই উপায়ে তাদের তৈরী করা হয়েছে, সেহেতু আদম নিজেকে শ্রেষ্ঠ দাবী করতে পারে না, পারে না তার উপর কর্তৃত্ব করতে। এতসব মতভেদের কারণে স্বেচ্ছায় স্বর্গ থেকে মর্ত্যে নেমে যায় লিলিথ!
লিলিথের ব্যবহারে নাখোশ আদম অভিযোগ করে স্রষ্টার কাছে। এমন সঙ্গিনী তাকে কেন দেওয়া হলো! যে তার কথা শোনে না? যে পালিয়ে গেল তাকে ছেড়ে? লিলিথের উপর বিরক্ত স্রষ্টা তার তিন ফেরেশতা পাঠায় লিলিথকে খুঁজে বের করতে। ফেরেশতারা স্রষ্টার বার্তা নিয়ে যায় লিলিথের জন্য। যদি সে ফিরে আসে, মেনে নেয় আদমের কর্তৃত্ব, তাহলে তাকে ক্ষমা করে দেয়া হবে। আর যদি সে প্রত্যাখ্যান করে, তাকে পেতে হবে শাস্তি। ফেরেশতারা লিলিথকে মিশরের এক সমুদ্র তীরে খুঁজে পায়। তাদের সাথে ফিরে যেতে বলে তাকে। কিন্তু লিলিথ বলে সে আর ফিরে যাবে না। এরপর তাকে শোনানো হয় ফিরে না যাওয়ার শাস্তি। শাস্তি মাথা পেতে নিয়ে স্বর্গ ত্যাগ করে লিলিথ, হয়ে যায় অভিশপ্ত!
মিথলজিতে লিলিথকে যেভাবেই প্রকাশ করা হোক না কেন, সাহিত্যিকদের চোখে লিলিথ বরাবরই একজন আকর্ষণীয় নারী চরিত্রেই প্রতীয়মান হয়েছে। লিলিথকে একদিক থেকে যেমন দেখানো হয়েছে অন্ধকারের প্রতিরূপ হিসাবে, আরেক দিকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে তার এক বিদ্রোহী রূপ। স্বর্গের সুখ ছেড়ে আসা এক নির্বোধ নারী, কিংবা নিজের অধিকারের জন্যে একাকী লড়ে যাওয়া এক দৃঢ়চেতা চরিত্র। তার চরিত্রের বিশ্লেষণ নির্ভর করে দৃষ্টিভঙ্গির উপর।
-মীর মোনাজ হক
07/01/2026
ছবিটিতে দেখা যায়, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীর একজন মুসলিম সৈনিক—যিনি মেসোপটেমিয়া (Iraq) ফ্রন্টে কর্মরত ছিলেন—একজন ক্ষুধার্ত খ্রিস্টান মহিলাকে খাবার দিচ্ছেন। যুদ্ধের নির্মম বাস্তবতার মাঝেও মানবিকতার এমন দৃশ্য ইতিহাসে বিরল হলেও অমূল্য।
এই ধরনের মানবিক মুহূর্ত নিয়ে সে সময়ের বিভিন্ন পত্রিকা ও প্রতিবেদনেও উল্লেখ রয়েছে। বিশেষ করে মুসলিম সৈনিকরা যুদ্ধক্ষেত্র ও যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকায় বহু অনাহারী ও অসহায় মানুষকে সাহায্য করেছিলেন—ধর্ম, জাতি বা পরিচয়ের ভেদাভেদ না করেই।
ছবির সৈনিকটি ছিলেন ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর পাঞ্জাবি মুসলিম রেজিমেন্টের সদস্য। সে সময় এই রেজিমেন্টের মুসলিম সৈনিকরা পাগড়ির সঙ্গে বিশেষ ধরনের নকশাযুক্ত (নকিলি) টুপি ব্যবহার করতেন—যা তাদের পরিচয়ের একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ছিল।
এই ছবিটি শুধু একটি ঐতিহাসিক দলিল নয়, বরং এটি তুলে ধরে ইসলামী সংস্কৃতির মূল মানবিক দর্শন—
ক্ষুধার্তকে খাবার দেওয়া এবং তৃষ্ণার্তকে পানি পান করানো।
যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও মানবতার এই আলো ইতিহাসের পাতায় আজও দীপ্তিমান।
07/01/2026
ফকরুদ্দিন বিরিয়ানি - ঢাকার এক মোহাজির শিল্প :
হাজী ফখরুদ্দিন ছিলেন ভারতের পাটনার দারভাঙ্গার বাসিন্দা। ভারত ভাগের পর ১৯৫৬ সালে সপরিবারে চলে আসেন চট্টগ্রামে। জীবিকার কোনো ঠিক ছিল না। অনেকটা ভাগ্যান্বেষণেই তিনি ১৯৬৫ সালে ঢাকায় আসেন। এটা-ওটা নানা কাজের পর ভিকারুননিসা নূন স্কুলে দারোয়ানের চাকরি পান তার পরের বছর। তখন স্কুলটিও এমন বড় ছিল না, ছাত্রীও ছিল কম। স্কুল কতৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে তিনি স্কুলের কম্পাউন্ডে ক্যান্টিন চালানো শুরু করেন। রান্নায় কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছিল না। তবে রান্না শিখেছিলেন দিল্লির নবাব পরিবারের পাচকদের উত্তরসূরি মুসলিম মিয়ার কাছ থেকে। গুরুর তালিম আর নিজের হাতযশে দ্রুতই তাঁর রান্নার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। যারাই তাঁর রান্না খেয়েছেন, হাতে তাঁর জাদুর ছোঁয়া আছে বলে স্বীকার করেছেন। ক্রমেই পরিণত হয়ে উঠেন ঢাকার কিংবদন্তির বাবুর্চি হিসেবে। সেই ক্যান্টিন থেকেই আজকের ফখরুদ্দিন বিরিয়ানী ও রেষ্টুরেন্ট এর জন্ম। বর্তমানে এই রেস্টুরেন্টের ঢাকায় সাতটি শাখা রয়েছে। এর মধ্যে মতিঝিলের জুট এসোসিয়েশন ভবনে রয়েছে একটি শাখা। ২০০৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সিঙ্গাপুরে এই রেস্টুরেন্টের একটি প্রবাসী শাখা খোলা হয়।
১৯৯৫ সালে হাজী ফখরুদ্দিন বাবুর্চি মারা যাবার পর তাঁর দুই ছেলে হাজী মোঃ শফিক এবং হাজী মোঃ রফিক এই প্রতিষ্ঠান চালাচ্ছেন। শুধু বাংলাদেশে নয়, ফখরুদ্দিনের বিরিয়ানির স্বাদ পৌঁছে গিয়েছিল জাপান, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর হয়ে জর্ডানের রাজপরিবারের অনুষ্ঠানেও। ঢাকার এই বিরিয়ানির স্বাদ নিয়েছেন জর্ডানের রাজপরিবারের বিয়ের অনুষ্ঠানের অতিথিরাও।
ঢাকায় ভিকারুননিসা নূন স্কুলের পাশে তাঁদের আদি কেন্দ্রটি ছাড়াও মগবাজার, গুলশান-১, ধানমন্ডি, মতিঝিল, বনানী ও উত্তরায় এবং চট্টগ্রামে শাখা করা হয়। এ ছাড়া সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া, দুবাইয় এবং লন্ডনেও ‘ফখরুদ্দিন বিরিয়ানি অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট’-এর শাখা ছিল।
ছবিতে আশির দশকে ঢাকায় একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে বিশ্বখ্যাত বাবুর্চি হাজী মো. ফখরুদ্দীন বাবুর্চি (ডান দিক থেকে প্রথম)।