13/02/2015
স্বপন কুমার ভৌমিক, এক পিতৃতুল্য শিক্ষকের অবসর
-------------------------------------------------------
“ভগবান, তুমি যুগে যুগে দূত, পাঠায়েছ বারে বারে
দয়াহীন সংসারে,
তারা বলে গেল ‘ক্ষমা করো সবে’, বলে গেল ‘ভালোবাসো-
অন্তর হতে বিদ্বেষবিষ নাশো’।
বরণীয় তারা, স্মরণীয় তারা, তবুও বাহির-দ্বারে
আজি দুর্দিনে ফিরানু তাদের ব্যর্থ নমস্কারে।”
(প্রশ্ন/রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)
সব শিশুই মাটিতেই ভূমিষ্ট হয়। হামাগুড়ি গুড়ি দেয়, হুটোপুটি খায়। শরীরের মাটির গন্ধ হয়। একদিন সে স্থানুবর্তী হয়ে উঠে দাঁড়ায়। হাঁটে শেখে, এগিয়ে যায়। শরীর সেই গন্ধ হারিয়ে যায়। কিন্তু কেউ কেউ থাকেন, যারা শরীরের জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত মাটির গন্ধ থাকে। বাবু শ্রী স্বপন কুমার ভৌমিক। বারুয়াখালী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। প্রতিষ্ঠাকাল আজ অবধি তা-ই। তার শরীরের মাটির সেই গন্ধ পাওয়া যায়, শোদা গন্ধ। তিনি ভালবেসে আষ্টেপিষ্টে মেখে ছিলেন সেই গন্ধ।
তার পরিবারের সদস্যরা ভারত চলে গেছেন অনেক আগেই, ১৯৮২ সালে। তিনিও গিয়েছিলেন। থাকতে পারেননি। এই মাটিতে তার নাড়ি পোতা আছে। সেই নাড়িতে টান লাগে। তিনি সেখানে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তুমুল অসুস্থ। তিনি বুঝেন সে মাটিতে তার শরীর-বৃক্ষ জড় মেলবে না। বরং উন্মুল হয়ে থাকবে। ওই যে, তার গায়ে লেগে আছে এই মাটির গন্ধ। তিনি আবার দেশে ফিরে আসেন সেই নাড়ি টানে, এই নদী-জল-বাতাসের টানে। শ্বাস নেন প্রাণ ভরে। এদেশে আশার পরপরই বারুয়াখালী উচ্চ বিদ্যালয়ে আসেন প্রধান শিক্ষক হয়ে। সেই থেকে পরম মমতায় আপন করে নিয়েছিলনে এই বিদ্যালয়টিকে। ঠেলা গাড়ি টানার মতো পেছন থেকে ধাক্কা দিয়েছেন, সামনে থেকে টানেছেন। কখনো সহকর্মীকে গাড়ি টানতে দিয়ে নিজে উঠে বসে থাকেন না, হাত-পা গুটিয়ে। মহান শিক্ষকরা যেমন হয়।
শিক্ষকতা দিয়েই তার পেশা জীবন শুরু। ’৭৬-এ আক্কাস কাজী তাকে শিকারীপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষতা করতে বলেন। সেই থেকেই শুরু। বারুয়াখালী উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক হারুন-অর-রশিদ, জাহাঙ্গীর ভুঁইয়া, মঞ্জুর আলম নাহীদ, আমজাদ হোসেন সহ অনেকই তার সেই সময়ের ছাত্র। মাঝে একবার স্বল্প সময়ের জন্য ছেদ পড়ে। তার পরিবারের সবাই ভারতে চলে যায়। তিনিও গিয়ে ছিলেন। আবার ফিরে আসেন। শিক্ষকতা শুরু করেন আবার। এক হিসেবে বারুয়াখালী উচ্চ বিদ্যালয়ে এখন তার শিক্ষক জীবনের তিন প্রজন্ম কাজ করছে। তার ছাত্র এবং ছাত্রর ছাত্র।
ছাত্র জীবনে ভাল খেলাধুলা করতেন তিনি। ফুটবলের উপর ছিল তার দারুন দখল। স্কুল-কলেজ জীবনে চমৎকার ফুটবল খেতেন। গোল যেমন করতেন, করাতেনও তেমন। সে সময় বেশকিছু খেলায় জেতার স্মৃতি আছে তার। বারুয়াখালী উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রথম দিকে কখনো ছাত্রদের-কখনো শিক্ষকদের অনুরোধ, জোরাবলিতে বাধ্যয়ে মাঠে নামতেন। মূলত তিনি উৎসাহ দিতেন। তার পায়ের মাপ এখনো চৌকস। খেলার মাঠে নির্ভুলভাবে বর্শা, চাকতি ছুড়ে শিক্ষার্থীদের বুঝিয়ে দিতেন কিভাবে ছুড়তে। তা দেখলে বোঝা যায় তার খেলার দক্ষতা।
পাঠ বইয়ের বাইরে প্রচুর বই পড়তেন তিনি। রবীন্দ্র-নজরুল-সুকান্ত-জীবনানন্দ-কায়কোবাদ-মধুসূধন-ঈশ্বচন্দ্রগুপ্ত-শামসুর রাহমান প্রমুখের। কবিতার অজস্র লাইন তার মুখস্ত। শিক্ষক হিসেবে ক্লাসে শুনিয়েছেন তা বহুবার। ধ্রুপদী সাহিত্য আর পৌরাণিক কাহিনী তার আত্মস্ত। তাই তার ক্লাসটা আনন্দ পাঠ হয়ে ওঠতো। বাংলা ক্লাসটা হয়ে ওঠতো আবৃতির ক্লাস, আর ধর্ম ক্লাস হয়ে ওঠতো পৌরানিক চরিত্রর লীলা ভূমি। যেকোনো মহান শিক্ষকদের মতো, তিনি উদাহরণ দিয়ে দিয়ে কথা বলেন। তার বিষয় উপস্থাপন পালকের মতো নরম, মেঘের মতো উদাস। ভাষা তার আন্তরিক আর সমৃদ্ধ। ক্লাসে বক্তৃতা দিতে দিতে নিজেই হয়ে ওঠতেন বই। গল্পের চরিত্রের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যেতেন। আবেগ তাড়িত হতেন কখনো। ক্লাসে তাই কেউ অমনো যোগী হলে দুঃখ পেতেন তিনি।
তিনি খুব আশাবাদী মানুষ। বিদ্যালয়ের নানা ঝঞ্ঝার মধ্যেও আশার কথা, স্বপ্নে কথা, সংগ্রামের কথা বলেগেছেন সারা জীবন। শিক্ষার্থীদের সুকুমার বৃত্তির বিকাশের কথা বলতেন। কবিতাকে ভালবাসতে শেখাতেন। লিখতে উৎসাহিত করতেন। তিনি যেন সেই মহান কথাটাই পুনঃ প্রতিষ্ঠা করে যান, ‘পৃথিবীতে সেই শিক্ষকই শ্রেষ্ঠ শিক্ষাক, তার ছাত্র তাঁকেও অতিক্রম করে।’ কোনো একজন শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেলে, ভাল কোথাও চান্স পেলে, ভাল একটা চাকুরি পেলে তিনি সবা চাইতে খুশি হন তিনি। সবার কাছে বলতে ভালবাসেন, ‘জানিস, ও আমাদের ছাত্র/ছাত্রী...।’
ছোট খাট মানুষ স্যার, কিন্তু ভেতরে অমিত তেজ বোঝাই। ভেতরে ভেতরে সবাই তাকে সমীহ করতো। স্পষ্টভাষী আর সদালাপী তিনি। কথার সময় মুখে একখিলি পান পুড়ে দিয়ে,তার তার কথার উচ্ছ্বাস যেন আর ধরে না। মুখে একছড়া হাসি সবসময় লেগেই থাকতো। তার সেই হাসি হাসি মুখ হাজারো শিক্ষার্থীর প্রেরণা। পান খেতেন। ক্লাস চলাকালীন সময়ে কে কি পড়াচ্ছেন, কিভাবে পড়াচ্ছেন, কোনো শিক্ষার্থী অমনোযোগী কি না দেখেতেন। স্কুলের এ-মাথা থেকে ও-মাথা, বারান্দা দিয়ে তাকে ঘুরতে দেখে মনে হতো একখণ্ড জমাট স্বপ্ন, একতাল ভালবাসা ঘুরে বেড়েছেন।
শিক্ষার্থীদের খুব ভালবাসতেন তিনি। মন ছিল আরো কোমল। বাবা-মা ছাড়া যেন কথাই বলতে পারেন না। শিক্ষার্থীদের খুব প্রশ্রয় দিতেন। একবার না পাড়লে ধৈর্য নিয়ে বারবার বোঝাতেন। শিক্ষার্থী কোনো অপকর্ম করলে পেটাতেন। তারপর টেবিলের ওপর চশমা নামিয়ে নিজেই কাঁদতেন। কখনো কখনো নিজের পকেটের টাকা গোপনে কোনো এক দরিদ্র শিক্ষার্থী বা অভিভাবকে গুঁজে দেয়ার ঘটনা তার আছে। ছোট্ট করে বলতেন, ‘ওরে খাওয়াইয়েন।’ তার টাকায় টিফিন খেয়ে অনেক শিক্ষার্থীই ক্ষুধা নিবারণ করছেন। স্কুলে কেউ অসুস্থ হলে তাকেই সবচেয়ে উদ্বিগ্ন দেখায়। এমনো হয়েছে, একজন শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়েও ক্লাস করছে, কিংবা স্কুলের বারান্দায় হাঁটছেন। তিনি দেখে, কাছে ডেকে কপালে হাত দিয়ে বলতেন, ‘তুই তো অসুস্থ, যা যা, বাড়ি যা।’ এই ভাল বাসতেন বলেই ফাঁকিবাজ শিক্ষার্থীদের জন্য কঠোর হতে পারতেন।
তখন শিক্ষকের কারো কারো অমত থাকলেও এসএসসি রেজাল্ট ভাল করার জন্য শিক্ষার্থীদের বাড়ি বাড়ি যাওয়ার ব্যবস্থা তিনিই চালু করেছিলেন। নিজেও গেছেন অনেক বাড়ি। তখন অনেক শিক্ষার্থীর পড়ার জানালায় ভেসে উঠেছে তার মুখ। হয়তো সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে, এমন সময় তিনি শিক্ষার্থীর বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে নাম ধরে হাক দিতেন, ‘কি রে .... বাড়ি আছস নি?’
তিনি শিক্ষার্থীদের তুই-তুমি বলে সম্বোধন করতেন। এটা তার আত্মার ডাক। শিক্ষার্থীরাও এই ডাক মেনে নিয়েছিল পরম শ্রদ্ধায়। আসলে এই শব্দে ডাকার যে ইমেজ, তা তার ষোল আনায় ছিল। তিনি পিতার মতো সবইকে আগলে রেখেছেন। রাস্তা-ঘাটে দেখা হয়েও শিক্ষার্থীদের খোঁজ খবর নিতেন।
কি শিক্ষক-কি শিক্ষার্থী, পাঠ্য পুস্তকের বাইরে সবাই বিস্তর জোর দিতেন। এজন্য স্কুল লাইব্রেরিটা উন্নতির জন্য চেষ্টা করেছেন। তিনি চাইতেন সবাই সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত হোক। ক্লাসে, শিক্ষক মিটিংয়ে, স্কুলের অনুষ্ঠানে সেই কথা বুঝাতে চেয়েছেন বহুবার। শুধু শিক্ষার্থী নয়, শিক্ষকদেরও বলতেন এই কথা। বলতে বলতে আবেগে-দুঃখে-ক্ষোভে কেঁদেও ফেলেছেন। সবাই হয়তো তার কথা শুনেনি, আকুতি বুঝেনি। যারা শুনেছে-বুঝেছে, তাদের প্রতি তার অগাধ ভালবাসা।
তিনি শিক্ষকতা করেছেন সারা জীবন। হাজার হাজার শিক্ষার্থীকে পড়িয়েছেন। এখনো রাস্তায় দেখা হলে, শিক্ষার্থীকে আশ্চর্য করে দিয়ে নাম ধরে বলেন, ‘কি রে...নাম... কেমন আছিস। আসিস স্কুলে।’ একসময় তিনি সাইকেল নিয়ে স্কুলে যাতায়াত করতেন। বিকেলের ম্লান আলোয় একটা ফনিক্স চালিয়ে স্যার যাচ্ছেন, এটা বহু শিক্ষার্থীরই দেখা পরম যত্নে দৃশ্য। ঝড় হোক-বৃষ্টি হোক, তিনি স্কুলে আসবেনই। যেন বলেন, এতো ছাত্র-ছাত্রী আসবো আর আমি না গিয়ে পারি। অসুস্থ শরীরেও স্কুলে আসা থেকে বিরত থাকতেন না তিনি। স্যার ছিলেন জন্মগতভাবে ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের লোক। কিন্তু কর্মগত ভাবে, নিজের জীবনে চূড়ান্ত রকমের অসাম্প্রদায়িকতা বজায় রেখেছেন তিনি। তিনি হয়ে ওঠেছেন সবার পিতা।
স্বপন কুমার ভৌমিক জন্মেছেন শিকারী পাড়ায়। শিকারীপাড়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মেট্রিক(বর্তমানে এসএসসি) দিয়েছেন ষাটের দশকের প্রথমে। তারপর পড়েছেন জগন্নাথ কলেজে (বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়)। শিক্ষা জীবনে মেধাবী ছাত্র ছিলেন। মেধা শুধু শিক্ষায় নয়, সমাজেও কাজে লাগিয়েছেন। তৎকালীন অনেক মতো তারও আর্থিক অবস্থা খুববেশি ভাল ছিল না তাদের। এজন্য টিউশনিও করতেন। তার পিতাও ছিলেন একজন স্কুল শিক্ষক। বাবার আদর্শের সবটুকু যেন ধারণ করছেন তিনি। শিকারীপাড়ার প্রভাবশালী মানুষ আক্কাস কাজী। ’৪৭ সালের দেশবিভাগের দেশবিভাগের পূর্বে তিনি বঙ্গবন্ধুর বন্ধু ও সহপাঠী ছিলেন। দেশ ভাগের পর স্বাভাবিক ভাবেই তিনি আওয়ামীলীদের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। আক্কাস কাজী অগাধ স্নেহ করতেন স্বপন কুমার ভৌমিককে। তার কাছ থেকেই পেয়েছিলেন আদর্শ, বিনয় আর নির্মোহের শিক্ষা। খুব আদর্শবাদী ছিলেন স্বপন কুমার। তখন ষাটের দশক। উত্তাল সময়। মুক্তিযুদ্ধ আসন্ন। দেশে কাজে নেমে পড়া মেধাবীদেরই কাজ। ছাত্র জীবনে রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে ছিলেন সেই আদর্শ আর দেশ প্রেমের জায়গা থেকে। স্কুলে থাকতেই তিনি ছাত্র লীগের সঙ্গে যুক্ত হন। শিকারীপাড়া ইউনিয়েন ছাত্র লীগের সাধারণ সম্পাদকেরও দায়িত্বপালন করেছেন। সেদিনের সেই ছাত্র লীগ আর বর্তমান ছাত্র লীগের মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাৎ। তিনি গিয়েছিলেন আদর্শের কারণে। আদর্শের কারণে একবার ভেবে ছিলেন ছাত্র ইউনিয়নে যোগ দিবেন। তবে তা আর হয়ে ওঠেনি। রাজনীতিতে আদর্শ হারিয়ে যাওয়ার কারণে স্বাধীনতা উত্তর সময়ে তিনি আর রাজনীতিতে জাড়ননি। বরং আদর্শকেই বুকে ধারণ করে আছেন। তথাপি স্বাধীনতা উত্তর সময়ে তাকে দুইবার জেলে যেতে হয়, ’৭৬-এর, এবং পরে।
খুব সাদামাটা জীবন যাপন করেন। তার জীবন যেন একাকার হয়ে আছে বারুয়াখালী উচ্চ বিদ্যালয়ের সঙ্গে। অস্বীকার করার উপায় নেই, বিদ্যালয়ে তাকে সবটুকু দেয়া সম্ভব হয়নি। শেষে দিকে এসেও বিদ্যালয়ের চরম রকমের বাজে অভিজ্ঞাতার মুখোমুখি হতে হলো। এর আগেও এক-দুইবার স্কুলের ভালোর জন্য তাকে লাঞ্চিত হতে হয়েছে। তিনি ইচ্ছে করলে তাদের বিরুদ্দে অনেক কিছুই করতে পারতেন। কিছুই করেননি। ক্ষমা করেছেন। তার অকুণ্ঠ ক্ষমায় নত হয়েছে সবাই। তার ব্যক্তিত্বই এমন- চূড়ান্ত রকমের সৎ, নির্মোহ, উদার। স্কুলের অনেক সংকট তার ব্যক্তিত্বের কাছে এসে নুইয়ে পড়েছে। তার অমন ব্যক্তিত্ব ছিল বলে অনেকেই অন্যায় থেকে বিরত থেকেছে।
১৯৯২ থেকে ২০১৫, ২৩ বছর। এর মধ্যে প্রায় ২০টি ব্যাচের এসএসসি পরিক্ষার্থীদের বিদায় দিয়েছেন। প্রতিবছরই স্কুলের বিদায় অনুষ্ঠানে সমান ভাবে কেঁদেছেন। প্রাক্তন আর বর্তমান শিক্ষার্থী মাত্র দেখেছে সেই দৃশ্য। প্রথম দিকে বিদায়ের দিন ঘনিয়ে আসতেই তিনি যেন ক্রমেই স্তম্ভিত হয়ে যেতেন। যেন এতগুলো শিক্ষার্থীদের কি করে বিদায় দেবেন, ভেবেই বিহ্বল। শিক্ষার্থীদের জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতেন। এরমাঝেই শান্তনা দিতেন। কখনো বলতেন-বিদ্যালয়ের মান রাখিস, স্কুলে আসিস মাঝে মাঝে। কেউ যদি স্যারের বাড়ি গিছে তো কি, স্যার যেন তার আপন সন্তানকেই কাছে পেলেন। আসতে তিনি নিজের সন্তান ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে কোনো ফারাক করেন নি। তার স্ত্রীও গুণী মানুষ। তিনিও যেন উছলে ওঠেন। কি গল্প কি আপ্যায়নে। ঘরে যা আছে সব বের করে দিতে পারলে বাঁচেন। তার হাতে যে আপ্যায়িত হয়েছে - নাড়ু-মুড়ি, পিঠা-পায়েস খেয়েছে, তা সারা জীবনে ভোলার নয়। তাকেও আমরা প্রণতি জানাই। শ্রদ্ধা ভরে স্মরণ করি।
বসন্ত এসেছে প্রকৃতিতে। ঋতুরাজ বসন্ত। ফুলে ফুলে ফুলে ছেয়ে গেছে পলাশ-শিমুল-কাঠল চাঁপার ডাল। আজ আমাদের প্রিয় স্বপন কুমার ভৌমিক স্যারের শেষ কর্মদিস। আজ তিনি বিদায় নেবেন। সবাই কাঁদবেন। তিনিও কাঁদবেন। কে কাকে শান্তনা দিবে? স্যারে নিজে তো শিক্ষা দিয়েছেনই, জীবন-আদর্শ দিয়েও যেন শিক্ষা দিয়েগেছেন। স্যারের চেয়ারটা ফাঁকা থাকবে না। তবে ঘর আলো করে রাখা মানুষটা থাকবে না, তা ভাবা যায় না। ভাবতে চোখে জল আসে। বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মতো, প্রতিটি গাছ, প্রতিটি ঘাস-পাতাও যেন তার যত্নে ও স্নেহে বেড়ে উঠেছে। বিদ্যালয়ের বারান্দাটা, মাঠ, ঘর, আসবাদ তার জন্য হুঁ হুঁ করবে। শূণ্যতা অনুভর করে স্তব্ধ থাকবে, কাঁদবে। তিনি বিদ্যালয়ের প্রথম বিদায়ী প্রধান শিক্ষক। বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা থেকে আজ অবধি তার অবদান গভীর। কিন্তু ধন-সম্পদে না হোক, মনের সম্পদে আমরা এতটাই দীন, স্যারকে আড়ম্বর ভাবে বিদায় দিতে পারলাম। আড়ম্বর রইলো শুধু অশ্রুতে। তাই প্রকৃতির সমস্ত ফুল তাকে দিলাম। তবে যে হৃদয় তিনি বড় করে দিয়েছেন শিক্ষা ও ভালবাসায়। সেটা তার চিরদিনের। প্রকাশ করতে না পারলেও, স্পন্দনের মতো বলছে, আমি আপনাকে ভালবাসি স্যার, কোনো হয়তো বোঝাতে পারেনি। আপনার স্নেহ ছিল বলে তো অবাধ্য হওয়ার স্পর্ধ দেখিয়েছি। আপনার অসীম ক্ষমা আছে তাই, স্বীকার করছি। রাস্তায় বা যেখানে প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দেখা হলেই বলেন, কিরে কেমন আছি? স্কুলে আসি কিংবা বাড়িতে আসিস। আমরাও বলছি, স্যার আপনি আসবেন। আপনি এলে এই স্কুল জেগে ওঠে, প্রাণ পায়। স্যার, আপনি ভালবাসতে পারতেন, আমরাই তা নিতে পারিনি।
দেশে শিশু মৃত্যুর হার কমনয়। শিশু জন্মের পরও ৫-৭ বছর পর্যন্ত মৃত্যুর সম্ভাবনা থাকে। একটু স্কুলের জীবন চক্রও তেমনি। স্বপন কুমার ভৌমিক একটি স্কুলের জন্ম থেকে যুব বয়স পর্যন্ত পৌছে দিয়েছেন। এবার স্কুলটি যদি তার আকাঙ্ক্ষা, তার স্বপ্ন, উত্তর উন্নতি করতে পারে, তবেই হবে তার প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন। এই পিতৃতুল্য শিক্ষককে আমরা কখনো ভুলবো না।
নিয়মানুয়ায়ি স্কুলগুলোতে এখন সারকুলার দিয়ে ‘শিক্ষক’ নিয়োগ দেয়া হয়। তারা স্কুলে পড়ান। স্কুলে পড়ালেই কি তিনি শিক্ষক হয়ে যান? না। অনেকেই পড়ান, কিন্তু সবাই শিক্ষক নন। শিক্ষক হওয়ার জন্য পড়ানোর ক্ষমতা ছাড়াও তার কিছু থাকতে হয়। এসব থাকলে তিনি কাউকে সরাসরি না পড়িয়েও শিক্ষক হয়ে ওঠতে পারেন। এমন কি জাতির শিক্ষকও হয়ে ওঠেন কেউ কেউ। বাংলাদেশে তার অনেক উদাহরণ আছে। বারুয়াখালী উচ্চ বিদ্যালয় সারা দেশে তো নয়ই, এমনটি ঢাকা জেলায়ও নয়, নবাবগঞ্জ উপজেলা পরিচিত একটি বিদ্যালয়। শিক্ষা-দীক্ষায় ততটা নামকরা নয়, তবে একটা মান আছে। স্বপন স্যার সেই স্কুলেরই প্রধান শিক্ষক। তার জন্ম, বেড়ে ওঠা, শিক্ষা-দীক্ষার কারণে হয়তো জাতির শিক্ষক হননি। তবে জাতিকে কতগুলো প্রজন্ম, একটি বিদ্যালয় উপহার দিয়েছেন। যেখান থেকে আরো শত-সহস্র প্রজন্ম বের হবে। যেখান থেকে জাতির কর্ণধারও জন্ম হবে। স্বপন স্যার সেই স্বপ্নই দেখতেন। তার মাঝে শিক্ষক গুণাবলির অনেকটাই আছে। যার বলে তিনি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছে বিশেষ সম্মানের মানুষ। সে কারণেই কিনা, অনেক ঝড়-ঝাপড়া তার উপর দিয়েই যায়। বেঁচে যায় সহকর্মীরা, বেঁচে যায় স্কুল। তবু তাঁর বিনয় হবে না, তিনি হয়তো বলবেন—
‘সেতারেতে বাঁধিলাম তার,
গাহিলাম আরবার
মোর নাম এই’ বলে খ্যাত হোক,
আমি তোমাদেরই লোক,
আর কিছু নয়,
এই হোক শেষ পরিচয়।’
পদাবলীর ইতিহাস থেকে জানা যায়, ভৌমিক শব্দের মানে ভূমির অধিকারী বা ভূ-স্বামী। এই শব্দ থেকেই ভুঁইয়া পদবির উৎপত্তি। স্বপন স্যার, ভূ-সম্মত্তির তেমন মালিক নন। একটি মাত্র ছেলে তার। নাম সজল কুমার ভৌমিক। পিতার মতোই গুণী হয়েছেন তিনি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগে। এছেলেই এখন স্বপন স্যারের সম্পদ। কিন্তু পুরো স্কুলটা-ই যেন তিনি অধিকার করে নিয়েছেন। তিনি বারুয়াখালী উচ্চ বিদ্যালয়ের গর্ব। তার শূন্য পূরণ হওয়ার নয়। তিনি সকল শিক্ষার্থীদেরই অভিভাবক।
এই পিতার বিদায়ে আমরা তাঁকে উৎসর্গ করছি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বিদায়’ কবিতাটা:
“ক্ষমা করো, ধৈর্য ধরো,
হউক সুন্দরতর
বিদায়ের ক্ষণ।
মৃত্যু নয়, ধ্বংস নয়,
নহে বিচ্ছেদের ভয়—
শুধু সমাপন।
শুধু সুখ হতে স্মৃতি,
শুধু ব্যথা হতে গীতি,
তরী হতে তীর—
খেলা হতে খেলাশ্রান্তি,
বাসনা হইতে শান্তি,
নভ হতে নীড়।
দিনান্তের নম্র কর
পড়ুক মাথার ’পর,
আঁখি ’পরে ঘুম—
হৃদয়ের পত্রপুটে
গোপনে উঠুক ফুটে
নিশার কুসুম।
আরতির শঙ্খরবে
নামিয়া আসুক তবে
পূর্ণ পরিণাম—
হাসি নয়, অশ্রু নয়,
উদার বৈরাগ্যময়
বিশাল বিশ্রাম।
প্রভাতে যে পাখি‐ সবে
গেয়েছিল কলরবে
থামুক এখন।
প্রভাতে যে ফুলগুলি
জেগেছিল মুখ তুলি
মুদুক নয়ন।
প্রভাতে যে বায়ুদল
ফিরেছিল সচঞ্চল
যাক থেমে যাক।
নীরবে উদয় হোক
অসীম নক্ষত্রলোক
পরমনির্বাক।
হে মহাসুন্দর শেষ
হে বিদায় অনিমেষ,
হে সৌম্য বিষাদ—
ক্ষণেক দাঁড়াও স্থির,
মুছায়ে নয়ননীর
করো আশীর্বাদ।
ক্ষণেক দাঁড়াও স্থির,
পদতলে নমি শির
তব যাত্রাপথে—
নিষ্কম্প প্রদীপ ধরি
নিঃশব্দে আরতি করি
নিস্তব্ধ জগতে।”
১০ চৈত্র ১৩০৫