04/02/2020
"স্বর্গীয় শ্রী কুলরঞ্জন গোস্বামী সম্পর্কে কিছু কথা"
শেরপুর জেলার অন্তর্গত নকলা উপজেলার একমাত্র শতবর্ষী স্কুল চন্দ্রকোনা রাজলক্ষ্মী উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক স্বর্গীয় শ্রী কুলরঞ্জন গোস্বামী আপাদমস্তক অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী লোক ছিলেন। সনাতন ধর্মের লোক হয়েও চন্দ্রকোনার চরমধুয়া গ্রামের এক মাদ্রাসার ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ছিলেন, যা বর্তমান বাংলাদেশে চিন্তাই করা যায় না। তাঁর মৃত্যুর পর ভারতের ব্যারাকপুরের স্থানীয় সংবাদপত্রে তাঁর সম্পর্কে যে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় তা হুবহু তুলে ধরলাম। আশাকরি বর্তমান প্রজন্ম তাঁর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে নিজেদের আদর্শবান নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলবে।
কুলরঞ্জন গোস্বামী
(১৯২২-২০০২)
- মাধব ভট্টাচার্য
১৯৬৬-৬৭'র পূর্ব পাকিস্তান। পূর্ব পাকিস্তান তখনও বাংলাদেশ হয়ে উঠেনি। কিন্তু মাটি উত্তপ্ত হচ্ছিল ধীরে ধীরে। এরকমই কোন এক মুহূর্তে সাদা ধুতি আর সাদা পাঞ্জাবি পরা ছ'ফুট দীর্ঘ সুঠাম সুন্দর স্বাস্থ্যের এক গোস্বামী ব্রাহ্মণ ছাতা মাথায় হেঁটে চলেছেন মাঠের আল ধরে পাশের গ্রামের মাদ্রাসায়। মাদ্রাসা থেকে মৌলভী সাহেবরা এসেছেন তাকে নিয়ে যেতে। যেতেই হবে। তিনি না গেলে যে মিটিং হবে না, সমস্যার সমাধান হবে না-তাই তিনি চলেছেন। এই গোস্বামীজি না মাদ্রাসা কমিটির প্রেসিডেন্ট। তাঁর যাওয়া মানেই সব সমস্যার সমাধান। সাদামাটা মানুষটির এমনই ছিল ব্যক্তিত্ব। ঘরের বাইরে সর্বত্র। এই মানুষটিই ৪২ এর ভারত ছাড়ো আন্দোলনে ইংরেজ তাড়াতে গিয়ে ব্রিটিশ পুলিশের হাতে গুলিবিদ্ধ হয়ে জেল খেটেছেন। ময়মনসিংহের সেন্ট্রাল জেলে বসে পড়াশোনা করে পরীক্ষা দিয়ে বিএ পাস করেছেন। স্বদেশী কয়েদিদের বিনোদনের কথা ভেবে জেলখানাতে তাদের নিয়ে নাটক করেছেন, ব্যাডমিন্টন খেলছেন, উদাত্ত কন্ঠে নজরুলের শেকল ভাঙার গান গেয়েছেন। এমনই ছিলেন প্রাণ প্রাচুর্যে একটি মানুষ। যখন স্যামনগরে ছিলেন প্রতিদিন ভোরে সূর্যের আলো ফোটার আগে, ব্রাহ্মমুহূর্তে কালিবাড়ি গঙ্গার ঘাটে নেমে নাল পেরে সূর্য প্রণাম করতে করতে উচ্চারণ করতেন-
ও জবাকুসুম সঙ্কাশং কাশ্যপেয়ং মহাদ্যুতিম।
ধ্বান্তারিং সর্ব পাপঘ্নং প্রণতোহস্মি
দিবাকরম।।
প্রতিদিন সকালে চন্ডীস্তোত্র পাঠ করে যিনি দিন শুরু করতেন- সেই মানুষটির দিন শেষ হয়ে গেল ৩১ মার্চের গভীর রাতে। কি এক অসহ্য যন্ত্রণা বুক জুড়ে। উঠে বসলেন বিছানায়। স্ত্রীকে ডাকলেন। কিন্তু তারপর কি যেন বলতে চাইছেন, যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যাচ্ছে শরীর কিন্তু মুখ দিয়ে যে কোনো কথা বেরোচ্ছে না। অসহায়া স্ত্রীর সে কি হা হতাশ! না, কথা আর মুখ থেকে সরল না, অব্যক্তই থেকে গেল। শেষবারের মতো স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরে কাতর কন্ঠ কঁকিয়ে উঠলো মাত্র। ব্যাস, তিনি চলে গেলেন। ১৯২২ থেকে ২০০২ দীর্ঘ ৮০ বছরের পথ পরিক্রমার অবসান।
মানুষটির নাম কুলরঞ্জন গোস্বামী। জন্মেছিলেন বর্তমান বাংলাদেশের এক অজ পাড়া গাঁ যশোদলে ১৯২২ এর ১ জুলাই। বাবা রুক্মিণীকান্ত মা শশীবালা। পিতৃ দত্ত নাম ছিল কুলদা। ৮ বছরের কুলদা তিন কিলোমিটার দূরের ধলা স্কুলে যেদিন প্রথম ভর্তি হতে গিয়েছিল স্কুলের হেডমাস্টার কুলদা নাম পাল্টে কুলরঞ্জন লিখে দিয়েছিলেন। কুলদা হয়ে গেলেন কুলরঞ্জন। কি রহস্য ছিল সেদিন ওই নাম পরিবর্তনের মধ্যে? 'কুল' থেকে 'দা' সরে গেলেও উত্তর জীবনে কুলরঞ্জন তার বংশ কুলকে রঞ্জিতই করেছেন।
স্কুলের পড়া শেষ করে কুলরঞ্জন ময়ময়মনসিংহ শহরে এসে আনন্দমোহন কলেজে ভর্তি হলেন। রাজনীতিতে ঢুকে পড়েছেন তখন। বিপ্লবী সুরেন্দ্রমোহন ঘোষের সান্নিধ্য তাকে সক্রিয় আন্দোলনের পথে দীক্ষা দিল। অবশ্য তারও আগে তার জীবনে রাজনীতির উন্মেষ প্রদীপটি জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন তার মামা নলিনীকান্ত চক্রবর্তী ও মাসি থিরুদা দেবি। নলিনীকান্ত ময়মনসিংহে সূর্যকান্ত আচার্য রাজ এস্টেটের ম্যানেজার ছিলেন।
প্রায় বছর ২ জেলে কাটিয়ে ১৯৪৪ সালে জেল থেকে ছাড়া পেয়ে ভাগ্যান্বেষণে বেরিয়ে শিক্ষকতাকেই জীবনের পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন এবং আজীবন তাই করে গেছেন। ময়মনসিংহ জেলার একটা ছোট্ট গ্রাম চন্দ্রকোনা। গ্রামে সব একটা স্কুল তৈরি হয়েছে। টিনের ছাউনি, নড়বড়ে খুঁটি, মুলি বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘেরা। বেঞ্চ, চেয়ার, টেবিল আছে কি নেই। সেই স্কুলে পড়ানোর জন্য বিএ পাস শিক্ষক প্রয়োজন। চন্দ্রকোনা বা আশেপাশের কোন বিএ পাশ ছেলে খুঁজে পাওয়া যায়নি। স্কুলের দুই কর্মকর্তা ময়মনসিংহ শহরে এসে বিএ পাশ মাস্টার খুঁজছেন।
এক বন্ধুর কাপড়ের দোকানে বসে আড্ডা দিচ্ছিলেন কুলরঞ্জন। সেই দোকানের সামনে দুই আগন্তুক এসে দাঁড়ালো। কৌতুহলী চোখ, কারো মুখে কোন কথা নেই। কুলরঞ্জন জিজ্ঞেস করলেন- কি চাই?
-না, মানে আমরা দূর গ্রাম থেকে আসছিলাম, মাস্টার খুঁজছি।
- মাস্টার!
-হ্যাঁ, বিএ পাস মাস্টার।
-কাপড়ের দোকানে মাস্টার পাওয়া যায় নাকি?
- তা ঠিক, কোথায় পাব জানিনা, এই আপনাদের দেখে দাঁড়ালাম। যদি সন্ধান দিতে পারেন।
- কুলরঞ্জন ওদের চোখ মুখের দিকে তাকিয়ে কৌতুক করেই বললেন- আমাকে দিয়ে হবে? আমি বিএ পাস।
- তাই! তাহলে তো পেয়ে গেলাম। আপনার মত পাশ করা জোয়ান ছেলে সে তো খুবই ভালো।
চাকরি হয়ে গেল কুলরঞ্জনের। ময়মনসিংহ টাউন থেকে খানিক ট্রেনে, খানিক নৌকাতে চেপে নদীপথে, গরুর গাড়িতে করে চন্দ্রকোনা এসে পৌঁছালেন একদিন কুলরঞ্জন গোস্বামী। জরিপ মিয়া আর বাচ্চু মিয়া এসে নিয়ে গিয়েছিলেন।
সেই আশা। তারপরে যে কি মায়ায় জড়িয়ে গেলেন আর ফেরা হলো না। মুলি বাঁশের বেড়া দেয়া সেই জুনিয়র স্কুলটাই হয়ে গেল তার কাছে যেন তীর্থক্ষেত্র। স্কুল কমিটিকে তিনি জানালেন শুধু ছেলেরা কেন মেয়েরাও পড়বে। নারী শিক্ষা না হলে যে দেশ জাগবে না। তাই হল। স্কুলে চালু হলো কো-এডুকেশন প্রথা। কিছুদিনের জন্য কলকাতা এসেছিলেন এমএ পড়তে। এই যা ছেদ। এরই মধ্যে ঘর বাঁধলেন। শেরপুর জমিদার স্টেটের নায়েব দ্বিজেন্দ্র চন্দ্র ভট্টাচার্য্যের বড় মেয়ে বেনুর সঙ্গে বিয়ে হল এক শুভ মুহূর্তে। সুখের সংসার।
১৯৫৪ সালে চন্দ্রকোনা রাজলক্ষ্মী ইনস্টিটিউশনের হেডমাস্টার হলেন কুলরঞ্জন। একটা জুনিয়র হাই স্কুলকে বাইলেটারেল বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত করলেন তিল তিল করে। আবার ১৯৬৮ সালে একদিন নিজ হাতে গড়া তীর্থ ছেড়ে সপরিবারে চলে এলেন এপারে। বৃদ্ধ শিক্ষক কামিনী রায়, মহবুর, হাসমতের সে কি কান্না। কিছুদিন কলকাতা থেকে এলেন শ্যামনগরে। দীর্ঘদিন কাটিয়েছেন শ্যামনগরে। ১৯৭২ এ স্কটিশ এ চাকুরী হওয়ার পর তো ট্রেনে ডেইলি প্যাসেঞ্জারী। ১৯৮৮তে অবসর। বই ছিল তার নিত্যসঙ্গী।
ভারত সরকার ব্রাহ্মলিপ্ত দিয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামীকে সম্মান জানিয়েছেন। গুণমুগ্ধরা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন স্মারক তুলে দিয়েছেন। এই প্রতিবেদকের সৌভাগ্য হয়েছিল তার ছাত্র হবার। শুধু বিদ্যা শিক্ষা নয়, একজন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষকে কাছে থেকে দেখার সুযোগ মিলেছিল।
দূরদৃষ্টি ছিল, ব্যক্তিত্ব ছিল, প্রাণে আনন্দ ছিল, ছিল ভালোবাসার আধার। মানুষকে আপন করে নিতে পারতেন মুহূর্তে। মানুষের ভালোবাসাও পেয়েছেন অফুরান।
ছোট্ট ফ্ল্যাট বাড়িতে সেই মানুষটি আজ আর নেই। ছড়িয়ে আছে ইতস্তত তার স্মৃতি। প্রিয়তমা স্ত্রীর উদাস চোখে ক্ষণে ক্ষণে জল, পুত্র-পুত্রবধুদের ম্লান মুখ, নাতি- নাতনীরা এখনও এঘর ওঘর খুঁজে বেড়ায় তাদের দাদুকে। এও তো বাঁচা। অন্যরকম বাঁচা।