04/12/2020
Open Heart
Monday, March 25, 2019
৭১ যুদ্ধের সময়ে ময়মনসিংহ
স্বাধীনতা ঘোষনার পর প্রথম যুদ্ধজয় ময়মনসিংহে
মহান মুক্তিযুদ্ধের আঞ্চলিক ইতিহাসে- ময়মনসিংহ এক উজ্জ্বল অধ্যায়। ২৬ মার্চ মধ্যরাতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমান স্বাধীনতা ঘোষনা করেন। এর ২৪ ঘন্টা পর। ২৭ মার্চ ১৯৭১। খাগডহর ইপিআর ক্যাম্পে বাঙালি ইপিআর সৈনিকদের সাথে পাকিস্তানী ইপিআরদের মধ্যে সশস্ত্র যুদ্ধ হয়। রাতবর চলা সেই যুদ্ধ পরদিন ২৮ মার্চ সকাল ৮টা পর্যন্ত চলে। যুদ্ধে পাকিস্তানী ক্যাপ্টেন কমর আক্কাস সহ ১২১ জন পাকিস্তানী ইপিআর খতম হয়। বিপরীতে শহীদ হয় ৬ বাঙালি সেনা। শহীদ হন দেলোয়ার, এমদাদুল, আনোয়ার, রাজ্জাক, হায়দার ও অর্জিত দত্ত। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে খাগডহর ইপিআর ক্যাম্পের ৮ ঘন্টার যুদ্ধ খাগডহর যুদ্ধ নামে খ্যাত। এ যুদ্ধের তাৎপর্য বহুমাত্রিক।
স্বাধীনতার ঘোষনার ২৪ ঘন্টার মধ্যে ময়মনসিংহে সংগঠিত হয় খাগডহর যুদ্ধ। যে যুদ্ধে নেতৃত্ব দেয় ও অংশ নেয় ইপিআর অফিসার ও সৈনিক সকলেই নিহত হয়। ২৮ মার্চ ময়মনসিংহে ছিল অন্যরকম দিন। যে দিন যুদ্ধজয়ের উল্লাসে বিজয় উদযাপন করে ময়মনসিংহ।
ইতিহাসবিদ ও মুক্তিযুদ্ধের গবেষকদের মতে, ২৭ মার্চে ময়মনসিংহের খাগডহর যুদ্ধটি হলে স্বাধীনতা ঘোষনার প্রশত যুদ্ধ যে যুদ্ধে পাকিস্তানীরা পরাজিত হয় এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রথম বিজয় হয় ময়মনসিংহে।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বলে, ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষনার পর কুমিল্লার কুমুরি যুদ্ধ হয় এবং ২৮ মার্চের পরও এ যুদ্ধ চলমান ছিল। ইতিহাসে কুমুরি যুদ্ধ মুক্তিযুদ্ধের প্রথম যুদ্ধ হিসেবে খ্যাত। এ যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন।
কিন্তু স্বাধীনতার ঘোষনার পর প্রথম যুদ্ধ জয়ের গৌরবটি অর্জন হয় ময়মনসিংহ ইপিআর ক্যাম্প খাগডহরে সংঘটিত যুদ্ধে। যে যুদ্ধে সাধারন সৈনিকরা অংশ নেন এবং ১২১ জন পাঞ্জাবীকে খতম করে বিজয়ী হন। ইতিহাসে এই যুদ্ধের যথাযথ মূল্যায়ন এখনও সময়ের দাবি।
ময়মনসিংহের মুক্তিযুদ্ধের প্রথম বিজয় উদযাপন হয়ে আসছে গত কয়েক বছর ধরে। সেই সাথে এই যুদ্ধের সমরনায়কদের যথাযথ স্বীকৃতি প্রদানের দাবি রয়েছে।
খাগডহর যুদ্ধে তৎকালীন বাঙালি ইপিআর সৈনিক শেখ হারুন অর রশিদ, নান্নু মিয়া, আফতাব উদ্দিন, আনিসুর রহমান, মফিজ উদ্দিন, বাবু মান্নান, মোঃ ফরহাদ হোসেন, শহীদ দেলোয়ার সহ অন্যান্য শহীদদের বীরত্বগাঁথা স্থানীয় জনমনে কিংবদন্তি হয়ে আছে।
২৭ মার্চ রাতে খাগডহর ইপিআর ক্যাম্পে বাঙালি সৈনিকদের হত্যার নির্দেশনা এসেছিল বেতার বার্তার সংকেতে। সেই সংকেত ধরতে পেরেছিলেন ওয়্যারলেস অপারেটরে ডিউটিতে থাকা বাঙালি ইপিআর সুবেদার মোঃ ফরহাদ হোসেন। তারা সতর্ক হয়েছিলেন। তারা প্রস্তুুতি নেন। রাত পৌনে ১২ টার দিকে পাঞ্জাবী সেনাদের অভিযান শুরুর সংকেত দেয়াও হয়। কিন্তু সম্ভাব্য পরিস্থিতির দিকে নজর রাখা বাঙালি সৈনিকরাই আগে আক্রমন রচনা করেন। দু পক্ষে তুমুল গোলাগুলি হয়। পরদিন সকালে পাঞ্জাবী কমান্ডার ক্যাপ্টেন কমর আক্কাস সহ ১৭ জন পাঞ্জাবী ইপিআর ক্যাম্প ছেড়ে পালাতে গেলে তাদেরকে ১ কিলো মিটার এলাকা দৌড়িয়ে নিয়ে খতম করে। বাঙালি সিপাহীরা। ঐ যুদ্ধে অসম সাহসী অগ্রনী ভূমিকা রাখা শেখ হারুন গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন।
যুদ্ধ শেষে খাগডহর ইপিআর ক্যাম্পের দায়িত্ব বুঝে নেন সুবেদার ফরিদ উদ্দিন। পরে তৎকালীন মেজর শফিউল্লাহ, ক্যাপ্টেন মতিউর রহমান প্রমুখ ময়মনসিংহে আসেন। মেজর শফিউল্লাহ ময়মনসিংহ ইপিআর ক্যাম্পের দায়িত্ব নেন। এ সময়ে হাজারো ছাত্র জনতা খাগডহর ইপিআর ক্যাম্প ঘেরাও করে।
২৮ মার্চ খাগডহর যুদ্ধ হয় ময়মনসিংহে মানুষজনকে উজ্জীবিত করে। দিনটি ছিল ঘটনাবহুল। পুলিশ লাইন থেকে অস্ত্রাগার ভেঙ্গে অস্ত্র সরবরাহ করা হয়। সেদিন পুলিশের ভূমিকা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে গর্বের এক অধ্যায়্ মেজর এ কে এম শফিউল্লআহ ছাত্রদের মাঝে অস্ত্র বিতরন করেন। যুদ্ধে অংশ নেয়া ইপিআর(বাঙালি) জওয়ানদের শহরের মাঝে একটি স্কুলে( বর্তমানে গার্লস ক্যাডেট কলেজ) নেয়া হয়। পরদিন ট্রেনযোগে তারা ঢাকা- জয়দেবপুরের উদ্দেশ্যে রওনা হয়।
২৮ মার্চ শহরে ছাত্র- জনতা- মুক্তিকামী মানুষ ছিল উৎফুল্ল ও উন্মুক্ত। পাঞ্জাবী ইপিআরদের খতম করার পরিনামে পাকিস্তানীরা ময়মনসিংহে বম্বিং করতে পারে- সেই আতংক জনমনে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু ২৩ এপ্রিল পর্যন্ত ময়মনসিংহ ছিল হানাদার মুক্ত। ইতিহাসবিদরা এই সময়টাকে ‘ময়মনসিংহ অন্তবর্তীকালীন স্বাধীন’ বলে উল্লেখ করেছেন। মুক্ত ময়মনসিংহ জুড়ে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়ার সেই অনুভূতি মানুষকে সদা জাগ্রত করে রাখে।
এরপর ময়মনসিংহের মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকরা মুক্তিযুদ্ধে ট্রেনিং নিতে ভারতে যাওয়া শুরু করেন। ৭ মার্চের পর ময়মনসিংহ যুদ্ধের যে রনপ্রস্তুতি শুরু হয়েছিল তা ২৬ মার্চ পর্যন্ত ছিল প্রস্তুতিমূলক। ২৭ মার্চ রাতে যুদ্ধের পরদিন ২৮ মার্চ সেই যুদ্ধ প্রস্তুতি আরও তীব্রতর হয়।
২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষনার খবর ২৭ মার্চ ময়মনসিংহে ছড়িয়ে পড়ে। দুপুর থেকেই শহর আশপাশ গ্রামগুলোর লোকজন দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে শহরে বিক্ষোভ মিছিল প্রকম্পিত করে তুলে। ছাত্র জনতা- কৃষক- শ্রমিক স্বাধীনতার ঘোষনাকে স্বাগত জানায়।খাগডহর ক্যাম্প ঘেরাও করা ছাত্রজনতার বিক্ষোভ মিছিলে অন্যান্য অনেকের মাঝে ছাত্রজনতা ম হামিদের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।
বাঙালি ইপিআর সিপাহীরা ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষন থেকে অনুপ্রানিত হয়েছিলেন। ২৫ মার্চ ঢাকায় পিলখানায় বাঙালি ইপিআর হত্যার পর ২৭ মার্চ রাতে ময়মনসিংহে ইপিআর ক্যাম্পে বাঙালি নিধনের পরিকল্পনা ছিল। সেজন্য ষড়যন্ত্র হয়েছিল। বাঙালি সিপাহীদের অস্ত্রজমা দিতে বলা হয়েছিল। ক্যাম্পে বড়খানায় আয়োজন করে বাঙালিদের একসাথে খেতে ডাকা হয়েছিল। কিন্তু বাঙালিরা সতর্ক ছিলেন। অবশেষে রাত ১২ টার দিকে ঘুমন্ত বাঙালিদের হত্যা করার সংকেত জারি করেন ক্যাম্প ইনচার্জ। কিন্তু ঘুমের ভান করে থাকা বাঙালি ইপিআররা কালবিলম্ব না করে পাঞ্জাবীদের বিরুদ্ধে ফায়ার ওপেন করেন। শেখ হারুন এই যুদ্ধ শুরু করেন।
at March 25, 2019
Email This
BlogThis!
Share to Twitter
Share to Facebook
Share to Pinterest
No comments:
Post a Comment
Newer PostOlder PostHome
Subscribe to: Post Comments (Atom)
নগর ভবন