30/05/2017
সিয়াম-এর আদব !
“আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “সিয়াম হল ঢাল। সুতরাং তোমাদের মাঝে যে সিয়াম পালন করবে সে যেন অশ্লীল আচরণ ও মুর্খতাসুলভ কথা ও কাজে লিপ্ত না হয়। যদি তাকে কেউ গালি দেয়, তাহলে তাকে বলে দেবে আমি সিয়াম পালনকারী, আমি রোজাদার।” [ সহীহ আল-বুখারী হাদীস নং ১৭৯৫, সহীহ মুসলিস হাদীস নং ১১৫১]
_____
অন্য বর্ণনায় এসেছে :
“তোমাদের কারো যখন রোজার দিন এসে যায় সে যেন অশ্লীল আচরণ ও শোরগোল না করে। যদি তাকে কেহ গালি দেয় বা তার সাথে মারামারি করতে চায় তাহলে তাকে বলে দেবে আমি একজন রোজাদার।” [সহীহ আল বুখারী হাদীস নং ১৮০৫]
আরেক বর্ণনায় এসেছে :
“রোজা রেখে তুমি কাউকে গালি দিবে না। যদি কেউ তোমাকে গালি দেয় তাহলে তাকে বলবে আমি রোজাদার। আর তখন যদি তুমি দাঁড়িয়ে থাকো তাহলে বসে যাবে।” [ নাসায়ী সনানে কুবরা ৩২৫৯, ইবনে কুযাইমা হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন হাদীস নং ১৯৯৪]
আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “যে মিথ্যা কথা ও কাজ এবং মূর্খতা পরিত্যাগ করতে পারল না, তার পানাহার বর্জনে আল্লাহর কোন প্রয়োজন নেই।” [সহীহ আল-বুখারী হাদীস নং ৫৭১০, আবু দাউদ হাদীস নং ২৩৬২, তিরমিজী হাদীস নং ৭০৭, নাসায়ী হাদীস নং ৩২৪৫]
আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি নবী কারীম সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেছেন যে, নবী কারীম সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “সিয়াম হল জাহান্নাম থেকে বাঁচার ঢাল, যে ব্যক্তি রোজা রাখা শুরূ করে সে যেন সেদিন মুর্খতা সুলভ আচরণ না করে। যদি কোন ব্যক্তি তার সাথে মূর্খতা সুলভ আচরণ করতে চায় তাহলে তাকে মন্দ বলবে না, গালি-গালাজ করবে না। বরং তাকে বলে দেবে আমি রোজাদার।” [নাসায়ী হাদীস নং ১৬৭/৪, তাবারানী হাদীস নং ৪১৭৯, আল-বানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।]
আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত যে, তিনি ও তার সহচরগণ যখন রোজা রাখতেন তখন মসজিদে বসে থাকতেন আর বলতেন, আমরা আমাদের রোজাকে পবিত্র রাখছি। [আহমাদ যুহদ অধ্যায় হাদীস নং ১৭৮, আবু নঈম হুলইয়াতে হাদীস নং ৩৮২/১]
হাদীসসমূহ থেকে শিক্ষা ও মাসায়েলঃ
১) জাহান্নাম থেকে মুক্তির একটি মাধ্যম হল রোজা। কারণ রোজা কুপ্রবৃত্তির সকল প্রকার চাহিদা পূরণ থেকে মানুষকে দূরে রাখে। আর জাহান্নামতো কু-প্রবৃত্তির পর্দা দিয়ে আবৃত।
২) বৈধ-অবৈধ সকল প্রকার অশ্লীলতাই রোজাদারের জন্য নিষিদ্ধ। অশ্লীল কথা, যা কিছু প্রবল যৌন উত্তেজনা সৃষ্টি করে তার সকল কিছুই নিষিদ্ধ।
৩) মুর্খতাসুলভ সকল প্রকার আচরণ নিষিদ্ধ। যেমন চেঁচামেচি, শোরগোল, বকাঝকা, ঝগড়া-ফাসাদ, গালি-গালাজ ও অযথা বিতর্ক ইত্যাদি।
৪) যদি রোজাদার করো গালিগালাজ, চিৎকার-শোরগোল এর সম্মুখীন হয় তাহলে তার করণীয় হল :
● সে এ সকল কাজের কোন প্রতি-উত্তর করবে না। ধৈর্য ধারণ করবে।
● কথাবার্তা সতর্কভাবে বলবে। একান্ত প্রয়োজন না হলে কথা বলবে না। কথা কম বললে ভুল কম হবে।
● যে তাকে এগুলোতে লিপ্ত করতে চায় তাকে বলে দেবে আমি রোজাদার। এতে সে সতর্ক হয়ে যাবে। তাকে ঝগড়া-বিবাদে লিপ্ত করতে প্রচেষ্টা চালাবে না।
● যদি প্রতিপক্ষ বিরত না হয় তাহলে তাকে বার বার বলতে হবে আমি রোজাদার।
● এ ধরনের পরিস্থিতিতে যদি রোজাদার দাঁড়িয়ে থাকে তাহলে তাকে বসে যেতে হবে। এতে সে প্রতিপক্ষের আচরণে উত্তেজিত হওয়া থেকে নিরাপদ থাকতে পারবে।
৫) এ সকল হাদীস থেকে এ কথা বুঝে নেয়ার অবকাশ নেই যে, অশ্লীলতা, গালিগালাজ, মুর্খতাসুলভ আচরণ, অসার ও অযথা বিতর্ক শুধু রোজা রাখা অবস্থায় নিষেধ, অন্য সময় নিষিদ্ধ নয়। বরং এর উদ্দশ্য হল, সর্বাবস্থায় এগুলো অবশ্যই নিষিদ্ধ বরং রোজা রাখা অবস্থায় এগুলোতে লিপ্ত হওয়া আরো জঘন্য অন্যায় এবং রমজান - রোজার শিক্ষা-বিরোধী।
৬) ইসলামী জীবন-দর্শনের মহত্ব প্রমাণিত। কিভাবে মুর্খ, অভদ্র আচরণের মোকাবেলায় অহিংস, সুন্দর আচরণ করতে হয় তার শিক্ষা দিয়েছে ইসলাম তার অনুসারীদের।
৭) এ হাদীসের উদ্দেশ্য এটা নয় যে, যদি রোজাদারের উপর কেউ জুলুম-অত্যাচার করে তবে তার প্রতিকার করা যাবে না, বিচার চাওয়া যাবে না। তার উপর কেহ জুলুম অত্যাচার করলে অবশ্যই এর যথাযথ প্রতিকার করা বৈধ।
৮) রোজা যথাযথভাবে কবুল হওয়ার জন্য অবশ্যই যাবতীয় অন্যায় কাজ থেকে মুখ, লজ্জাস্থান ও অন্যান্য অঙ্গ-প্রতঙ্গকে রক্ষা করতে হবে। বিরত থাকতে হবে মিথ্যা কথা ও কাজ, অশ্লীলতা, নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, গীবত, পরনিন্দা, দুর্নীতি, খাদ্যে ভেজাল, মাপে কম দেয়া ইত্যাদি অন্যায় কাজ থেকে। এগুলো যে মুর্খতাসুলভ কাজ, তাতে কারো দ্বিমত নেই।
৯) অধিকাংশ আলেম এ ব্যাপারে একমত যে, গীবত, পরনিন্দা, মিথ্যা কথা, মুর্খতাপূর্ণ আচরণ ইত্যাদি কাজগুলো রোজা নষ্ট করে না। তবে তার সওয়াব অবশ্যই কমিয়ে দেয়। এবং এগুলোতে লিপ্ত হওয়ার অপরাধের শাস্তি আছেই।
১০) এ হাদীসসমূহ থেকে আরো প্রমাণিত হলো যে, রোজার উদ্দেশ্য শুধু ক্ষুধা-পিপাসা সহ্য করা নয়। যত রকম অনাচার, অন্যায়, অভদ্র আচরণ, মুর্খতা সুলভ কথা ও কাজ আছে তার সব কিছু থেকেই দূরে থাকতে হবে। যদি এগুলো থেকে বিরত থাকা না হয় তাহলে রোজা রেখে যেন কোন ফলই লাভ করা গেল না।
১১) এ হাদীসসমূহ থেকে আরো প্রমাণিত হল, মিথ্যা কথা ও মিথ্যা নির্ভর কাজই হলো সকল অন্যায়ের মূল।
এ জন্য আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন,
ﻓَﺎﺟْﺘَﻨِﺒُﻮﺍ ﺍﻟﺮِّﺟْﺲَ ﻣِﻦَ ﺍﻟْﺄَﻭْﺛَﺎﻥِ ﻭَﺍﺟْﺘَﻨِﺒُﻮﺍ ﻗَﻮْﻝَ ﺍﻟﺰُّﻭﺭِ
“অতএব তোমরা প্রতিমার অপবিত্রতা থেকে বেঁচে থাকো এবং বেঁচে থাকো মিথ্যা থেকে।”
এ আয়াতে আল্লাহ পৌত্তলিকতার অপরাধের সাথে মিথ্যাকে উল্লেখ করেছেন। মিথ্যার ভয়াবহতা বুঝাতে এটাই যথেষ্ট।