18/08/2022
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সন্তোষ রবিদাস তার চা শ্রমিক' মা' কে নিয়ে আবেগঘন এই লেখাটি লিখেছেন ...
পড়তে পড়তে নিজের অজান্তেই চোখে জল চলে এলো ! মৌলভীবাজার জেলার শমসেরনগরে ফাঁড়ি কানিহাটি চা বাগানের এক চা শ্রমিক পরিবারের ছেলে আমি । জন্মের ছয় মাসের মাথায় বাবাকে হারিয়েছি । মা চা - বাগানের শ্রমিক । তখন মজুরি পেতেন দৈনিক ১৮ টাকা । সেই সময় আমাকে পটের দুধ খাইয়ে , অন্যের বাসায় রেখে মা যেতেন বাগানে কাজ করতে । ২০০৭ সালে আমি ক্লাস ফাইভে পড়ি । মায়ের মজুরি তখন ৮৮ টাকা । এক দিন বললেন , ' বাজারে গিয়ে পাঁচ কেজি চাল নিয়ে আয় । ' সেই চাল দিয়ে এক মাস চলেছে আমাদের । পরদিন সকালে স্কুলে যাওয়ার আগে দেখি মা চাল ভাজলেন । পলিথিনে সেই ভাজা চাল , আটার রুটি আর লাল চা একটা বোতলে ভরে গামছায় প্যাঁচালেন । আর আমাকে আটার রুটি ও লাল চা দিলেন । দুপুরে খেতে গিয়ে দেখি শুধু পেঁয়াজ , শুকনা ভাত , তেল আর লবণ আছে । তা দিয়ে মেখে খেলাম । রাতেও কোনো তরকারি ছিল না । তখন পাশের বাসার কাকু আমাকে ডেকে কুমড়া আর আলু দিয়েছিলেন , যা দিয়ে আমরা দুইটা দিন পার করেছিলাম । তখন কুপি বাতির আলোয় পড়তাম । মা আগেই রেডি করে দিতেন বাতি । তেল শেষ হয়ে গেলে আর পড়া হতো না । দোকানদার বাকিতে তেল দিতেন না । পঞ্চম শ্রেণির পর ভর্তি পরীক্ষায় পাস করে ক্যামেলিয়া ডানকান ফাউন্ডেশন স্কুলে পাঁচ বছরের জন্য ফ্রি পড়ালেখার সুযোগ পাই । মা অনেক খুশি হয়েছিলেন । তখন তাঁর সামান্য আয়ের একটা অংশ থেকে আমাকে টিফিন খাওয়ার জন্য প্রতি সপ্তাহে ৭০-৮০ টাকা দিতেন । ২০১৩ সালে বিএএফ শাহীন কলেজে ভর্তি হই । তখন মা ১০২ টাকা করে পেতেন । এই সময়ে তিনি গ্রামীণ ব্যাংক থেকে কিস্তি তুলে আমার ভর্তির টাকা , ইউনিফর্ম আর বই - খাতা কিনে দিয়েছিলেন । ২০১৪ ডিসেম্বর । মায়ের হাতে টাকা নেই । তখন এইচএসসির রেজিস্ট্রেশন চলছিল । মা ৫০ টাকার একটা নোট দিয়ে চোখের জল ফেলতে ফেলতে বলেছিলেন , ' কেউ ধার দেয়নি রে বাপ । ' কলেজের এক শিক্ষকের কাছ থেকে ধার নিয়ে সেবার রেজিস্ট্রেশন ফি দিয়েছিলাম । এইচএসসির পর ভর্তি পরীক্ষার কোচিং । মা তখন আবার লোন নিলেন গ্রামীণ ব্যাংক থেকে । লোনের কিস্তির জন্য এই সময় মা বাড়ি থেকে অনেক দূরে গিয়ে বালু শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন । বিনিময়ে পেতেন ৩০০ টাকা । আমি জানতাম ঘরে চাল নেই । শুধু আলু খেয়েই অনেক বেলা কাটিয়েছিলেন মা । এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পেলাম । মা তখন কী যে খুশি হয়েছিলেন ! কিন্তু ভর্তির সময় যত ঘনিয়ে আসছিল , মায়ের মুখটা তত মলিন দেখাচ্ছিল । কারণ চা - বাগানে কাজ করে যা পান তা দিয়ে তো সংসারই চলে না । ভর্তির টাকা দেবেন কোথা থেকে । পরে এলাকার লোকজন চাঁদা তুলে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিতে সহায়তা করল । বিশ্ববিদ্যালয়ে টিউশনি করেই চলতাম । হলের ক্যান্টিনে ২০ টাকার সবজি - ভাত খেয়েই দিন পার করেছি । অনেক দিন সকালে টাকার অভাবে নাশতাও করতে পারিনি । দুর্গাপূজায় কখনো একটা নতুন জামা কিনতে পারিনি । ২০১৮ সালে শ্রেষ্ঠ মা হিসেবে উপজেলায় মাকে সম্মাননা দেওয়া হবে বলে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে জানানো হয় । পরে মায়ের নামটা কেটে দেওয়া হয়েছিল । খোঁজ নিয়ে জেনেছি , মা আমার চা শ্রমিক । স্টেজে উঠে নাকি কিছু বলতে পারবেন না । তাই নাম কেটে দিয়েছে ! মা এখনো প্রতিদিন সকালে একটা বোতলে লবণ , চা - পাতা ভর্তা , আটার রুটি , সামান্য ভাত পলিথিনে ভরে নিজের পাতি তোলার গামছায় মুড়িয়ে নিয়ে দৌড়ান চা - বাগানে । আট ঘণ্টা পরিশ্রম করে মাত্র ১২০ টাকা মজুরি পান ! এই মজুরিতে কিভাবে চলে একজন শ্রমিকের সংসার ? আজকাল মায়ের শরীর আর আগের মতো সায় দেয় না । বলেন , ' তোর চাকরি হইলে বাগানের কাজ ছেড়ে দেব । ' আমি এখন সেই দিনের প্রতীক্ষায় আছি .... !
- সন্তোষ রবিদাস অঞ্জন , ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়