26/01/2022
পিতা-মাতার যে আচরণগুলো সন্তানের নেতিবাচক মানসিকতা সৃষ্টির জন্য দায়ী।
সন্তান! পৃথিবীতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। সন্তান পিতা-মাতার নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস।পিতা-মাতার কাছে পৃথিবীতে সন্তানের চেয়ে মহামূল্যবান কিছু নেই, এর চেয়ে আপন কেউ নেই। সন্তানের জন্য জীবন দিয়েছেন পৃথিবীতে এমন পিতা-মাতার সংখ্যাও কম নয়।
আমরা নিশ্চয়ই সম্রাট বাবর এর ঘটনা জানি যিনি নিজ পুত্র জাহাঙ্গীরের প্রাণ ভিক্ষা চেয়েছিলেন আল্লাহর কাছে নিজের প্রাণের বিনিময়ে। সত্যি সত্যি তার পুত্র বেঁচে জান সম্রাট বাবর মারা যান।
হাদীসে আছে সন্তানের জন্য পিতা-মাতার দোয়া সরাসরি আল্লাহর নিকট পৌঁছে যান কোন বাঁধা ছাড়াই। তাই তো সন্তান পরকালে নাজাতের উছিলাও। যেই সন্তান আমাদের জন্য এত কিছু আমরা আমাদের অজান্তেই সেই সন্তানের মিধ্যে কোন নেতিবাচক মানসিকতা সৃষ্টি করছিনা তো।
জানা-অজানায় আমাদের আচরণ গুলো দায়ী না তো? ভেবেছেন কখনো? চলুন তবে আলোচনা শুরু করা।
১। দাম্পত্য কলহ ( সন্তানের নেতিবাচক মানসিকতা)প্রথম এবং প্রধান কারন।
সন্তানের নেতিবাচক মানসিকতা সৃষ্টিতে দাম্পত্য কলহ অনেক প্রভাব ফেলে। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কথা কাটাকাটি, মনোমালিন্য, ঝগড়া হওয়া অস্বাভাবিক কিছুই নয়। কিন্তু তা যদি হয় সন্তানের চোখের সামনে তবে এটা অবশ্যই অনেক বড় কিছু ব্যাপার।
সন্তান যদি দেখে তার বাবা-মা’র মধ্যে মিল,মহব্বত, ভালোবাসা,শ্রদ্ধা,সম্মান কিছুই নেই তখন সে মানসিক অস্থিরতায় ভুগবে। নিজেকে অসুখী মনে করবে। নিজের প্রতি বিশ্বাস উঠে যাবে। নিজেকে অসহায় আর অনিরাপদ ভাববে।
বাবা-মা যে সবচেয়ে বড় ভরসাস্থল এ বিশ্বাস টা তার মধ্যে লোপ পেতে শুরু করবে। এই সবকিছু মিলে জীবনের প্রতি তার নেতিবাচক মানসিকতা তৈরি করবে। সে পৃথিবীটাকে তেমন চোখে দেখবে যেমন সে তার পরিবারে বড় হচ্ছে।
সুতরাং বাবা-মা’র এ বিষয়টাতে সচেতন হওয়া অনেক জরুরী। কখনো কোনভাবে সন্তানের সামনে একে অপরের প্রতি ঝগড়া তো দূরের কথা, সামান্যতম অশ্রদ্ধাও দেখাবেননা যদি সন্তান নামক মহামূল্যবান রত্নকে প্রকৃত সন্তান রুপে বড় করতে চান।
২। সন্তানের উপর অল্পতেই রেগে যাওয়া (সন্তানের নেতিবাচক মানসিকতা)
আপনার যদি অল্পতেই রেগে যাওয়ার অভ্যাস থাকে তাহলে সেটা কন্ট্রোলে রাখার চেষ্টা করুন এখন থেকেই। কারন সন্তানের ক্ষেত্রে আপনার এ অল্পতে রেগে যাওয়া অভ্যাস দারুনভাবে খারাপ প্রভাব ফেলবে। সন্তান লালন -পালন অত্যন্ত ধৈর্যের বিষয়।
উঠতে বসতে, খাওয়াতে -নাওয়াতে সব জায়গায় সন্তানকে ডিল করতে হয় ধৈর্যের সাথে। কারন শিশুরা ভুল-ত্রুটি সহজে বুঝেনা। তাদের বোঝাতে হয়।তাই হুট হাট তাদের উপর রেগে যাবেননা।
আপনি এমন করলে আপনার সন্তানের মধ্যে একরকম আতংক তৈরি হবে, সে ভীতু হয়ে যাবে দিন দিন। নিজের প্রতি নেতিবাচক মানসিকতা তৈরি হবে যে সে কিছুই পারেনা তাই তার বাবা-মা তার উপর রাগ করে।
ভয়, জড়তা, দ্বিধা-দ্বন্দ্ব এই নেতিবাচকতাগুলো তার মধ্যে জেকে বসলে সে আর নিজের বিকাশ ঘটাতে পারবেনা। ফলশ্রুতিতে আপনি হবেন ব্যর্থ বাবা- মা। তাই সন্তানকে আর অযথা রাগ নয়।
৩। সন্তানকে নেতিবাচক কথা শোনানো
তোর দ্বারা এই হবেনা, সেই হবেনা। তুই এটা পারিসনা। তুই কোনদিনও পারবিনা। তুই এমন কেন। কোন গুণ নাই কেন তোর। তোকে এটা দিবনা, তোর রেজাল্ট ভালো না কেন। তুই পড়া পারিসনা আবার এত আবদার কেন?
এই যে এত না আর এত কেন শুনতে শুনতে আপনার সন্তান সত্যি সত্যি একদিন ভেবে বসে যে সত্যি সে কিছুই পারেনা। তার দ্বারা কিছুই হয়না। জীবনে বড় হয়ে সে কিছুই করতে পারবেনা।
ভাবুন একবার আপনি আপনার অজান্তে আপনার সন্তানের বিশ্বাসের মেরুদন্ডটা ভেংগে দিচ্ছেন। তার মধ্যে নেতিবাচকতার বীজ বপন করতে করতে কখন যে এর মহীরুহের জন্ম দিয়েছেন নিজেই জানেননা।
সন্তানের মনে আঘাত লাগে এমন কোন ভাষা আমাদের ব্যবহার করা উচিত নয়। শিশুদের মন অত্যন্ত সেন্সিটিভ হয়, তাদের সেন্স অব হিউমার অতি দ্রুত কাজ করে। তাদেরও আলাদা ব্যক্তিত্ব থাকে। কখনো নেতিবাচক কথাগুলো বলে তাদের চলার পথটাকে কণ্টকাকীর্ণ করবেননা।
৪।অন্যের সন্তানের সাথে তুলনা করা
আপনার সন্তানের লেখাপড়া নিয়ে অন্যের সন্তানের সাথে তুলনা করার অভ্যাস থাকলে তা আপনার সন্তানের জন্য খুবই মারাত্মক ব্যাপার।
আমরা প্রায়শঃ নিজের সন্তানকে বলে থাকি অমুকের ছেলে লেখাপড়ায় ভালো, পরীক্ষায় নাম্বার বেশি পায়, বাবা-মার বাধ্য বিভিন্ন বিষয়ে তুলনা করে থাকি। এতে করে আপনার সন্তানের মধ্যে হীনমন্যতা সৃষ্টি হয়।
নিজের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব সৃষ্টি হয়, সে ভাবে সে সবদিক দিয়েই অযোগ্য তাই তাকে এত কথা শুনতে হয়। আস্তে আস্তে সে নিজেকে গুটিয়ে নিতে পারে। তাই সন্তানকে অন্যের সাথে তুলনা না করে তার কি করা উচিত সে বিষয়ে পরামর্শ দিতে পারেন,তুলনা নয়।
৫। কথায় কথায় অভিযোগ করা
কথায় কথায় অভিযোগ করবেননা। আপনার সন্তান যদি একবার বুঝে যায় যে আপনি তাকে আদরের চেয়ে অভিযোগই বেশি করে থাকেন সে ক্ষেত্রে তার চলার পথে অনিশ্চয়তায় ভুগবে।
আপনি তাকে এটা পারোনা কেন,ওটা করোনা কেন, এটা এমন করলে কেন? এমন প্রশ্নবানে জর্জরিত না করে তার সাথে বসে তার সমস্যা নিয়ে আলোচনা করুন। সমাধানের পথ সৃষ্টি করুন।যাতে তার মধ্যে নেতিবাচক মানসিকতা সৃষ্টি না হয়।
৬। সংসারের অন্য সদস্যদের সাথে খারাপ সম্পর্ক
অনেক সময় আমাদের নিজ জ্ঞাতী-গোষ্ঠী,প্রতিবেশির সাথে নানা কারনে সম্পর্ক খারাপ হয়। আমরা না ভেবেই সে খারাপ সম্পর্ক গুলো নিয়ে নানারুপ বিরুপ মন্তব্য সন্তানের সামনে করে থাকি।
সন্তানও আপনার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তাদের খারাপ ভাবতে শুরু করে। এতে সম্পর্কের গুরুত্বের প্রতি তার নেতিবাচক ধারণা জন্মায়।
কাউকে শ্রদ্ধা সম্মান করা বিষয়টা তার কাছে ততটা গুরুত্ব পায়না। আর জীবনে ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে হলে সবার সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা জরুরী।
৭। সন্তানের উপর অযথা কর্তৃত্ব ফলানো
অনেক বাবা-মা ই সন্তানকে নিজের মতামতের বাইরে কিছু করতে দেননা। তার ওঠা, বসা, চলা ফেরা, পছন্দ, অপছন্দ সব কিছু বাবা-মা নিয়ন্ত্রণ করতে চায়।এতে সন্তানের পরনির্ভরশীলতা নামক নেতিবাচক গুণাবলি তৈরি হয়। সন্তানকে একটা নির্দিষ্ট বয়সের পর তার মতামতের প্রাধাণ্য দিন।
৮। মারধোর করা
অনেক বাবা-মা প্রচন্ড রাগ ঝাড়েন সন্তানের উপর কথায় কথায় মারধোর করেন। এই আচরণ আপনার সন্তানকে মানসিক ভাবে ভীতু করে দিতে পারে। সন্তানের শরীরের আঘাত সেটা মন পর্যন্ত চলে যায়।
পিতা-মাতার ভালোবাসার প্রতি তার সন্দেহ নামক নেতিবাচকতা সৃষ্টি হয়। ৯। কথায় কথায় অভিযোগ, অভিশাপ দেয়াসন্তানকে অভিশাপ দিবেননা কখনো কোন পরিস্থিতিতে। মনে রাখবেন বাবা-মা হিসেবে সন্তানকে অভিশাপ দিলে সেটা সৃষ্টিকর্তার কাছে কবুল হয়ে যায়।
৯।বাবা-মা’র অসততা
সন্তান সৎ আর ভালো মানুষ হোক প্রত্যেক পিতামাতায় এটা চান। কিন্তু পিতা-মাতার অসততা দেখে বড় হওয়া সন্তানরা পরিবশগত ভাবেই অসত হয়।
সন্তান সব সময় বাবা-মা কে অনুকরণ করে বড় হয় তাই তারা যা দেখবে সেটাই শিখে বড় হবে। তাই সৎ থাকুন কথায়, আচরণে কাজে তাহলে আপনার সন্তানও অন্যসব নেতিবাচক গুনাবলি অর্জন থেকে বিরত থাকবে
১০। বাবা-মা’র নেতিবাচক আচরণ
কোন কোন বাবা তার সন্তানের সামনেই সিগারেট খান, সন্তানের সামনেই মিথ্যে কথা বলেন, সন্তানের সামনেই অন্যদের ঠকান,সন্তানের সামনেই অন্যের গীবত করেন এসব নেতিবাচক মানসিকতা দেখে দেখে বড় হওয়া সন্তানেরা অটোমেটিক বড় হয় এসব নেতিবাচকতা নিয়ে।
বাবা-মা ভালো সন্তান ভালো। বাবা-মাই হচ্ছে সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষক। সন্তানের কল্যানার্থে তাদের, ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে আপনার ভূমিকায় সর্বোচ্চ।