26/12/2025
৮ম শ্রেণির পাঠ্যসূচি ও মান অনুযায়ী জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের শৈশব নিয়ে 'কাজী নজরুল ইসলামের ছোটবেলা' বিষয়ক একটি প্রবন্ধ নিচে উপস্থাপন করা হলো:
কাজী নজরুল ইসলামের ছোটবেলা
ভূমিকা
বাংলা সাহিত্যের আকাশে কাজী নজরুল ইসলাম এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তিনি আমাদের জাতীয় কবি এবং ‘বিদ্রোহী কবি’ হিসেবে বিশ্বনন্দিত। অন্যায়, অবিচার আর পরাধীনতার বিরুদ্ধে তাঁর বজ্রকণ্ঠ চিরকাল বাঙালিকে প্রেরণা দিয়ে আসছে। তবে এই মহান কবির শৈশব ও কৈশোর ছিল প্রচণ্ড অভাব-অনটন এবং অদম্য সংগ্রামের গল্পে ঘেরা। তাঁর জীবন আমাদের শেখায় যে, প্রবল ইচ্ছাশক্তি থাকলে চরম প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজেকে বিকশিত করা সম্ভব।
জন্ম ও বংশ পরিচয়
১৮৯৯ সালের ২৪শে মে (১১ই জ্যৈষ্ঠ ১৩০৬ বঙ্গাব্দ) ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে নজরুল জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম কাজী ফকির আহমদ এবং মায়ের নাম জাহেদা খাতুন। নজরুলের পূর্বপুরুষরা বিচারক বা ‘কাজী’ ছিলেন বলে তাঁদের বংশের পদবি ছিল কাজী।
‘দুখু মিয়া’ ও জীবনসংগ্রাম
নজরুলের শৈশব ছিল দুঃখের কালো মেঘে ঢাকা। জন্মের পর একে একে বেশ কয়েকজন ভাইবোন মারা যাওয়ায় তাঁর ডাকনাম রাখা হয়েছিল ‘দুখু মিয়া’। দুর্ভাগ্যজনকভাবে মাত্র নয় বছর বয়সে তাঁর বাবা মারা যান। পিতৃহারা কিশোর নজরুলকে সংসারের হাল ধরতে হয় খুব অল্প বয়সেই। তিনি গ্রামের মক্তব থেকে নিম্ন প্রাথমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সেখানেই শিক্ষকতা শুরু করেন। একই সাথে মাজারের খাদেম এবং মসজিদের মুয়াজ্জিনের কাজও করেন তিনি। শৈশবের এই কঠিন অভিজ্ঞতা তাঁর মনে সাধারণ মানুষের প্রতি গভীর মমত্ববোধ তৈরি করেছিল।
লেটো দলের কিশোর কবি
নজরুল ছিলেন অসম্ভব মেধাবী এবং চঞ্চল। পড়াশোনার চেয়ে গান ও নাটকের প্রতি তাঁর আকর্ষণ ছিল বেশি। মাত্র ১২-১৩ বছর বয়সে তিনি ‘লেটো’ নামক এক লোকসংগীতের দলে যোগ দেন। অল্প বয়সেই তিনি এই দলের জন্য ‘চাষার সঙ’, ‘শকুনীবধ’, ‘রাজপুত্রের সঙ’ ইত্যাদি পালাগান ও কবিতা রচনা করে সকলকে তাক লাগিয়ে দেন। লেটো দলেই তাঁর সংগীত ও কাব্য প্রতিভার প্রথম বিচ্ছুরণ ঘটে।
রুটির দোকান ও ত্রিশাল জীবন
অভাবের তাড়নায় নজরুল একবার আসানসোলের একটি রুটির দোকানে মাসিক এক টাকা বেতনে কাজ নেন। সারাদিন রুটি বেলা আর দোকানে কাজ করলেও তাঁর ভেতরে ছিল অজানাকে জানার তীব্র তৃষ্ণা। সেখানে তাঁর পরিচয় হয় পুলিশ দারোগা কাজী রফিজউল্লাহর সাথে। নজরুলের প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে তিনি তাকে ১৯১৪ সালে ময়মনসিংহের ত্রিশালে দরিরামপুর স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি করে দেন। ত্রিশালের সেই স্মৃতি কবির জীবনে এক বিশেষ স্থান দখল করে আছে।
শিক্ষা ও সৈনিক জীবন
পরবর্তীতে নজরুল আবার নিজ এলাকায় ফিরে আসেন এবং রানীগঞ্জের সিয়ারসোল রাজ স্কুলে পড়াশোনা করেন। ১৯১৭ সালে দশম শ্রেণির ছাত্র থাকাবস্থায় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে তিনি পড়াশোনা ছেড়ে বাঙালি পল্টনে যোগ দেন। সৈনিক হিসেবে তিনি করাচি যান এবং সেখানে থাকাকালেই তাঁর সাহিত্যচর্চার প্রসার ঘটে।
উপসংহার
কাজী নজরুল ইসলামের শৈশব ছিল ভাঙাগড়ার এক বিচিত্র উপাখ্যান। অভাবের কশাঘাত তাঁর প্রতিভাকে দমাতে পারেনি, বরং তাঁকে করেছে আরও ধারালো ও সাহসী। শৈশবের সেই ‘দুখু মিয়া’ই আজকের বিশ্বজয়ী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁর জীবন থেকে প্রতিটি শিক্ষার্থীর শিক্ষা নেওয়া উচিত যে, কোনো বাধা বা দারিদ্র্যই মানুষের সাফল্যের পথে অন্তরায় হতে পারে না।