22/12/2025
"হাংরি জেনারেশন '২৭"
আমরা প্রতিটি ব্যাচের আলাদা আলাদা নাম দেই, খুব শখের প্রতিষ্ঠান তো। মেডিকেল স্ট্যান্ডার্ড এক্সাম ব্যাচ এর নাম দিয়েছি "হাংরি জেনারেশন '২৭"। হাংরি জেনারশন আসলে কি সেটার ব্যাপারেও একটু লেখা দরকার।
হাংরি মুভমেন্ট : কালচারাল বাস্টার্ড আর হা-ভবঘুরেদের বিপ্লব।
ষাটের দশক।
দেশভাগ–পরবর্তী পশ্চিমবঙ্গ তখন এক অস্থির সময় পার করছে। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, উদ্বাস্তু কলোনিতে ঠাসা জীবন, অনাহার, বেকারত্ব আর রাজনীতির নোংরা ক্ষমতার খেলা। স্বরাজের স্বপ্ন তখন কাগজে রয়ে গেছে, বাস্তবে শুধু ভাঙা মানুষ।
ঠিক এই সময়েই আবির্ভাব ঘটে একদল তরুণ কবির।
তারা আর সাহিত্যসভা, পুরস্কার কিংবা পত্রিকার অনুমোদনের অপেক্ষা করল না।
এক পাতার বুলেটিনে কবিতা, গদ্য, অনুগল্প আর স্কেচ ছাপিয়ে নামিয়ে আনল রাস্তায়।
কফি হাউজ, কলেজ ক্যাম্পাস, লাইব্রেরি আর কলকাতার মোড়ে মোড়ে দাঁড়িয়ে পাঠ করল তাদের লেখা।
রবীন্দ্রনাথ–জীবনানন্দে অভ্যস্ত বাঙালি এমন কবিতা আগে শোনেনি।
কোনো কবিতার প্রথম লাইনই ছিল ধাক্কা—
“তিন বিধবা গর্ভ করে শুয়ে আছি পুণ্য বিছানায়।”
এই তরুণরা নিজেদের পরিচয় দিল—
🔥 ‘হাংরি জেনারেশন’ 🔥
নেতৃত্বে ছিলেন মাত্র ২১ বছরের কবি মলয় রায়চৌধুরী—
যিনি ভবিষ্যতে নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে বলবেন,
“আমি একজন কালচারাল বাস্টার্ড।”
🟥 শুধু লেখা নয়, সরাসরি আঘাত
হাংরিয়ালিস্টরা শুধু কবিতা লিখেই থামেনি।
১৯৬৩ সালে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী, এমএলএ, সচিব, লেখক আর সাংবাদিকদের পাঠানো হলো নানা ধরনের মুখোশ—জন্তু, দানব, জোকার, মিকি মাউস, দেবতা।
প্রতিটি মুখোশে লেখা—
👉 “দয়া করে মুখোশটা খুলে ফেলুন।”
কবি–সাহিত্যিকদের পাঠানো হলো বিয়ের কার্ড, যেখানে লেখা—
👉 “F**k the Bastards of Gungshalik School of Poetry”
বাণিজ্যিক পত্রিকায় ছোটগল্পের নামে গেল সাদা কাগজ,
বুক রিভিউয়ের বদলে পাঠানো হলো জুতোর বাক্স।
কখনো বইয়ের দাম ধরা হলো এক লক্ষ টাকা,
কখনো চিত্রপ্রদর্শনীর শেষে পুড়িয়ে ফেলা হলো সব ছবি।
এ ছিল প্রথাগত সাহিত্য আর ভদ্রতার মুখোশের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ।
🟥 কারা ছিল এই ‘ক্ষুধার্ত’রা?
এই আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন—
শক্তি চট্টোপাধ্যায়, বিনয় মজুমদার, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, উৎপলকুমার বসু, ফালগুনী রায়সহ বহু তরুণ লেখক।
এদের বড় অংশই দেশভাগ দেখা প্রজন্ম।
অনেকে বেড়ে উঠেছেন উদ্বাস্তু পরিবারে, বস্তিতে, অনিশ্চিত জীবনে।
তাদের ‘ক্ষুধা’ শুধু ভাতের ক্ষুধা ছিল না—
এ ছিল নিজের কথা বলার ক্ষুধা,
সঠিক শব্দ খুঁজে পাওয়ার ক্ষুধা,
অবদমিত জীবনের সত্য তুলে ধরার ক্ষুধা।
তারা মার্কসবাদের সীমাবদ্ধতাও আগেই বুঝেছিলেন।
বামপন্থার সাথেও তাদের সংঘাত ছিল।
তাদের কাছে কবিতা ছিল অরগ্যাজমের মতো স্বতঃস্ফূর্ত—
শিল্পের বিরুদ্ধে যুদ্ধই ছিল শিল্প সৃষ্টির শর্ত।
🟥 রাষ্ট্রের রোষ ও আদালতের কাঠগড়া
১৯৬৫ সালে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে প্রথমবার—
✊ কবিদের হাতে হাতকড়া পরানো হলো।
মলয় রায়চৌধুরীসহ ছয়জন কবি গ্রেপ্তার হলেন।
মলয়ের কবিতা ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’–কে অশ্লীল বলে মামলা হলো।
হাতকড়া পরিয়ে রাস্তায় হাঁটিয়ে আদালতে নেওয়া হলো তাকে।
অনেকে চাকরি হারালেন, অনেকেই ভয়ে আন্দোলন ছেড়ে দিলেন।
এমনকি আন্দোলনের ভেতর থেকেই বিশ্বাসঘাতকতা এলো।
নিম্ন আদালতে সাজা হলেও,
১৯৬৭ সালে উচ্চ আদালতে মলয় বেকসুর খালাস পান।
যে কবিতাকে অশ্লীল বলা হয়েছিল, সেটিই পরে জায়গা করে নেয়
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশিত আন্তর্জাতিক সংকলনে।
🟥 শেষ হয়ে যাওয়া নয়, দাগ রেখে যাওয়া
হাংরি মুভমেন্ট খুব বেশি দিন জ্বলে উঠতে পারেনি।
দমন, ভয় আর ভাঙনের কারণে থেমে যায় আন্দোলন।
হ্যান্ডবিলগুলো সংরক্ষিত হয়নি, অনেক লেখা হারিয়ে গেছে।
কিন্তু তারা যা করে গেছে—
নাগরিক জীবন, রাষ্ট্রযন্ত্র আর সামাজিক ভণ্ডামির ওপর
এত তীব্র কলমের আঘাত
বাংলা সাহিত্যে আর কেউ দিতে পারেনি।
❓ সাহিত্য কি অশ্লীল?
❓ নাকি অশ্লীল আমাদের সমাজ, রাষ্ট্র আর মুখোশধারী ভদ্রতা?
✊ হাংরি জেনারেশন ছিল ক্ষুধার্তদের ভাষা।
আর সেই ক্ষুধা আজও পুরোপুরি মেটেনি।