21/06/2024
ইদানীং রাসেল'স ভাইপার নিয়ে কিছু ভুলভাল পোস্ট এবং সংবাদ ফেসবুকে ঘুরে বেড়াচ্ছে, যা জনমনে ভুল ধারণা এবং আতঙ্কের জন্ম দিচ্ছে। যার দরুন প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পাশাপাশি মানুষ-ও ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে।
সর্বপ্রথম, ওটার নাম Russell’s Viper বা রাসেল'স ভাইপার, যাঁর অনুবাদ রুপ হলো: রাসেলের ভাইপার।
এদের এমন নামকরণের কারণ হলো "স্যার প্যাট্রিক রাসেল ১৭ শতকে ভারতীয় সাবকন্টিনেন্টের অনেক সাপের সর্বপ্রথম পরিচিতি এবং বিশ্লেষণ করেছিল রাসেল'স ভাইপার সহ। তাই ১৮ শতকে সাপের ক্লাসিফিকেশনের সময় বিজ্ঞানীরা উনার নাম জুড়ে দেয় সাপগুলোর সাথে।"
💠সে যাইহোক, গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রাসেল'স ভাইপার বিশ্বের ৫ম বিষধর সাপ নয়, এমনকি এটি সেরা ৩০ নাম্বারের মধ্যেও নেই। বরং এটির অবস্থান আমাদের দেশের গোখরো বা ক্রেইটের-ও পরে, এবং এর কামড়ে সুস্থ হওয়া অহরহ মানুষ আছে। আবার মোটেও এটির কামড়ে বাঁচার সম্ভাবনা ২০% বা এতো কম নয়, বরং রেকর্ড অনুযায়ী এই স্ট্যাটিস্টিক্সটি উল্টো।
শুধু হাসাপাতালে দেরীতে যাওয়া, ওঝার কাছে গিয়ে সময় নষ্ট করা এবং ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী না চলা বা কনসাল্টের মধ্যে না থাকার কারণেই রুগী মারা পড়ে পরবর্তীতে। তারপরেও রাসেল'স ভাইপারের কামড়ে সুস্থতার হার ৭০% এর মতো প্রায়, যদি সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা নেয় তবেঁ সুস্থতার হার ৯০% এর চেয়ে বেশি তথ্যানুসারে।
💠এঁরা বাচ্চা গড়ে ৩৫টি করে দেয়, তাও-ও প্রাকৃতিক বা ইকোসিস্টেমের কারণে অর্ধেক বাচ্চা এমনিতেই মা-রা পড়ে, যেমন: চিল, পেঁচা, শিয়াল, বনবিড়াল, বানর, গুইসাপ, বেঁজি ইত্যাদি সহ আরে বেশ কিছু প্রাকৃতিক কারণ।
💠প্রায় সব বিষধর সাপেদের ভেনমের মধ্যেই অন্যান্য ভেনমের উপস্থিতি থাকে, মূলত সাপেদের ভেনম হলো অনেকগুলো বিষের ককটেল বা মিশ্রণ। অন্যান্য বিষ শিকারকে দূর্বল করা বা হজমে সহায়তার জন্য; তবে সেইগুলো লিথাল বা মানুষ মারার মতো যথেষ্ট শক্তিশালী নয়। আবার এরা রাগের দিক থেকেও পিছিয়ে অনেক, "বিশ্বের সবচেয়ে রাগী সাপ ব্ল্যাক মাম্বা, পাফ-এডার ইত্যাদি থেকে তো পিছিয়েই, এমনকি গোখরা থেকেও পিছিয়ে।"
কোনো সাপ-ই তেড়ে এসে কামড়ায় না,বরং সাপেরা মানুষদের এড়িয়ে চলা পছন্দ করে। যদি আপনি এগুলোকে কোণঠাসা না করেন বা খুব কাছে গিয়ে বা এমন কিছু করে এগুলোকে থ্রেট ফিল না করান, তবে কখনোই আপনাকে কামড়াতে উদ্যত হবে না। এক্ষেত্রে অনেক সময় এই সাপ আপনার দিকে আক্রমনাত্মক ভঙ্গিতে হিস সাউন্ড অথবা বাইট ছুঁড়বে ভয় দেখাতে, যেটা দেখে অনেকেই ভেবে বসে যে তাড়া করছে।
তাছাড়া রাসেল'স ভাইপারের বাইটের প্রায় অধিকাংশ রেকর্ড-ই হলো এগুলোর ওপর পা অথবা হাত দেয়া, নয়তো অজগর ভেবে ধরতে যাওয়া। এছাড়া রাসেল'স ভাইপার এতোটাই অলস প্রকৃতির যে মানুষ দেখে তেড়ে আসা অথবা পালানো, কোনোটিই-ই এদের সাথে যায় না। এমনকি বাধ্য না হলে এঁরা নিজের জায়গা থেকে নড়ে-ই না, একই জায়গাতেই ৩-৪ দিনও পড়ে থাকে।
💠স্রষ্টা আমাদের প্রকৃতির সব কিছুই প্রকৃতি তথা আমাদের প্রয়োজনে সৃষ্টি করেছেন। সাপ আমাদের ইকোলজি যেমন ব্যালেন্স করে, তেমন আমাদের বিভিন্ন রক্তবাহিত জটিল এবং কঠিন রোগের ঔষধও প্রদান করে। হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, ব্লাড প্রেশার নিয়ন্ত্রণকারী Captopril-জাতীয় ঔষধ, এমনকি বেথা নাশক বা পেইন কিলারের মতো মেডিসিন তৈরীতেও সাপের ভেনম ব্যাবহার হয়।
💠এবং সাপের এন্টিভেনম দু’প্রকারের: একটি মনোভ্যালেন্ট বা নির্দিষ্ট সাপের, আর অন্যটি পলিভ্যালেন্ট বা সব বিষধর সাপের জন্য কার্যকরী একটি ককটেল বা এন্টিভেনমের মিশ্রণ। সুতরাং, রাসেল'স ভাইপার সহ সব বিষধর সাপের এন্টিভেনম-ই আছে দেশে। সর্বোপরি সাপ'সহ সকল প্রাণীরা আমাদের ইকোলজি বা প্রকৃতির অংশ। একমাত্র সঠিক তথ্য এবং ধারণা-ই আমাদের সুরক্ষিত রাখতে পারে।
সাপে কাটলে ওঝা নয়, হাসপাতালে চিকিৎসা হয়।
সাধারণত সাপ মানুষকে এড়িয়ে চললেও ঠিক উল্টো স্বভাব রাসেল ভাইপারের। নিজেকে বিপন্ন মনে করলেই করে বসে আক্রমণ। আক্রমণের ক্ষেত্রে এটি এত ক্ষিপ্র যে, ১ সেকেন্ডের ১৬ ভাগের ১ ভাগ সময়ে শেষ করতে পারে পুরো প্রক্রিয়া। ক্ষেপে গেলে শব্দ করে প্রচণ্ড জোরে। ঠিক যেন প্রেসার কুকারের মতো।
রাসেল ভাইপারের বিষ হেমাটোটক্সিক, যার কারণে ছোবল দিলে আক্রান্ত স্থানে পঁচন ধরে। ছোবলের পাঁচ মিনিটের মধ্যে ফুলে যায় ক্ষতস্থান। এর বিষ নষ্ট করে দিতে পারে ফুসফুস, কিডনিসহ বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ।
বেশির ভাগ সাপ ডিম পাড়লেও রাসেল ভাইপার বাচ্চা দেয়। গর্ভধারণ শেষে স্ত্রী রাসেল ভাইপার সাধারণত ২০ থেকে ৪০টি বাচ্চা দেয়। তবে ৮০টি পর্যন্ত বাচ্চা দেয়ার রেকর্ডও আছে। একদিকে উচ্চ প্রজনন ক্ষমতা, অন্যদিকে বেজি, গুইসাপসহ প্রকৃতি থেকে সাপের শত্রু বিলীন হয়ে যাওয়া সেইসঙ্গে ইঁদুর, ব্যাঙসহ সাপের পর্যাপ্ত খাবারের উপস্থিতি থাকায় বাড়ছে রাসেল ভাইপার।
বন্যপ্রাণী ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ মো. আবু সাঈদ বলেন,
❝দেশের সব অঞ্চলে শিয়াল, গুইসাপ ও বেজি দেখলেই লোকজন মেরে ফেলছেন। তারা জানেন না, এটির উপকারিতা কত! এ কারণেই রাসেল ভাইপারের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। কারণ তার খাদক নেই। ইকো সিস্টেমে ব্রেক হয়ে গেছে।❞
দেশে একটা সময় বিলুপ্ত বলা হলেও দেশজুড়ে এখন মাথাব্যাথার কারণ হয়ে উঠেছে রাসেল ভাইপার। বরেন্দ্র অঞ্চলের বাসিন্দা হলেও সাপটির রাজত্ব এখন দেশের অন্তত ২৫টি জেলায়। পৌছে গেছে চাঁদপুর, বরিশাল, পটুয়াখালী পর্যন্ত। সবচেয়ে বেশি আনাগোনা মানিকগঞ্জ, ফরিদপুর, শরীয়তপুরসহ পদ্মা, মেঘনা ও যমুনার অববাহিকায়, যার ছোবলে চলতি বছর এরই মধ্যে মারা গেছেন অন্তত ১০ জন, যাদের অধিকাংশই কৃষক এবং জেলে।
দেশে বছরে চার লাখেরও বেশি মানুষকে সাপে কাটে, যাদের মধ্যে সাত হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়।
চন্দ্রবোড়ার দংশনে সঠিক সময়ে চিকিৎসা শুরু না করতে পারলে অঙ্গহানি এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে, তাই কালক্ষেপণ না করে যতো দ্রুত সম্ভব এন্টিভেনম সমৃদ্ধ হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য পৌছুতে হবে।
(গুরুত্বপূর্ণ লেখাটি ফেসবুক থেকে কপি করেছেন - Prof. Dr. Murshidul Md Hasan)