29/05/2020
১৪.০৫.২০১৯
অনুচ্ছেদ ২৭ অনুযায়ী- আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান এবং সবাই সমান আইনের আশ্রয় লাভের অধিকারী। অর্থ্যাৎ এর মাধ্যমে সকল নাগরিকের মধ্যে আইনের সাম্য প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। যখনই কেউ আইনের সাম্য নষ্ট করে তার বিরুদ্ধে এটিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা যায়;
অনুচ্ছেদ ২৮ অনুযায়ী- সকল ধর্ম,বর্ন,নারী,পুরুষ ও জন্মস্থান ভেদে রাষ্ট্র যেন বৈষম্য না করতে পারে তার বিধান দেয়া হয়েছে;
অনুচ্ছেদ ২৯ অনুযায়ী- সরকারী পদে নিয়োগ লাভে সকল নাগরিকের সাম্যের নিশ্চয়তা দিয়েছে;
অনুচ্ছেদ ৩১ অনুযায়ী- সকল নাগরিকের আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার নিশ্চিত করেছে। এই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আইনী প্রক্রিয়া ব্যতিত কোন নাগরিকের জীবন, স্বাধীনতা, দেহ, সুনাম বা সম্পত্তির হানী ঘটানো যাবে না। অর্থ্যাৎ পুলিশ চাইলেই যে কাউকে তুলে নিয়ে কারাগারে নিক্ষেপ করতে পারবে না। সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে আইনী প্রক্রিয়া শুরু না করে কাউকে গ্রেপ্তারও করতে পারবে না;
অনুচ্ছেদ ৩২ অনুযায়ী- যথাযথ আইনী প্রক্রিয়া ছাড়া কোন নাগরিকের ব্যক্তি ও জীবনের স্বাধীনতা হরন করা যাবে না;
অনুচ্ছেদ ৩৩ অনুযায়ী- এখানে ব্যক্তির গ্রেপ্তার ও আটক বিষয়ে রক্ষাকবচ দেয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, কোন ব্যক্তিকে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তারের কারন যথাশীঘ্র উল্লেখ না করে আটক রাখতে পারবে না এবং তাকে তার মনোনীত আইনজীবীর সাথে পরার্মশ করার সুযোগ দিতে হবে। তাছাড়া আটকের পরবর্তী ২৪ ঘন্টার মধ্যে আটককৃত ব্যক্তিকে আদালতে উপস্থাপন করবে পরবর্তী নির্দেশনার জন্য। তবে যদি তাকে কোন বিবর্তনমূলক আইনে আটক করা হয় বা সেই ব্যক্তি বর্তমানে দেশের শত্রু হয় তবে তার ক্ষেত্রে এই বিধান প্রযোজ্য হবে না। এটি সংবিধানের মূল ধারার সাংঘর্ষিক হলেও নিবর্তন মূলক আইনের যথেচ্ছ ব্যবহার এর গ্রহনযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। কেনইবা এই স্ববিরোধীতা;
অনুচ্ছেদ ৩৪ অনুযায়ী- বাধ্যতামুলক শ্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অর্থ্যাৎ কেউ জোর করে কাউকে দিয়ে শ্রম আদায় করতে পারবে না। এই অনুচ্ছেদে দুটি ব্যতিক্রম আছে- যেমন শ্রম যদি কারাভোগের অংশ হয় তাহলে বাধ্যতামুলক শ্রম আদায় করা যাবে আর দ্বিতীয়টি হল যদি জনগনের উদ্দেশ্য সাধনকল্পে তা আবশ্যক মনে হয়। যদিও কোন কোন ক্ষেত্রে রাষ্ট্র মনে করবে বাধ্যতামুলক শ্রম জনগনের উদ্দেশ্য সাধনকল্পে প্রয়োজন তা কোথাও উল্লেখ নেই। এখানে আইনের অস্পষ্টতা রয়েছে।
অনুচ্ছেদ ৩৫ অনুযায়ী- ফৌজদারী অপরাধের বিচার ও দন্ড নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছে। বর্তমান সময়ে যদি কোন কাজ অপরাধের পর্যায়ে না পড়ে তাহলে পরবর্তীতে নতুন আইন করে সেই কাজকে অপরাধ সংজ্ঞায়িত করে শাস্তি দেয়া যাবে না। একে আমরা ইংরেজিতে বলি "রেট্রোস্পেক্টিভ ইফেক্ট" এই নিয়ম পৃথিবীর প্রায়ই দেশেই আছে। একই অনুচ্ছেদের ৪ উপ-অনুচ্ছেদ খুবই গুরুত্বপূর্ণ- এতে বলা হয়েছে, কোন অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করা যাবে না। তাহলে ফৌজদারী কার্যবিধির ১৬৭ ধারা অনুযায়ী পুলিশ 'রিমান্ড' নামক ভয়ানক পদ্ধতির মাধ্যমে যেসব স্বাকারোক্তি অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবহার করেন তার গ্রহনযোগ্যতা কতটুকু? আইনের এই সাংঘর্ষিক অবস্থান বজায় রেখেই চলছে আমাদের ফৌজদারী শাসন ব্যবস্থা ;
অনুচ্ছেদ ৩৬ অনুযায়ী- নাগরিকের আইন সংগত বসবাস ও চলাফেরার নিশ্চয়তা বিধান করা হয়েছে ;
অনুচ্ছেদ ৩৭ অনুযায়ী- সকল নাগরিকদের শান্তিপূর্ন উপায়ে সভা-সমাবেশের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে ;
অনুচ্ছেদ ৩৮ অনুযায়ী- সকল নাগরিক আইন সংগত বিধি-নিষেধ সাপেক্ষে সংগঠন করার অধিকার দেয়া হয়েছে;
অনুচ্ছেদ ৩৯ অনুযায়ী- সকলের বাক-স্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে ;
অনুচ্ছেদ ৪০ অনুযায়ী- পেশা বা বৃত্তি নির্বাচনের স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে ;
অনুচ্ছেদ ৪১ অনুযায়ী- সকল নাগরিকের ধর্মীয় স্বাধীনতা বিধান করা হয়েছে ;
অনুচ্ছেদ ৪২ অনুযায়ী- সম্পত্তির উপর নাগরিকের অধিকার এবং সেই সম্পত্তি রাষ্ট্র যেন বাধ্যতামুলক অধিগ্রহন, রাষ্ট্রার্য়ত্তকরন ও দখল করতে না পারে তার বিধান দেয়া হয়েছে ;
অনুচ্ছেদ ৪৩ অনুযায়ী- আইনগত বিধি-নিষেধ সাপেক্ষ্যে নাগরিকের গৃহে প্রবেশ, তল্লাশি ও আটক থেকে নিরাপত্তা সহ চিঠিপত্র ও অন্যান্য যোগাযোগের গোপনীয়তা অধিকার দেয়া হয়েছে ;
এবার আসি রীট নিয়ে মুল আলোচনায়। পূর্বেই উল্লেখিত আছে, সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদে মহামান্য হাইকোর্টকে কতিপয় ক্ষেত্রে সরাসরি হস্তক্ষেপের ক্ষমতা দিয়েছে। আলোচনার সুবিধার্থে অনুচ্ছেদটি হুবহু তুলে দেয়া হলো---
অনুচ্ছেদ ১০২ (১) কোন সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির আবেদনক্রমে এই সংবিধানের তৃতীয় ভাগের দ্বারা অর্পিত অধিকার সমুহের যেকোন একটি বলবৎ করিবার জন্য প্রজাতন্ত্রের বিষয়াবলীর সহিত সম্পর্কিত কোন দ্বায়িত্ব পালনকারী ব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষকে হাইকোর্ট বিভাগ নির্দেশাবলী দান করিতে পারিবেন।
(২) হাইকোর্ট বিভাগের নিকট যদি সন্তোষজনক ভাবে প্রতীয়মান হয় যে,"আইনের দ্বারা অন্য কোন সমফল প্রদ বিধান করা হয় নাই, তাহা হইলে
(ক) কোন সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির আবেদনক্রমে
(অ) প্রজাতন্ত্র বা কোন স্থানীয় কর্তৃপক্ষের বিষয়াবলীর সহিত সংশ্লিষ্ট যেকোন দায়িত্ব পালনে রত ব্যক্তিকে আইনের দ্বারা অনুমোদিত নয়, এমন কোন কার্য করা হইতে বিরত রাখিবার জন্য কিংবা আইনের দ্বারা তাহার করনীয় কার্য করিবার জন্য নির্দেশ প্রদান করিয়া, অথবা-
(আ) প্রজাতন্ত্র বা কোন স্থানীয় কর্তৃপক্ষের বিষয়াবলীর সহিত সংশ্লিষ্ট যেকোন দায়িত্ব পালনে রত ব্যক্তির কৃত কোন কার্য বা গৃহিত কোন কার্যধারা আইন সংগত কতৃর্ত্ব ব্যতিরেকে করা হইয়াছে বা গৃহিত হইয়াছে ও তাঁহার কোন আইনগত কার্যকারীতা নাই বলিয়া ঘোষনা করিয়া উক্ত বিভাগ আদেশ দান করিতে পারিবেন, অথবা
(খ) যেকোন ব্যক্তির আবেদনক্রমে
(অ) আইন সংগত কর্তৃত্ব ব্যতিরেকে বা বেআইনী উপায়ে কোন ব্যক্তিকে প্রহরায় আটক রাখা হয় নাই বলিয়া যাহাতে উক্ত বিভাগের নিকট সন্তোষজনক ভাবে প্রতীয়মান হইতে পারে, সেইজন্য প্রহরায় আটক উক্ত ব্যক্তিকে উক্ত বিভাগের সম্মুখে আনয়নের নির্দেশ প্রদান করিয়া, অথবা
(আ) কোন সরকারী পদে আসীন বা আসীন বলিয়া বিবেচিত কোন ব্যক্তিকে তিনি কোন কর্তৃত্ববলে অনুরুপ পদমর্যাদায় অধিষ্ঠানের দাবী করিতেছেন, তাহা প্রদর্শনের নির্দেশ প্রদান করিয়া উক্ত বিভাগ আদেশ দান করিতে পারিবেন।"
উপরের অনুচ্ছেদটির ব্যাখ্যা করলে দেখা যায় - হাইকোর্ট এমনকিছু ক্ষেত্রে সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে পারেন যেখানে অন্য কোন আইনের মাধ্যমে কোন প্রকার প্রতিকারের ব্যবস্থা করা হয়নি।
সংবিধান অনুযায়ী, কোন সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি তার আইনী প্রতিকার লাভের জন্য সর্বনিম্ন এখতিয়ারাধীন আদালতে অভিযোগ দায়ের করবেন। যদি তিনি নিম্ন আদালত সমুহের সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট না হন তবে উপরের আদালতে যাবেন। অতএব দেখা যায়, সাধারনত হাইকোর্ট অভিযোগ দায়ের করার জন্য প্রাথমিক আদালত নয়। তবে কিছু কিছু বিষয়ে হাইকোর্ট প্রাথমিক বা বিশেষ অধিক্ষেত্র হিসাবে কাজ করে। তেমনেই একটি অধিক্ষেত্র হল এই রীট।
উপরের আলোচনা থেকে কয়কটি বিষয় স্পষ্ট অনুচ্ছেদ ১০২ (২) (ক) (অ) (আ) এর অধীনে আবেদন করতে পেলে কোন ব্যক্তির নিজের সংক্ষুব্ধ বা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বাধ্যবাধকতা আছে। কিন্তু অনুচ্ছেদ ১০২ (২) (খ) (অ) (আ) এর অধীনে যে কেউ সংক্ষুব্ধ হয়ে হাইকোর্ট- এর নিকট আবেদন করতে পারবেন।
এছাড়া আরও একটি বিষয় পরিস্কার করে বোঝা দরকার তা হলো- কোন ব্যক্তির বিরুদ্ধে রীট মামলা চলে না। প্রতিপক্ষ হতে হবে রাষ্ট্র কিংবা তার কোন অঙ্গে নিয়োজিত কোন কর্মকর্তা বা কর্মচারী।
আমাদের সংবিধান মুলত ব্রিটেন, ভারত ও মালয়েশিয়ার সংবিধানের আদলে রচনা করা হয়েছে। আমাদের দেশের পরিপেক্ষিতে এটি কতটা সঠিক বা কার্যকর সে প্রশ্ন ভিন্ন, কিন্তু এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ভাবে স্বীকৃত মৌলিক অধিকার সমুহের যথাযথ সংরক্ষন হচ্ছে কি না সেটিই দেখার বিষয়। সেহেতু ব্যক্তি বা ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠানকে এই আইনের আওতার বাইরে রাখা হয়েছে, তাই কোন প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান যদি আপনার মৌলিক অধিকার ক্ষুন্ন করে, তাহলে আপনি রীট মামলা দায়ের করতে পারবেন না। আপনাকে যেতে হবে, দেওয়ানী আদালত-এ, যার দীর্ঘ প্রক্রিয়া আমাদের কেবল নিরুৎসাহীই করে না, বিচার প্রক্রিয়ার অসাড়তাও নির্দেশ করে। ধরে নেয়া যাক- আপনি একটি প্রাইভেট মেডিকেল-এ ডাক্তার হিসাবে কর্মরত আছেন। আপনি পাঁচ (৫) বছর যাবৎ সুনামের সহিত কাজ করার পর,ম্যানেজমেন্ট যদি কোন কারনে আপনার উপর ক্ষিপ্ত হন, তাহলে কোন প্রকার কারন প্রদর্শন ছাড়াই আপনাকে চাকুরী হতে বরখাস্ত করতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে আপনার মনে হতেই পারে, এটি যদি সরকারী মেডিকেল হয়, তাহলে কি হবে? সহজ উত্তর আপনি রীট মামলা করার সুযোগ পাবেন, যার ফলাফল মোটামোটি ভাবে দ্রুত। সাম্যের নামে এই অসাম্যই কেন? তার উত্তর আমার জানা নাই।
উপরে আলোচনাটি মুলত সংবিধানের আলোকে রীট মামলা দায়ের করতে পারার বিধান বিষয়ে সীমাবদ্ধ। এতে যৌক্তিক বিশ্লেষন তেমন একটা নেই। রীট মামলা দায়ের করতে পারার বিধান আর এর মাধ্যমে সত্যিকারের প্রতিকার পাওয়া এক বিষয় নয়। বর্তমানে সাধারনের স্বার্থে এর ব্যবহার হওয়ার পাশাপাশি এটিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে অপব্যবহারও করা হচ্ছে। উদাহরন স্বরুপ ধরা যাক- সুন্দরবনের রামপালে কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র বন্ধের নির্দেশনা চেয়ে অক্টোবর মাসে দায়সারা ভাবে একটি রীট মামলা দায়ের করা হয়। আপাত দৃষ্টিতে এই রীট মামলা দায়ের করার পেছনে বৃহৎ জনগনের স্বার্থ মনে করা হলেও দেখা যায়, মামলাটি করার পূর্বে কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও তার প্রভাব সম্পর্কে কোন প্রকার গবেষণা করা হয়নি। ফলে আশানুরুপ ফল পাওয়া যায় নাই, শুরুতেই মুখ থুবড়ে পড়ে এর ভবিষ্যৎ। এতে যারা এবিষয়ে প্রতিবাদ করে আসছিলেন তাদের পক্ষ থেকে মামলা করার সুযোগটি নষ্ট হয়ে গেল, কেননা একই বিষয়ে দুটি মামলা চলতে পারে না (যদি ভিন্ন কোন প্রতিকার চাওয়া না হয়)।
আমরা দেখি, রাষ্ট্র পরিচালনায় ক্ষমতাসীন সরকারগুলো জনগনের ইচ্ছার প্রতিফলন না ঘটিয়ে রাজনৈতিক বিচারে প্রজাতন্ত্রের কার্যাদি নির্বাহ করার কারনে, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে, অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় প্রচলিত আইনের ব্যত্যয় ঘটেছে। বিগত পাঁচ (৫) বছরে বা তার আগের পাঁচ (৫) বছরে কি পরিমান সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারী ও.এস.ডি বা কাজবিহীন অবস্থায় পাঁচ (৫)টি বছরে জনগনের টাকা শ্রদ্ধ করেছেন তা থেকে কিছুটা ধারনা পাওয়া যায়। নির্বাচন আসন্ন বা পরবর্তী সরকার আসার পর এর ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে বলে ধারনা করা যায়। এছাড়া রাষ্ট্রযন্ত্রের বিভিন্ন অঙ্গগুলো তাদের কার্য নির্বাহ করার সময় অনেক ক্ষেত্রে এমন সব সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন যা সংবিধানের মৌলিক অধিকার পরিপন্থী। যেখানে রাষ্ট্রের দায়িত্বই হচ্ছে প্রজাতন্ত্রের নাগরিকদের সুবিধা-অসুবিধার দেখভাল করা সেখানে রাষ্ট্র নিপীড়কের ভুমিকা নেয়ার ফলে আদালত-এর কাছে সব সমস্যার সমাধান খুজতে যাওয়া ছাড়া আমাদের আর কোন গতান্তর থাকে না। সে কারনে বর্তমানে মামলার সংখ্যা যেখানে পৌঁছেছে তার চুড়ান্ত নিস্পত্তি হতে সময় লাগবে অন্তত আগামী দশ (১০)টি বছর। তাহলে মামলা করে লাভ কি হয়? এই ভাবনাটি মামলা দায়ের করার পূর্বের ধারনা। এরসাথে মামলা দায়ের, পরিচালনা ও অপরাপর প্রক্রিয়া যুক্ত আছে। আপনি কি চান বা কি পেতে পারেন তার ধারনার উপরই এসব প্রশ্নের উপর নির্ভরশীল। এনিয়ে বিস্তারিত আলোচনার প্রয়োজন। প্রথমত জানা দরকার, রীট মামলা দায়ের করার পর প্রথম শুনানীর দিন কি আদেশ-নির্দেশ পাওয়া যায় এবং সেটির আলাদা কোন গুরুত্ব আছে কি না? রীট মামলার ক্ষেত্রে এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়, রীট মামলা করার পেছনে কারন থাকে প্রাথমিক শুনানীর দিনই যেন অপর পক্ষের কোন কাজের বিরুদ্ধে রুল জারির পাশাপাশি অর্ন্তবর্তীকালীন স্থগিতাদেশ পাওয়া যায়। "রুল" হল "কারন দর্শানো নোটিশের আদালতি ভাষা"। ধরুন আপনি শুধুমাত্র রুল পেলেন প্রাথমিক শুনানীর দিন। তাহলে ধরে নিতে হবে আপনার মামলাটি মুলত ঝুলে গেল। এই মামলা সকল নোটিশ জারি করার পর চুড়ান্ত শুশানীর জন্য তৈরী হতে সময় লাগবে এবং যে পরিমান মামলা বিভিন্ন কোর্টে তালিকায় চুড়ান্ত শুনানীর জন্য অপেক্ষমান আছে, তাতে কোন কোর্ট নতুন মামলা নিতে আগ্রহী হবেন কি না সন্দেহ। দীর্ঘ সময় ধরে মামলা চুড়ান্ত শুনানী না হওয়ার কারনে অনেক সময় মামলা করার মুল উদ্দেশ্য হারিয়ে যায়। যেমন ধরুন- আপনি কোন এক সরকারী বিভাগে কর্মরত আছেন। নিয়ম অনুযায়ী আপনার পদোন্নতি হবার কথা অথচ আপনাকে পদোন্নতি না দিয়ে আপনার পরের অবস্থানে থাকা ব্যক্তিকে পদোন্নতি দিয়ে দিল। আপনি এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রীট মামলা দায়ের করলেন, আপনি সেই নিয়োগের বিরুদ্ধে স্থগিতাদেশ পেলেন না, কেবল "রুল" পেলেন। মামলাটি ঝুলে রইল। ছয় (৬) মাস অতিবাহিত হওয়ার পর ডিপার্টমেন্ট আপনাকেও পদোন্নতি দিল। এক্ষেত্রে ধরে নেয়া যায় এবং আইন আছে যে, একই বছরের মধ্যে যেহেতু পদোন্নতি হয়েছে সেহেতু আপনার সিনিয়রিটি বজায়। থাকবে। তাহলে আপনার রীট মামলা করার আর কোন প্রয়োজনীয়তা থাকে না। এক্ষেত্রে আদালতে আবেদনকারীর এবং রাষ্ট্রের যে ব্যয় তা পুরোটাই নেতিবাচক ব্যয়। তবে রীট মামলার মাধ্যমে কার্যকর সমাধান পাওয়ার তালিকাও কম দীর্ঘ নয়।
মাইলফলক হিসেবে উল্লেখ করতে হয়-
"মাজদার হোসেন" বনাম "বাংলাদেশ" মামলা, ১৯৯৯
মাজদার হোসেন সহ ৪৪১ জুডিশিয়াল অফিসার ১৯৯৫ সালে হাইকোর্ট বিভাগে একটি রীট আবেদন করেন। আবেদনের অন্যান্য দাবিসমুহের মধ্যে বিচার বিভাগের পৃথকীকরনের দাবি ছিল। সরকার পক্ষ এ মামলায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেনি। এক তরফা শুনানী করে হাইকোর্ট বিভাগ ১৯৯৭ সালে রায় দেন। এ রায়ের বিরুদ্ধে সরকার আপিল করে। আপিল বিভাগ হাইকোর্ট বিভাগের রায়ের আংশিক পরিবর্তন করে ১৯৯৯ সালে রায় ঘোষনা করেন। এ রায়ে সরকারের নির্বাহী বিভাগ হতে বিচার বিভাগের পৃথকীকরনের জন্য ১২টি নির্দেশাবলী দিয়েছেন।
বিচার বিভাগের পৃথকীকরনের দাবি ব্রিটিশ আমল থেকে হয়ে আসছে কিন্তু বিভিন্ন সময়ে এর উদ্যােগ নেয়া হলেও প্রকৃতপক্ষে ফলপ্রসূ কিছুই হয়নি। সুপ্রীম কোর্ট তা গুরুত্ব সহকারে বিষয়টি বিবেচনা করেন এবং এজন্য কি কি করনীয় তা বর্ননা দিয়ে সরকারকে তা বাস্তবায়নেরর নির্দেশ দেন। আওয়ামীলীগ সরকার, বিএনপির নেতৃত্বে জোট সরকার, লতিফুর রহমানের তত্ত্বাবধায়ক সরকার কেউ এগুলো বাস্তবায়ন করেনি। শেষে সরকারের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার জন্য ব্যবস্থা নেয়ার উদ্যােগ নিলে তড়িঘড়ি করে ফখরুদ্দীনের তত্ত্বাবধায়ক সরকার ১৮৯৮ সালের ফৌজদারী কার্যবিধি সংশোধন পূর্বক নিম্ন আদালতগুলোকে নির্বাহী বিভাগ হতে নভেম্বর, ২০০৭ বিচার বিভাগ পৃথক করা হয়। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট থাকলেও তাঁরা এখন আর বিচারিক কার্যাবলী সম্পাদন করেন না। তাছাড়াও সাম্প্রতিক কালে এমন অসংখ্য মামলার নজীর আছে, যার মাধ্যমে দেশে অনেক সমস্যার যুগান্তকারী সমাধান পাওয়া গেছে। সেসব নিয়ে বিস্তারিত অনেক লেখার বিষয় আছে যা পরবর্তীর জন্য রইল।
ছোট্র করে একটু বলে নেয়া দরকার, আদালতের কোন অর্ন্তবর্তীকালীন আদেশ যদি কেউ ভঙ্গ করেন তাহলে কি হবে? এর পরিপেক্ষিতে আদালত অবমাননার জন্য নতুন করে একটি মামলা হয় আদেশ/নির্দেশ ভঙ্গকারীর বিরুদ্ধে, তাতে আদালত মামলার বিষয়বস্তুর আলোকে প্রয়োজনীয় শাস্তিমুলক আদেশ দিতে পারেন। এসব মামলার ক্ষেত্রে প্রচলিত সমাধান হচ্ছে ভুল স্বীকার সহ শর্তহীন ক্ষমা চাওয়া, অভিযোগের কোন একটি বিষয়ে যদি আপনি আপত্তি করেন তবে সেই মামলা উভয়পক্ষের শুনানীর মাধ্যমে নিস্পত্তি হয়। বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই প্রথমোক্ত সমাধানই বেছে নিতে দেখা যায়।
রীট বিষয়টি অনেক বিস্তৃত একটি আইনী বিধান। এত স্বল্প পরিসরে এর পূর্ন আলোচনা সম্ভব নয়। কিন্তু সাধারন পাঠক কিছুটা ধারনা অন্তত এই লেখার মাধ্যমে পেলে হয়তো রীট বা প্রচলিত আইন ও তার প্রয়োগ সম্পর্কে বিস্তারিত লেখার আগ্রহ সৃষ্টি করবে আমার, ধন্যবাদ।।
[সংকলিত এই লিখনীর ভুল শুদ্ধিয়ে দেয়া জ্ঞানীর কর্তব্য]