16/01/2026
সে এক চরম পরীক্ষার সময়। আরবের তপ্ত মরুভূমিতে ইসলামের দাওয়াত দিতে গিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) একের পর এক কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হচ্ছেন। পরম প্রিয়তমা স্ত্রী খাদিজা (রা.) এবং পরম আশ্রয়দাতা চাচা আবু তালিব ইন্তেকাল করেছেন। মক্কার কুরাইশদের অত্যাচার চরমে পৌঁছেছে, আর তায়েফের ময়দানে ঝরেছে তাঁর পবিত্র রক্ত। ইসলামের ইতিহাসে এই বছরটি 'আমুল হুজন' বা 'দুঃখের বছর' হিসেবে পরিচিত।
ঠিক এমনই এক নিস্তব্ধ রাতে, যখন গোটা মক্কাবাসী গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, তখন কাবা শরীফের হাতিমে শুয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন বিশ্বনবী (সা.)। হঠাৎ আধো-ঘুম আধো-জাগরণ অবস্থায় তিনি এক স্বর্গীয় আলোকচ্ছটা দেখতে পেলেন। জিবরাঈল (আ.) আকাশ থেকে নেমে এলেন মহান রবের বিশেষ বার্তা নিয়ে।
ফেরেশতা জিবরাঈল (আ.) এবং মিকাঈল (আ.) নবীজিকে জমজম কূপের পাশে নিয়ে গেলেন। সেখানে এক অলৌকিক অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হলো—যাকে বলা হয় 'শাক্কুস সাদর'। তাঁর বক্ষ বিদীর্ণ করে হৃদপিণ্ডটি বের করে আনা হলো এবং জমজমের পবিত্র পানি দিয়ে ধুয়ে ঈমান ও হিকমতে (প্রজ্ঞা) পরিপূর্ণ করে আবার যথাস্থানে স্থাপন করা হলো। এটি ছিল আসন্ন এক মহাজাগতিক সফরের প্রস্তুতি।
-----------------------------------------------------------------------
মসজিদুল হারামের দরজায় একটি শ্বেতশুভ্র পশু দাঁড়িয়ে ছিল। গাধার চেয়ে বড় আর খচ্চরের চেয়ে ছোট এই অদ্ভুত সুন্দর প্রাণীটির নাম 'বোরাক'। এর গতি এতই বেশি ছিল যে, তার দৃষ্টি যেখানে গিয়ে পড়ে, একেকটি পদক্ষেপ সেখানে গিয়ে পড়ে।
জিবরাঈল (আ.) বললেন, "হে আল্লাহর রাসুল, আরোহন করুন।"
মুহূর্তের মধ্যে বোরাক মক্কা থেকে রওনা হলো ফিলিস্তিনের জেরুজালেমের 'বায়তুল মুকাদ্দাস' অভিমুখে। ইতিহাসে এই অংশটুকুকে বলা হয় 'ইসরা'। মরুর বুক চিরে বাতাসের বেগে ছুটে চললেন তাঁরা। পথে তিনি সিনাই পর্বত এবং বেথলেহেমের মতো পবিত্র স্থানগুলো অতিক্রম করলেন, যেখানে পূর্ববর্তী নবীগণের স্মৃতি জড়িয়ে আছে।
বায়তুল মুকাদ্দাসে পৌঁছে নবীজি (সা.) দেখলেন সেখানে পূর্ববর্তী লক্ষাধিক নবী-রাসুল সমবেত হয়েছেন। সেখানে তিনি দুই রাকাত সালাত আদায় করলেন এবং সকল নবী-রাসুলের ইমামতি করলেন। এটি ছিল এক অনন্য দৃশ্য—যেখানে সৃষ্টির সেরা মানবকে স্বীকৃতি দিলেন জগতের সকল নবী। এরপর তাঁর সামনে পানি, দুধ ও শরাবের তিনটি পাত্র পেশ করা হলো। নবীজি (সা.) দুধের পাত্রটি বেছে নিলেন। জিবরাঈল (আ.) মুচকি হেসে বললেন, "আপনি স্বভাবজাত ধর্মকেই (ফিতরাত) বেছে নিয়েছেন।"
-----------------------------------------------------------------------
বায়তুল মুকাদ্দাস থেকে এবার শুরু হলো দ্বিতীয় পর্ব— 'মেরাজ' বা ঊর্ধ্বগমন। এক বিশেষ সিঁড়ি বা লিফটের মাধ্যমে (যাকে মেরাজ বলা হয়) তাঁরা আকাশের দিকে যাত্রা করলেন। পৃথিবীর সীমানা ছাড়িয়ে মহাকাশের প্রথম স্তরে গিয়ে জিবরাঈল (আ.) আকাশের দরজায় করাঘাত করলেন।
উপর থেকে প্রশ্ন এলো, "কে আপনি?"
— "আমি জিবরাঈল।"
— "আপনার সাথে কে?"
— "মুহাম্মদ (সা.)।"
— "তাঁকে কি ডাকা হয়েছে?"
— "হ্যাঁ।"
ফটক খুলে গেল। প্রথম আসমানে নবীজি (সা.) দেখলেন একজন দীর্ঘদেহী মহিমান্বিত পুরুষ বসে আছেন। তাঁর ডানে ও বামে মানুষের রুহ বা আত্মা। ডানে তাকালে তিনি হাসছেন, আর বামে তাকালে তিনি কাঁদছেন। জিবরাঈল (আ.) পরিচয় করিয়ে দিলেন, "ইনি আপনার পিতা আদম (আ.)।"
আদম (আ.) তাঁর সুযোগ্য সন্তান ও শেষ নবীকে দেখে খুশিতে আত্মহারা হয়ে দোয়া করলেন। সেখানে নবীজি জান্নাতী এবং জাহান্নামীদের কিছু দৃশ্যও প্রত্যক্ষ করলেন, যা তাঁর হৃদয়কে বিচলিত করে তুলল।
-----------------------------------------------------------------------
ভ্রমণ চলল ঊর্ধ্বপানে। প্রতিটি আসমানে একই নিয়ম মেনে নবীজি প্রবেশ করতে থাকলেন:
দ্বিতীয় আসমান: এখানে তাঁর দেখা হলো হযরত ঈসা (আ.) এবং হযরত ইয়াহইয়া (আ.)-এর সাথে। তাঁরা দুজনে নবীজিকে পরম শ্রদ্ধায় স্বাগত জানালেন।
তৃতীয় আসমান: এখানে দেখা হলো হযরত ইউসুফ (আ.)-এর সাথে। তাঁর সৌন্দর্য দেখে নবীজি মুগ্ধ হলেন। জিবরাঈল (আ.) বললেন, "ইউসুফকে জগতের অর্ধেক সৌন্দর্য দান করা হয়েছে।"
চতুর্থ আসমান: এখানে সাক্ষাৎ হলো হযরত ইদ্রিস (আ.)-এর সাথে।
পঞ্চম আসমান: দেখা হলো হযরত হারুন (আ.)-এর সাথে।
ষষ্ঠ আসমান: এখানে দেখা হলো হযরত মুসা (আ.)-এর সাথে। মুসা (আ.) নবীজিকে দেখে কেঁদে ফেললেন। কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, "আমার পরে এক যুবক নবী হয়ে এলেন, যাঁর উম্মত আমার উম্মতের চেয়েও বেশি জান্নাতে যাবে।" (এটি ছিল আনন্দের ও গর্বের কান্না)।
সপ্তম আসমান: এখানে দেখা হলো জাতির পিতা হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর সাথে। তিনি 'বায়তুল মামুর' (ফেরেশতাদের কাবা)-এ হেলান দিয়ে বসে ছিলেন। তিনি নবীজিকে বললেন তাঁর উম্মতদের জান্নাতে গাছ লাগানোর জন্য সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ পাঠ করতে বলতে।
-----------------------------------------------------------------------
সপ্তম আকাশ পেরিয়ে জিবরাঈল (আ.) নবীজিকে নিয়ে এক অভাবনীয় স্থানে পৌঁছালেন। সেখানে একটি বিশাল কুল বৃক্ষ বা বরই গাছ, যার নাম 'সিদরাতুল মুনতাহা'। এই গাছের পাতাগুলো হাতির কানের মতো বিশাল এবং এর ফলগুলো মটকার মতো বড়। স্বর্ণের পতঙ্গরা গাছটিকে ঘিরে ডানা ঝাপটাচ্ছিল এবং সেটি নূরের হাজারো রঙে ঝলমল করছিল।
এখানে এসে জিবরাঈল (আ.) থমকে দাঁড়ালেন। তিনি বললেন, "হে আল্লাহর রাসুল! এর সামনে যাওয়ার অনুমতি আমার নেই। যদি আমি আর এক ইঞ্চিও সামনে অগ্রসর হই, তবে আল্লাহর নূরের তাজল্লিতে আমার পাখাগুলো পুড়ে ছাই হয়ে যাবে।"
বিশ্বের ইতিহাসে এটিই সেই সীমানা, যেখানে সৃষ্টি ও স্রষ্টার মাঝে এক সূক্ষ্ম পর্দা বিদ্যমান। নবীজি (সা.) একা এগিয়ে চললেন এক রহস্যময় আধ্যাত্মিক বাহনে, যার নাম 'রফরফ'। তিনি কাল ও স্থানের (Time and Space) উর্ধ্বে চলে গেলেন।
-----------------------------------------------------------------------
নবীজি (সা.) এমন এক জায়গায় পৌঁছালেন যেখানে কলমের খসখস শব্দ শোনা যাচ্ছিল (যা দিয়ে ফেরেশতারা তাকদির লিখছেন)। তিনি পর্দা সরিয়ে আরশে আজিমের সন্নিকটে পৌঁছালেন। পবিত্র কুরআনের ভাষায়, তাঁদের মধ্যকার দূরত্ব ছিল মাত্র দুই ধনুক পরিমাণ, অথবা তার চেয়েও কম।
সেখানে কোনো শব্দ ছিল না, কোনো উপমা ছিল না। ছিল শুধু এক পরম প্রশান্তি। নবীজি (সা.) তাঁর রবকে সালাম পেশ করলেন এই বলে—
"আত্তাহিয়াতু লিল্লাহি ওয়াস সালাওয়াতু ওয়াত তয়্যিবাত" (যাবতীয় সম্মান, উপাসনা ও পবিত্রতা একমাত্র আল্লাহর জন্য)।
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন উত্তর দিলেন—
"আসসালামু আলাইকা আইয়ুহান নাবিয়্যু ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু" (হে নবী! আপনার ওপর শান্তি, আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক)।
এটি ছিল মহাবিশ্বের শ্রেষ্ঠতম সংলাপ। আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় হাবিবকে জান্নাত ও জাহান্নাম দেখালেন এবং উম্মতের জন্য এক বিশেষ উপহার তুলে দিলেন— যা ছিল ৫০ ওয়াক্ত নামাজ।
-----------------------------------------------------------------------
আল্লাহর সান্নিধ্য থেকে ফেরার পথে ষষ্ঠ আসমানে আবার দেখা হলো হযরত মুসা (আ.)-এর সাথে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, "আপনার উম্মতের জন্য আল্লাহ কী দিয়েছেন?"
নবীজি বললেন, "দিন-রাতে ৫০ ওয়াক্ত নামাজ।"
অভিজ্ঞ নবী মুসা (আ.) বললেন, "হে আল্লাহর রাসুল! ফিরে যান। আপনার উম্মত এত নামাজ পড়তে পারবে না। আমি বনী ইসরাইলদের নিয়ে অনেক পরীক্ষা করেছি। আল্লাহর কাছে গিয়ে এটি কমিয়ে আনুন।"
নবীজি (সা.) আল্লাহর কাছে কয়েকবার যাতায়াত করলেন এবং প্রতিবার আল্লাহ কিছু কিছু করে কমিয়ে দিলেন। শেষ পর্যন্ত তা এসে দাঁড়াল ৫ ওয়াক্তে। আল্লাহ বললেন, "হে মুহাম্মদ! এই ৫ ওয়াক্ত নামাজ যে আদায় করবে, সে ৫০ ওয়াক্তেরই সওয়াব পাবে। আমার কথার কোনো রদবদল হয় না।"
-----------------------------------------------------------------------
রাত্রির শেষ প্রহরে নবীজি (সা.) পুনরায় মক্কায় ফিরে এলেন। তাঁর বিছানা তখনও গরম ছিল এবং ওজুর পানির গড়িয়ে পড়ার শব্দ তখনও স্তব্ধ হয়নি। পরদিন সকালে যখন তিনি কাবা চত্বরে এই অলৌকিক ভ্রমণের কথা বললেন, কুরাইশরা হাসাহাসি শুরু করল। তারা বলল, "এক রাতে কেউ মক্কা থেকে জেরুজালেম গিয়ে আবার আসমানে ঘুরে আসতে পারে? এ অসম্ভব!"
কাফেররা তাঁকে পরীক্ষা করার জন্য বায়তুল মুকাদ্দাসের বর্ণনা জানতে চাইল। আল্লাহ তায়ালা নবীজির চোখের সামনে বায়তুল মুকাদ্দাসের দৃশ্য তুলে ধরলেন এবং তিনি খুঁটিনাটি সব বর্ণনা নির্ভুলভাবে বলে দিলেন। এমনকি পথে তিনি কুরাইশদের একটি কাফেলা দেখেছিলেন, তাদের নিখুঁত বর্ণনাও দিলেন।
সবশেষে আবু বকর (রা.) যখন এই সংবাদ শুনলেন, তিনি এক মুহূর্ত দেরি না করে বললেন, "যদি মুহাম্মদ (সা.) এটি বলে থাকেন, তবে তা ধ্রুব সত্য।" এই অটল বিশ্বাসের কারণেই নবীজি তাঁকে 'সিদ্দিক' (মহা সত্যবাদী) উপাধি দেন।
-----------------------------------------------------------------------
শবে মেরাজ কেবল একটি ভ্রমণ ছিল না; এটি ছিল নবীজির অপমানের বিনিময়ে আল্লাহর দেওয়া এক মহিমান্বিত সংবর্ধনা। এটি আমাদের শিখিয়ে দেয় যে, যখন দুনিয়ার সব দরজা বন্ধ হয়ে যায়, তখন আসমানের দরজাগুলো মুমিনের জন্য খুলে যায়। ৫ ওয়াক্ত নামাজ সেই মেরাজেরই একটি টুকরো যা প্রতিটি মুমিনের জন্য উপহার হিসেবে রয়ে গেছে।
-----------------------------------------------------------------------