Dr Rupam Writings

Dr Rupam Writings Dr Rupam's own writings- different types of Poetry, articles & stories etc

30/09/2025

গল্পঃ

নিয়মের শক্তি
- আশিকুর রহমান রুপম // ৩০.০৯.২০২৫

রাজশাহী শহরের একটা এলাকার দুইটা প্রতিবেশি ছিল। এক বাড়িতে থাকত রোহান, আরেকটা বাড়িতে বাস করত সোহান। দুই জনই ৪র্থ শ্রেণীতে পড়ত। রোহানের বাবা ছিলেন হাই স্কুলের শিক্ষক, আর সোহানের বাবা ছিলেন বিশিষ্ট ব্যবসাহী। রোহানরা ২ ভাই আর সোহানরা ১ ভাই, ১ বোন।

রোহানের বাবা ছিলেন অত্যন্ত গম্ভীর, রাশভারী মানুষ। নিয়মের ব্যপারে ছিলেন খুবই কড়া। এক চুলও এদিক ওদিকে হতে দিতেন না। বাসায় ২ ভাই সব সময় দুষ্টুমি করলেও, যখনই রোহানের বাবার আসার শব্দ বা গলার শব্দ পেত দুই ভাই ভয়ের চোটে টেবিলে পড়তে বসে যেত। রোহানের বাবা মাস্টার সাহেব নিয়ম করে ফজরের আগে উঠতেন। এরপর দুই ভাইকে এক ডাক দেওয়ার সাথে সাথে তারা লাফিয়ে উঠত। দুই ভাইকে পরিষ্কার পাঞ্জাবী পড়িয়ে মসজিদে নিয়ে যেতেন। ফজরের সময় পাঞ্জাবী সব সময় পরিষ্কার দেখতে চাইতেন। নোংরা পাঞ্জাবী দেখলে রেগে যেতেন। বাড়ি থেকে বের হবার সময় নিজের পকেট থেকে সুগন্ধি আঁতর লাগিয়ে দিতেন দুই ভাইয়ের পাঞ্জাবীতে। এতে তিনি মানতেন যে দিনের শুরুটাই পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা এবং সুগন্ধি মন ও মস্তিষ্কে একটা সুন্দর প্রভাব ফেলে। নামাজ শেষ করে বাড়ি ফেরার পথে তিনি ছোট ছোট সুরা শুনতে চাইতেন, দুই ভাইয়ের কাছ থেকে। পালানোর কোনো উপায় নেই, রাগ দেখানোরও কোনো উপায় নেই। কারন একটু ব্যপ্তয় ঘটলেই "মাইরের উপর ওষুধ নাই"। দুই ভাইও চালাক। কি দরকার বাপু! মাইর খাওয়ার । বাপ যা চাচ্ছেন দিয়ে দাও। সব ঠান্ডা।

যাই হোক, এরপর বাড়ি ফিরে বাড়ির পেছনের ছোট্ট বাগানে নিয়ে গিয়ে ব্যায়াম শুরু। বিভিন্ন রকম ব্যায়াম শিখাতেন। তিনি মানতেন শরীর সুস্থ তো, সব সুস্থ। আধা ঘন্টা ব্যায়াম করে এসে হাত মুখ ধুয়ে চা, মুড়ি, কলা খেয়ে পড়তে বসাতেন। এর পর শুরু হতো ঐ দিনের ক্লাসে কি কি ধরবে বা কি কি পড়া আছে, সেগুলো হয়েছে কি না। না হলে ওখানে বসে শেষ করে বাবার কাছে পড়া দিয়ে তারপর উঠে গোসল করে এসে নাসতা। স্কুলে কোনো দিনও গোসল না করে পাঠাতেন না মাস্টার সাহেব। তিনি মানতেন স্কুল থেকেই একটা ফরমাল জীবনের শুরু হয়। আর গোসল না করে গেলে সেই ফরমালিটি কখনো পুরণ হয় না, এমন কি শীত কালেও তিনি গরম পানি দিয়ে হলেও গোসল করতে বলতেন। এর পর স্কুল ড্রেস পড়ে নাসতা করতেন দুই ছেলে আর তাদের মাকে নিয়ে। তিনি সব সময় ৪ জনকে নিয়ে সকালের নাসতা আর রাতের খাবার এক সাথে খেতেন। স্কুলের ড্রেসটাও হতে হবে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন, আইরন করা। কুচকানো ড্রেস দেখলেই তেলে বেগুনে জ্বলে উঠতেন। ২ ভাইয়েরই ২ সেট ড্রেস থাকতো। এবং সেই ড্রেস গুলো নিজেকে কাঁচতে হতো। অবশ্য অন্যান্য কাপড় চোপড় ওদের মা-ই কেঁচে দিত। হাজার হোক ছোট মানুষ।

অন্যদিকে সোহানের ঘুম ভাঙত সকাল সাড়ে ৮ টা থেকে পৌনে ৯ টার দিকে। সকাল থেকে মা অনেক বার ডাকলেও সে উঠত না। বরং উলটো মাকেই বকা বকি করত। আর সোহানের বাবাও তখন ঘুমে থাকতেন। উঠতেন ১০টার পরে। উঠে নাসতা করে দোকানে যেতেন। যাই হোক, সোহান ঘুম উঠে গোসল তো দূরে থাক, কোনো রকমে ২ টা মুখে গুজেই দৌড় দিত স্কুলে। বেশির ভাগ দিনই তার স্কুলে পৌছাতে দেরি হত। স্যারেরাও বিরক্ত ছিল ওর উপর। কয়েকবার অভিভাবক কল করেছে। কোনোবারই তাঁর বাবা আসেনি। এসেছে মা। আর মা-এর তো তেমন প্রভাবই ছিল না। কারন বাবা ছিলেন এগুলা ব্যাপারে উদাসীন।

এদিকে রোহানের বাবার বাড়ি ফিরতে ফিরতে ৩ টা বেজে যেত। বাড়ি ফিরে যদি দেখতেন যে দুই ভাই না ঘুমিয়ে খেলছে বা টিভি দেখছে, তাহলেই তুলকালাম ঘটনা ঘটে যেত। নিয়ম ছিল স্কুল থেকে এসে গোসল করে, নামাজ পড়ে, দুপুরের খাবার খেয়ে কোনো কথা হবে না, সরসরি ঘুম। বাবা যেন এসে দেখতে পান যে দুই ভাই ঘুমাচ্ছে। তাই অনেক সময় ঘুম না এলেও বাবার আসার শব্দে দৌড়ে গিয়ে দুই ভাই ঘুমের অভিনয় করত। আর অভিনয় করতে করতে কখন যেন সত্যি সত্যিই ঘুমিয়ে পড়ত তারা। বিকালে উঠে বাবা তাদের এক সাথে আসরের নামাজ পড়তে মসজিদে নিয়ে যেতেন। একবার ফেরার পথে রোহান বারবার বাবার মুখের দিকে তাকাচ্ছে আর কেমন যেন কাচু মাচু করছে। বাবা তা খেয়াল করলেন, আর মুচকি হেসে বললেন, কি রে খেলতে যাবি মাঠে?
ওমনি, দুই ভাই এক সাথে হ্যা সূচক মাথা নাড়ালেন। ঠিক আছে যাহ! তবে চারিদিকের আজান শেষ হবার আগেই বাড়ি ঢোকা চাই। দেরি হলে খবর আছে।
সেই থেকে আসরের নামাজ শেষে বাবার আগেই তারা মসজিদ থেকে বের হয়ে মাঠের দিক দৌড় দিত। এবং মাগরিবের সময় আবার মসজিদে বাবার সাথে দেখা হত। মসজিদ থেকে বাড়ি ফিরে ভাল করে হাত মুখ ধুয়ে নাসতা করে কঠোর মনযোগ দিয়ে পড়াশোনা। বাবা বলতেন মাগরীবের আর ফজরের পরের সময়টা সোনার চেয়েও দামি। এ সময় কখনোই নষ্ট করা যাবে না। একটানা এশা পর্যন্ত পড়ে, মসজিদে নামাজ পড়ে এসে। বাবা সবাইকে নিয়ে রাতের খাবার খেতে বসতেন। এমন না যে মা দাঁড়িয়ে থেকে খাবার সার্ভ করছেন আর বাকি বাপ-ব্যাটা খাবার খাচ্ছেন, বরং মা সহ সবাই এক সাথে খাবার খান। খাবার টেবিলে বাবা রোহানদের দুই ভাইকে জিজ্ঞেস করেন আজ সারাদিনে নতুন কি শিখেছো? দুই ভাই সুন্দর করে উত্তর দিত। কিছু না শিখলে খাবার থেমে যেত। আগে শিখবে, বলতে হবে তাঁর পর ঠান্ডা খাবার হলেও তা খেতে হবে। এই রকম কড়া নিয়ম ছিল রোহানদের। ১০-১১ টার মধ্যে ঘুম।

অন্যদিকে সোহানের ঘুমাতে ঘুমাতে রাত ১২-১টা বেজে যেত। সোহানের বাবা রাত করে বাসায় আসত। এসে খাবার খেয়ে ঘুম দিত। এই জন্য তাঁর উঠতেও দেরি হত। তিনি ডায়াবেটিস, ফ্যাটি লিভার ও ওবেসিটি (স্থুলতা) তে আক্রান্ত। তবু এদিকে ভ্রুক্ষেপ নাই। ছেলে কি করছে, তাঁর বালাইও নাই। কিনে দিয়েছেন একটা স্মার্ট ফোন, সোহান সারাদিন ঐ ফোনে ব্যস্ত থাকে। গেমস খেলে, টিকটক দেখে। অল্প বয়সেই চোখে চশমা আর সেও কিছুটা স্থুল (মোটা)। বিকালেও সে মাঠে খেলতে যাই না। সবাই যখন মাঠে, তখন সে ঘুমাই। ওঠে প্রাইভেট টিচার এলে। টিচারও বিরক্ত তাঁর উপর। কোনো হোম ওয়ার্ক ঠিক মত করে না সে। আজ পেট ব্যাথা, কাল জ্বর, পরশু দিন স্কুলে প্রোগ্রাম, এই সব বলে বলে কাটিয়ে দিত। অনেক টিচার বিরক্ত হয়ে চলে গেছে। কিন্তু এই টিচার যেতে পারে নি। কারন তারও যে টাকা দরকার। ভাবে সে কষ্ট মষ্ট করে একে চালিয়ে নিয়ে যেতে পারে কি না! সোহানের মা এলে, টিচার উনাকে বলতে থাকেন যে, ছেলে ঠিক মত পড়ছে না। এরকম করলে রেজাল্ট ভাল হবে না। আপানারা একটু কেয়ার নেন। এরকম সময় সুস্বাদু নাস্তা চলে আসে সামনে। টিচারও থেমে যান। খাওয়ার সামনে নিয়ে কি আর অন্তত শাসন করা চলে!

রোহানদের বাসায় একটা মাত্র স্মার্ট ফোন সেটা তে রোহানদের হাত দেওয়া নিষেধ। মায়ের ছিল বাটন ফোন। মা চাইলে অবশ্য বাবার স্মার্ট ফোন ব্যবহার করতেন। রোহানদের ছিল অনেক গল্পের বই, পত্রিকা, বিজ্ঞান ম্যাগাজিন। ছোট খাটো লাইব্রেরী হয়ে গিয়েছিল বাসায়।

এভাবেই দিন কেটে যেতে লাগল। বছর শেষে এল পরীক্ষা। সারা এলাকায় সে কি উত্তেজনা। যে সকল অভিভাবক অর্ধশিক্ষিত বা অশিক্ষিত তারাও ভাল ভাল রান্না করে ছেলে মেয়েদের পরীক্ষা দিতে পাঠান যাতে ভাল রেজাল্ট করে। পরীক্ষা শেষে সোহানের কিঞ্চিত মন খারাপ। অংক পরীক্ষা ভাল হয় নি। সব মিললেও উত্তরটাই শুধু একটু এলো মেলো হয়ে গেছে।

রেজাল্টের দিন। স্কুল মাঠ জুড়ে সব বাবা মা এসেছে। বার্ষিক পরীক্ষার ফলাফল বলে কথা। পরের ক্লাসে উঠে যাবে সব ছাত্রছাত্রীরা। অবশ্য বরাবরের মত এবারও সোহানের মা এসেছেন শুধু। রোহানের বাবা মা উভয়েই এসেছেন।ফলাফল ঘোষনা হলঃ
৪র্থ থেকে ৫ম ক্লাসে ১ম স্থান অধিকার করল রোহান। সোহান ১০০ জন ছাত্রের মধ্যে ৭৬ তম হয়েছে। রোহানের বড় ভাই ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে ১ম হয়েছে। রোহানদের বাবা মায়ের চোখে জ্বল। আনন্দের জ্বল। পরিশ্রম সার্থক। মহান আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করলেন তারা।

অন্যদিক আরেকজনের চোখেও একবিন্দু জ্বল ছিল... কিন্তু কিছু না করতে পারার কষ্টের জ্বল। তিনি হলেন সোহানের মা ......

এবার আপনারাই বলেন, এটা কি নিয়মের বেড়াজাল? নাকি নিয়মের শক্তি? 🙂

Address

Proactive Bhaban, Estern Side Of Ex-food Garden, Binodpur Bazar
Rajshahi
6206

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Dr Rupam Writings posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Shortcuts

Share

Category