14/01/2026
তোলো ছিন্নবীণা
বাঁধো নতুন তারে-
=============
জানি না কেন এই কথাটাই বারবার মনে ফিরে আসে। হয়তো কারণ, কিছু ভাঙন এমন হয় যেগুলো আর জোড়া লাগে না; তারা শুধু নতুন সুরে বেঁচে থাকতে শেখে। এভাবেই তো আমরা “বেঁধে বেঁধে আছি” হাত ধরে নয়, পাশাপাশি বসে নয়, কেবল স্মৃতির সূক্ষ্ম সুতোয়। ভুলে যাওয়ার জন্য নয়, বরং সময় যত দূরে নেয়, তত গভীরে ধরে রাখার জন্য। কারণ স্মৃতির সুর যদি থেমে যেত, হয়তো এই বুকটাই শূন্য হয়ে পড়ত।
মধুরও মধুরও ধ্বনি বাজে,
হৃদয়ও কমলও বন মাঝে…
সরদহ সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের আঙিনায় কেটেছিল আমাদের কৈশোরের সবচেয়ে মধুর দিনগুলো। ছেলেবেলার ছোট ছোট সুখ-দুঃখ, অকারণ অভিমান, নিঃস্বার্থ হাসি আর অনাবিল আনন্দে ভরা সেই সময় আজও মনে পড়লে বুকের ভেতর কোথাও একটা নরম ব্যথা জেগে ওঠে। ফেলে আসা দিনগুলোকে আমরা ভুলিনি, ভুলে যাওয়ার কোনো উপায়ও নেই। নতুন করে সেই দিনগুলোর কাছাকাছি যেতে চেয়েই হয়তো মন আজো বারবার পেছনে ফিরে তাকায়, স্মৃতির দরজায় নীরবে কড়া নাড়ে।
স্মৃতিচারণেরও একটা অদ্ভুত মাদকতা থাকে। গত ক’দিন ধরে আমরা যেন সেই ঘোরের ভেতরেই আটকে আছি। কখনো অকারণেই হেসে উঠি, আবার পরমুহূর্তেই চোখ ভিজে আসে, নিজের কাছেই তার ব্যাখ্যা খুঁজে পাই না। কখনো চায়ের কাপ তুলতে গিয়ে পিরিচটাই উঠে আসে; হাত ঠিক আছে, মনটাই যেন ঠিক জায়গায় নেই। চোখ ঝাপসা হয়- যেমন হয়, যখন ভেতরের দৃশ্যগুলো বাইরের সবকিছুকে ঢেকে দেয়। সেই ঝাপসা চোখেই একে একে ভেসে ওঠে নামগুলো: কে রুমা, কে বিপ্লবী; বেলী, যেন ফুলের গন্ধে মোড়া কিম্বা শাহানার শাহানশাহ; কাকলীর কলকাকলীতে নওরোজ- নতুন দিনের ডাক, দীপুর দীপ্তি, মুকুট- নীরব গর্বের মতো, লতিফা- মমতার ছায়ায় মোড়া, মুক্তি- সব স্মৃতির শেষে দাঁড়িয়ে থাকা একটুকরো নিঃশ্বাস, আর আমি এই সব নামের মাঝখানেই আটকে থাকা একটুকরো সময়।
মুক্তিরো মন্দিরের সোপানতলে দাঁড়িয়ে মনে হয়, এরা সবাই আমাদের জীবনের এমন এক একটি অধ্যায়, যেগুলো শেষ হয়ে গেলেও কখনো বন্ধ হয় না। যাদের ছাড়া গল্প লেখা যায়, কিন্তু পড়া যায় না।
আবার হবেগো দেখা-এই কথাটার ভেতরে যে কতটা নীরব কান্না লুকিয়ে থাকে, তা কেবল যারা দূরে গেছে তারাই জানে। কারণ বিদায়ের সময় কেউ বলে না- এটাই শেষ। সবাই বলে- আবার হবে। আর সেই “আবার”-এর অপেক্ষায় কেটে যায় কত রাত, কত বছর। সময় আমাদের আলাদা জীবনে বেঁধে দিয়েছে, আলাদা দায়িত্ব শিখিয়েছে, তবু হৃদয়ের ভেতর সেই দিনগুলো আজো ঠিক আগের জায়গাতেই পড়ে আছে- একটুও নড়েনি। টিকে থাক মনে, তেরোই জানুয়ারির সমস্ত স্মৃতিগুলো- আগামীর পুনর্মিলনী পর্যন্ত। যদি সত্যিই আবার দেখা হয়, তখন হয়তো অনেক কিছু বদলে যাবে; শুধু এই স্মৃতিগুলোই নিঃশব্দে বলে দেবে- আমরা একদিন এমনই ছিলাম, একসাথে।
কিছু মানুষ যায় না। তারা থেকে যায়- চোখের জলে, হঠাৎ থেমে যাওয়া কথায়, আর এমন কিছু রাতে, যখন সব ঠিক থাকার মাঝেও বুকটা নিঃশব্দে ভেঙে পড়ে।
বাচ্চারা, তোমরা যারা অবাক ভেবে, বিস্ময়ে আমাদের দেখেছো, তোমাদের অনেক আদর আর স্নেহাশিস। সেই ছোট ছোট চোখের উজ্জ্বলতা, নিঃশব্দ হাসি, খেলা-ধুলার শব্দ যা আমাদেরও ছিলো- সবই আজও মনে পড়ে। ফেলে আসা দিনগুলো মনে করার সময় বোধ হয়, আমাদের সেই কৈশোরের খুশি আর ভালোবাসা আজও টিকে আছে নিরাপদ, নীরব, কিন্তু শক্তিশালী। মনে হয়, এই অনুভূতিগুলোই আমাদের সময়ের সীমানার বাইরে রাখে, যেন অদৃশ্যভাবে সবকিছুকে বেঁধে।
ঢাকা, ১৩ জানুয়ারী ২০২৬।
10/07/2025
08/12/2024
01/12/2023
27/12/2022
23/12/2022
13/12/2022
01/01/2021
05/08/2020
01/06/2020
12/02/2019