08/04/2022
সনাতন পদ্ধতি থেকে যখন দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত সৃজনশীল শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করা হলো, তখন লক্ষ্য ছিল ছেলেমেয়েরা পুরো বইটি পড়ে এমন কিছু প্রশ্নের উত্তর বা সমাধান দিবে যা তার ভিতরের সৃজনশীলতাকে বৃদ্ধি করবে। দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষকতা পেশায় আছি বা নিজের সন্তানের পড়াশোনার একটু আধটু দেখাশোনা করতে গিয়ে যা বুঝতে পারছি, আমাদের সনাতন পদ্ধতিই অনেক অনেক ভালো ছিল।
কেন বলছি, তা আমার দিক থেকে একটু ব্যাখ্যা করা দরকার।
প্রথমত, সৃজনশীল ব্যবস্থার একটা লক্ষ্য ছিল প্রাইভেট শিক্ষক বা নোট/গাইড বইয়ের থেকে নির্ভরশীলতা কমানো। এত বছর যাবার পরও বাস্তবে তা হয়েছে কি ? বরং আরও বেড়েছে। উদ্দীপকের গ এবং ঘ অংশের উত্তর সরাসরি খুঁজে না পেয়ে শিক্ষার্থীরা আগে যাদের একটি নোট/গাইডে কাজ হলেও এখন ২/৩টি গাইড হাতড়ে সময় নস্ট করছে ! প্রাইভেট টিউটরের স্মরনাপন্ন হচ্ছে বেশি করে। কোচিং সেন্টারে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে সবাই ! যেন সব সমাধান গাইড , কোচিং আর প্রাইভেট স্যারের কাছে !
দ্বিতীয়ত, সৃজনশীলতার জন্য অনেক অনেক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আমরা শিক্ষকেরা তা থেকে কতটুকু নিতে পারছি জানি না, কিন্তু এটুকে জানি অনেক শিক্ষকই সৃজনশীল প্রশ্ন করার ক্ষেত্রে গাইড বইয়ের সহায়তা নেন। বাস্তবে, সৃজনশীল প্রশ্ন প্রনয়ন করার জন্য যে সময় দরকার বা শিক্ষক ছাত্র অনুপাত থাকা দরকার, তা বাংলাদেশে একেবারেই নেই। অদূর ভবিষ্যতেও সম্ভব বলে মনে করি না। একজন শিক্ষককে দৈনিক ৪/৫ টা ক্লাস নিয়ে সৃজনশীল প্রশ্ন প্রণয়ন, উত্তরপত্র মূল্যায়ন, পাশাপাশি পরের দিনের আবার ৪/৫ টা ক্লাসের ( এর মধ্যে মাল্টিমিডিয়া ক্লাস ২/১ টি তো থাকেই ) ক্লাস প্রস্তুতি গ্রহণ ! কোনটার মান কি হবে পাঠকদের কাছে প্রশ্ন থাকলো। আর আমাদের কলেজের মত প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রায় প্রতিটি ক্লাসে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১৫০ থেকে ২০০ জন ! বুঝুন একবার অবস্থাটা!
আমি নিজে যখন ছাত্র ছিলাম, তখনও বিজ্ঞানের কিছু বিষয় এবং ইংরেজিটা স্যারদের বাসায় গিয়ে প্রাইভেট পড়তাম। স্যারেরা একটি টেবিলে ৮/১০ জনকে নিয়ে বসতেন। আমি চাকরি জীবনে কখনো প্রাইভেট পড়াই নি। কিন্তু, শিক্ষার্থীদের কাছে শুনি, এখন প্রাইভেটে এক এক ব্যাচে ৪০/৫০ জন বা তারও বেশি ছাত্র ছাত্রী নিয়ে বসেন স্যারেরা ! কোচিঙের অবস্থা তো আরও খারাপ ! বুঝিনা কিছুই, এগুলো প্রাইভেট না অন্য কিছু !
দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত সৃজনশীল পড়ে উচ্চশিক্ষায় গিয়ে কিন্তু সেই সনাতন পদ্ধতিতেই ফিরে যেতে হয়। তা হলে কি যেই লাউ, সেই কদুই নয় কি ?
নিউজিল্যান্ড এ নাকি ১২ বছর বয়স পর্যন্ত ছেলে মেয়েদের স্কুলে পরীক্ষা নাই ! পড়ার কোনো চাপ নাই। খেলতে খেলতে শেখা আর কি ! আমার চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ুয়া সন্তানকে স্কুলে যেতে হচ্ছে পিঠে ১০/১৫ কেজির ব্যাগ নিয়ে। স্কুলের পড়া, বাসার পড়া, কিছুদিন পর পর এই পরীক্ষা সেই পরীক্ষা নিয়ে ব্যস্ততায় হাসি,খেলার সময়টুকু পার হচ্ছে মুখ বেজার করে। আর এর সাথে যদি কোচিং আর প্রাইভেট টিউটর ধরি, তা হলে একটা বাচ্চার ওপর কি পরিমাণ চাপ যায়, তা সহজেই অনুমেয়। আমি এখনো এসবে যাই নি, তবে মনে হচ্ছে যেতে হবে।
নরওয়ে সহ অনেক উন্নত দেশে শিক্ষক শিক্ষার্থীর অনুপাত 1:30. আমাদের দেশে কি এমন অদূর ভবিষ্যতে সম্ভব হবে ?
এই সৃজনশীল শিক্ষাব্যবস্থায় জিপিএ ৪ থেকে ৫ পাওয়া অনেক শিক্ষার্থী বিভিন্ন সময় বিভিন্ন আবেদন নিয়ে আসে। অধ্যক্ষ স্যারের অনুপস্থিতিতে কখনো কখনো সেসব অনুমোদনের দায়িত্ব আমাকে পালন করতে হয়। কিংবা খাতা পত্র মূল্যায়নের সময় তাদের লেখা দেখে ভাবি এই ছেলে বা মেয়েটা কিভাবে ৭০ থেকে ৮০% নাম্বার নিয়ে এসএসসি পাশ করলো !
সেদিন ঘটনাক্রমে একটি নামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাস্টার্সে পড়ুয়া শিক্ষার্থীকে College বানানটি Collage লিখতে দেখে ভাবলাম হয়তো লিখতে ভুল হয়েছে। ভুলটি সংশোধনের জন্য তাকে সঠিক বানানটি লিখতে বললে, সে বলল, তারটিই ঠিক ! আমার ফেসবুকে অনেক শিক্ষার্থীর প্রোফাইলে Collage বানানটি দেখেছি ! Carmichael কে হতে দেখেছি karmikel বা karmichel! এমন কত কিছু !
তাই মূল্যায়নের সময় এসেছে ! একটি নিচু ক্লাসের বাচ্চার ৮/১০ টি সাবজেক্ট পড়ার আদৌ কোন প্রয়োজন আছে কিনা এসব যেমন ভাবতে হবে। তেমনি ভাবতে হবে, সৃজনশীল ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীরা সত্যি সত্যি সৃজনশীলটা অর্জন করতে পারছে কিনা। ভাবতে হবে, একজন শিক্ষকের পক্ষে একটি ক্লাসে ২০০ জনকে পড়িয়ে শিক্ষার্থীর প্রকৃত কোনো উপকার হচ্ছে কিনা ! কিংবা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকের শিক্ষাদানে সহায়ক পরিবেশ বা অন্য সকল উপকরণ নিশ্চিত করা আছে কিনা !
শান্তনু কুমার পাল( টুটুল)।
সহযোগী অধ্যাপক, রংপুর সরকারি সিটি কলেজ, রংপুর।