20/03/2020
© লেখক : ড. মিজানুর রহমান খান
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
রাজশাহী
বাংলাদেশ।
সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ। আমার হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসা ও অপার শ্রদ্ধা বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি ও কৃতির প্রতি। জয়বাংলা!❤
~~~
এই পোস্টটি গতকাল আমার দেওয়ার কথা ছিলো। দিইনি। কারণ আমি জানি সারা দেশের মানুষ এরকম লাখলাখ পোস্ট দিবে। আমি সারাবছর পোস্ট দিই বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার বিষয়ে। সারাবছর পোস্ট দিই সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে। ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে। কিন্তু গতকাল আমি কোনো পোস্ট দিইনি। আমি সারাদিন ভেবেছি কেবল করোনা ভাইরাস নিয়ে। বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য নিয়ে।লাখো মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি ও মৃত্যুর বিষয় নিয়ে।
যে মুহূর্তে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ পালিত হচ্ছে ঠিক সেই সময়ে বাংলাদেশে ঢুকেছে প্রাণঘাতী এবং ভয়ঙ্কর ভাইরাস Covid19 বা করোনা ভাইরাস। যার ছোবলে কয়েক হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটেছে খুব দ্রুত। যে রোগের কোনো টিকা নেই, নেই কোনো নির্দিষ্ট ওষুধ।
করোনার কারণে বড়ো সমাবেশ বাতিল করা হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে, বিদেশি অতিথিরা আসছেন না বিধায় সরকারি অনেক অনুষ্ঠান ছোট্ট করা হয়েছে এবং দেরিতে হলেও স্কুল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এ পর্যন্ত সব ঠিক আছে। ঠিক নেই কেবল করোনার জন্য গৃহীত কোনো ব্যবস্থার। কারণ এখনো পর্যন্ত কার্যকর এমন কোনো ব্যবস্থা গৃহীত হয়নি বাংলাদেশে যেগুলো করোনা-আক্রান্ত রোগীদের রক্ষা করতে পারবে। ন্যূনতম চিকিৎসাসেবা দিতে পারবে হাসপাতালগুলো। মানুষকে আশ্বস্ত করতে পারে এমন কোনো বাস্তব ব্যবস্থা গৃহীত হয়নি সরকারের পক্ষ থেকে।
১. বাংলাদেশের সরকার করোনা আক্রান্ত দেশগুলোর পরিস্থিতি এবং পরিণতি থেকে কোন শিক্ষাই গ্রহণ করেনি। যেমন জনসমাবেশ (Mass Gathering) কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেনি এখন পর্যন্ত। হাসপাতালগুলোও প্রস্তুত নয় কার্যত। করোনা ভাইরাস সংক্রান্ত থিয়োরির পাশাপাশি অবকাঠামোগত প্রস্তুতি দেখতে চায় জনগণ।
২. যে ইতালিতে করোনা মহামারীতে রূপ নিয়েছে সেই ইতালি-প্রবাসীদের বাংলাদেশে প্রবেশের সুযোগ দিয়েছে সরকার। এটা ছিলো মস্ত বড়ো ভুল সিদ্ধান্ত। দেশে প্রবেশের সুযোগ যখন দিয়েছে, তখন তার জন্য যেসমস্ত পরীক্ষানিরীক্ষার কাজে যা যা করণীয় ছিলো তার কিছুই করেনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। আশকোনা হাজি ক্যাম্পে প্রকৃতপক্ষে স্বাস্থ্যসম্মত কোনো পরিবেশ ছিলো না। উল্টো পররাষ্ট্র মন্ত্রী প্রবাসী বাংলাদেশীদের প্রতি কটূক্তি করেছেন যা অমার্জনীয়।
৩. দেশের হাসপাতালগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের গণরুমের মতো। গাদাগাদি করে থাকতে হয়। একসঙ্গে হাজার হাজার মানুষ করোনায় আক্রান্ত হলে দেশের হাসপাতালগুলোতে সেবা দেওয়া মোটেই সম্ভবপর নয়। ৩০০ শয্যার হাসপাতালে বড়ো জোর ৬০০ জনকে আশ্রয় দিতে পারবে। কিন্তু সেখানে ১০০০ জনকে নেওয়া অসম্ভব ব্যাপার।
৪. এই মুহূর্তে করোনার পরীক্ষানিরীক্ষার জন্য পর্যাপ্ত কিটস হাসপাতালগুলোতে নেই। থার্মাল স্ক্যানার বা মেশিন মোটেও পর্যাপ্ত নয়। ডাক্তাররাও এ ব্যাপারে অভিজ্ঞ নন। টেকনিশিয়ানরাও নন। এখনো তারা করোনা-রোগী দেখলে পালিয়ে বাঁচেন। কারণ তাদেরই নেই কোনো নিরাপত্তা(Safety)।
৫. গলাবাজি করে এমপি বা মন্ত্রী হওয়া যায়। কিন্তু গলাবাজি করে একজন ভালো সংগঠক বা ব্যবস্থাপক বা চিকিৎসক বা প্রকৌশলী বা সাংবাদিক বা অধ্যাপক হওয়া যায় না। সুতরাং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ভুলভাল যা বোঝাচ্ছেন মন্ত্রী-এমপি-সচিবরা হয়তো তাতেই সন্তুষ্ট থাকছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু ব্যাপারটা এতো হাল্কা নয় মোটেও। এই কেটে যাচ্ছে যাক, এই আরেকটু দেখি কী হয় বা এজাতীয় অনুমাননির্ভর সিদ্ধান্ত জনগণ আশা করে না।
৬. সারা পৃথিবীর বিমানবন্দর, রেলওয়ে স্টেশন, সাবওয়ে, মন্দির, মসজিদ, গির্জা, প্যাগোডা, হোটেল, রেস্টুরেন্ট, মদপানের পানশালা, শপিংমল, গণপরিবহন ও জনসমাবেশ(Mass Gathering) সর্বোচ্চ সতর্কতায় কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ঘোষিত। অথচ বাংলাদেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রী প্রতিদিন টেলিভিশনে এসে চেহারা দেখাচ্ছেন। গর্বের সঙ্গে বলছেন করোনায় আক্রান্ত রোগী পাওয়া গেছে বটে কিন্তু কারও মৃত্যু হয়নি এখনও। অথবা, এমন কোনো পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়নি যে দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে হবে। আপনারা তাহলে একজন বা দু'জন বা তিনজন বা পাঁচজনের মৃত্যু দেখে তারপর সিদ্ধান্ত নিতে চান? একজনেরও মৃত্যুর অপেক্ষা করা আপনার কাজ নয়। আপনার বা আপনাদের কাজ একজনেরও যেন মৃত্যু না হয় তার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
৭. বাংলাদেশি একজন ডাক্তারের মতে Pandemic-এ পরিণত হওয়া করোনা যদি কোনোক্রমে বিস্তার লাভ করে বাংলাদেশে তাহলে শুধু বিনা চিকসায় বাংলাদেশের ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ লোকের প্রাণহানী ঘটবে। ইতালিতে ৭০ বছর বয়সের উপরে যাদের বয়স তাদের বাঁচানো যায়নি। কারণ বয়সের কারণে তাদের শরীরের ইমিউন সিস্টেম দুর্বল হয়ে পড়েছিলো। তাই তারা অমানবিক সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছিলো যে ৭০ বছর বয়সের নিচে যারা আছে শুধু তাদের বাঁচাও। অন্তত একটা প্রজন্মকে রক্ষা করা হোক।
আপনি কি চাইবেন আপনার বাবা-মা, দাদা-দাদি, চাচা-চাচি যারা ৭০ বছর বয়সের ঊর্ধ্বে আছেন, তারা আপনার চোখের সামনে বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুবরণ করুক!
৮. বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ বাঙালির জীবনে দ্বতীয়বার আসবে না। গতকাল পর্যন্ত যা হয়েছে তা হয়েছে। এখন ১৭ কোটি মানুষের দিকে অনুগ্রহ করে ফিরে তাকান আপনারা। মুজিববর্ষ উপলক্ষে এখন পর্যন্ত যে পরিমাণ ব্যয় রাষ্ট্রের হয়েছে তার দ্বিগুণ বা চারগুণ ব্যয় করুন ব্যাপক ঝুঁকিপূর্ণ জনস্বাস্থ্যের জন্য। সতেরো কোটি বাংলাদেশীর জন্য সেটাই হবে মুজিববর্ষের শ্রেষ্ঠ উপহার।
৯. বাংলাদেশের প্রত্যেকটি বাড়িকে কোয়ারেন্টাইন ঘোষণা করে মানুষকে অবরুদ্ধ করে ফেলুন। পুলিশে না কুলালে আর্মি ও বিজিবি নামিয়ে দিন। ওই ৩১ তারিখ পর্যন্তই হোক সেটা। তবু করুন এই কাজ। আশাতীত ফল পাবে দেশবাসী। নাহলে-
মন্ত্রী, এমপি, সচিব, আমলা, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক, ব্যাংকার, ব্যবসায়ী, কৃষক, শ্রমিকসহ বহু মানুষের মৃত্যু হবে। এই মুহূর্তে কেউই দেশ ছেড়ে পালাতেও পারবেন না। কারণ সারা পৃথিবীর বিমানবন্দর অবরুদ্ধ। এটা আবেগের ব্যাপার নয়। যাকিছু সংঘটিত হচ্ছে সারা পৃথিবীতে এবং যেসব পরিণতি আমরা লক্ষ করছি তার জন্য কঠোর থেকে কঠোরতর হওয়ার কোনো বিকল্প নেই।
★দ্রষ্টব্য: এই লেখা যখন লিখছি তখন জানতে পারলাম যে বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের এক আনসার(নিরাপত্তাকর্মী)সর্দি-হাঁচি-কাশি নিয়ে তার গ্রামের বাড়ি রংপুরে গিয়ে মারা গিয়েছে।★
**মৃত্যুর মিছিল দেখতে না চাইলে জনসমাবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করুন। সরকার জনসমাবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা না করলে সরকারকে বাধ্য করুন এই ঘোষণা দিতে। নাহলে কেউই বাঁচবো না আমরা।**