06/04/2022
'লালসালু' উপন্যাসের আক্কাস গ্রামে একটা স্কুল খুলতে চায়। মজিদ গ্রামবাসীকে নিয়ে মজলিসে বসে। মজিদ চমৎকার একটা পরিবেশ তৈরি করে। গ্রামবাসীর সামনে আক্কাসকে মোটামুটি পাগল বানিয়ে ছেড়ে দেয়।এরপর মজিদ গ্রামে একটা পাকা মসজিদ বানানোর প্রস্তাব করে। আক্কাসের স্কুল খোলার কথা মানুষ বেমালুম ভুলে যায়। মানুষের মাথায় পাকা মসজিদ, সওয়াব, আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টি কিলবিল করে। আক্কাস কোথাকার কোন ছোকরা, ইংরাজি স্কুলে পড়ে মাথার বায়ু চড়ে গেছে। গ্রামে স্কুল খুলতে চায়। মানুষজনের এখনি স্কুল দরকার নেই। তবে এখুনি নেকি দরকার। মজিদ মানুষের উপর যে আধিপত্য কায়েম করে রাখে তাতে আক্কাস টিকতে পারেনি। স্কুল খোলা হলো না আক্কাসের, মজিদের ইচ্ছানুযায়ী গ্রামে পাকা মসজিদ নির্মাণ শুরু হয়।
মজিদ অত্যন্ত সুকৌশলে স্কুলকে পাকা মসজিদের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। মানুষের চিন্তা করার ক্ষমতা সে জায়গায় পৌঁছাতে পারেনি যে,তারা পাল্টা প্রশ্ন করবে,মসজিদের সাথে স্কুলের বিরোধ কোথায়?
সে প্রশ্ন তারা করবে না, মূর্খতা তাদের মজ্জাগত।তারা যে ধর্ম পালন করে সেটিও যে আসল ইসলাম ধর্ম নয় সেটিও তারা জানে না। মজিদ বাইরে বাইরে শুধুই ইসলামের একটা আবহ তৈরি করে রাখে,বাদ-বাকি সব কিছুই মজিদের মনগড়া রীতিনীতি।
ঠিক মজিদের মতোই
ধর্মান্ধ, মৌলবাদ ও ধর্ম-ব্যবসায়ীরা ধর্মের কৃত্রিম একটা আবহ তৈরি করে, মানুষের অন্ধতা ও মূর্খতাকে কাজে লাগিয়ে তারা তাদের উদ্দেশ্যগুলো বাস্তবায়ন করে। বিগত তিরিশ চল্লিশ বছরে বাংলাদেশে একটা ধর্মীয় বা সামাজিক বিপ্লত হতে পারতো। তার কিছুই হয়নি।বরং দেশটা ধর্মান্ধতার গভীরে তলিয়ে গেছে। একেবারেই মজিদের ফর্মুলার বাস্তবায়ন মনে হয়। কেউ দুবাই থাকে,কেউ মালয়শিয়া থাকে,কেউ কুয়েত থাকে।আয়রোজগার ভালো,হুজুরের দোয়া দরকার। আবার,
সেখানে কাজে কর্মে সুবিধা করতে পারছে না, দোয়া দরকার। ওইযে মজিদের মতো, যে বার ফসল ধ্বংস হয়ে গেছে, মজিদের মাধ্যমে আল্লাহকে জানাতে হবে।যে বার ফসল ভালো হয়েছে, মজিদের মাধ্যমে আল্লাহকে শুকরিয়া জানাতে হবে। সাধারণ মানুষের ভাগ্যের অবস্থা যেমনই হোক, মজিদের লাভ দুই দিকেই।
দেশে যারা ব্যবসা বাণিজ্য করে, চাকরি-বাকরি করে,আয়রোজগার ভালো। এলাকায়, দেশে,জনগণের কাছে দাতা-ত্রাতা সাজতে হবে, দান-খয়রাতের ক্ষেত্র ওই একটাই। মানুষের রক্তচুষে ফুলেফেঁপে উঠেছে। হয়তো মাঝে মাঝে অপরাধবোধ সুরসুরি দেয়,কিছু একটা দিয়ে টিয়ে আবার চাঙ্গা হতে চায়। যে এলাকায় একটা মসজিদ হলেই হতো, সেখানে তিনটা চারটা মসজিদ হয়েছে।কাঁচা মসজিদ পাকা হয়েছে, পাকা মসজিদ এসি হয়েছে।
মনে হয় দেশে ইসলামের বিরাট একটা বিপ্লব হয়ে গেছে। বস্তুত,
ধর্মের কারবারিরা মানুষকে ধর্ম থেকে বিচ্যুত করে ফেলেছে বলা যায়। বাইরে ইসলামিস্ট হলেও ভেতরে ভেতরে পশ্বাধিক জঘন্য, রক্তচোষা,অপরের সম্পদও প্রাণের ভক্ষণকারী হয়েছে।
মানুষের দায়িত্বশীলতা,সম্প্রীতি, সহমর্মিতা তলানিতে ঠেকেছে। এরা মানুষকে বাইরে থেকে ধর্মের লেবাস পরিয়েছে আর ভেতরে ভেতরে প্রচণ্ড দুর্নীতিবাজ হওয়ার ক্ষেত্র প্রসারিত করেছে। মানুষ ধার্মিক হলে ওদের লস, বরং মূর্খ ও দুর্নীতিগ্রস্থ হলেই তাদের লাভ।
এরা মানুষকে জ্ঞান-বিজ্ঞান বিমুখ করেছে।এটা যে কতটা ভয়াবহ তা আরও দশ বিশ বছর পর মারাত্মকভাবে টের পাওয়া যাবে।এরা মহিলাদেরকে আবারও গৃহবন্দী করার সব আয়োজন সম্পন্ন করেছে।
শুধু মানুষজন নয়। এরা নিরীহ গাছপালাকেও পেরেক মেরে কলমা খাওয়াচ্ছে। গাছপালারও কলমা লাগে নাকি?এরা নিষ্পাপ গাছকে এত বড় পেরেক মেরে কলমা ঝুলিয়ে রাখে কেন তার উদ্দেশ্যও স্পষ্ট।
দেশের সব প্রথা-প্রতিষ্ঠানে এরা হামলে পড়েছে। ধর্মটা একটা ঢাল মাত্র। এদের কৃত্রিম ধর্মীয় কাঠামোর বাইরে গেলে কেউ টিকতে পারছে না,সংঘবদ্ধ আক্রমণ অনিবার্য।
এদের সাথে অন্যদের ফাইট করা আসলেই কঠিন। একদিকে মূর্খ একটা শ্রেণিকে তারা কাজে লাগায়, প্রচণ্ডভাবে অপরাধের অনুশোচনায় ভোগা একটা শ্রেণিকে এরা কাজে লাগায়। আর আছে মারাত্মক রকমের মুনাফেক একটা শ্রেণি। সারাদিন খোলামেলা আয়েশ করে গভীর রাতে এসে বলে, হিজাবেই নারীর আসল সৌন্দর্য।
মজিদ,খালেক ব্যাপারী, মূর্খ গ্রামবাসী ও মহব্বতনগর গ্রাম।
বাংলাদেশ,তুমি কি পারবে?