30/08/2025
আজ ৩০ আগস্ট, ১৫৬৯ সাল এই দিনে জন্মগ্রহণ করেন মহান মুঘল সম্রাট নূরউদ্দীন মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর , যিনি ১৬০৫ থেকে ১৬২৭ সাল পর্যন্ত ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে এক সোনালি অধ্যায়ের সূচনা করেন। তিনি ছিলেন মুঘল সাম্রাজ্যের চতুর্থ সম্রাট, সম্রাট আকবর ও সম্রাজ্ঞী মারিয়ম-উজ-জামানীর জ্যেষ্ঠ পুত্র। তার ২২ বছরের শাসনকাল শিল্প, সাহিত্য, ন্যায়বিচার, সুফিবাদ, এবং প্রকৃতিপ্রেমে সমৃদ্ধ এক অসাধারণ সময় হিসেবে ইতিহাসে অমর হয়ে আছে।
জাহাঙ্গীরের জন্ম ফতেহপুর সিক্রির নিকটে বিখ্যাত সুফি সাধক শেখ সেলিম চিশতির দরগাহের পাশে। জন্মের পর তার নাম রাখা হয়েছিল নূরউদ্দীন মুহাম্মদ সেলিম, কারণ আকবর বহুদিন প্রার্থনার পর পুত্রপ্রাপ্তির আশায় শেখ সেলিম চিশতির দোয়া প্রার্থনা করেছিলেন।
তার নিজের আত্মজীবনী “তুজুক-ই-জাহাঙ্গীরি”-তে তিনি লিখেছেন, “আমার জন্ম হয়েছিল ৩০ আগস্ট ১৫৬৯ সালে, ফতেহপুর সিক্রির নিকটে শেখ সেলিম চিশতির দরগাহের পাশে। আমার পিতা সম্রাট আকবর মহান দরবেশের দোয়ার বরকতে আমার জন্মকে আল্লাহর এক বিশেষ অনুগ্রহ হিসেবে গণ্য করতেন, তাই তিনি আমার নাম রাখেন ‘সেলিম’।” (Tuzuk-i-Jahangiri, Vol-I, Trans. Alexander Rogers, 1909, p. 23)
১৬০৫ সালে সম্রাট আকবরের মৃত্যুর পর সেলিম সিংহাসনে বসেন এবং “জাহাঙ্গীর” উপাধি গ্রহণ করেন, যার অর্থ “বিশ্বজয়ী”। তার সিংহাসন আরোহন উপমহাদেশের মুসলিম সমাজে নতুন এক আশার সঞ্চার করে।
তার শাসনকালে দিল্লি, আগ্রা, লাহোর, কাশ্মীর, গুজরাট এবং বাংলাসহ বিভিন্ন প্রদেশে প্রশাসনিক সংস্কার, শিল্প ও শিক্ষা বিস্তার, সুফি দরবারের উন্নয়ন এবং মুসলিম স্থাপত্য পুনর্গঠনে বিপুল অবদান রাখেন।
জাহাঙ্গীরের অন্যতম বড় অবদান ছিল মসজিদ, মাদ্রাসা ও খানকাহগুলোর পুনর্গঠন। তুজুক-ই-জাহাঙ্গীরি অনুসারে, তিনি দিল্লি, লাহোর, আগ্রা ও ফতেহপুর সিক্রির বহু মসজিদ সংস্কারে অর্থ বরাদ্দ করেন। লাহোরের শাহদারা মসজিদ তার আমলে পুনর্নির্মিত হয়। ইতিকাদ খানকার মসজিদ সংস্কারে বিশেষ ভূমিকা রাখেন। মাদ্রাসার ওয়াকফ সম্পত্তি সুরক্ষায় কঠোর আইন প্রণয়ন করেন। আবুল ফজলের “আইন-ই-আকবরি” অনুযায়ী, আকবরের শেষ দিকে যে মাদ্রাসাগুলোর আয় হ্রাস পেয়েছিল, জাহাঙ্গীর সেখানে নতুন করে ওয়াকফ তহবিল প্রদান করেন। (Abul Fazl, Ain-i-Akbari, Vol-II, Asiatic Society Publication, 1891, pp. 147-149)
জাহাঙ্গীরের শাসনকালে মুঘল চিত্রকলা ও শিল্পকলার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। তিনি প্রকৃতি, প্রাণী, উদ্ভিদ এবং প্রতিকৃতিচিত্রের প্রতি বিশেষ অনুরাগী ছিলেন। তার পৃষ্ঠপোষকতায়, উস্তাদ মংশুর, আবুল হাসান, ও বিশনদাস-এর মতো বিখ্যাত শিল্পীরা অসংখ্য অনন্য চিত্রকর্ম তৈরি করেন। উস্তাদ মংশুরের “Album of Birds” (c. 1612) আজও মুঘল মিনিয়েচার পেইন্টিংয়ের এক অনন্য নিদর্শন। আবুল হাসানের আঁকা “Portrait of Jahangir” (c. 1617, Smithsonian Collection) জাহাঙ্গীরের শিল্পপ্রীতির প্রমাণ।
জাহাঙ্গীর গভীরভাবে প্রভাবিত ছিলেন সুফিবাদ ও আধ্যাত্মিক চর্চায়। তিনি বিশ্বাস করতেন, শেখ সেলিম চিশতির দোয়ার বরকতেই তার জন্ম হয়েছে। ফলে তিনি ফতেহপুর সিক্রির ওই দরগাহের উন্নয়নে বিশাল অর্থ দান করেন। এছাড়াও, তিনি দিল্লির নিজামউদ্দীন আউলিয়া, আজমিরের মুঈনউদ্দীন চিশতি, এবং গুজরাটের শাহ আলম দরগাহ-সহ বহু সুফি দরগাহে অনুদান প্রদান করেন। তার শাসনামলে মুঘল দরবার সুফি সাধকদের জ্ঞান ও প্রজ্ঞার প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন করত।
জাহাঙ্গীর শুধু শিল্পীই ছিলেন না, বরং প্রথম দিকের মুসলিম প্রকৃতিবিদদের একজন। তিনি প্রাণী, উদ্ভিদ ও পাখির বৈজ্ঞানিক বর্ণনা লিখে গেছেন তুজুক-ই-জাহাঙ্গীরিতে। ইউরোপীয় ইতিহাসবিদ Sir Thomas Roe তার দরবার পরিদর্শনের সময় উল্লেখ করেছেন যে, জাহাঙ্গীরের হাতে রাখা প্রাকৃতিক পর্যবেক্ষণ-পত্রগুলো সেই সময়ে ইউরোপকেও বিস্মিত করেছিল।
(Sir Thomas Roe, Embassy to the Mughal Court, 1615, Cambridge Edition, 1931, pp. 62-65)
২৮ অক্টোবর ১৬২৭ সালে সম্রাট জাহাঙ্গীর মৃত্যুবরণ করেন। তার সমাধি লাহোরের শাহদারা বাগে অবস্থিত, যা মুঘল স্থাপত্যশৈলীর এক অনন্য নিদর্শন। তার পুত্র সম্রাট শাহজাহান সিংহাসনে আরোহণ করেন এবং মুঘল স্থাপত্যকে সর্বোচ্চ শিখরে উন্নীত করেন।
সম্রাট জাহাঙ্গীর শুধুমাত্র একজন শাসকই নন, তিনি ছিলেন শিল্প, প্রকৃতি, সুফিবাদ ও জ্ঞানের এক অনন্য প্রতীক। তার আমলে মুঘল সাম্রাজ্য সাংস্কৃতিক বিকাশ, ন্যায়বিচার, আধ্যাত্মিকতা ও শিল্পকলার এক নতুন যুগে প্রবেশ করেছিল।
আজ, তার জন্মবার্ষিকীতে, আমরা তার অবদানকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি।
লিখেছেন: হাসনাত হাসান রাহাত