01/06/2026
মদীনার মিম্বর থেকে: সত্যের বজ্রনিনাদ
(ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট আকবর হাশেমি রাফসানজানি-কে সামনের কাতারে বসিয়ে রেখেই মদীনা মুনাওয়ারার মসজিদে নববীর সম্মানিত ইমাম ও খতীব, শায়খ আলী ইবন আবদুর রহমান আল-হুজাইফী (হাফিযাহুল্লাহ)-এর এক ঐতিহাসিক জুমআর খুতবার নির্বাচিত অংশের অনুবাদ।)
«“আহলে সুন্নাহ এবং রাফেযীদের (শিয়াহ) মধ্যে কীভাবে ঐক্য ও মেলবন্ধন সম্ভব? আহলে সুন্নাহ তো তারা—যাঁরা আল্লাহর কিতাব ও তাঁর রাসূলের সুন্নাহকে বুকের ভেতর আগলে রেখেছেন; যাঁদের মাধ্যমেই আল্লাহ তাআলা এই দ্বীনের হেফাজতের ব্যবস্থা করেছেন; যাঁরা যুগে যুগে ইসলামের সুউচ্চ মিনারকে সমুন্নত রাখতে জীবনব্যাপী সংগ্রাম করেছেন এবং রচনা করেছেন ইসলামের এক দীপ্তিমান সোনালি ইতিহাস।»
«আর অপরদিকে রাফেযীরা তো তারা—যারা রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর মহান সাহাবীদের অভিশাপ দেয় এবং ইসলামের ভিত্তিমূলক স্তম্ভগুলোকে ভেঙে ফেলতে চায়! অথচ এই সাহাবায়ে কেরামই (রাযিয়াল্লাহু আনহুম) আমাদের কাছে কুরআন ও সুন্নাহ পৌঁছে দিয়েছেন। সুতরাং, যে ব্যক্তি তাঁদের মর্যাদাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, সে প্রকৃতপক্ষে দ্বীনের ভিত্তিকেই আঘাত করে।”»
আহলে সুন্নাহ ও রাফেযীদের মধ্যে কীভাবে ঐক্য হতে পারে, যখন তারা ইসলামের প্রথম তিন খলিফাকে গালিগালাজ করে?
তাদের যদি সামান্যতম বিবেক ও বোধশক্তি থাকত, তবে তারা বুঝত যে—আবু বকর, উমর ও উসমান (রাযিয়াল্লাহু আনহুম)-এর প্রতি কটূক্তি করা মানে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর মর্যাদাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা।
কারণ, আবু বকর ও উমর (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) ছিলেন রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নিকটতম সহচর, তাঁর শ্বশুর, তাঁর বিশ্বস্ত উজির ও সংগ্রামের সাথী। জীবনের প্রতিটি কঠিন মুহূর্তে তাঁরা নবীজীর পাশে ছিলেন। এমনকি মৃত্যুর পরও তাঁরা রওজা মুবারকে তাঁরই সান্নিধ্যে শায়িত আছেন। এ সম্মান আর ক’জনের ভাগ্যে জুটেছে?
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জীবদ্দশায় সংঘটিত প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সংগ্রামে তাঁরা তাঁর পাশে থেকে ঈমান, সাহস ও আত্মত্যাগের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। রাফেযীদের ভ্রান্তি প্রমাণের জন্য এ একটি দলিলই কি যথেষ্ট নয়?
আর উসমান (রাযিয়াল্লাহু আনহু)—যাঁর হাতে রাসূলুল্লাহ ﷺ পর্যায়ক্রমে তাঁর দুই কন্যাকে বিবাহ দিয়েছিলেন। এ কারণেই তিনি ইতিহাসে “যুন্-নূরাইন”—দুই নূরের অধিকারী—উপাধিতে সমুজ্জ্বল।
আল্লাহ তাআলা কি তাঁর রাসূলের জন্য সর্বোত্তম সঙ্গী ছাড়া অন্য কাউকে মনোনীত করতে পারেন? যদি শায়খাইন ও উসমান (রাযিয়াল্লাহু আনহুম)-এর ব্যাপারে তাদের অভিযোগ সত্য হতো, তবে নবী কারীম ﷺ কি উম্মতকে সে বিষয়ে সতর্ক না করেই দুনিয়া থেকে বিদায় নিতেন?
প্রকৃতপক্ষে, এই তিন মহান খলিফাকে গালি দেওয়া মানে আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-কেও অপমান করা। কারণ, আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) নিজেই সন্তুষ্টচিত্তে আবু বকর (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর হাতে বায়াত করেছিলেন; নিজের স্নেহধন্য কন্যা উম্মে কুলসুমকে উমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর সাথে বিবাহ দিয়েছিলেন; এবং উসমান (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর খেলাফতকালেও তাঁর বিশ্বস্ত সহচর, উপদেষ্টা ও শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। আল্লাহ তাঁদের সকলের প্রতি সন্তুষ্ট হোন।
এখন প্রশ্ন হলো—আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) কি কখনো কোনো কাফেরের হাতে নিজের কন্যাকে বিবাহ দিতে পারেন? কিংবা কোনো কাফেরের হাতে বায়াত হতে পারেন?
سُبْحَانَكَ هَٰذَا بُهْتَانٌ عَظِيمٌ
«“আপনি পবিত্র! এ তো এক মহা অপবাদ।”»
পবাদ।” — সূরা আন-নূর, আয়াত ১৬।
অনুরূপভাবে, আমীর মুয়াবিয়া (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-কে অভিশাপ দেওয়া মূলত হাসান ইবন আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর প্রজ্ঞা, সিদ্ধান্ত ও মর্যাদার প্রতিই আঘাত হানার শামিল।
কারণ, হাসান (রাযিয়াল্লাহু আনহু) কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি, মুসলিম উম্মাহর ঐক্য এবং রক্তপাত বন্ধ করার মহান উদ্দেশ্যে মুয়াবিয়া (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর পক্ষে খেলাফতের দাবি ত্যাগ করেছিলেন। এই মহৎ কর্মের তাওফিক আল্লাহ তাআলাই তাঁকে দান করেছিলেন। শুধু তাই নয়, স্বয়ং রাসূলুল্লাহ ﷺ বহু পূর্বেই এ ঘটনার সুসংবাদ প্রদান করেছিলেন এবং তাঁর এ পদক্ষেপের প্রশংসা করেছিলেন।
তাহলে প্রশ্ন হলো—আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর প্রিয় দৌহিত্র, জান্নাতি যুবকদের নেতা হাসান (রাযিয়াল্লাহু আনহু), কি কখনো মুসলমানদের নেতৃত্ব কোনো কাফেরের হাতে অর্পণ করতে পারেন?
﴿سُبْحَانَكَ هَٰذَا بُهْتَانٌ عَظِيمٌ﴾
«“আপনি পবিত্র! এ তো এক মহা অপবাদ!”
আর তারা কীভাবে উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-এর প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে, যাঁর মর্যাদা ও মাতৃত্বের ঘোষণা স্বয়ং আল্লাহ তাআলা তাঁর মহাগ্রন্থে অবতীর্ণ করেছেন? আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
«﴿النَّبِيُّ أَوْلَىٰ بِالْمُؤْمِنِينَ مِنْ أَنْفُسِهِمْ وَأَزْوَاجُهُ أُمَّهَاتُهُمْ﴾
“নবী মুমিনদের নিকট তাদের নিজেদের অপেক্ষা অধিক ঘনিষ্ঠ, আর তাঁর স্ত্রীগণ তাদের মাতা।”
— সূরা আল-আহযাব, আয়াত ৬»
যাঁকে রব্বুল আলামীন সমগ্র মুমিনদের মা হিসেবে ঘোষণা করেছেন, তাঁর প্রতি কটূক্তি ও বিদ্বেষ প্রদর্শন কত বড় স্পর্ধা—তা সহজেই অনুধাবন করা যায়।
আহলে সুন্নাহ ও রাফেযীদের মধ্যে কীভাবে ঐক্য সম্ভব, যখন তারা এমন সব বিশ্বাস লালন করে, যা তাদের নিজেদের দাবির সাথেই সাংঘর্ষিক?
তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী, খোমেনী ছিল তাদের সেই কথিত অদৃশ্য ‘মাহদী’র প্রতিনিধি, যে মাহদী নাকি সামেরার এক গুপ্ত গুহায় আত্মগোপন করে আছে। তাদের নীতিমতে, প্রতিনিধির নির্দেশ মূল ব্যক্তির নির্দেশেরই সমতুল্য। ফলে তাদের ধারণা অনুযায়ী, যদি সেই অদৃশ্য মাহদী নিষ্পাপ (মাসুম) হয়ে থাকে, তবে তাঁর প্রতিনিধিও নিষ্পাপ বলে গণ্য হবে।
কী বিস্ময়কর ও স্ববিরোধী এই আকীদা!
‘বেলায়াতে ফকীহ’-এর এই তত্ত্বের মাধ্যমে তারা নিজেদের বহু মৌলিক দাবিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে ফেলেছে। বাতিল মতবাদের একটি বৈশিষ্ট্য হলো—তা শেষ পর্যন্ত নিজের ভেতরকার দ্বন্দ্বেই ভেঙে পড়ে। সত্যের বিরুদ্ধে নির্মিত প্রাসাদ যতই সুদৃশ্য হোক, তার ভিত্তি থাকে বালুকারাশির ওপর।
অথচ আহলে বাইতের সম্মানিত সদস্যগণ এসব অতিরঞ্জন, কুসংস্কার ও ভ্রান্ত বিশ্বাস থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র ছিলেন। শিয়া মতবাদের অসারতা ও স্ববিরোধিতার পক্ষে শরয়ী ও যুক্তিগত প্রমাণ এত অধিক যে, তা গণনা করাও দুরূহ।
অতএব, যদি তারা মুক্তি ও সফলতা কামনা করে, তবে তাদের উচিত কুরআন ও সহীহ সুন্নাহর নির্মল ইসলামের দিকে প্রত্যাবর্তন করা।
আর মুসলমানদের জন্য আবশ্যক হলো—আকীদা ও দ্বীনের বিষয়ে সর্বদা সতর্ক ও সজাগ থাকা। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
«﴿هُمُ الْعَدُوُّ فَاحْذَرْهُمْ ۚ قَاتَلَهُمُ اللَّهُ ۖ أَنَّىٰ يُؤْفَكُونَ﴾
“তারাই শত্রু; অতএব তাদের সম্পর্কে সতর্ক থাকো। আল্লাহ তাদের ধ্বংস করুন! তারা কোথায় বিভ্রান্ত হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে!”
— সূরা আল-মুনাফিকূন, আয়াত ৪»
স্মরণ রাখা প্রয়োজন, রাফেযী মতবাদের উৎপত্তি সম্পর্কে বহু ঐতিহাসিক গ্রন্থে আবদুল্লাহ ইবনে সাবা ও অন্যান্য প্রাথমিক বিভ্রান্ত চিন্তাধারার প্রভাবের আলোচনা পাওয়া যায়।
আমরা মহান আল্লাহর দরবারে দোয়া করি—তিনি শায়খ আলী ইবন আবদুর রহমান আল-হুজাইফী (হাফিযাহুল্লাহ)-কে তাঁর সন্তুষ্টি ও ভালোবাসার পথে পরিচালিত করুন, হকের ওপর অটল রাখুন এবং দ্বীনের পক্ষে তাঁর নির্ভীক অবস্থানের সর্বোত্তম প্রতিদান দান করুন।
آمين يا رب العالمين