26/10/2025
স্বপ্নের ঘোড়া ও মায়ার সরাইখানা
এক গ্রামে থাকতেন প্রবীণ শিক্ষক 'আলীবর্দি'। বইয়ের পাতায় কেটেছে তাঁর সারা জীবন, বিশেষ করে তিনি ছিলেন প্রাচীন শৌর্যবীর্যের গল্পে মুগ্ধ। আধুনিক দুনিয়ার লোভ, মিথ্যা আর স্বার্থপরতা তাঁকে বড় পীড়া দিত। তিনি ভাবতেন, "কোথায় গেল সেই বীরদের ন্যায়পরায়ণতা? কেন নেই এখন কেউ দুর্বলকে রক্ষা করার জন্য?"
একদিন আলীবর্দি সিদ্ধান্ত নিলেন, তিনি নিজেই হবেন সেই বীর। পুরনো মরচে ধরা বর্ম চাপালেন গায়ে, দুর্বল ঘোড়াটার নাম রাখলেন 'তুফান' আর নিজের নাম দিলেন 'হক্ব-রক্ষক আলীবর্দি' (Don Quixote-এর মতো)। তাঁর উদ্দেশ্য — জগৎ থেকে সব অন্যায় দূর করা।
আলীবর্দির প্রতিবেশী ছিলেন সরল, বাস্তববুদ্ধিসম্পন্ন কৃষক 'মনসুর'। নিজের সামান্য জমি আর পরিবারের বাইরে তাঁর চিন্তা ছিল না। আলীবর্দি তাঁকে নিজের সহকারী (Squire) হওয়ার প্রস্তাব দিলেন, আর মনসুরকে প্রতিশ্রুতি দিলেন বড় একটা পুরস্কারের —হয়তো কোনো সাম্রাজ্যের গভর্নরশিপ! সহজ-সরল মনসুর দ্বিধা নিয়ে রাজি হলেন।
তাঁদের প্রথম অভিযান। পথে একটি সরাইখানা দেখে আলীবর্দি চিৎকার করে উঠলেন, "এ তো এক ভয়ঙ্কর দুর্গ! এখানে নিশ্চয়ই অত্যাচারী রাজা বন্দী করে রেখেছে রাজকন্যাকে!"
মনসুর দেখলেন, এটা একটা পুরোনো, ধুলো মাখা, সাধারণ সরাইখানা, আর সরাইখানার মালিক একজন মোটাসোটা সাদাসিধে লোক।
আলীবর্দি কিন্তু শুনলেন না। তিনি সরাইখানার মালিককে 'দুর্গাধিপতি' সম্বোধন করে বললেন, "হে দুর্গের অধিপতি, আমাকে এখনই নাইট হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে, যাতে আমি জগতের দুঃখী মানুষের জন্য লড়তে পারি!"
মালিক অবাক হলেও শিক্ষকের পাগলামি বুঝে হেসে তাকে রসিকতার ছলে 'নাইট' উপাধি দিলেন।
রাতে, আলীবর্দি দেখলেন একদল লোক সরাইখানার পেছনের উঠোনে বিশ্রাম নিচ্ছে। তাঁর মনে হলো, ওরা সবাই ভয়ঙ্কর ডাকাত!
আসলে তারা ছিল গ্রামের নিরীহ পশুপালক।
আলীবর্দি 'তুফান'কে ছুটিয়ে দিলেন তাদের দিকে। তিনি তরবারি (যা ছিল আসলে পুরোনো লাঠি) ঘোরাতে লাগলেন। পশুপালকরা ভয় পেয়ে, কেউ হেসে, কেউ বিরক্ত হয়ে লাঠি নিয়ে উল্টো তাঁকে মারতে শুরু করল। মনসুর শত অনুরোধ করেও তাঁকে থামাতে পারলেন না। মার খেয়ে ক্লান্ত-বিধ্বস্ত হয়ে যখন আলীবর্দি মাটিতে পড়লেন, তখনও তিনি বললেন, "এরা সবাই দুষ্ট জাদুকরের মায়ার ফাঁদ, যারা আমার বীরত্বকে ব্যর্থ করতে চাইছে!"
মনসুর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, "গুরু, এরা ডাকাত নয়, সাধারণ মানুষ। এই সরাইখানা কোনো দুর্গ নয়, কেবল একটি বিশ্রামাগার। আপনি যা দেখছেন, তা আপনার স্বপ্নের মায়া, বাস্তব নয়।"
আলীবর্দি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, "হয়তো বাহ্যিক চোখে তাই দেখা যায়, মনসুর। কিন্তু যদি আমার এই পাগলামির মাধ্যমে একজন মানুষও সামান্যতম ন্যায় বা আদর্শের কথা একবার ভাবে — যদি এই হাস্যকর প্রচেষ্টা কাউকে তার ভেতরের ভালো মানুষটাকে বাঁচিয়ে রাখতে সাহস যোগায় — তাহলে আমার এই কষ্ট সার্থক।"
এরপর তাঁরা পথে দেখলেন একটি বড় বাতাসকল (Windmill)। আলীবর্দি সেটিকে দেখে চেঁচিয়ে উঠলেন, "ওই দেখ, মনসুর! বিশাল দৈত্যরা আক্রমণ করছে! ওদের এখনই ধ্বংস করতে হবে!"
মনসুর দু'হাত তুলে বললেন, "দোহাই আপনার, ওগুলো দৈত্য নয়, ওগুলো বাতাসকল! গ্রামের মানুষ ফসল পিষতে ব্যবহার করে।"
কিন্তু আলীবর্দি তার কথা শুনলেন না। ঘোড়া ছোটালেন দৈত্যদের দিকে! ফলাফল, বাতাসকলের পাখার আঘাতে ছিটকে পড়লেন আলীবর্দি। জ্ঞান ফেরার পর মনসুর যখন তাঁকে উঠাচ্ছিলেন, আলীবর্দি তখনো ফিসফিস করে বললেন, "ওই দৈত্যরা জাদুবলে নিজেদের বাতাসকলে পরিণত করেছিল, কিন্তু আমি জানতাম, আমি তাদের হারাতে পারতাম..."
মনসুর ধীরে ধীরে বুঝতে পারলেন, আলীবর্দি হয়তো বাস্তবের দৃষ্টিতে 'পাগল', কিন্তু তাঁর আদর্শের ভেতরের সত্যটা খুবই মূল্যবান। তিনি হয়তো জগৎকে বদলাতে পারছেন না, কিন্তু তাঁর প্রচেষ্টা মানুষকে মনে করিয়ে দিচ্ছে — জীবনের কিছু মূল্যবোধ আছে, যা ভুলে যাওয়া উচিত নয়। মনসুর নিজেও আলীবর্দির সাথে থেকে ধীরে ধীরে আরও দয়ালু, আরও স্বপ্ন দেখতে পারা মানুষে পরিণত হলেন। তাঁর বাস্তববুদ্ধির সাথে মিশে গেল কিছুটা আলীবর্দির আদর্শ।
গল্পের শিক্ষা:
'হক্ব-রক্ষক আলীবর্দি'র গল্পটি আমাদের শেখায় যে:
* বাস্তবকে মেনে নিন, কিন্তু আদর্শকে হারাবেন না:
জীবনের কঠিন বাস্তবতা এবং আদর্শবাদ বা স্বপ্নের মধ্যে ভারসাম্য রাখা প্রয়োজন। ডন কুইক্সোটের মতো শুধু স্বপ্নে বাঁচলে কষ্ট আসে, আবার শুধু বাস্তববাদী হলে জীবন মূল্যহীন হয়ে যেতে পারে।
* আদর্শের শক্তি:
কোনো একজন মানুষের গভীর বিশ্বাস ও আদর্শ অন্যদের কাছে পাগলামি মনে হলেও, সেই বিশ্বাস সমাজে ভালো প্রভাব ফেলতে পারে। আপনার স্বপ্ন হয়তো জগৎকে সরাসরি পাল্টাবে না, কিন্তু তা অন্যদের মধ্যে ভালো কাজ করার প্রেরণা বা মানবিক মূল্যবোধ বাঁচিয়ে রাখার সাহস যোগাতে পারে।
* দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য:
আমরা সবাই একই জগৎ দেখি, কিন্তু যার যার মনের চোখ দিয়ে আমরা তার ভিন্ন ব্যাখ্যা করি। আপনার 'বাতাসকল' হয়তো অন্য কারও কাছে 'দৈত্য' হতে পারে। অন্যের দৃষ্টিভঙ্গিকে সম্পূর্ণ উড়িয়ে না দিয়ে বোঝার চেষ্টা করা উচিত।
16/02/2022