07/11/2022
তারল্য সৃষ্টিতে ব্যাংকের ভূমিকা সম্ভাবনা ও বাস্তবতা
২০২২ সালে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার উঠেছে বেন এস বার্নানকে, ডগলাস ডায়মন্ড এবং ফিলিপ ডিবভিগের হাতে। বেন বার্নানকে দুই মেয়াদে সফলতার সঙ্গে ফেডারেল রিজার্ভের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। ডগলাস ডায়মন্ড শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। তিনি ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক শেষ করে ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর এবং পিএইচডি অর্জন করেন। ফিলিপ ডিবভিগ বর্তমানে ওয়াশিংটন (সেন্ট লুইস) বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। এর আগে তিনি ইয়েল এবং প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন।
একটি দেশের আর্থিক কাঠামোর প্রধান হলো ব্যাংক খাত। ব্যাংক কী, কীভাবে কাজ করে, অর্থনীতিতে ব্যাংকের অবদান, ব্যাংক খাতে কীভাবে সংকট সৃষ্টি হয় এবং অর্থনীতির ওপর তার প্রভাব কী ইত্যাদি বিষয়ে বিশ্লেষণমূলক তত্ত্বের জন্য তাদের এ পুরস্কারে ভূষিত করেছে নোবেল কমিটি। এ তিনজন অর্থনীতিবিদের মৌলিক কাজ প্রকাশ পায় মূলত ১৯৮৩-৮৪ সালে। এর আগে সমাজে ব্যাংকগুলোর ভূমিকা কী সে সম্পর্কে বস্তুনিষ্ঠ কোনো সাধারণ থিওরি ছিল না। ডায়মন্ড এবং ডিবভিগ একটি গাণিতিক মডেল উপস্থাপন করে দেখা যে ব্যাংকগুলো সঞ্চয়কারী এবং ঋণগ্রহীতার মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করে। তবে এ কাজটি আপাতদৃষ্টিতে সহজ মনে হলেও এটিই অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি।
ব্যাপারটা একটু সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করা যাক। ধরা যাক একটি গ্রাম, যেই গ্রামের মানুষের ব্যাংক সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই। গ্রামের লোকজন স্বাভাবিক কাজকর্ম করে যা আয় হয় তা থেকে সংসারের প্রয়োজনীয় খরচ বহন করার পর কিছুটা উদ্বৃত্ত থাকে। সঞ্চয়কারীরা এ উদ্বৃত্ত সম্পদ (অর্থ) কোনো লাভজনক খাতে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী। কিন্তু একটি পরিবারের উদ্বৃত্ত আয়ের পরিমাণ এত বেশি নয় যে বড় কোনো প্রকল্পে বিনিয়োগ করা যায়। তবে গ্রামের সবার উদ্বৃত্ত একত্র করলে লাভজনক একটি প্রকল্পে বিনিয়োগ সম্ভব। এখানে প্রথম প্রশ্ন হলো, উদ্বৃত্ত আয় একত্র করবে কে? ধরা যাক, সে গ্রামে একজন উদ্যোক্তা আছেন যে উদ্বৃত্ত আয় একত্র করার কাজটা করবেন এবং একটি প্রকল্পে বিনিয়োগ করবেন। প্রকল্প থেকে উদ্যোক্তার আয় হবে সবার একত্রিত বিনিয়োগের টাকার (আসল এবং মুনাফা) থেকে কিছু বেশি। এ অতিরিক্ত আয়ই হবে উদ্যোক্তার পাওনা, যা তাকে তহবিল সংগ্রহ করতে উদ্বুদ্ধ করবে।
তবে এখানে অনেক সমস্যা তৈরি হবে। প্রথমত, গ্রামের কার কার কাছে উদ্বৃত্ত আয় আছে তা জানা জরুরি। এ তথ্য সংগ্রহ খুবই সময়সাপেক্ষ এবং ব্যয়বহুল যদি একটা গ্রামকে আমরা গোটা একটা দেশের সঙ্গে তুলনা করি। দ্বিতীয়ত, উদ্যোক্তাকে সবাই বিশ্বাস করবেন বাস্তবে এমন মনে করার কোনো কারণ নেই। অর্থনীতির এসব সমস্যা নিয়ে কথা বলেছেন অনেক অর্থনীতিবিদ। তাদের মধ্যে অন্যতম হল নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ রোনাল্ড কোয়াস (১৯৯১), অলিভার উইলিয়ামসন (২০০৯) এবং জোসেফ স্টিগিলজ (২০০১)। তবে ডায়মন্ড এবং ডিবভিগ অন্য একটি সমস্যার কথা বিশদ বর্ণনা করেছেন যা তাদের পূর্ববর্তী কেউ এমনভাবে আলোচনা করেনি। যেমন প্রকল্পের ঝুঁকি কতটুকু এটা সাধারণ জনগণের অজানা। তবে ঝুঁকি কম হলেও অনেক সঞ্চয়কারী সে ঝুঁকি নিতে রাজি হবে না, কারণ পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষই ঝুঁকিবিমুখ। যদি তাই হয়, উদ্যোক্তা সে লাভজনক প্রকল্পটি গ্রহণ করতে পারবে না এবং অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
ধরা যাক, গ্রামের সবাই উদ্যোক্তার প্রকল্পের ঝুঁকি ভাগাভাগি করে নিয়ে বিনিয়োগ করতে সম্মত হলো। এক্ষেত্রে ডায়মন্ড এবং ডিবভিগ আরো একটি বড় সমস্যা চিহ্নিত করেছেন। বাস্তবে অধিকাংশ প্রকল্পই দীর্ঘমেয়াদি হয়ে থাকে। ধরা যাক, উদ্যোক্তার প্রকল্পের মেয়াদও দীর্ঘ। পূর্ণ মেয়াদের আগে যদি প্রকল্পটি গুটিয়ে ফেলতে হয়, তবে মোটের ওপর আর্থিক ক্ষতি হয়ে যাবে। অর্থাৎ প্রকল্পটি একটি অতরল সম্পদ (যেই সম্পদকে সহজেই অর্থে রূপান্তর করা যায় না)। যেহেতু ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত, বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ভবিষ্যতে এমন কোনো পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে যা প্রকল্প থেকে তাদের বিনিয়োগকে উত্তোলন করতে বাধ্য করবে। এ অবস্থায় যদি বিনিয়োগকারী চাহিবামাত্র বিনিয়োগকৃত অর্থ ফেরত না পান, অথবা ফেরত পেলেও প্রাপ্ত অর্থ যদি আসলের চেয়ে কম হয়, তবে সঞ্চয়কারীরা প্রকল্পে বিনিয়োগ করবে না। আর যেহেতু উদ্যোক্তার প্রকল্পটি দীর্ঘমেয়াদি (বাস্তবে তাই হয়), সেহেতু চাহিবামাত্র উদ্যোক্তা সঞ্চয়কারীদের তহবিল ফেরত দিতে পারবে এমন নিশ্চয়তা নেই। এ অবস্থায় সঞ্চয়কারী এবং উদ্যোক্তার মধ্যে সরাসরি অর্থ আদান-প্রদান হবে না। কারণ, আমানতকারীর দরকার তারল্যের নিশ্চয়তা, অন্যদিকে প্রকল্পে বিনিয়োগ স্বল্পমেয়াদে একটি অতরল সম্পদ। তারল্যের এ হেরফেরের জন্য লাভজনক প্রকল্পে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হবে।
এ সমস্যা সমাধানে ব্যাংকের ভূমিকাই ডায়মন্ড এবং ডিবভিগ বিশদভাবে পর্যালোচনা করেছেন। তারা দেখিয়েছেন, ব্যাংক আর্থিক মধ্যস্থতাকারী হিসেবে প্রধান দুটি সমস্যার সমাধান করে। এক, সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের মাঝে ঝুঁকির সামাজিকীকরণ (যেহেতু ব্যাংকে আমানতকারীর সংখ্যা অনেক), দুই, অতরল সম্পদকে তরল সম্পদে রূপান্তর। ব্যাংকের এ দ্বিতীয় কাজটির প্রতি ডায়মন্ড এবং ডিবভিগ বিশেষ জোর দিয়েছেন।
ব্যাংক বিভিন্ন শ্রেণীর আমানতকারীদের কাছ থেকে আমানত সংগ্রহ করে বিভিন্ন মেয়াদে। যেমন চলতি, স্থায়ী এবং মেয়াদি আমানত। চলতি আমানতের বিশেষত্ব হলো আমানতকারী চাহিবামাত্র ব্যাংক দিতে বাধ্য থাকে। তাই যেসব সঞ্চয়কারী যেকোনো সময় আমানতের অর্থ ফেরত পেতে ইচ্ছুক, তাদের জন্য ব্যাংকের চলতি আমানত উপযুক্ত। এসব আমানত এক করে ব্যাংক উদ্যোক্তাকে দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগের জন্য তহবিল প্রদান করে। যেহেতু ব্যাংকের আমানত সংগ্রহ একটি চলমান প্রক্রিয়া, সেহেতু কিছুসংখ্যক আমানতকারী ব্যাংক থেকে অর্থ উত্তোলন করলে ব্যাংকের তারল্যের সংকট হয় না। তাই ব্যাংক উদ্যোক্তাকে প্রকল্পের নির্দিষ্ট মেয়াদের আগে প্রকল্প গুটিয়ে ফেলার তাগাদা দেয়ার প্রয়োজন পড়ে না। যদি কোনো বিশেষ কারণে উদ্বুদ্ধ হয়ে, যেমন আর্থিক খাতের প্রতি চরম অনাস্থা, দেশজুড়ে আর্থিক সংকট, বিশ্ববাজারে ধস, যুদ্ধবিগ্রহ বা কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ, আমানতকারীদের একটা বড় অংশ একই সময়ে ব্যাংকের কাউন্টারে অর্থ উত্তোলনের জন্য ভিড় করে, তবে ব্যাংকের তারল্য সংকট দেখা দেবে।
এ সমস্যা সমাধানের কিছু টেকসই ব্যবস্থা আছে ব্যাংক খাতের। প্রথমত, দেশের আন্তঃব্যাংকিং বাজার (কল মানি মার্কেট) প্রাথমিক ধাক্কাটা সামাল দিতে চেষ্টা করে। তবে আন্তঃব্যাংকিং বাজার কার্যকর হবে তখনই যখন আমানত উত্তোলনের হিড়িক গুটিকতক ব্যাংক বা শাখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। কিন্তু সমস্যাটা যদি হয় সামগ্রিক ব্যাংক খাতে, আমানতকারীরা দলে দলে ব্যাংকের কাউন্টারে ভিড় করবে আমানতের অর্থ উত্তোলনের জন্য। ব্যাংক আমানতকারীদের চাহিদা মেটাতে বিনিয়োগকৃত দীর্ঘমেয়াদি সম্পদকে নগদ অর্থে রূপান্তরের চেষ্টা করবে। এতে সম্পদ থেকে প্রাপ্ত অর্থের পরিমাণ হবে বিনিয়োগকৃত মূল্যের অনেক কম। তাই ব্যাংকগুলো সব আমানতকারীর অর্থ ফেরত দিতে অপারগ হবে, যার পরিণতি হবে দেউলিয়াত্ব। যেসব ব্যাংক টিকে থাকবে, তারা বিনিয়োগে অতিরক্ষণশীল নীতি অনুসরণ করবে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান তারল্য সংকটে পড়বে এবং তাদের চুক্তিবদ্ধ দায় পরিশোধ করতে অসমর্থ হবে। এ অবস্থাকে ডায়মন্ড এবং ডিবভিগ ‘ব্যাংক রান’ বলে অভিহিত করেছেন।
ডায়মন্ড এবং ডিবভিগ সমস্যা চিহ্নিতকরণের পাশাপাশি তা থেকে উত্তরণের পথ দেখিয়েছেন। আর তা হচ্ছে তারল্য সংকটের সময় অর্থবাজারে সরাসরি সরকারি হস্তক্ষেপ। সরকার এটা করে থাকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে। এজন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংককে বলা হয় বাণিজ্যিক ব্যাংকের ঋণের শেষ আশ্রয়স্থল। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কার্যক্রম আমানতকারীদের মনে আশ্বাসের জন্ম দেয় যে আপত্কালে সরকার পাশে থাকবে। সরকারি হস্তক্ষেপ দুই রকমের হতে পারে। এক. জনগণের করের টাকায় মৃতপ্রায় ব্যাংককে দেউলিয়াত্ব থেকে উদ্ধার করা। দুই. ব্যাংকে জামানতের ওপর বীমা। দ্বিতীয় বিকল্পটিই শ্রেয় বলে মনে করেন এই দুই নোবেল জয়ী অর্থনীতিবিদ। তাদের মতে, ঋণের শেষ আশ্রয়স্থল আমানত বীমার মতো বিশ্বাসযোগ্য এবং কার্যকর নয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সবসময় যদি সংকটাপন্ন ব্যাংককে উদ্ধার করতে থাকে, তবে ব্যাংক পরিচালকদের মধ্যে এক ধরনের নৈতিক অবক্ষয়ের সৃষ্টি হবে। অধিক মুনাফার আশায় ব্যাংকগুলোর মধ্যে মাত্রাতিরিক্ত ঝুঁকি নেয়ার প্রবণতা বাড়বে। যদি সফল হয় তবে ব্যাংকের অধিক মুনাফা হবে। যদি ব্যর্থ হয়, তবে সরকার উদ্ধার করবে। তাই সংকটাপন্ন ব্যাংককে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিঃশর্ত উদ্ধার সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য সুখকর নয়। এজন্য আমানতের বীমার ওপর আস্থা রেখেছেন ডায়মন্ড এবং ডিবভিগ। তাদের মতে, আমানত বীমা একটি বাধ্যতামূলক প্রতিশ্রুতি। ব্যর্থতার জন্য ব্যাংকের মালিক, পরিচালনা পর্ষদ এবং অফিসারদের জবাবদিহিতার আওতায় এনে শাস্তির বিধান রাখা যেতে পারে।
বলাবাহুল্য, তাদের অনুসৃত এ নীতির আলোকে বিশ্বের প্রায় সব দেশেই ডিপোজিট ইন্স্যুরেন্স বা আমানত বীমা চালু রয়েছে। যদিও আমানত বীমার অনেক সমালোচনা আছে, তবে বর্তমান বিশ্বের আর্থিক প্রেক্ষাপটে ‘ব্যাংক রান’ থেকে পরিত্রাণের জন্য এর চেয়ে বেশি জুতসই কোনো ব্যবস্থা নেই। এই তত্ত্বের সমর্থন নিয়ে কভিড-১৯ মহামারীতে আর্থিক খাতের তারল্য নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিভিন্ন দেশের সরকারের সম্প্রসারণমূলক মুদ্রানীতিসহ অন্যান্য হস্তক্ষেপ বজায় রেখেছিল। যার কারণে কভিডকালে পৃথিবীর কোনো দেশেই তারল্যের সংকট দেখা যায়নি।
ড. এম কবির হাসান: অধ্যাপক, নিউ অরলিন্স বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাষ্ট্র
ড. মোহাম্মদ দুলাল মিয়া: সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, ফাইন্যান্স ও অর্থনীতি বিভাগ, নিজওয়া বিশ্ববিদ্যালয়, ওমান