▪️ইসলামী শরী'আহর ইলম অর্জনের জন্য কিছু পরামর্শ-
১. প্রথমেই কুরআনের ইলম অর্জন করুন। বিশুদ্ধভাবে তাজবীদসহ কুরআন তিলাওয়াত শিখুন। সাধ্যানুযায়ী কুরআন হিফয করুন। দৈনিক একটা নির্দিষ্ট সময়ে অর্থ ও তাফসীরসহ কুরআন পড়ুন। তাফসীরে সা'দী, তাফসীর মুয়াসসার, তাফসীর ইবনু কাছীর এর মুখতাছার, এভাবে পড়তে পারেন।
২. হাদীসের ইলম অর্জন করুন। সহীহ হাদীস থেকে নিয়মিত কিছু হাদীস অর্থ ও ব্যাখাসহ পড়ুন। সুন্নাহ আপনাকে কুরআনের ইলমকে পূর্ণতা দিবে। পাশাপাশি সাহাবীদের আছার পড়ুন। রিয়াযুস সালেহীন, ঊমদাতুল আহকাম, বুলুগুল মারাম, সহীহ বুখারী ও মুসলিম অথবা আল জামিউ লিমা ফিস সহীহাইন, এভাবে আগাতে পারেন।
৩. এরপর আক্বীদার ইলম অর্জন করুন। এক্ষেত্রে প্রথমেই ঈমান ও আক্বীদার বিষয়গুলো বুঝে নিন। এজন্য সংক্ষিপ্ত কোনো কিতাব পড়ুন। যেমন-
কিতাবুত তাওহীদ, উসূলুস সালাসাহ, কাওয়াঈদুল আরবাআহ। এভাবে বড় কিতাবের দিকে আগাবেন। সাথে সাথে মানহাজ বিষয়ক কিতাবগুলো দেখে নেওয়ার চেষ্টা করবেন।
এই কিতাবগুলো শেষ করার পর ফিক্বহ শিখবেন। ফিক্বহের জন্যও ছোট কিতাব দিয়ে শুরু করুন। যেমন-
ফিক্বহুল মুয়াসসার, মুখতাছার ফিকহুস সুন্নাহ, মুলাখখাস ফিক্বহী, সহীহ ফিকহুস সুন্নাহ, এভাবে বড় কিতাবের দিকে আগাবেন। পাশাপাশি উসূলে হাদীস ও উসূলে ফিক্বহের ইলম অর্জন করবেন।
৪. তারপর ইলমুল আলাহ তথা মূল ইলম অর্জনে সহায়ক জ্ঞানগুলো ধাপে ধাপে শিখবেন। এক্ষেত্রে আরবী ভাষা সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য পাবে। সর্বনিম্ন এক বছর নির্বিঘ্নে আরবী ভাষায় টানা সময় দিন। যাতে করে ভাষা জ্ঞানটা যথাযথ হয়ে যায়। আরবী ব্যাকরণের নাহু ও সরফের নিয়মগুলো সংক্ষিপ্ত ভাবে জেনে রাখা জরুরী। এভাবে সীরাহ, ফারায়েয, ইতিহাস সহ প্রয়োজনীয় ইলম অর্জন করতে পারেন।
▪️ইলম অর্জনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম ও সতর্কতা-
একসাথে একাধিক বিষয়ে ইলম অর্জনে মনোনিবেশ না করাই উচিত। কেবল কুরআন ও হাদীসের অধ্যয়নের পাশাপাশি একটি মাত্র সহায়ক বিষয় মুযাকারার জন্য রাখা যায়। তবে মনে রাখতে হবে এটা মূল ইলম অর্জনকে বাধাগ্রস্ত না করে।
✍️সার্বিক উপদেশসমূহ-
১. প্রতিটি বিষয়ে একটি মূল কিতাব নির্ধারণ করুন। যাতে সেই বিষয়টা আপনি সেই কিতাব থেকে মূলভিত্তি হিসেবে শিখতে পারেন। এর সাথে একটি উপযুক্ত ব্যাখ্যা (শারহ) নির্বাচন করুন। পড়ার সময় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো হাইলাইট করুন। এটা হয় বইয়ের পাশে, না হয় আলাদা খাতায়।
২. সব কিছু মুখস্থ করতে হবে না। যা আপনার মনন ও চিন্তাশক্তি বাড়ায়, সেদিকে মনোযোগ দিন।
৩. মূল কিতাবগুলোকেই অনুসরণ করুন। সার্বিক নোট বা টীকাসমূহ এগুলো যেন হয় কেবল জরুরি অবস্থায় কিতাব বুঝতে সহায়তা পাওয়ার জন্য।
৪. ইলম আসে দুইভাবে। যথা -
- উস্তাযের মুখ থেকে শোনার মাধ্যমে (মুশাফাহা)
- নিজে পড়ার মাধ্যমে (মুতালাআহ)
কাজেই উস্তায ছাড়া নিজে নিজে পড়া যেন অতিরঞ্জিত না হয়, আবার শুধুই উস্তায নির্ভর হওয়াও উচিত নয়। বরং উভয়ের মাঝে সমন্বয় করার চেষ্টা রাখতে হবে।
৫. কোন বিষয়ে কোন কিতাব পড়বেন, তা আগে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের অভিজ্ঞ কারো থেকে জেনে নিন। যাতে করে সময় নষ্ট না হয়।
৬. আপনার ইলম অর্জনকে একজন উস্তাযের সাথে সীমাবদ্ধ রাখবেন না, যেন তিনি নিভে গেলেও আপনি থেমে না যান। একাধিক অপশন সবসময় প্রস্তুত করে রাখবেন।
৭. সবসময় নিজেই নিজেকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করবেন। ইলম অর্জনে অদম্য ইচ্ছা ও আগ্রহ সবসময় বেশি থাকা জরুরি।
৮. উসূল ও ভাষা (আরবী) এর মূলভিত্তি যতটা পারবেন দ্রুত শিখে ফেলবেন। কারণ মূল ইলম অর্জনে গন্তব্যে পৌঁছতে এই দুটোর বিকল্প নেই।
৯. যেন প্রতিদিন অন্তত কিছু না কিছু জ্ঞান অন্তরে স্থান পায়। গ্যাপ হয়ে গেলে ইলম অর্জনে অলসতা চলে আসবে।
১০. সদা সর্বদা মহান আল্লাহর সাথে সম্পর্ক ঠিক রাখুন। আর প্রতিনিয়ত তাঁর নিকটে একনিষ্ঠতার সাথে তাওফীক্ব চান, যেন তিনি আপনার সামনে সব প্রতিবন্ধকতা দূর করেন। ইলম অর্জনের পথকে সহজ করে দেন।
১১. নির্ভরযোগ্য কিতাব একবার পড়া যথেষ্ট নয়, বরং একাধিকবার পড়তে হয়। প্রয়োজনে আরো বেশিবার পড়া জরুরি।
১২. ইলমের স্বাদ উপভোগ করুন। কারণ, এটি দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ মর্যাদার একটি। মহান আল্লাহ ইলমের বিষয় দিয়েই অহির সূচনা করেছেন।
১৩. দৈনিক একটি নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করুন ইলম অর্জনের জন্য, যে সময়ে আপনি নিজেকে বাধ্য করবেন পড়াশোনায় বসতে। এভাবে নিয়মিত অভ্যাস গড়তে হবে ও বাস্তবায়ন করতে হবে।
১৪. মাঝে মাঝে বেশি পরিশ্রমী হয়ে পড়ুন। স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশি পড়ুন। তবে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসে নিজের সীমা অতিক্রম করবেন না। তাহলে পথ হারিয়ে ফেলবেন আবার।
১৫. নিজের জন্য সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য স্থির করুন এবং ধৈর্য্য ধরে সে লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করুন।
১৬. বুদ্ধিমান ও একনিষ্ঠ ছাত্রদের সাথে বসুন। তাদের সাথে যোগাযোগ দৃঢ় করুন। ইলম ও তাকওয়ার কাজে তাদের থেকে সহযোগিতা নিন এবং তাদেরকেও সহযোগিতা করুন।
১৭. যারা আপনাকে ইলম অর্জনের ক্ষেত্রে হতাশ করে তাদের কথায় কান দিবেন না।
১৮. একটা সুন্দর সাজানো গোছানো পরিকল্পনা করুন-
সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ছোটো ছোটো লক্ষ্য নির্ধারণ করে সেটাকে পূর্ণতা দিন ছোটো ছোটো সময়ে। পাশাপাশি নিজের সামর্থ্য বিশ্লেষণ করুন।
১৯. বারবার নিজেকে স্বরণ করিয়ে দিন-
দ্রুত ফল আশা করবেন না। দ্রুত ফল আশা করবেন না। দ্রুত ফল আশা করবেন না। যার সূচনাটা সুন্দর হয় না তার সমাপ্তিও দৃষ্টিনন্দন হয় না।
২০. ইলম অর্জনের জন্য পাঁচটি বিষয় দরকার-
আত্মত্যাগ, বিনয়, নিরবতা, ক্ষুধা সহ্য, অহংকার বর্জন।
২১. ইলম অর্জনের ক্ষেত্রে পাখা হলো-
ইখলাস (নিয়্যত), সময়ের যথাযথ ব্যবহার (নিজেকে সবকিছু থেকে আলাদা করুন), মুখস্থ করা, বুঝা, একনিষ্ঠ উপদেশ, প্রতিযোগী বন্ধু, অপরকে শেখানো ও ব্যাখ্যার অভ্যাস করা।
২২. যদি একটি কিতাব পড়া শুরু করেন, শেষ না হওয়া পর্যন্ত থামবেন না অথবা শেষ না করে অন্য কিতাবে যাবেন না।
২৩ . প্রতিটি কিতাবের জন্য একটি খাতা রাখবেন-
বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ও বিরল বিষয়গুলো লিখে রাখুন। অনুরুপ যে বিষয়গুলো নিজের মতো করে বুঝেছেন সেগুলো এবং যে বিষয়গুলো জটিল মনে হয়েছে সেগুলো লিখে রাখুন।
২৪. সদা সর্বদা আল্লাহর সাহায্য চান। ইলম অর্জনে কখনোই কখনো হতাশ হবেন না।
২৫. ইলমকে কখনো অবজ্ঞা করবেন না। এটি অনেকটা নদীর মতো, আপনি ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলে একদিন ঠিকই সীমানায় পৌঁছে যাবেন।
رب زدني علما، اللهم إني أسألك علما نافعا ورزقا طيبا وعملا متقبلا.
🖋️ আব্দুল হাকীম মাদানী
আল-ইলম একাডেমী
Welcome to the official page of Al-Ilm Academy (An Islamic Learning Platform). Founding Director: Ustaz Abdul Hakim Madani.
হে সম্মানিত মুসলিম ভাই!
কুরবানীর ব্যাপারে আপনার মনকে প্রশস্ত রাখুন এবং আনন্দিত হোন। কারণ কুরবানীর পশু ক্রয় করা, ভালো পশু খোঁজা এবং সামর্থ্য অনুযায়ী উত্তম পশু নির্বাচন করা এসব আল্লাহর নিদর্শনসমূহকে সম্মান করার অন্তর্ভুক্ত।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
﴿ذَٰلِكَ وَمَن يُعَظِّمْ شَعَائِرَ اللَّهِ فَإِنَّهَا مِن تَقْوَى الْقُلُوبِ﴾
এটাই বিধান; আর যে ব্যক্তি আল্লাহর নিদর্শনসমূহকে সম্মান করে, নিশ্চয়ই তা অন্তরের তাকওয়ার পরিচায়ক। সূরা আল-হাজ্জ: ৩২।
তাই কুরবানীকে শুধু একটি সামাজিক রীতি বা বার্ষিক খরচ হিসেবে দেখা উচিত নয়। এটি আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের মহান ইবাদত, ত্যাগের প্রকাশ এবং ইসলামের অন্যতম প্রকাশ্য নিদর্শন।
আলেমগণ এবিষয়ে অনেক বক্তব্য উল্লেখ করেছেন। তাদের মধ্যে শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ رحمه الله বলেন, আর্থিক ইবাদতের মধ্যে সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ হলো নাহর বা কুরবানী, আর শারীরিক ইবাদতের মধ্যে সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ হলো সালাত।
সূত্র: মাজমূঊল ফাতাওয়া, ১৬/৫৩২
অতএব, সামর্থ্যবান মুসলিমের উচিত কুরবানীর ব্যাপারে অবহেলা না করা, ভালো পশু নির্বাচনে যত্নবান হওয়া এবং একে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি, তাকওয়া ও দ্বীনের নিদর্শন সম্মানের অংশ হিসেবে গ্রহণ করা। আল্লাহ আমাদের কুরবানী কবুল করুন এবং অন্তরে তাকওয়া দান করুন। আমীন!
আগামীকাল আরাফার দিন। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
যে ব্যক্তি আরাফার দিন রোজা রাখে, আল্লাহ তার দুই বছরের গুনাহ ক্ষমা করে দেন—এক বছর আগের এবং এক বছর পরের।
সূত্র: সহীহুল জামে, হাদীস: ৬৩৩৫
আরাফার দিনের রোজা হাজীদের জন্য নয়; বরং যারা হজে নেই, তাদের জন্য অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ আমল। তাই আগামীকাল সামর্থ্য থাকলে রোজা রাখা, বেশি বেশি তাকবীর, তাহলীল, তাসবীহ, ইস্তিগফার ও দোয়া করা উচিত।
আল্লাহ আমাদের আরাফার দিনের বরকত লাভের তাওফীক দিন এবং আমাদের গুনাহসমূহ ক্ষমা করুন। আমীন।
ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল رحمه الله ছিলেন এমন এক বিরল ব্যক্তিত্ব; যাঁর মাঝে ইলম, আমল, তাকওয়া, যুহদ, সুন্নাহর অনুসরণ এবং চরিত্রের সৌন্দর্য একসাথে মিলিত হয়েছিল। তাঁকে শুধু মুহাদ্দিস বললে তাঁর মর্যাদাকে সংকুচিত করা হয়। বরং তিনি ছিলেন বহু বিদ্যায় ইমাম এবং উম্মাহর অন্যতম শ্রেষ্ঠ আলেম।
হাম্বালি আলেমগণ তাঁর সম্পর্কে বলেছেন, ইমাম আহমাদ ছিলেন আটটি বিষয়ে ইমাম। যথা-
হাদীসে ইমাম, ফিকহে ইমাম, ভাষায় ইমাম, কুরআনে ইমাম, দারিদ্র্যে ধৈর্যে ইমাম, যুহদে ইমাম, ওয়ারায় ইমাম, এবং সুন্নাহতে ইমাম। সুবহানাল্লাহ।
এই একটি বক্তব্যই তাঁর ব্যক্তিত্বের গভীরতা বুঝিয়ে দেয়। সাধারণত মানুষ একটি বিদ্যায় পারদর্শী হয়; কিন্তু ইমাম আহমাদ رحمه الله ছিলেন এমন একজন, যিনি ইলমের সাথে আমল, ফিকহের সাথে যুহদ, এবং হাদীসের সাথে চরিত্রকে একত্র করেছিলেন।
ইমাম শাফেঈ رحمه الله তাঁর সম্পর্কে বলেছিলেন, আমি বাগদাদ থেকে বের হয়েছি, অথচ সেখানে আহমাদ ইবনু হাম্বালের চেয়ে বেশি পরহেজগার, মুত্তাকি, ফকীহ ও জ্ঞানী কাউকে রেখে আসিনি।
বিশেষভাবে লক্ষণীয় বিষয় হলো ইমাম শাফেঈ رحمه الله এই প্রশংসা করেছিলেন তখন, যখন ইমাম আহমাদ রাহিমাহুল্লাহ এখনো যুবক ছিলেন। অর্থাৎ তাঁর প্রতিভা ও ইলম অল্প বয়সেই আলেমদের নজর কাড়ে।
তাঁর ফিকহী প্রজ্ঞার একটি চমৎকার ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। একবার কিছু আহলুল হাদীস আবু আসিম আদ-দাহহাক ইবন মাখলাদ رحمه الله-এর মজলিসে উপস্থিত ছিলেন। তিনি তাঁদের উদ্দেশে বললেন, তোমরা কি ফিকহ শেখো না? তোমাদের মাঝে কোনো ফকীহ নেই!
তখন তাঁরা বললেন, আমাদের মাঝে একজন আছেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তিনি কে? তাঁরা বললেন, এখনই আসবেন। কিছুক্ষণ পর ইমাম আহমাদ رحمه الله আসলেন। তাঁকে সামনে আসতে বলা হলে তিনি বলেন, মানুষকে ডিঙিয়ে সামনে আসা আমি অপছন্দ করি। তখন আবু আসিম বললেন, এটিও তাঁর ফিকহের অংশ।
এরপর তাঁকে সামনে বসানো হলো এবং একের পর এক মাসআলা জিজ্ঞেস করা হলো। তিনি সবগুলোর উত্তর দিলেন। তখন আবু আসিম বিস্মিত হয়ে বললেন, এ ব্যক্তি সমুদ্রের প্রাণীদের মতো; তিনি সাধারণ স্থলের প্রাণীদের অন্তর্ভুক্ত নন! অর্থাৎ তাঁর জ্ঞান ছিল অসাধারণ ও বিরল।
ইবন মাকুলা رحمه الله বলেন, তিনি সাহাবী ও তাবেঈদের মতামত সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি জ্ঞান রাখতেন।
আর আব্দুল ওয়াহহাব আল-ওয়াররাক رحمه الله বলেন, আমি আহমাদ ইবনু হাম্বলের মতো কাউকে দেখিনি। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, কোন জিনিস আপনাকে তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব বুঝিয়েছে?
তিনি বলেন, এক ব্যক্তিকে ষাট হাজার মাসআলা জিজ্ঞেস করা হলো, আর তিনি প্রতিটির উত্তরে বললেন, আমাদেরকে হাদীস বর্ণনা করেছেন…
অথবা আমাদেরকে সংবাদ দিয়েছেন…। অর্থাৎ তাঁর ফিকহ ছিল সরাসরি কুরআন ও সুন্নাহভিত্তিক।
তবুও ইতিহাসে কিছু অজ্ঞ লোক বলত, আহমদ ফকীহ নন; তিনি শুধু মুহাদ্দিস। এ প্রসঙ্গে ইবনু আকীল رحمه الله বলেন, এটি চরম অজ্ঞতা। কারণ তিনি এমনভাবে হাদীসের উপর ভিত্তি করে ফিকহ নির্মাণ করেছেন, যা অধিকাংশ মানুষ বুঝতেই পারে না।
এরপর ইমাম যাহাবী رحمه الله মন্তব্য করেন, সম্ভবত তারা মনে করে, তিনি শুধু আজকের যুগের সাধারণ মুহাদ্দিসদের মতো ছিলেন! আল্লাহর কসম! ফিকহে তিনি লায়স, মালিক, শাফেঈ ও আবু ইউসুফের পর্যায়ে পৌঁছেছিলেন। যুহদ ও ওয়ারায় ছিলেন ফুযাইল ও ইবরাহিম ইবন আদহামের স্তরে। আর হিফযে ছিলেন শু‘বা, ইয়াহইয়া আল-কাত্তান ও ইবনুল মাদীনীর পর্যায়ে।
তারপর তিনি গভীর একটি কথা বলেন, অজ্ঞ ব্যক্তি নিজের মর্যাদাই জানে না; তাহলে সে অন্যের মর্যাদা কীভাবে চিনবে?
এটাই ইতিহাসের একটি বাস্তবতা মহান মানুষদের প্রকৃত মর্যাদা সাধারণ চোখ সহজে বুঝতে পারে না। কারণ বড় ব্যক্তিত্বকে বুঝতে হলে বড় দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন।
ইমাম আহমাদ رحمه الله শুধু একজন আলেম ছিলেন না; বরং তিনি ছিলেন সুন্নাহর দুর্গ, আকীদার রক্ষক এবং ইলম ও আমলের এক জীবন্ত প্রতীক। তাঁর জীবন প্রমাণ করে প্রকৃত ইলম শুধু তথ্যের আধিক্য নয়; বরং তা চরিত্র, তাকওয়া, ধৈর্য ও সুন্নাহর প্রতি অবিচলতার নাম। মহান আল্লাহ আমাদেরকেও তাদের মত কবুল করুন। আমীন!
১২ই মে, ২০২৬, মঙ্গলবার
আল-ইলম ইন্সটিটিউট রাজশাহী।
12/05/2026
ইলমী জগতের একটি আনন্দের সংবাদ
শাইখ মুহাম্মাদ বারহাজী হাফিযাহুল্লাহ
মসজিদে নববী-এর সম্মানিত ইমাম এবং তাইবা বিশ্ববিদ্যালয়-এর উস্তায আজ তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ডক্টরেট গবেষণাপত্রের মুনাকাশায় অংশগ্রহণ করেছেন।
শাইখের গবেষণাপত্রটির শিরোনাম হলো:
আবু আল-কাসিম আল-হাসান ইবন মুহাম্মাদ ইবন হাবীব আন-নাইসাবুরী (মৃত্যু: ৪০৬ হি.) রচিত তাফসীর ইবন হাবীব: সূরা হাদীদের শুরু থেকে সূরা তালাকের শেষ পর্যন্ত, গবেষণা ও তাহকীক।
গবেষক: আব্দুর রহমান ইবন সামীর ইবন জামিল কাসিম (উস্তায, কুল্লিয়্যাতুল কুরআনিল কারীম, মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়)।
মুনাকাশা বোর্ডে আরও উপস্থিত ছিলেন-
• আলী ইবন আব্দুল্লাহ আস-সাকাকির, তাফসীর ও উলূমুল কুরআন বিভাগের প্রধান।
• আব্দুল্লাহ ইবন সুগান আয-যাহরানী, অভ্যন্তরীণ আলোচক।
এ ধরনের গবেষণা ও তাহকীক আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেয় উম্মাহর ইলমী ঐতিহ্য এখনো জীবিত। শত শত বছরের প্রাচীন তাফসীর, পান্ডুলিপি ও ইলমী ভাণ্ডার নতুনভাবে গবেষিত হচ্ছে, যাচাই-বাছাই হচ্ছে এবং নতুন প্রজন্মের সামনে উপস্থাপিত হচ্ছে।
আল্লাহ তাআলা কুরআনের খিদমতে নিয়োজিত সকল আলেম, গবেষক ও তালিবুল ইলমকে কবুল করুন এবং তাঁদের ইলমে বরকত দান করুন। আমীন!
ইলমুন নাহু, তাফসীর এবং কুরআন তিলাওয়াত-
কুরআন পাঠে নাহুর গুরুত্ব হলো নাহুর নিয়ম শেখার মাধ্যমে আপনি কুরআনকে সঠিকভাবে, ভুল উচ্চারণ ও লাহনমুক্তভাবে পড়তে সক্ষম হন। এ প্রসঙ্গে সালিম ইবনু কুতাইবা রহিমাহুল্লাহর একটি বাণী উল্লেখ করছি, যা প্রমাণ করে, যে ব্যক্তি আল্লাহর কিতাবকে আল্লাহ যেভাবে নাযিল করেছেন, সেভাবে ভুলত্রুটিমুক্তভাবে পড়ে, তার মর্যাদা কত উচ্চ। তিনি বলেন-
আমি ইবনু হুবাইরাহ আল-আকবারের কাছে ছিলাম। কথোপকথনের একপর্যায়ে আরবী ভাষার আলোচনা উঠল। তখন তিনি বললেন, আল্লাহর শপথ, দুই ব্যক্তির দ্বীন এক, বংশমর্যাদা এক, মুরুয়ত এক; কিন্তু একজন লাহন করে, আরেকজন লাহন করে না, এরা কখনও সমান নয়। দুনিয়া ও আখিরাত উভয় ক্ষেত্রেই যে লাহন করে না, সেই অধিক মর্যাদাসম্পন্ন।
আমি বললাম, আল্লাহ আমীরকে কল্যাণ দান করুন, দুনিয়ার ক্ষেত্রে তো তার ফাসাহাত ও আরবিয়তের কারণে সে উত্তম এটি বুঝলাম। কিন্তু আখিরাতে কেন সে শ্রেষ্ঠ হবে?
তিনি বললেন, কারণ সে আল্লাহর কিতাবকে আল্লাহ যেভাবে নাযিল করেছেন, সেভাবেই পড়ে। আর যে ব্যক্তি লাহন করে, তার লাহন তাকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যায় যে, সে আল্লাহর কিতাবে এমন কিছু ঢুকিয়ে দেয় যা তাতে নেই, এবং এমন কিছু বের করে দেয় যা তাতে আছে। আমি বললাম, আমীর সত্য বলেছেন, এবং খুবই সুন্দর বলেছেন।
আর কুরআন শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে নাহু-বিদ্যার গুরুত্ব এ বিষয়েও ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত ঘটনার দ্বারা জানা যায় যে, আরবী ভাষায় অজ্ঞ ব্যক্তি যেন কুরআন শিক্ষা না দেয়। বরং কুরআন শিক্ষাদানকারীর নাহুর নিয়ম সম্পর্কে জ্ঞান থাকা অপরিহার্য। সেই বর্ণনায় এসেছে:
আমীরুল মুমিনীন উমর ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহুর খিলাফতকালে এক বেদুইন এল। সে বলল, কে আমাকে আল্লাহ তাআলা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর যা নাযিল করেছেন, তার কিছু শিক্ষা দেবে? তখন এক ব্যক্তি তাকে সূরা বারাআত (তাওবা) পড়িয়ে দিল এভাবে,
أن الله برئ من المشركين ورسوله
এখানে "رسوله" শব্দটি যের দিয়ে (রসূলিহি) পড়ল। তখন বেদুইন বলল, আল্লাহ কি তাঁর রাসূল থেকেও সম্পর্কচ্ছেদ করেছেন? যদি আল্লাহ তাঁর রাসূল থেকে সম্পর্কচ্ছেদ করে থাকেন, তবে আমিও তাঁর থেকে সম্পর্কচ্ছেদ করলাম।
এ কথা ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে পৌঁছল। তিনি তাকে ডাকলেন এবং বললেন, হে বেদুইন, তুমি কি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে সম্পর্কচ্ছেদ করছ?
সে বলল, হে আমীরুল মুমিনীন, আমি মদীনায় এসেছি, অথচ কুরআন সম্পর্কে আমার কোনো জ্ঞান নেই। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কে আমাকে পড়াবে? তখন এই ব্যক্তি আমাকে সূরা বারাআত পড়িয়ে দিল এভাবে,
أن الله برئ من المشركين ورسوله
তখন আমি বললাম, আল্লাহ কি তাঁর রাসূল থেকেও সম্পর্কচ্ছেদ করেছেন? যদি আল্লাহ তাঁর রাসূল থেকে সম্পর্কচ্ছেদ করে থাকেন, তবে আমিও তাঁর থেকে সম্পর্কচ্ছেদ করলাম।
তখন ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, হে বেদুইন, এভাবে নয়। সে বলল, তাহলে কীভাবে, হে আমীরুল মুমিনীন? তিনি বললেন, (পেশ দিয়ে- রসূলুহু)
أن الله برئ من المشركين ورسولُه
তখন বেদুইন বলল, আমিও আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যাদের থেকে সম্পর্কচ্ছেদ করেছেন, তাদের থেকে সম্পর্কচ্ছেদ করছি।
এরপর ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু নির্দেশ দিলেন, আরবী ভাষায় পারদর্শী নয় এমন কেউ যেন কুরআন শিক্ষা না দেয়। আর তিনি আবুল আসওয়াদ আদ-দুয়ালিকে নাহুর ভিত্তি প্রণয়নের নির্দেশ দিলেন।
মানুষকে নিয়ে সালাত পড়ান যে ইমাম, তার জন্যও নাহু-বিদ্যার গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। কারণ এর মাধ্যমে কুরআন পাঠে তার জিহ্বা সঠিক থাকে এবং মানুষকে ইমামতি করার সময় লাহনে পড়ে যাওয়া থেকে সে বেঁচে যায়।
আমাদের সালাফে সালিহীনের কাছ থেকে একাধিক বর্ণনা এসেছে, যা প্রমাণ করে, যে ইমাম কুরআন তিলাওয়াতে লাহন করে, তার ইমামতি পছন্দনীয় নয়। যেমন, ওমর ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহু লাহনকারীর পেছনে সালাত পড়াকে সঠিক মনে করতেন না।
আর হাসান আল-বাসরীর কাছে বলা হলো, আমাদের একজন ইমাম আছেন, যিনি লাহন করেন। তিনি বললেন, তাকে তোমাদের কাছ থেকে সরিয়ে দাও; কারণ ই'রাব হচ্ছে কথার অলংকার।
আর সালাতে কুরআন পাঠে লাহনের হুকুম সম্পর্কে চার মাযহাবের মধ্যে এ বিষয়ে কোনো মতভেদ নেই যে, যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে এমন লাহন করে, যা অর্থ বদলে দেয়, তার নিজের সালাত ও তার ইমামতি কোনোটাই সহীহ নয়।
আর যদি সে ইচ্ছাকৃত না হয়ে অর্থ বিকৃত করে ফেলে, তাহলে যদি তা সূরা ফাতিহার মধ্যে হয়, তার ইমামতি সহিহ হবে না। আর যদি ফাতিহা ছাড়া অন্য কোথাও হয়, তাহলে সালাত সহীহ হবে, তবে তা মাকরুহ হবে। এটি ইমাম শাফেঈ ও ইমাম আহমাদের মাযহাব। আর মালিকি মাযহাবে ফাতিহার মধ্যে হোক বা অন্যত্র লাহনকারী ইমামের ইমামতি সহিহ নয়।
কুরআনের তাফসিরে নাহুর গুরুত্ব-
কুরআনের তাফসিরে নাহু-বিদ্যার গুরুত্ব সম্পর্কে আলেমদের বহু বক্তব্য বর্ণিত হয়েছে। বরং তারা স্পষ্টভাবে বলেছেন, মুফাসসিরের জন্য নাহুর নিয়মে গভীর পারদর্শিতা থাকা অপরিহার্য; প্রাচীন ও পরবর্তী নাহুবিদদের মতামত সম্পর্কে জ্ঞান থাকতে হবে; আরবদের কবিতার সঙ্গেও পরিচিত হতে হবে।
এ বিষয়ে সাহাবী, তাবেঈ ও আলেমদের কিছু বক্তব্য নিম্নরূপ-
আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন,
যখন কুরআনের কোনো বিষয় তোমাদের কাছে অস্পষ্ট মনে হয়, তখন তা কবিতায় খুঁজে দেখো; কারণ কবিতাই হচ্ছে আরবদের দিওয়ান।
হাসান আল-বাসরী বলেছেন, অনারবিয়ত তাদের ধ্বংস করেছে; তারা কুরআনের সঠিক তা’ওয়িল ছাড়া অন্য অর্থ করেছে।
ইমাম যুহরী রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, মানুষ কুরআনের তাফসিরে এত ভুল করেছে কেবল এ জন্য যে, তারা আরবদের ভাষা জানত না।
ফুযাইল ইবন ঈয়ায রহিমাহুল্লাহ কতই না সুন্দর বলেছেন, তোমরা কখনও কুরআন বুঝতে পারবে না, যতক্ষণ না তার ই‘রাব জানতে পারো।
মুজাহিদ রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাতের প্রতি ঈমান রাখে, তার জন্য আল্লাহর কিতাব সম্পর্কে কথা বলা হালাল নয়, যদি সে আরবদের ভাষাসমূহ সম্পর্কে জ্ঞানী না হয়।
ইমাম মালিক রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, যে ব্যক্তি আরবী ভাষায় অজ্ঞ, অথচ আল্লাহর কিতাবের তাফসির করে তাকে যদি আমার সামনে আনা হয়, তবে আমি তাকে শাস্তির দৃষ্টান্ত বানাব।
কিছু সালাফ বলেছেন, যাকে ভাষা ও আরবী জ্ঞান দেওয়া হয়েছে, তাকে কুরআনের চাবিগুলোর একটি চাবি দেওয়া হয়েছে; এর মাধ্যমে সে কুরআনের অর্থ বুঝতে পারে।
আরেকজন বলেছেন, যে ব্যক্তি নাহু থেকে মানুষকে ফিরিয়ে রাখে, সে যেন আল্লাহর কিতাব থেকেই তাদের ফিরিয়ে রাখে। কারণ নাহু নষ্ট হয়ে গেলে মুসলিমদের জীবনে কুরআনও নষ্ট হয়ে যায়, তার তিলাওয়াতের উচ্চারণ বিশৃঙ্খল হয়, আরবি ভাষার নিয়ম বিলুপ্ত হয়, আর কুরআনের অর্থও বন্ধ হয়ে যায়, কারণ তা বোঝার উপায়ই হারিয়ে যায়, তার গুপ্তভাণ্ডার আহরণ করাও আর সম্ভব থাকে না।
আরেকজন বলেছেন, যদি নাহু বিলুপ্ত হয়ে যায়, তবে কুরআন বোঝাও বিলুপ্ত হয়ে যাবে।
আবু বকর আল-আমবারী রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন,
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, তাঁর সাহাবী এবং তাবেঈদের পক্ষ থেকে কুরআনের ই'রাবের ফযিলত, তা শেখার প্রতি উৎসাহ, এবং লাহনের নিন্দা ও অপছন্দনীয়তা সম্পর্কে এত কিছু বর্ণিত হয়েছে যে, কুরআনের পাঠকদের ওপর এটি অপরিহার্য হয়ে যায় তারা যেন তা শেখার জন্য নিজেদের সর্বশক্তি নিয়োগ করে।
মুফাসসির ইবনু আতিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন,
কুরআনের ইরাব শরীয়তের একটি মৌলিক বিষয়। কারণ এর মাধ্যমেই কুরআনের সেই অর্থসমূহ সুপ্রতিষ্ঠিত হয়, যা-ই শরিয়ত। কুরআন আরবদের ভাষায় নাযিল হয়েছে। তাই ভাষাটিকে জানা অপরিহার্য। কারণ ইরাবই কুরআনের বিদ্যাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ।
আবুল বাকা আল-উকবারী রহিমাহুল্লাহ তাঁর إملاء ما منّ به الرحمن من وجوه الإعراب গ্রন্থের ভূমিকায় বলেছেন, কুরআনের অর্থ অনুধাবন এবং তার উদ্দেশ্য ও তাৎপর্য স্পষ্ট করার সবচেয়ে সোজা পথ হলো তার ই‘রাব জানা।
ইমাম যারকাশী রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, জেনে রাখুন, যে ব্যক্তি ভাষার প্রকৃত রূপ ও তার অর্থবোধ সম্পর্কে জ্ঞানী নয়, তার জন্য আল্লাহর কালামের কোনো অংশের তাফসির করা বৈধ নয়। আর তার জন্য এ ভাষার অল্প কিছু শেখাও যথেষ্ট নয়।
আল্লামা যামাখশারী রহিমাহুল্লাহ আরবি না জেনে তাফসিরে প্রবেশকারীদের সম্পর্কে সতর্ক করে বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে না তাঁর নাযিলকৃত কিতাবের ব্যাপারে, আর আরবিয়তে দক্ষ না হয়েও তার তা’ওয়িলে হাত দেয়, সে যেন অন্ধ উষ্ট্রীর পিঠে আরোহণ করেছে এবং অন্ধের মতো হাতড়ে বেড়াচ্ছে। সে যা বলে, তা মনগড়া, মিথ্যা, বাজে কথা—আর আল্লাহর কালাম তা থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র।
তিনি আরও বলেছেন, মুফাসসিরের জন্য ইরাব-শাস্ত্রে অশ্বারোহী বীরের মতো পারদর্শী হওয়া অপরিহার্য।
আল্লামা জাওহারী রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, তাফসীরের শর্ত পূর্ণ হয় তখনই, যখন মুফাসসির ইরাবের উপকরণে পূর্ণ সজ্জিত থাকবে, যাতে বাক্যের ভিন্ন ভিন্ন রূপ তার কাছে গুলিয়ে না যায়।
ইমাম সুয়ূতী রাহিমাহুল্লাহ ইজমা نقل করেছেন যে, আরবী ভাষায় পূর্ণ জ্ঞান না থাকা পর্যন্ত কারও জন্য তাফসিরে কথা বলা জায়েয নয়। এ কারণেই আহলুল ইলম মুফাসসিরের শর্তগুলোর মধ্যে রেখেছেন, তিনি যেন আরবদের ভাষায় পারদর্শী হন।
ইবনু আব্দিস সালাম আত-তূনুসী ফতোয়া দিয়েছেন যে, যে ব্যক্তির আরবি ভাষায় কোনো উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ নেই, তাকে তাফসির পড়া থেকেও বিরত রাখা উচিত।
হিশাম ইবন আবদিল মালিক তাঁর সন্তানদের বলেছিলেন, তোমরা কুরআন ও নাহু শিখো। কারণ নাহু ছাড়া কুরআন হলো মাথাবিহীন দেহের মতো।
উল্লেখ্য যে,
- ইমামের মুখস্থ যতই শক্তিশালী হোক না কেন, তার ভুলে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়। আর সে যা ভুলে গেছে, তা নাহুর জ্ঞান ছাড়া সঠিকভাবে পড়া তার পক্ষে সম্ভব নয়। আল্লাহর কসম, কতবার আমি এমন লোকদের পেছনে নামাজ পড়েছি, যাদের মুখস্থ ভালো ছিল; কিন্তু নাহু না জানার কারণে তারা এমন কঠিন ভুল ও লাহনে পড়ত, যা অর্থ পুরো বদলে দিত। বরং কখনও এমন ভুলও করেছে, যা ঈমানকে কুফরে এবং কুফরকে ঈমানে পরিণত করে দেয়—অথচ সে নিজেই তা বুঝতে পারে না। আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কোনো শক্তি ও সামর্থ্য নেই।
- শাইখ ইবন উসাইমীন রহিমাহুল্লাহ আশ-শারহুল মুমতি (৪/২৪৯)-এ মাকরূহ হওয়ার পক্ষে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এই হাদীস দ্বারা দলিল দিয়েছেন,
"يؤم القوم أقرؤهم لكتاب الله"
অর্থ: মানুষের ইমামতি করবে তাদের মধ্যে যে আল্লাহর কিতাব সবচেয়ে ভালো পড়ে। তিনি এর দ্বারা দলীলের দিক ব্যাখ্যা করে বলেন: এটি সংবাদরূপে এলেও এর অর্থ আদেশ। কাজেই যদি এমন কাউকে ইমাম বানানো হয়, যে তাদের মধ্যে সবচেয়ে উত্তম কিরাআতকারী নয়, তবে তারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদেশের বিরোধিতা করল।
২৬ এপ্রিল, ২০২৬। রোববার।
আল ইলম ইন্সটিটিউট রাজশাহী।
নববী হেদায়েতে আধুনিক শিক্ষণ-পদ্ধতির শিকড়
- আব্দুল হাকীম মাদানী
আধুনিক যুগে শিক্ষাবিদ, ভাষাবিদ, মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীরা যে ইতিবাচক শিক্ষণ-পদ্ধতির কথা বলেন, তার অনেকগুলোই উজ্জ্বলভাবে প্রতিফলিত হয়েছে মহানবী ﷺ-এর শিক্ষণ-পদ্ধতিতে। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের ভুল সংশোধনের ক্ষেত্রে এমন ইতিবাচক পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়েছে, যা লক্ষ্য অর্জন করে, কিন্তু শিক্ষার্থীর উপর কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলে না।
শিক্ষাবিদ রুশদি তুআইমা উল্লেখ করেন, শিক্ষকের উচিত শিক্ষার্থীর ভাষাগত ভুল সম্পর্কে নিজের দৃষ্টিভঙ্গি সংশোধন করা। বিশেষ করে প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার্থীর ভুল কোনোভাবেই তাকে ধমকানো, উপহাস করা, বা তার যোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ করার কারণ হতে পারে না। বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভুলই শিক্ষার্থীর জন্য একটি ইতিবাচক উপাদান, যার মাধ্যমে সে সমস্যার উৎস খুঁজে পেতে পারে। এই সমস্যা কখনো ভুল শিক্ষণ-পদ্ধতি থেকে, কখনো শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত সমস্যার কারণে, আবার কখনো পাঠ্যবস্তুর জটিলতা থেকেও হতে পারে। তাই শিক্ষকের দায়িত্ব হলো শিক্ষার্থীর ভুলকে সহনশীলতা ও নিরপেক্ষতার সাথে গ্রহণ করা, যাতে সমস্যাটি নির্ণয় ও সমাধান করা যায়।
বাস্তবতা হলো ভুল মানেই ব্যর্থতা নয়। বরং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, ভুল থেকে শেখা জ্ঞান অনেক বেশি স্থায়ী ও প্রভাবশালী হয়। একজন শিক্ষার্থী হয়তো ক্লাসে শেখানো বিষয় কয়েক সপ্তাহ পর ভুলে যেতে পারে, কিন্তু নিজের করা ভুল এবং তার সংশোধন সে দীর্ঘদিন মনে রাখে।
শিক্ষাবিদ এরিক জেনসনও বলেছেন, প্রকৃতপক্ষে ব্যর্থতা বলে কিছু নেই; বরং ভুল হলো মূল্যবান প্রতিক্রিয়া এবং উন্নতির সুযোগ। এগুলোকে ইতিবাচকভাবে কাজে লাগিয়ে শেখা সম্ভব।
কিন্তু অনেক শিক্ষক শিক্ষার্থীদের ভুলের ওপর অতিরিক্ত গুরুত্ব দিতে গিয়ে মূল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়েন। ভাষা শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হলো সাবলীল যোগাযোগ দক্ষতা অর্জন। তাই শুধুমাত্র ভুল ধরার দিকে মনোযোগ দিলে শিক্ষার্থী সঠিক গঠন শেখার সুযোগ হারায়। ডগলাস ব্রাউন এ বিষয়ে সতর্ক করে বলেছেন, শিক্ষক যেন কেবল ভুলের পর্যবেক্ষক না হয়ে যান।
মাহমুদ নাহলা উল্লেখ করেন, যোগাযোগভিত্তিক শিক্ষণ-পদ্ধতিতে শিক্ষকের ভূমিকা হলো শিক্ষার্থীদের মধ্যে যোগাযোগের পরিবেশ তৈরি করা, তাদের উৎসাহ দেওয়া, আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলা এবং আনন্দময় পরিবেশ সৃষ্টি করা। কথা বলার সময় ভুল ধরার পরিবর্তে তা পরে সংশোধন করা উচিত। কারণ ভুল শেখার অবিচ্ছেদ্য অংশ, এটি কোনো দুর্বলতা নয়।
নবী ﷺ-এর শিক্ষণ-পদ্ধতিতে ভুল সংশোধনের দৃষ্টান্ত-
উপরোক্ত সব নীতিই নবী ﷺ-এর শিক্ষণ-পদ্ধতিতে বিদ্যমান ছিল। যেমন আমরা কিছু উল্লেখ করছি-
১. ব্যক্তিকে লক্ষ্য না করে সাধারণভাবে সংশোধন: আয়িশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেন,
كان النبي صلى الله عليه وسلم إذا بلغه عن الرجل الشيء لم يقل: ما بال فلان يقول؟ ولكن يقول: ما بال أقوام يقولون كذا وكذا؟
অর্থাৎ, নবী ﷺ কারো ভুল শুনলে তার নাম উল্লেখ করতেন না; বরং বলতেন: লোকদের কী হলো, তারা এমন কথা বলে কেন? এভাবে তিনি ব্যক্তিকে বিব্রত না করে শিক্ষা দিতেন।
২. কোমলতা ও সহানুভূতির মাধ্যমে সংশোধন: মুআবিয়া ইবনুল হাকাম (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর হাদীসে এসেছে, তিনি সালাতে কথা বলে ফেললে, নবী ﷺ তাকে ধমক দেননি, মারেননি, গালি দেননি; বরং অত্যন্ত কোমলভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন,
إن هذه الصلاة لا يصلح فيها شيء من كلام الناس، إنما هو التسبيح والتكبير وقراءة القرآن
অর্থাৎ, এই সালাতে মানুষের কোনো কথা বলা যায় না; বরং এটি তাসবীহ, তাকবীর ও কুরআন তিলাওয়াতের জন্য। এখানে দেখা যায়, নবী ﷺ শিক্ষার্থীর মানসিক অবস্থাকে বিবেচনায় রেখে তাকে সংশোধন করেছেন।
৩. সহানুভূতি ও বাস্তব সহায়তার মাধ্যমে শিক্ষা: এক ব্যক্তি সিয়াম অবস্থায় স্ত্রীর সাথে সহবাস করে ফেললে নবী ﷺ তাকে তিরস্কার না করে ধাপে ধাপে সমাধান দিয়েছেন এবং শেষে সহানুভূতির সাথে তাকে সাহায্য করেছেন।
৪. প্রশ্ন-উত্তরের মাধ্যমে ভুল উপলব্ধি করানো: এক যুবক যখন নবী ﷺ-এর কাছে ব্যভিচারের অনুমতি চাইল, তখন তিনি সরাসরি 'এটা হারাম' বলেননি। বরং প্রশ্নের মাধ্যমে তাকে নিজেই উপলব্ধি করিয়েছেন,
أتحبه لأمك؟ … ولا الناس يحبونه لأمهاتهم…
অর্থাৎ, তুমি কি এটা তোমার মায়ের জন্য পছন্দ করো?যুবক বলল: না। তিনি বললেন: মানুষও তাদের মায়ের জন্য এটা পছন্দ করে না। এভাবে তিনি যুবককে যুক্তি ও আবেগ, দুই দিক থেকেই বোঝালেন, ফলে যুবক নিজেই ভুল বুঝতে পারল।
শিক্ষণীয় বিষয়সমূহ-
এই নববী পদ্ধতি থেকে আমরা কিছু গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাই। যেমন:
- ভুল শিক্ষার স্বাভাবিক অংশ, এটি ব্যর্থতা নয়।
- শিক্ষার্থীর মর্যাদা রক্ষা করে সংশোধন করতে হবে।
- সরাসরি তিরস্কারের পরিবর্তে ইঙ্গিত, প্রশ্ন ও সংলাপ ব্যবহার করা উত্তম।
- শিক্ষার্থীর মানসিক অবস্থা ও বয়স বিবেচনায় রাখা জরুরি।
- আবেগীয় সমর্থন (emotional support) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
- শিক্ষক নির্দেশক, শিক্ষার্থী শেখার কেন্দ্রবিন্দু।
পরিশেষে-নবী ﷺ-এর শিক্ষণ-পদ্ধতি কেবল আধ্যাত্মিক দিক থেকেই নয়, বরং শিক্ষাবিজ্ঞান ও মনোবিজ্ঞানের দিক থেকেও সর্বোত্তম আদর্শ। আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা আজ যে নীতিগুলো আবিষ্কার করেছে, তার অনেকগুলোই শতাব্দী পূর্বে নববী শিক্ষায় বিদ্যমান ছিল। অতএব, শিক্ষকদের জন্য উচিত এই নববী পদ্ধতি অনুসরণ করা, যাতে শিক্ষা হয় কার্যকর, মানবিক ও স্থায়ী প্রভাববাহী। মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে বুঝার তৌফীক্ব দান করুন। আমীন!
১৬ এপ্রিল, ২০২৬
আল-ইলম ইন্সটিটিউট রাজশাহী-৬২০৩।
বইপড়ার প্রতি অদম্য অনুরাগ-
জ্ঞানপিপাসু মানুষের ইতিহাসে এমন কিছু উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রয়েছে, যা আমাদেরকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। তারা শুধু বই পড়তেন না; বরং বই ছিল তাদের জীবন, তাদের নিঃশ্বাস, তাদের প্রশান্তি। প্রখ্যাত আলেম আবুল আব্বাস আল-মুবাররিদ বলেন:
ما رأيت أحرص على العلم من ثلاثة: الجاحظ، والفتح بن خاقان، وإسماعيل بن إسحاق القاضي
- আমি জ্ঞানার্জনে তিনজনের মতো আগ্রহী কাউকে দেখিনি। জাহিয, ফাতহ ইবন খাকান এবং ইসমাঈল ইবন ইসহাক আল-ক্বাযী। এরপর তিনি তাদের অবস্থা বর্ণনা করেন। জাহিয সম্পর্কে বলেন:
كان إذا وقع في يده كتاب قرأه من أوله إلى آخره
- তার হাতে কোনো বই পড়লে, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পড়ে ফেলতেন। আর ফাতহ ইবন খাকান তিনি এমন পর্যায়ের পাঠক ছিলেন যে,
كان يحمل الكتاب في خفه... فينظر فيه وهو يمشي
- তিনি পরিহিত মোজা মধ্যে বই রাখতেন, আর হাঁটতে হাঁটতে তাতে দৃষ্টি বুলাতেন। আর ইসমাঈল ইবন ইসহাক,
ما دخلت عليه قط إلا وفي يده كتاب
- আমি কখনো তার কাছে যাইনি, অথচ তার হাতে বই ছিল না, এমন হয়নি।
এমনই আরেক বিস্ময়কর ব্যক্তিত্ব আবুল ওয়াফা ইবন আকীল (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:
إني لا يحل لي أن أضيع ساعة من عمري
- আমার জন্য বৈধ নয়, আমি আমার জীবনের একটি মুহূর্তও নষ্ট করি। তিনি আরও বলেন, যখন তিনি পড়তে বা আলোচনা করতে পারতেন না, তখনও তিনি চিন্তা চালিয়ে যেতেন, যতক্ষণ না নতুন কোনো জ্ঞান লিখে রাখার মতো বিষয় মনে আসে।
প্রখ্যাত আলেম ইমাম ইবনুল জাওযী (রাহিমাহুল্লাহ ) বলেন:
ما أشبع من مطالعة الكتب
-আমি কখনো বই পড়া থেকে তৃপ্ত হই না। তিনি আরও বলেন:
إذا رأيت كتاباً لم أره فكأني وقعت على كنز
- যখন কোনো নতুন বই দেখি, মনে হয় যেন গুপ্তধন পেয়েছি।
ইমাম ইবনুল কয়্যিম (রাহিমাহুল্লাহ) এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করেন, যিনি অসুস্থ অবস্থাতেও বই পড়া ছাড়েননি। ডাক্তার যখন তাকে নিষেধ করলেন, তিনি বললেন:
أليست النفس إذا فرحت قويت الطبيعة؟
- মন যখন আনন্দিত হয়, তখন কি শরীর শক্তিশালী হয় না? তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন, জ্ঞান তার হৃদয়ে আনন্দ দেয়, আর সে আনন্দই তাকে শক্তি দেয়।
আন্দালুসের প্রখ্যাত আলেম ইবনু রুশদ -এর নাতি সম্পর্কে বলা হয়:
لم يدع النظر والقراءة منذ عقل إلا ليلة وفاة أبيه وليلة عرسه
- তিনি জ্ঞান হওয়ার পর থেকে পড়াশোনা ছাড়েননি, শুধু দুই রাতে; পিতার মৃত্যুর রাত ও নিজের বিয়ের রাত। আরেকজন বলেন:
غبرت أربعين عاماً ما قلت ولا بت ولا اتكأت إلا والكتاب على صدري
- চল্লিশ বছর কাটিয়েছি, কখনো বসিনি, শুইনি বা বিশ্রাম নিইনি, অথচ বুকের উপর বই ছিল না এমন হয়নি।
একজন জ্ঞানপিপাসু পিতার অবস্থা তার সন্তান এভাবে বর্ণনা করেন, তিনি ৬৭ বছর বেঁচেছিলেন, কিন্তু একদিনও বই পড়া ছাড়া কাটাননি। এমনকি ঈদের দিনেও না। যখন তাকে বিশ্রাম নিতে বলা হলো, তিনি বললেন:
والله لا أحسب راحة تبلغ مبلغها
- আল্লাহর কসম! এর মতো প্রশান্তি আর কিছুতে নেই।
একজন পিতা গরম দুপুরে প্রদীপ জ্বালিয়ে বই লিখছিলেন। ছেলে বলল এটা তো বিশ্রামের সময়!
তিনি উত্তরে বললেন:
أنا مع رسول الله وأصحابه والتابعين
- আমি এখন রাসূল ﷺ, সাহাবী ও তাবেঈনদের সাথেই আছি!
শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) সম্পর্কে বলা হয়েছে:
لا تكاد نفسه تشبع من العلم
- তার আত্মা কখনো জ্ঞান থেকে তৃপ্ত হতো না।
শাইখ আলী তানতভী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:
ربما مر علي يوم أقرأ فيه ثلاثمئة صفحة
- অনেক দিন গেছে, আমি দিনে ৩০০ পৃষ্ঠা পড়েছি।
আর মাহমুদ শাকের (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, তিনি কুরআন, হাদীস, ফিকহ, ভাষা, ইতিহাস, এমনকি চিকিৎসা ও জ্যোতির্বিজ্ঞান পর্যন্ত পড়েছেন। তার উদ্দেশ্য ছিল:
لألاحظ وأتبين وأزيح الثرى عن الخبيء
-আমি পর্যবেক্ষণ করি, বুঝি এবং লুকানো সত্যকে প্রকাশ করি।
উপরোল্লিখিত এই সব ঘটনা আমাদের শেখায় যে, জ্ঞান অর্জন কোনো সাধারণ কাজ নয়; এটি একটি ভালোবাসা, একটি নেশা, একটি ইবাদত। যারা জ্ঞানকে ভালোবেসেছেন, তারা সময়কে নষ্ট করেননি; বরং সময়কে অর্থবহ করেছেন। তাই, আপনি যদি সত্যিকার অর্থে উন্নতি করতে চান, তবে বইকে সঙ্গী বানান।
কারণ, বই শুধু জ্ঞান দেয় না, মানুষকে গড়ে তোলে, চিন্তাকে শাণিত করে, আর আত্মাকে আলোকিত করে। মহান আল্লাহ আমাদের সকলের সহায় হৌন। আমীন!
- আব্দুল হাকীম মাদানী
১২ এপ্রিল, ২০২৬, রোববার
আল-ইলম ইন্সটিটিউট রাজশাহী।
ইসলাম-ই সর্বপ্রথম এবং ইসলাম-ই সর্বশেষ
জাহিলিয়াত যুগে আরব সমাজের মূল ভিত্তি ছিল গোত্রীয় আসাবিয়্যাহ বা বংশীয় অহংকার। তারা এই আসাবিয়্যাহকেই তাদের আনুগত্য, পরিচয়, সম্মান ও মর্যাদার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গ্রহণ করেছিল। অধিকার ও দায়িত্ব নির্ধারণ করা হতো গোত্রের ভিত্তিতে; যুদ্ধ ঘোষণা হতো গোত্রের জন্য, শান্তি প্রতিষ্ঠিত হতো গোত্রের স্বার্থে। সে সময়কার রাজনৈতিক কাঠামোগুলোও গড়ে উঠেছিল এই সংকীর্ণ চিন্তার ওপর; কখনো জাতিগত, কখনো ধর্মীয়, আবার কখনো উভয়ের মিশ্রণে।
এই অন্ধকার বাস্তবতার মধ্যে রাসূলুল্লাহ ﷺ ইসলাম নিয়ে আগমন করেন। তিনি মানুষের পরিচয়ের ভিত্তি আমূল পরিবর্তন করে দেন। গোত্র, বংশ, ভাষা বা ভূখণ্ডের পরিবর্তে তিনি আকীদাকে, অর্থাৎ আল্লাহর প্রতি ঈমানকে মানব পরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দু বানান। তিনি শুধু আরবদেরই নয়, বরং আরব ও অনারব সকল জাতিকে একই পতাকার নিচে একত্রিত করেন। তিনি জাহিলিয়াতের বিভাজনকে ভেঙে দেন এবং একটি নতুন মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে মানুষকে মূল্যায়ন করা হয় তাকওয়ার ভিত্তিতে।
ইসলাম জীবন ও সমাজব্যবস্থায় একটি মৌলিক বিপ্লব ঘটায়। এটি মানুষের চিন্তা, মূল্যবোধ, সম্পর্ক, শাসনব্যবস্থা সবকিছুকে পুনর্গঠন করে। আনুগত্যের কেন্দ্র হয়ে ওঠে একমাত্র মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ﷺ। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র সবকিছুই ইসলামের অধীন হয়ে যায়। যুদ্ধ ও শান্তির ধারণাও ইসলামী শরীয়তের আলোকে নির্ধারিত হয়, যেখানে জিহাদ হলো মানুষের কাছে সত্য পৌঁছানোর একটি মাধ্যম, নিছক দখল বা আধিপত্য বিস্তারের উপায় নয়।
কিন্তু ইতিহাসের এক পর্যায়ে মুসলিমদের মাঝে চিন্তাগত ও রাজনৈতিক দুর্বলতা দেখা দেয়। বিশেষ করে হিজরী ত্রয়োদশ শতাব্দী (উনবিংশ শতাব্দী) থেকে ইউরোপীয় জাগরণ ও শক্তির প্রভাবে মুসলিম বিশ্বে এক ধরনের আত্মবিশ্বাসহীনতা তৈরি হয়। এই সুযোগে পশ্চিমা উপনিবেশবাদ মুসলিম সমাজে প্রবেশ করে শুধু সামরিক শক্তি দিয়ে নয়, বরং চিন্তা, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও রাজনীতির মাধ্যমে।
তারা মুসলিমদের ঐক্যের মূল ভিত্তি ইসলামী আকীদাকে আঘাত করে। সিরিয়ার খ্রিস্টান বুদ্ধিজীবীদের মাধ্যমে তারা জাতীয়তাবাদ ও কৌমীয়তার ধারণা ছড়িয়ে দেয়। নাসিফ ইয়াজিজি, বুতরাস আল-বুস্তানি প্রমুখ ব্যক্তি 'জাতীয় পরিচয়' ও 'রাষ্ট্রীয় জাতীয়তা'-র ধারণা প্রচার করে, যা ইসলামের উম্মাহ-ভিত্তিক ঐক্যের সম্পূর্ণ বিপরীত।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর উসমানী খেলাফতের পতন ঘটে। এটি ছিল মুসলিম ঐক্যের শেষ শক্তিশালী প্রতীক। খেলাফত ভেঙে যাওয়ার পর ব্রিটেন ও ফ্রান্স মুসলিম বিশ্বের মানচিত্রকে টুকরো টুকরো করে ফেলে। তারা নতুন নতুন রাষ্ট্র তৈরি করে এবং প্রতিটি রাষ্ট্রে জাতীয়তাবাদী চিন্তা প্রতিষ্ঠা করতে শুরু করে।
এই প্রক্রিয়ায় তারা শিক্ষা ব্যবস্থা, গণমাধ্যম, সংস্কৃতি এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করে। মুসলিমদের শেখানো হয় তোমার পরিচয় ইসলাম নয়, বরং তোমার দেশ, ভাষা, জাতি। ফলে ধীরে ধীরে মুসলিমদের মধ্যে উম্মাহর চেতনা দুর্বল হয়ে যায়, আর জাতীয়তাবাদ শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
এমনকি দুঃখজনকভাবে কিছু আলেম ও ইসলামী আন্দোলনও এই প্রভাব থেকে মুক্ত থাকতে পারেনি। তারা জাতীয়তাবাদকে ইসলামের অংশ হিসেবে উপস্থাপন করতে শুরু করে। حب الوطن من الإيمان (অর্থাৎ, দেশপ্রেম ঈমানের অংশ) এই ভিত্তিহীন কথাটি হাদীস হিসেবে প্রচারিত হতে থাকে, যদিও মুহাদ্দিসগণ একে জাল বলে ঘোষণা করেছেন।
এইভাবে পশ্চিমা চিন্তা মুসলিমদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করে। মুসলিমরা নিজেদের সম্পর্ক নির্ধারণ করে জাতীয়তার ভিত্তিতে, কুরআন-সুন্নাহ ব্যাখ্যা করে পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গিতে, এবং শরীয়তের বিধানকেও জাতীয় স্বার্থের সাথে মিলিয়ে বুঝতে চেষ্টা করে। ফলাফল হলো মুসলিমরা মুসলিমদের শত্রু ভাবতে শুরু করে, আর কাফিরদের বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করে।
বর্তমান সময়ে وطني أولاً (আমার দেশ আগে) এই স্লোগান নতুনভাবে উত্থাপিত হয়েছে। এটি দেখতে আকর্ষণীয় হলেও বাস্তবে এটি একটি বিপজ্জনক রাজনৈতিক ধারণা। এটি মুসলিমদেরকে তাদের উম্মাহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয় এবং তাদেরকে একটি ছোট গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ করে।
এই স্লোগান বিভিন্ন দেশে বিভিন্নভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। তুরস্কে খেলাফত বিলুপ্ত করার জন্য, মিশরে ইসরাইলের সাথে আপস করার জন্য, ফিলিস্তিনে ভূমি ছেড়ে দেওয়ার জন্য, পাকিস্তানে মুসলিমদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতার জন্য এভাবে প্রত্যেক ক্ষেত্রে দেশ আগে স্লোগান ব্যবহার করা হয়েছে ইসলামের স্বার্থের বিরুদ্ধে।
ইসলাম এই ধারণাকে স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করে। ইসলাম নির্দেশ দেয় মহান আল্লাহ, তাঁর রাসূল ﷺ এবং জিহাদের প্রতি ভালোবাসা সবকিছুর ঊর্ধ্বে রাখতে হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
قُلْ إِنْ كَانَ آبَاؤُكُمْ... أَحَبَّ إِلَيْكُمْ مِنَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ... فَتَرَبَّصُوا
-অর্থাৎ, যদি তোমাদের কাছে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের চেয়ে দুনিয়াবী সম্পর্ক বেশি প্রিয় হয়, তবে তোমরা অপেক্ষা করো (শাস্তির জন্য)।
নবী ﷺ বলেছেন, من دعا إلى عصبية فليس منا অর্থাৎ, যে ব্যক্তি গোত্রীয়তা বা পক্ষপাতিত্বের দিকে আহ্বান করে, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।
ইসলাম মুসলিমদের সম্পর্ককে এক দেহের সাথে তুলনা করেছে, مثل المؤمنين في توادهم... অর্থাৎ, তারা পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা, দয়া ও সহমর্মিতায় একটি দেহের মতো।
ইসলাম উম্মাহর ধারণাকে আকীদার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠা করেছে। মুসলিমরা একে অপরের সাহায্যকারী, একে অপরের বন্ধু, একে অপরের শক্তি। আল্লাহ বলেন, وَالْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنَاتُ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ - অর্থাৎ, ইসলাম মুসলিমদের একত্রিত থাকার নির্দেশ দেয় এবং বিভক্তিকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করে। এমনকি একাধিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠাকেও নিরুৎসাহিত করেছে।
তাছাড়া ইসলাম জিহাদকে ফরজ করেছে, যাতে ইসলামের দাওয়াত সারা পৃথিবীতে পৌঁছে যায়। তাই সংকীর্ণ জাতীয় সীমানা ইসলামের সার্বজনীন দৃষ্টিভঙ্গির সাথে সাংঘর্ষিক।
সবশেষে বলা যায়, وطني أولاً তথা দেশ সবার আগে ধারণা মুসলিমদের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এটি তাদের ঐক্য নষ্ট করে, আকীদা দুর্বল করে এবং ইসলামের শাসন থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।
অতএব, প্রত্যেক মুসলিমের দায়িত্ব হলো নিজেকে ইসলামের প্রকৃত চেতনায় গড়ে তোলা, উম্মাহর ঐক্যের জন্য কাজ করা, এবং এই ভ্রান্ত জাতীয়তাবাদী ধারণাকে প্রতিহত করা।
কারণ আমাদের স্লোগান হওয়া উচিত الإسلام أولاً وأخيراً অর্থাৎ, ইসলামই প্রথম, ইসলামই শেষ।
মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে সঠিক বুঝা ও মানার তৌফীক্ব দান করুন। আমাদের সকলের সহায় হৌন। আমীন! বারাকাল্লাহু ফিকুম।
বিনীত-
১ লা এপ্রিল, বুধবার
আব্দুল হাকীম মাদানী
আল-ইলম ইন্সটিটিউট রাজশাহী।
Click here to claim your Sponsored Listing.
Location
Category
Contact the school
Telephone
Address
Nawdapara (Aam-Chattar), Sapura
Rajshahi
6203