26/04/2026
ইলমুন নাহু, তাফসীর এবং কুরআন তিলাওয়াত-
কুরআন পাঠে নাহুর গুরুত্ব হলো নাহুর নিয়ম শেখার মাধ্যমে আপনি কুরআনকে সঠিকভাবে, ভুল উচ্চারণ ও লাহনমুক্তভাবে পড়তে সক্ষম হন। এ প্রসঙ্গে সালিম ইবনু কুতাইবা রহিমাহুল্লাহর একটি বাণী উল্লেখ করছি, যা প্রমাণ করে, যে ব্যক্তি আল্লাহর কিতাবকে আল্লাহ যেভাবে নাযিল করেছেন, সেভাবে ভুলত্রুটিমুক্তভাবে পড়ে, তার মর্যাদা কত উচ্চ। তিনি বলেন-
আমি ইবনু হুবাইরাহ আল-আকবারের কাছে ছিলাম। কথোপকথনের একপর্যায়ে আরবী ভাষার আলোচনা উঠল। তখন তিনি বললেন, আল্লাহর শপথ, দুই ব্যক্তির দ্বীন এক, বংশমর্যাদা এক, মুরুয়ত এক; কিন্তু একজন লাহন করে, আরেকজন লাহন করে না, এরা কখনও সমান নয়। দুনিয়া ও আখিরাত উভয় ক্ষেত্রেই যে লাহন করে না, সেই অধিক মর্যাদাসম্পন্ন।
আমি বললাম, আল্লাহ আমীরকে কল্যাণ দান করুন, দুনিয়ার ক্ষেত্রে তো তার ফাসাহাত ও আরবিয়তের কারণে সে উত্তম এটি বুঝলাম। কিন্তু আখিরাতে কেন সে শ্রেষ্ঠ হবে?
তিনি বললেন, কারণ সে আল্লাহর কিতাবকে আল্লাহ যেভাবে নাযিল করেছেন, সেভাবেই পড়ে। আর যে ব্যক্তি লাহন করে, তার লাহন তাকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যায় যে, সে আল্লাহর কিতাবে এমন কিছু ঢুকিয়ে দেয় যা তাতে নেই, এবং এমন কিছু বের করে দেয় যা তাতে আছে। আমি বললাম, আমীর সত্য বলেছেন, এবং খুবই সুন্দর বলেছেন।
আর কুরআন শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে নাহু-বিদ্যার গুরুত্ব এ বিষয়েও ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত ঘটনার দ্বারা জানা যায় যে, আরবী ভাষায় অজ্ঞ ব্যক্তি যেন কুরআন শিক্ষা না দেয়। বরং কুরআন শিক্ষাদানকারীর নাহুর নিয়ম সম্পর্কে জ্ঞান থাকা অপরিহার্য। সেই বর্ণনায় এসেছে:
আমীরুল মুমিনীন উমর ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহুর খিলাফতকালে এক বেদুইন এল। সে বলল, কে আমাকে আল্লাহ তাআলা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর যা নাযিল করেছেন, তার কিছু শিক্ষা দেবে? তখন এক ব্যক্তি তাকে সূরা বারাআত (তাওবা) পড়িয়ে দিল এভাবে,
أن الله برئ من المشركين ورسوله
এখানে "رسوله" শব্দটি যের দিয়ে (রসূলিহি) পড়ল। তখন বেদুইন বলল, আল্লাহ কি তাঁর রাসূল থেকেও সম্পর্কচ্ছেদ করেছেন? যদি আল্লাহ তাঁর রাসূল থেকে সম্পর্কচ্ছেদ করে থাকেন, তবে আমিও তাঁর থেকে সম্পর্কচ্ছেদ করলাম।
এ কথা ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে পৌঁছল। তিনি তাকে ডাকলেন এবং বললেন, হে বেদুইন, তুমি কি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে সম্পর্কচ্ছেদ করছ?
সে বলল, হে আমীরুল মুমিনীন, আমি মদীনায় এসেছি, অথচ কুরআন সম্পর্কে আমার কোনো জ্ঞান নেই। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কে আমাকে পড়াবে? তখন এই ব্যক্তি আমাকে সূরা বারাআত পড়িয়ে দিল এভাবে,
أن الله برئ من المشركين ورسوله
তখন আমি বললাম, আল্লাহ কি তাঁর রাসূল থেকেও সম্পর্কচ্ছেদ করেছেন? যদি আল্লাহ তাঁর রাসূল থেকে সম্পর্কচ্ছেদ করে থাকেন, তবে আমিও তাঁর থেকে সম্পর্কচ্ছেদ করলাম।
তখন ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, হে বেদুইন, এভাবে নয়। সে বলল, তাহলে কীভাবে, হে আমীরুল মুমিনীন? তিনি বললেন, (পেশ দিয়ে- রসূলুহু)
أن الله برئ من المشركين ورسولُه
তখন বেদুইন বলল, আমিও আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যাদের থেকে সম্পর্কচ্ছেদ করেছেন, তাদের থেকে সম্পর্কচ্ছেদ করছি।
এরপর ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু নির্দেশ দিলেন, আরবী ভাষায় পারদর্শী নয় এমন কেউ যেন কুরআন শিক্ষা না দেয়। আর তিনি আবুল আসওয়াদ আদ-দুয়ালিকে নাহুর ভিত্তি প্রণয়নের নির্দেশ দিলেন।
মানুষকে নিয়ে সালাত পড়ান যে ইমাম, তার জন্যও নাহু-বিদ্যার গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। কারণ এর মাধ্যমে কুরআন পাঠে তার জিহ্বা সঠিক থাকে এবং মানুষকে ইমামতি করার সময় লাহনে পড়ে যাওয়া থেকে সে বেঁচে যায়।
আমাদের সালাফে সালিহীনের কাছ থেকে একাধিক বর্ণনা এসেছে, যা প্রমাণ করে, যে ইমাম কুরআন তিলাওয়াতে লাহন করে, তার ইমামতি পছন্দনীয় নয়। যেমন, ওমর ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহু লাহনকারীর পেছনে সালাত পড়াকে সঠিক মনে করতেন না।
আর হাসান আল-বাসরীর কাছে বলা হলো, আমাদের একজন ইমাম আছেন, যিনি লাহন করেন। তিনি বললেন, তাকে তোমাদের কাছ থেকে সরিয়ে দাও; কারণ ই'রাব হচ্ছে কথার অলংকার।
আর সালাতে কুরআন পাঠে লাহনের হুকুম সম্পর্কে চার মাযহাবের মধ্যে এ বিষয়ে কোনো মতভেদ নেই যে, যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে এমন লাহন করে, যা অর্থ বদলে দেয়, তার নিজের সালাত ও তার ইমামতি কোনোটাই সহীহ নয়।
আর যদি সে ইচ্ছাকৃত না হয়ে অর্থ বিকৃত করে ফেলে, তাহলে যদি তা সূরা ফাতিহার মধ্যে হয়, তার ইমামতি সহিহ হবে না। আর যদি ফাতিহা ছাড়া অন্য কোথাও হয়, তাহলে সালাত সহীহ হবে, তবে তা মাকরুহ হবে। এটি ইমাম শাফেঈ ও ইমাম আহমাদের মাযহাব। আর মালিকি মাযহাবে ফাতিহার মধ্যে হোক বা অন্যত্র লাহনকারী ইমামের ইমামতি সহিহ নয়।
কুরআনের তাফসিরে নাহুর গুরুত্ব-
কুরআনের তাফসিরে নাহু-বিদ্যার গুরুত্ব সম্পর্কে আলেমদের বহু বক্তব্য বর্ণিত হয়েছে। বরং তারা স্পষ্টভাবে বলেছেন, মুফাসসিরের জন্য নাহুর নিয়মে গভীর পারদর্শিতা থাকা অপরিহার্য; প্রাচীন ও পরবর্তী নাহুবিদদের মতামত সম্পর্কে জ্ঞান থাকতে হবে; আরবদের কবিতার সঙ্গেও পরিচিত হতে হবে।
এ বিষয়ে সাহাবী, তাবেঈ ও আলেমদের কিছু বক্তব্য নিম্নরূপ-
আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন,
যখন কুরআনের কোনো বিষয় তোমাদের কাছে অস্পষ্ট মনে হয়, তখন তা কবিতায় খুঁজে দেখো; কারণ কবিতাই হচ্ছে আরবদের দিওয়ান।
হাসান আল-বাসরী বলেছেন, অনারবিয়ত তাদের ধ্বংস করেছে; তারা কুরআনের সঠিক তা’ওয়িল ছাড়া অন্য অর্থ করেছে।
ইমাম যুহরী রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, মানুষ কুরআনের তাফসিরে এত ভুল করেছে কেবল এ জন্য যে, তারা আরবদের ভাষা জানত না।
ফুযাইল ইবন ঈয়ায রহিমাহুল্লাহ কতই না সুন্দর বলেছেন, তোমরা কখনও কুরআন বুঝতে পারবে না, যতক্ষণ না তার ই‘রাব জানতে পারো।
মুজাহিদ রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাতের প্রতি ঈমান রাখে, তার জন্য আল্লাহর কিতাব সম্পর্কে কথা বলা হালাল নয়, যদি সে আরবদের ভাষাসমূহ সম্পর্কে জ্ঞানী না হয়।
ইমাম মালিক রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, যে ব্যক্তি আরবী ভাষায় অজ্ঞ, অথচ আল্লাহর কিতাবের তাফসির করে তাকে যদি আমার সামনে আনা হয়, তবে আমি তাকে শাস্তির দৃষ্টান্ত বানাব।
কিছু সালাফ বলেছেন, যাকে ভাষা ও আরবী জ্ঞান দেওয়া হয়েছে, তাকে কুরআনের চাবিগুলোর একটি চাবি দেওয়া হয়েছে; এর মাধ্যমে সে কুরআনের অর্থ বুঝতে পারে।
আরেকজন বলেছেন, যে ব্যক্তি নাহু থেকে মানুষকে ফিরিয়ে রাখে, সে যেন আল্লাহর কিতাব থেকেই তাদের ফিরিয়ে রাখে। কারণ নাহু নষ্ট হয়ে গেলে মুসলিমদের জীবনে কুরআনও নষ্ট হয়ে যায়, তার তিলাওয়াতের উচ্চারণ বিশৃঙ্খল হয়, আরবি ভাষার নিয়ম বিলুপ্ত হয়, আর কুরআনের অর্থও বন্ধ হয়ে যায়, কারণ তা বোঝার উপায়ই হারিয়ে যায়, তার গুপ্তভাণ্ডার আহরণ করাও আর সম্ভব থাকে না।
আরেকজন বলেছেন, যদি নাহু বিলুপ্ত হয়ে যায়, তবে কুরআন বোঝাও বিলুপ্ত হয়ে যাবে।
আবু বকর আল-আমবারী রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন,
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, তাঁর সাহাবী এবং তাবেঈদের পক্ষ থেকে কুরআনের ই'রাবের ফযিলত, তা শেখার প্রতি উৎসাহ, এবং লাহনের নিন্দা ও অপছন্দনীয়তা সম্পর্কে এত কিছু বর্ণিত হয়েছে যে, কুরআনের পাঠকদের ওপর এটি অপরিহার্য হয়ে যায় তারা যেন তা শেখার জন্য নিজেদের সর্বশক্তি নিয়োগ করে।
মুফাসসির ইবনু আতিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন,
কুরআনের ইরাব শরীয়তের একটি মৌলিক বিষয়। কারণ এর মাধ্যমেই কুরআনের সেই অর্থসমূহ সুপ্রতিষ্ঠিত হয়, যা-ই শরিয়ত। কুরআন আরবদের ভাষায় নাযিল হয়েছে। তাই ভাষাটিকে জানা অপরিহার্য। কারণ ইরাবই কুরআনের বিদ্যাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ।
আবুল বাকা আল-উকবারী রহিমাহুল্লাহ তাঁর إملاء ما منّ به الرحمن من وجوه الإعراب গ্রন্থের ভূমিকায় বলেছেন, কুরআনের অর্থ অনুধাবন এবং তার উদ্দেশ্য ও তাৎপর্য স্পষ্ট করার সবচেয়ে সোজা পথ হলো তার ই‘রাব জানা।
ইমাম যারকাশী রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, জেনে রাখুন, যে ব্যক্তি ভাষার প্রকৃত রূপ ও তার অর্থবোধ সম্পর্কে জ্ঞানী নয়, তার জন্য আল্লাহর কালামের কোনো অংশের তাফসির করা বৈধ নয়। আর তার জন্য এ ভাষার অল্প কিছু শেখাও যথেষ্ট নয়।
আল্লামা যামাখশারী রহিমাহুল্লাহ আরবি না জেনে তাফসিরে প্রবেশকারীদের সম্পর্কে সতর্ক করে বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে না তাঁর নাযিলকৃত কিতাবের ব্যাপারে, আর আরবিয়তে দক্ষ না হয়েও তার তা’ওয়িলে হাত দেয়, সে যেন অন্ধ উষ্ট্রীর পিঠে আরোহণ করেছে এবং অন্ধের মতো হাতড়ে বেড়াচ্ছে। সে যা বলে, তা মনগড়া, মিথ্যা, বাজে কথা—আর আল্লাহর কালাম তা থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র।
তিনি আরও বলেছেন, মুফাসসিরের জন্য ইরাব-শাস্ত্রে অশ্বারোহী বীরের মতো পারদর্শী হওয়া অপরিহার্য।
আল্লামা জাওহারী রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, তাফসীরের শর্ত পূর্ণ হয় তখনই, যখন মুফাসসির ইরাবের উপকরণে পূর্ণ সজ্জিত থাকবে, যাতে বাক্যের ভিন্ন ভিন্ন রূপ তার কাছে গুলিয়ে না যায়।
ইমাম সুয়ূতী রাহিমাহুল্লাহ ইজমা نقل করেছেন যে, আরবী ভাষায় পূর্ণ জ্ঞান না থাকা পর্যন্ত কারও জন্য তাফসিরে কথা বলা জায়েয নয়। এ কারণেই আহলুল ইলম মুফাসসিরের শর্তগুলোর মধ্যে রেখেছেন, তিনি যেন আরবদের ভাষায় পারদর্শী হন।
ইবনু আব্দিস সালাম আত-তূনুসী ফতোয়া দিয়েছেন যে, যে ব্যক্তির আরবি ভাষায় কোনো উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ নেই, তাকে তাফসির পড়া থেকেও বিরত রাখা উচিত।
হিশাম ইবন আবদিল মালিক তাঁর সন্তানদের বলেছিলেন, তোমরা কুরআন ও নাহু শিখো। কারণ নাহু ছাড়া কুরআন হলো মাথাবিহীন দেহের মতো।
উল্লেখ্য যে,
- ইমামের মুখস্থ যতই শক্তিশালী হোক না কেন, তার ভুলে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়। আর সে যা ভুলে গেছে, তা নাহুর জ্ঞান ছাড়া সঠিকভাবে পড়া তার পক্ষে সম্ভব নয়। আল্লাহর কসম, কতবার আমি এমন লোকদের পেছনে নামাজ পড়েছি, যাদের মুখস্থ ভালো ছিল; কিন্তু নাহু না জানার কারণে তারা এমন কঠিন ভুল ও লাহনে পড়ত, যা অর্থ পুরো বদলে দিত। বরং কখনও এমন ভুলও করেছে, যা ঈমানকে কুফরে এবং কুফরকে ঈমানে পরিণত করে দেয়—অথচ সে নিজেই তা বুঝতে পারে না। আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কোনো শক্তি ও সামর্থ্য নেই।
- শাইখ ইবন উসাইমীন রহিমাহুল্লাহ আশ-শারহুল মুমতি (৪/২৪৯)-এ মাকরূহ হওয়ার পক্ষে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এই হাদীস দ্বারা দলিল দিয়েছেন,
"يؤم القوم أقرؤهم لكتاب الله"
অর্থ: মানুষের ইমামতি করবে তাদের মধ্যে যে আল্লাহর কিতাব সবচেয়ে ভালো পড়ে। তিনি এর দ্বারা দলীলের দিক ব্যাখ্যা করে বলেন: এটি সংবাদরূপে এলেও এর অর্থ আদেশ। কাজেই যদি এমন কাউকে ইমাম বানানো হয়, যে তাদের মধ্যে সবচেয়ে উত্তম কিরাআতকারী নয়, তবে তারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদেশের বিরোধিতা করল।
২৬ এপ্রিল, ২০২৬। রোববার।
আল ইলম ইন্সটিটিউট রাজশাহী।