18/06/2021
আজকে আমরা জানব রসায়নের একজন বসকে নিয়ে। তাঁর নাম আবু আব্দুল্লাহ জাবির ইবনে হাইয়ান। ইউরোপীয় পন্ডিতগন তাঁর নাম বিকৃত করে জিবার (Geber) নামে লিপিবদ্ধ করেন। এক ওষুধ বিক্রেতা ও চিকিৎসকের ঘরে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তখন কেই বা জানত এই মানুষটা একদিন রসায়নের জগতের একচ্ছত্র অধিপতি হবে !!
মূলত ইউরোসেন্ট্রিক ইতিহাসবিদরা সব সময় চেয়েছে নন ইউরোপিয়ান (বিশেষ করে মুসলিম) বিজ্ঞানীদের দারুন দারুন সব ইতিহাস গুলো গোপন করে রাখতে। (মুসলিম মস্তিষ্ক, পৃষ্ঠা ২২)
🔖তো যাইহোক আসল কথায় আসি। যারা এখন নবম দশম শ্রেণিতে পড়ছো তোমাদের রসায়ন বইয়ের একদম প্রথম অধ্যায়েই দেখবে লেখা আছে, " আলকেমিস্ট জাবির ইবনে হাইয়ান সর্বপ্রথম গবেষণাগারে রসায়নের গবেষণা করেন। তাই তাঁকে কখনো কখনো রসায়নের জনক বলা হয়ে থাকে। জাবির ইবনে হাইয়ান বিশ্বাস করতেন সকল পদার্থ মাটি, পানি, আগুন আর বাতাস দিয়ে তৈরি। তাই তিনি গবেষণা করলেও রসায়নের প্রকৃত রহস্যগুলো তার কাছে পরিষ্কার ছিল না। তবে রসায়নের প্রকৃত রহস্য উদ্ভাবন করে রসায়ন চর্চা প্রথম শুরু করেন অ্যান্টনি ল্যাভয়সিয়ে, রবার্ট বয়েল, স্যার ফ্রান্সিস বেকন এবং জন ডাল্টনসহ অন্যান্য বিজ্ঞানী। অ্যান্টনি ল্যাভয়সিয়েকে আধুনিক রসায়নের জনক বলা হয়।" (পৃষ্ঠা ৪, রসায়ন, নবম-দশম শ্রেণি-২০২১)
অর্থাৎ জাবির ইবনে হাইয়ানের অসাধারণ কীর্তিগুলোকে তুলে ধরা তো হয়নি বরং কোনোমতে দায়সারা গোছে তাঁর নামটা উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু এমনটি হলে তো চলবে না। মুসলমান হিসেবে আমাদেরকে এসব জানতে হবে। তা না জানলে আমরা অনুপ্রেরণা পাবো কোথা থেকে ?
🔖সবার আগে আমাদের অ্যালকেমি সম্বন্ধে জানা প্রয়োজন ।এটি প্রাচীনকালে প্রকৃতির এক ধরনের অনুসন্ধান এবং জ্ঞানের দার্শনিক ও আধ্যাত্মিক একটি শাখাকে বোঝায় যাতে জ্ঞানের সকল শাখার সকল উপাদানের সম্মিলনের মাধ্যমে একটিমাত্র উচ্চতর মহান শক্তির অস্তিত্বের ধারণা করা হতো। "অ্যালকেমিস্ট জাবির ইবনে হাইয়ানের মূল উদ্দেশ্যই ছিল Artificial Creation of Life! " (মুসলিম মস্তিষ্ক, পৃষ্ঠা ২৪)
🔖তিনি নানাভাবে তাঁর রাসায়নিক বিশ্লেষণ বা সংশ্লেষণের নামকরণ বা সংজ্ঞা উল্লেখ করেছেন। পাতন, উর্ধ্বপাতন, পরিস্রাবণ, দ্রবণ, কেলাসন, ভস্মীকরণ, গলন, বাষ্পীভবন ইত্যাদি রাসায়নিক সংশ্লেষণ বা অনুশীলন গবেষণার সময় পদার্থের কী কী রূপান্তর ঘটে এবং তার ফল কী দাঁড়ায়, তিনি তাও বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন।
🔖চামড়া ও কাপড়ে রঙ করার প্রণালী, ইস্পাত প্রস্তুত করার পদ্ধতি, লোহা, ওয়াটার প্রুফ কাপড়ে বার্নিশ করার উপায়, সোনার পানি দিয়ে পুস্তকে নাম লেখার জন্য লোহার ব্যবহার ইত্যাদি আবিষ্কার করেন।
🔖তিনিই সর্ব প্রথম নাইট্রিক এসিড, সালফিউরিক এসিড আবিষ্কার করেন।আমরা জানি যে, নাইট্রিক এসিডে স্বর্ণ গলে না। নাইট্রিক এসিড ও হাইড্রোক্লোরিক এসিডের মিশ্রনে স্বর্ণ গলানোর ফরমুলা তিনিই প্রথম আবিষ্কার করেন। নাইট্রিক এসিড ও হাইড্রোক্লোরিক এসিডের মিশ্রনে স্বর্ণ গলানোর পদার্থটির নাম যে "Aqua Regia" এ নামটিও তাঁর প্রদত্ত। এই Aqua Regia ই একমাত্র তরল যা স্বর্ণকে গলাতে পারে।
🔖"Physical point of view থেকে দেখলে প্রশমন বিক্রিয়ার অম্ল-ক্ষারক তত্ত্ব মূলত আসে জাবির ইবনে হাইয়ান এর বিখ্যাত Sulphur-Mercury তত্ত্ব থেকে।" (মুসলিম মস্তিষ্ক, পৃষ্ঠা ২৫)
🔖তিনি বস্তু জগতকে প্রধানত তিন ভাগে বিভক্ত করেন। প্রথম ভাগে স্পিরিট, দ্বিতীয় ভাগে ধাতু এবং তৃতীয় ভাগে যৌগিক পদার্থ।
1.Spirits: যাদেরকে তাপে বাষ্পীভূত করা যায়।যেমনঃকর্পূর,আর্সেনিক এবং এমোনিয়াম ক্লোরাইড।
2.Metals: সোনা,রূপা,লেড,তামা এবং লোহা ইত্যাদি।
3.Compounds: যাদেরকে গুড়া করা যায়।
তাঁর এ আবিষ্কারের উপর নির্ভর করেই পরবর্তী বিজ্ঞানীরা বস্তুজগৎকে তিনটি ভাগে ভাগ করেন। যথা— বাষ্পীয়, পদার্থ ও পদার্থ বহির্ভূত।
🔖যদিও তিনি একজন অ্যালকেমিস্ট ছিলেন তবুও তিনি উন্নতচরিত্র ধাতু - সোনা,রূপা) বানানোর দিকে নজর দিয়েছে বলে মনে হয় না। এর পরিবর্তে তিনি নিজেকে বিভিন্ন রাসায়নিক পদ্ধতির আধুনিকীকরণ এবং রাসায়নিক বিক্রিয়ার ক্রিয়া-কৌশল নিয়ে গবেষণা করার প্রতি উৎসর্গ করেন।এভাবেই তিনি আলকেমি থেকে আজকের রসায়নশাস্ত্রকে বের করে আনেন।তিনি জোর দিয়ে একথা বলেন যে,রাসায়নিক বিক্রিয়ায় নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যর বিভিন্ন পদার্থ অংশ নেয় এবং এভাবে বলা যেতে পারে - এরা ধ্রুব অনুপাতের সূত্র (Law of constant proportions) মেনে চলে।
🔖জাবির ইবনে হাইয়ান তাঁর জীবদ্দশায় অনেক বই লিখেছেন। যার বেশিরভাগই কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে। রসায়ন ছাড়াও তিনি বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখা যেমন চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানে অবদান রেখেছেন।তার রসায়ন নিয়ে লেখা বই - "Kitab-al-Kimya" এবং "Kitab-al-Sab'een" ল্যাটিনসহ বিভিন্ন ইউরোপীয় ভাষায় অনূদিত হয়েছে। এই অনুবাদগুলো পরবর্তী কয়েক শতাব্দী যাবৎ ইউরোপে বেশ জনপ্রিয় ছিল এবং আজকের আধুনিক রসায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
🔖জাবির কর্তৃক উদ্ভাবিত বেশ কিছু পারিভাষিক শব্দ যেমন "Alkali" এখনও অনেক ইউরোপীয় ভাষায় পাওয়া যায় এবং বৈজ্ঞানিক অভিধানের অংশ। তাঁর ব্যবহৃত আরবি শব্দ " আল ইকসির " থেকেই এসেছে "Elixir of Life ". এটি একটি আজব গাছের প্রাপ্ত আজব পাউডার, যার অস্তিত্ব সম্ভবত নেই। (মুসলিম মস্তিষ্ক, পৃষ্ঠা ২৭)
🔖তাঁর রচিত বইয়ের একটি ক্ষুদ্র অংশই কেবল সম্পাদিত এবং প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর বইগুলো এখনও আরবিতে সংরক্ষিত আছে যেগুলোতে টীকাযুক্ত এবং প্রকাশ করা বাকি।
🔖জাবিরের রচনাসম্ভার বলে পরিচিত বইগুলো কি সত্যিই জাবিরের লেখা নাকি পরবর্তীতে তার অনুসারীগণ তার নামে এই বইগুলো লিখেছেন কিনা সে ব্যাপারে সন্দেহের অবকাশ আছে। সার্টনের মতে তার (জাবিরের) সত্যিকার গুরুত্ব তখনই বোঝা যাবে যখন তার সবগুলো বই সম্পাদনা এবং প্রকাশ করা হবে। জাবিরের রচনাসম্ভার থেকে তার যেসব ধর্মীয় এবং দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি পাওয়া যায় তা অনেক সময় সমালোচিত হয়েছে। " মূলত জ্ঞানী মহলে এমন কোনো ডিবেট নেই- সেখানে মুসলিম বিজ্ঞানীদের উপর ইসলামের বিশাল প্রভাবের কথা স্বীকৃত যে, ইসলামের কারণেই মুসলিম বিশ্বে জ্ঞানচর্চা ছড়িয়ে যায়।"(মুসলিম মস্তিষ্ক, পৃষ্ঠা ১২৬) যাই হোক আমাদের বুঝতে হবে জাবিরের প্রধান অবদান রসায়নে ; ধর্মে নয়।
🔖জাবিরের বিভিন্ন এসিড যেমন নাইট্রিক, হাইড্রোক্লোরিক, সাইট্রিক ও টারটারিক এসিড প্রস্তুতি এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষামূলক গবেষণার উপর জোর দেয়ার সাফল্য লাভ ছিল অসাধারণ এবং এর উপর ভিত্তি করেই তাকে রসায়নের জনক বা "Father of Chemistry" নামে অভিহিত করা যেতে পারে।Max Mayerhaff এর ভাষায়,"The development of chemistry in Europe can be traced directly to Jabir Ibn Haiyan." (Biographies of Muslim scholars & scientists)
🔖অনেক ইতিহাসবিদই এ মধ্যযুগকে "অন্ধকার যুগ" বলে মুসলিম বিজ্ঞানী ও দার্শনিকদের দারুণ দারুণ আবিষ্কারকে গোপন করতে চায়। কিন্তু সত্য তো কখনো চাপা থাকে না। একদিন না একদিন প্রকাশ পাবেই। আমাদের মুসলিম স্বর্ণযুগ সম্পর্কে জানতে হবে। মুসলিম বিজ্ঞানীদের নানা আবিষ্কারের গল্প জানা থাকতে হবে। তখন আমরা অনুপ্রেরণা পাবো যে আমরাও পারি। মধ্যযুগের মুসলিম বিজ্ঞানীদের দারুণ দারুণ আবিষ্কারের গল্প রয়েছে "1001 Inventions, The Enduring Legacy of Muslim Civilization"
এ বইটিতে। PDF দিয়ে দিলাম যাতে সবাই পড়তে পারে। এছাড়াও গার্ডিয়ান পাবলিকেশন্স কর্তৃক প্রকাশিত আরমান ফিরমান ভাইয়ার " মুসলিম মস্তিষ্ক "
বইটাও পড়া যেতে পারে। এছাড়াও "1001 Invention & The library of Secret " নামে দারুণ একটি শর্ট ফিল্ম দেখে আসতে পারো ইউটিউবে।
Short-film : https://youtu.be/JZDe9DCx7Wk
PDF (1001 Invention) :
https://drive.google.com/file/d/1PoO2FroE9NGkJzlusK6IJ53TkJd3Adbg/view?usp=drivesdk
~Code of life -Islam