02/12/2024
🌌🌌❄️❄️গ্রাফিনের আশ্চর্য জগৎ❄️❄️🌌🌌
আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সবকিছুতেই এখন ইলেকট্রনিকসের প্রভাব অনস্বীকার্য। আমরা দেখছি, ইলেকট্রনিক ডিভাইসগুলোর কার্যক্ষমতা যেমন বাড়ছে, তেমনি ওজনে হালকা হচ্ছে। এখন প্লাস্টিকের চেয়েও পাতলা অথচ ইস্পাতের চেয়েও শক্ত, তামার চেয়েও বেশি বিদ্যুৎ পরিবাহী পদার্থ বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন। এই পদার্থগুলো এত পাতলা যে এগুলোর পুরুত্ব নেই বললেই চলে। তাই এগুলোকে দ্বিমাত্রিক পদার্থ বলা হয়। এই দ্বিমাত্রিক পদার্থের জগৎ—গ্রাফিনের জগৎ। এই জগতের সন্ধান আমরা পেয়েছি মাত্র ২০ বছর আগে, ২০০৪ সালে দুজন সাদামাটা হাসিখুশি পদার্থবিজ্ঞানীর মাধ্যমে। এই দুজন বিজ্ঞানী হলেন আন্দ্রে গাইম ও কনস্টান্টিন নভোসেলভ। আবিষ্কারের মাত্র ছয় বছরের মাথায় ২০১০ সালে তাঁরা পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পান।
পদার্থবিজ্ঞানের জগতে একেবারে অজ্ঞাতকুলশীল হয়তো নন, কিন্তু ততটা বিখ্যাতও ছিলেন না ম্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক আন্দ্রে গাইম ও কনস্টান্টিন নভোসেলভ। বড় কোনো রিসার্চ গ্রান্টও তাঁরা পাননি কোনো দিন। তা ছাড়া কোনো সিরিয়াস গবেষণা থেকে নয়, আক্ষরিক অর্থেই ডাস্টবিন থেকে উঠে এসেছে তাঁদের আবিষ্কার।১৯৫৮ সালে রাশিয়ায় জন্ম আন্দ্রে গাইমের। মস্কো ফিজিক্যাল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটে আন্ডারগ্র্যাজুয়েট, পরে চেরনোগোলোভার ইনস্টিটিউট অব সলিড স্টেট ফিজিকস থেকে পোস্টগ্র্যাজুয়েট। তারপর চলে যান নেদারল্যান্ডসে। সেখানে নাইমিগান ইউনিভার্সিটিতে পড়িয়েছেন অনেক বছর। নেদারল্যান্ডসের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন তিনি। ১৬ বছর পর নিজের অজান্তেই গাইমকে অনুসরণ করলেন নভোসেলভ। কনস্টান্টিন নভোসেলভেরও জন্ম রাশিয়ায়, ১৯৭৪ সালে। পড়াশোনাও প্রথমে মস্কো ফিজিক্যাল টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি, পরে চেরনোগোলোভার ইনস্টিটিউট অব সলিড স্টেট ফিজিকসে। সেখান থেকে পিএইচডি করার জন্য পাড়ি জমান নেদারল্যান্ডসের নাইমেগেন ইউনিভার্সিটিতে। সেখানেই তাঁর পরিচয় হয় প্রফেসর গাইমের সঙ্গে। নভোসেলভ যদিও গাইমের সরাসরি তত্ত্বাবধানে পিএইচডি করেননি, কিন্তু গাইমের বহুমুখী গবেষণার প্রতি আকৃষ্ট হলেন।গাইমও নভোসেলভের উৎসাহ ও উদ্দীপনায় খুশি। বেশির ভাগ বিজ্ঞানী সাধারণত একটা বিষয় নিয়েই গবেষণা করেন বছরের পর বছর। কিন্তু বিজ্ঞানীদের মধ্যে ক্ষুদ্র একটা অংশ আছেন, যাঁরা কয়েক বছর পরপর গবেষণার ক্ষেত্র বদল করেন।আন্দ্রে গাইম তাঁদের দলে। ১৯৯৭ সালে প্রফেসর গাইম ডায়াম্যাগনেটিজম নিয়ে কাজ করতে করতে আবিষ্কার করেন শক্তিশালী চুম্বকক্ষেত্রে ডায়াম্যাগনেটিক পদার্থ বিকর্ষিত হয়। পানি ডায়াম্যাগনেটিক পদার্থ। তাঁর মাথায় এল শক্তিশালী চুম্বকক্ষেত্রে পানি রাখলে পানির কণা বিকর্ষিত হয়ে শূন্যে ভাসতে থাকবে। এটাকে আরও আকর্ষণীয় করার জন্য পানির বদলে তিনি একটা জীবন্ত ব্যাঙ ব্যবহার করলেন। ব্যাঙের শরীরের জলীয় অংশ ডায়াম্যাগনেটিক। উপযুক্ত শক্তির চৌম্বকক্ষেত্র তৈরি করে গাইম দেখালেন যে সেই চৌম্বকক্ষেত্রে একটা ব্যাঙ বিকর্ষণ বলের ক্রিয়ায় শূন্যে ভেসে থাকে। এ রকম বিজ্ঞান মজার, তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু এটা কোনো মৌলিক আবিষ্কার নয়। এ রকম মজার আবিষ্কার যেগুলো দেখে মানুষ শুরুতে হাসে, পরে ভাবতে বসে—তাদের জন্য হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির ইগ-নোবেল কমিটি ইগ-নোবেল পুরস্কার চালু করেছে বেশ কয়েক বছর আগে থেকে। ২০০০ সালে চৌম্বকক্ষেত্রের প্রভাবে শূন্যে ভাসমান ব্যাঙের জন্য ইগ-নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয় প্রফেসর আন্দ্রে গাইমকে। একটা ধারণা ছিল যে যাঁরা ইগ-নোবেল পুরস্কার পান, তাঁদের পক্ষে সত্যিকারের নোবেল পুরস্কার পাওয়া সম্ভব নয়। তাই ইগ-নোবেল পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে একজন সত্যিকারের নোবেল বিজয়ীকে অতিথি হিসেবে আনা হয়। ইগ-নোবেলের সেই প্রচলিত ধারণা ভেঙে গেছে ২০১০ সালে। প্রফেসর আন্দ্রে গাইম হলেন প্রথম বিজ্ঞানী, যিনি ইগ-নোবেল ও নোবেল পুরস্কার দুই-ই পেয়েছেন।২০০১ সালে ম্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটিতে যোগ দেন প্রফেসর গাইম। পরপরই কনস্টান্টিন নভোসেলভকে পোস্ট-ডক্টরাল ফেলো হিসেবে তাঁর ডিপার্টমেন্টে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করলেন। কনস্টান্টিন নভোসেলভের পিএইচডি শেষ হয়নি তখনো। থিসিস জমা দিয়েই ম্যানচেস্টারে চলে এলেন নভোসেলভ। কাজ শুরু করলেন গ্রাফিন নিয়ে। প্রতি শুক্রবার বিকেলে সবাই যখন নানা রকম সামাজিক আনন্দে মেতে ওঠে, তখন গাইম আর নভোসেলভের গ্রুপ মেতে ওঠে—ফ্রাইডে ইভনিং এক্সপেরিমেন্টে। বড় কোনো যন্ত্রপাতি নেই। প্রায় খালি হাতে ল্যাবে যা আছে, তা কাজে লাগিয়েই নানা রকম পরীক্ষা। এ রকম একটা ‘ফ্রাইডে ইভনিং এক্সপেরিমেন্ট’-এর ফসল গ্রাফিন—যা থেকে ২০১০ সালের নোবেল পুরস্কার।
গ্রাফিন নতুন কোনো পদার্থ নয়। গ্রাফিনের অস্তিত্বের কথা বিজ্ঞানীদের জানা ছিল অনেক দিন আগে থেকেই। কার্বনের একটা রূপ গ্রাফাইট। ষড়ভুজাকৃতির পারমাণবিক বন্ধনযুক্ত গ্রাফাইটের গঠন সম্পর্কেও সম্যক ধারণা আছে বিজ্ঞানীদের। আমরা যে পেনসিল দিয়ে লিখি—সেই পেনসিলের শিস মূলত গ্রাফাইট। পেনসিলের লেখাগুলো গ্রাফাইটের অনেকগুলো আস্তরণের সমষ্টি। গ্রাফাইটের এই আস্তরণগুলোর প্রতিটি একেকটা গ্রাফিন। গ্রাফিনের একেকটা আস্তরণ এতটাই পাতলা যে এর পুরুত্ব একটা পরমাণুর ব্যাসের সমান, অর্থাৎ ১ মিলিমিটারের ১ কোটি ভাগের ১ ভাগ। আরও পরিষ্কারভাবে বলা যায়, ১০ পাতা কাগজের পুরুত্ব যদি ১ মিলিমিটার হয়, তাহলে ১০ লাখ গ্রাফিনের আস্তরণের পুরুত্ব হবে ১ পাতা কাগজের পুরুত্বের সমান। এর আগে গ্রাফিনের আরও সব গঠন আবিষ্কৃত হয়েছে। কার্বন ন্যানোটিউবের কথা আমরা জানি। ৬০টি কার্বন পরমাণু মিলে ফুটবল আকৃতির ফুলারিন আবিষ্কারের জন্য রসায়নে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছে ১৯৯৬ সালে। গ্রাফিনের অস্তিত্ব জানা থাকা সত্ত্বেও তাকে আলাদা করা যাচ্ছিল না এত দিন। ফলে তার অনেক ধর্মও পরীক্ষা করে দেখা সম্ভব হচ্ছিল না। আন্দ্রে গাইম ও কনস্টান্টিন নভোসেলভ শুরু করলেন নানা রকম পরীক্ষা। কিন্তু কিছুতেই সফল হচ্ছিলেন না। সিনিয়র গবেষকদের একজন গ্রাফিনের পুরু আস্তরণ তৈরি করেন আর সবাই মিলে চেষ্টা করেন কীভাবে তার একটা আস্তরণ আলাদা করা যায়। যে গ্রাফিনগুলো টেবিলে লেগে থাকত, তা পরিষ্কার করার জন্য ব্যবহার করা হতো স্কচটেপ। গ্রাফিনের ওপর টেপ লাগিয়ে টান দিয়ে টেপটা তুলে ফেললে টেপের সঙ্গে গ্রাফিনও উঠে আসে। ওই ব্যবহৃত টেপগুলো স্বাভাবিকভাবেই ময়লার ঝুড়িতে ফেলে দেওয়া হয়। একদিন কী মনে করে ও রকম একটা ফেলে দেওয়া টেপ ময়লার ঝুড়ি থেকে তুলে নিলেন নভোসেলভ। কনফোকাল মাইক্রোস্কোপের নিচে টেপটাকে রেখে দেখলেন তাতে যে গ্রাফিন লেগে আছে, তার পুরুত্ব অবিশ্বাস্য রকমের কম। একটা পথ পেয়ে গেলেন তাঁরা। ধরতে গেলে এভাবেই আলাদা হয়ে গেল অবিশ্বাস্য রকমের পাতলা পদার্থ গ্রাফিন। এর পুরুত্ব এতই কম (১ মিলিমিটারের ১ কোটি ভাগের ১ ভাগ) যে নেই বললেই চলে। তাই গ্রাফিনকে বলা হচ্ছে দ্বিমাত্রিক পদার্থ, যার শুধু দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ আছে, কিন্তু কোনো পুরুত্ব নেই। গ্রাফিনের একটা ষড়ভুজ আকৃতির কোষে দুটো কার্বন পরমাণু থাকে, যার ক্ষেত্রফল মাত্র ০.০৫২ বর্গ ন্যানোমিটার। ঘনত্ব ০.৭৭ মিলিগ্রাম/বর্গমিটার, অর্থাৎ ১ মিটার বাই ১ মিটার আকৃতির এক খণ্ড গ্রাফিনের ভর হবে ১ মিলিগ্রামেরও কম। গ্রাফিন এত পাতলা যে এটা মাত্র ২.৩ শতাংশ আলো শোষণ করে, অর্থাৎ এর মধ্য দিয়ে প্রায় সব আলোই বিনা বাধায় চলে যেতে পারে। মানে গ্রাফিন কাচের মতো স্বচ্ছ। এত পাতলা, এত স্বচ্ছ, অথচ গ্রাফিন ইস্পাতের চেয়েও কমপক্ষে ১০০ গুণ শক্ত। গ্রাফিনের ভার সইবার ক্ষমতা ৪২.০ নিউটন/মিটার, অথচ ইস্পাতের ভার সইবার ক্ষমতা মাত্র ০.৪০ নিউটন/মিটার। ১ মিটার দৈর্ঘ্য ও ১ মিটার প্রস্থের এক খণ্ড গ্রাফিন দুটি খুঁটির মধ্যে বেঁধে দিলে তার ওপর ৪ কিলোগ্রাম ভর রাখলেও গ্রাফিন খণ্ডটি ছিঁড়বে না। এটা এতই পাতলা যে খালি চোখে একে দেখাই যাবে না। এর ওপর একটা বিড়াল শুয়ে থাকলে মনে হবে বিড়ালটি শূন্যের ওপর শুয়ে আছে। এই গ্রাফিন খণ্ডের ওজন হবে ১ মিলিগ্রামেরও কম, অথচ বিড়ালের একটা গোঁফের ওজনও ১ মিলিগ্রামের বেশি হবে। গ্রাফিন বিদ্যুৎ সুপরিবাহী। এর বিদ্যুৎ পরিবাহিতা তামার চেয়েও বেশি। গ্রাফিনের তাপ পরিবাহিতাও তামার চেয়ে ১০ গুণ বেশি। ২০০৪ সালে গ্রাফিনের এসব গুণ প্রকাশ করেন গাইম ও নভোসেলভ সায়েন্স জার্নালে। পরের বছর আরেকটি পেপার প্রকাশ করেন বিখ্যাত নেচার সাময়িকীতে। দ্রুত সাড়া পড়ে যায় বিজ্ঞানজগতে। গ্রাফিনের ভবিষ্যৎ ব্যবহার নিশ্চিত হয়ে পড়ে অনেকগুলো ক্ষেত্রে। প্রযুক্তির ক্ষেত্রে বিপ্লব ঘটানোর ক্ষমতা রাখে গ্রাফিন। এর অবিশ্বাস্য রকমের কম ভর, স্বচ্ছতা, বিদ্যুৎ সুপরিবাহিতার কারণে কম্পিউটার টাচ-স্ক্রিন, কম্পিউটার চিপস ইত্যাদির ক্ষেত্রে গ্রাফিন অচিরেই সিলিকনের জায়গা দখল করে নেবে। সোলার সেল, মোবাইল, ইলেকট্রনিকস, গাড়ির পার্টস, আকাশযানের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ থেকে শুরু করে স্যাটেলাইটেও জায়গা করে নেবে গ্রাফিন। প্রযুক্তির আগামী বিশ্ব হবে গ্রাফিন–বিশ্ব—এ রকমই আশা করেন বিজ্ঞানের ভবিষ্যৎ–দ্রষ্টারা। ম্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটিতে প্রফেসর গাইম ও নভোসেলভের তত্ত্বাবধানে ইতিমধ্যেই গড়ে উঠেছে ন্যাশনাল গ্রাফিন ইনস্টিটিউট, গ্রাফিন ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড ইনোভেশন সেন্টার (জিইআইসি)। বাংলাদেশের টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার ড. নাজমুল করিম ম্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি সম্পন্ন করে নলেজ এক্সচেঞ্জ ফেলো হিসেবে গবেষণা করছেন ন্যাশনাল গ্রাফিন ইনস্টিটিউটে। গ্রাফিন ব্যবহার করে ই-টেক্সটাইল প্রস্তুত করার প্রজেক্টে কাজ করছেন তিনি। হাসপাতালে অপারেশনের রোগীদের অ্যানেসথেসিয়া দেওয়ার পর অনেক রোগীর ঠান্ডা লেগে যায়। খুবই পাতলা ই-টেক্সটাইলের মাধ্যমে রোগীর শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা যায় সহজেই। এই প্রজেক্টের জন্য ডক্টর নাজমুল করিমকে যুক্তরাজ্যের আইসিইউআরই ৩৫ হাজার পাউন্ড পুরস্কার দিয়েছে। "বিজ্ঞান সাময়িকী: বিজ্ঞান চিন্তা" থেকে সংগৃহিত।