10/01/2021
ফেসবুকে এক শ্রেণীর পুরুষদের মধ্যে অদ্ভুত একটা প্রবণতা লক্ষ্য করলাম। সেটা হল, আনুশকা হত্যার একমাত্র আসামী দিহানকে গ্লোরিফাই করা এবং আনুশকাকে দোষী সাব্যস্ত করার একটা প্লাটফর্ম তৈরি করার চেষ্টা করা। তাদের যুক্তি হল,
- দিহান রক্তাক্ত আনুশকাকে না লুকিয়ে হাসপাতালে নিয়ে এসেছে
- দিহান আনুশকার মাকে ফোন করে খবর দিয়েছে।
- এই রুমডেটে আনুশকা সমান দোষী এবং মারা যাওয়া স্রেফ একটা দুর্ঘটনা মাত্র।
মাত্র ১৯ বছর বয়সী দিহানের টাইমলাইন ঘুরে আসুন। দেখবেন, ওর দামী মোটরবাইক, গাড়ি, বিবাহপূর্ব শারীরিক সম্পর্ক, কোকেন, শো অফ এসব নিয়েই সব পোস্ট। ওর বাবা সামান্য একজন ভূমি রেজিস্ট্রার এবং সরকার দলীয় নেতা। কিন্তু উনি কলাবাগানের সেই ফ্ল্যাটসহ অঢেল সম্পদের মালিক৷ নিশ্চিত থাকতে পারেন, উনি এই মামলাকে প্রভাবিত করবেন এবং ভিন্নখাতে নেয়ার চেষ্টা করবেন। মেডিকেল রিপোর্টগুলোও সঠিকভাবে দিবে কিনা নিশ্চিত নই। দিহানের অনেকগুলো পোস্টই গাড়ির সাথে বিভিন্ন পোজে। ওর বড়ভাই নিজ বউকে বিয়ের মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই বিষ খাইয়ে মারার দায়ে অভিযুক্ত। পরে কোর্টের বাইরে টাকা দিয়ে কেইস ধামাচাপা দিয়েছে। দিহানকে নির্দোষ প্রমাণ করার এই চেষ্টাটাই পুরুষতান্ত্রিকতা। আর এই ঘটনাকে যারা বৈধতা দিচ্ছেন, তাদের মধ্যেই কেউ কেউ হয়ত পটেনশিয়াল ধর্ষক।
ওর পারিবারিক আবহ শুনে বুঝতেই পারছেন, দিহানের পারিবারিক শিক্ষা কোন লেভেলের। এমন নয় যে খুবই ভদ্র, মার্জিত আর শিক্ষিত এক তরুণ, যৌবনের তাড়নায় একটা ভুল করে ফেলেছে। এটা সে করেছে খুবই ঠান্ডা মাথায় পরিকল্পিতভাবে৷ হ্যাঁ, আনুশকাকে খুন করার প্ল্যান তার ছিল না কিন্তু দিহানের তৈরি করা পরিস্থিতির প্রভাবে আর অস্বাভাবিকতায় মারা গেছে মেয়েটা।
আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হল, দুজনের বয়স। মিডিয়া এবং পুলিশ ১৭ বছরের আনুশকাকে ১৯ বলার চেষ্টা করেছে যাতে ধর্ষণটা মিউচুয়াল সম্পর্কে পরিণত হয়ে শাস্তিটা কমে যায়, আবার ২০-২১ বছরের দিহানকে ১৯ এর নিচে দেখাবার চেষ্টা করছে যাতে কিশোর হিসেবেও শাস্তিটা কমে আসে। দুজনকেই যথাযথভাবে মেডিকেল টেস্ট করে বয়স নির্ধারণ করা হোক। এই চেষ্টার মধ্যেও মামলাকে প্রভাবিত করার আলামত স্পষ্ট। বাকি ৩ জন বন্ধুর ছবি আর পরিচয়ও উন্মুক্ত করা হয়নি। মামলার আসামী হওয়া সত্ত্বেও দ্রুত ছেড়ে দেয়া হয়েছে। এদের একজন খুবই প্রভাবশালী কারো ছেলে, যার পরিচয় মিডিয়া লুকাচ্ছে বলে মাস্টারমাইন্ড স্কুলের শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেছেন। রক্তক্ষরণ এর ধরণ দেখে মনে হচ্ছে, এই কেইসটা গ্যাং রেপ হবার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেয়া যায় না। আনুশকার মা দাবী করেছেন, ৪ টা ছেলেই উনাকে জানিয়েছিল বাসা হতে এসেছে। এমনও হতে পারে, প্রভাবশালী ছেলের পরিবারের চাপে দিহান সব দায় একাই কাঁধে তুলে নিয়েছে।
আমাদের দাদী-নানীদের বিয়ে হত ১২-১৩ বছরে৷ কোনদিন এদের কেউ মারা গিয়েছে কিংবা অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে, এমনটা শুনেছেন? ১৭ বছরের আনুশকার সাথেও সম্মতিক্রমে সম্পর্ক হলে মারা যাবার প্রশ্নই উঠত না। একটা ১৯ বছরের ছেলের মাথায় এরকম বিকৃত যৌনাচারের আইডিয়া এলো কই থেকে? ইসলাম ধর্মেও এধরণের কার্যকলাপ সম্পূর্ণ হারাম। রক্তক্ষরণ হতে একটা বিষয় পরিষ্কার যে, আনুশকা এসবে অভ্যস্ত ছিল না এবং তার আপত্তি বা প্রতিবাদ দিহান শুনেনি। কিংবা নেশাজাতীয় কিছুর প্রভাবে আনুশকা পুরো সেন্সে ছিল না। দিহানের ইতিহাস ঘাঁটলে আমি নিশ্চিত আরো বহু নারীর সাথে তার সম্পর্কের ঘটনা উঠে আসবে।
দিহান ভাবেনি, রক্তক্ষরণে আনুশকার মৃত্যু হতে পারে। তাই নিজেকে বাঁচাবার জন্যই আহত আনুশকাকে হাসপাতালে নিয়ে এসেছে এবং মাকে কল দিয়েছে। আর সে ধর্ষক হলেও ঠান্ডা মাথার খুনী তো না। তবে দিহান যদি নিশ্চিত হত আনুশকা মারা গেছে, তবে হাসপাতালে না এনে লাশ লুকানোর ব্যবস্থা করত, কোন সন্দেহ নেই৷
যারা দিহানকে ফেরেশতা সাজাবার চেষ্টা করছেন এবং আনুশকা আর ওর পরিবারকে দায়ী করছেন, এরা দুঃখজনকভাবে দিহানের কার্যকলাপকে বৈধতা দেয়ার চেষ্টা করছেন। এভাবে খালি বাসায় একটা অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরীকে ফুসলিয়ে নিয়ে বিকৃত লালসা চরিতার্থ করার চেষ্টা ভয়াবহ অপরাধ। এদের মা, বোন বা স্ত্রীর সাথে এমনটা হলে এরা কিন্তু আনুশকার দোষ আর খুঁজত না। পুরো দোষই চাপাত ধর্ষকের উপর।
আনুশকার পরিবারের দোষ অবশ্যই ছিল। কিশোরী মেয়ের নিরাপত্তার জন্য তাদের শিক্ষা আর কৃতকর্মের মধ্যে কিছু ভুলও ছিল। কিন্তু এজন্য কি তারা মেয়ের রক্তাক্ত লাশ ডিজার্ভ করে?
দিহানের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। এতে অন্যান্য দিহানরাও সতর্ক হয়ে যাবে। আর আনুশকাদের বাবা মায়েরা কি এই ঘটনা হতে কিছু শিখবেন বা নিজেদের বদলাবেন?
আনুশকার বাবার জন্যেও খারাপ লাগছে। আনুশকা ওর বাবাকে দুপুর ১২-১৯ মিনিটে শেষ কল দিয়েছিল, সম্ভবত দিহানের ফ্ল্যাট হতেই, যা ওর বাবা অন্যান্য ব্যস্ততার কারণে ধরতে পারেননি৷ এই ব্যস্ততা কি মেয়ের জীবনের চাইতেও জরুরী ছিল? হয়ত সেই ফোনে আনুশকা ওর বাবাকে জীবন বাঁচানোর জন্য আকুতি জানাত... কিংবা দিহানদের হাত হতে রক্ষা করতে অনুরোধ করত.... এরপর হয়ত ওর কাছ হতে ফোন কেড়ে নেয়া হয়...। খুব ইমার্জেন্সি কিছু না হলে কি একটা মেয়ে তার বয়ফ্রেন্ড এর বাসা হতে বাবাকে কল দেয়?
ঘন্টাখানেক পরেই মেয়ের মৃত্যু সংবাদ পান উনি। মেয়ের এই শেষ কলটা রিসিভ না করার আফসোস উনার কি সারাজীবনে যাবে? এই আক্ষেপ কি উনাকে আমৃত্যু তাড়িয়ে বেড়াবে না!!
©Atique Ua Khan