মানব সভ্যতার ক্রমবিকাশ ও গতিশীলতার পেছনে শিক্ষার প্রভাব অনস্বীকার্য। অনাদিকাল থেকে সভ্যতার এ ক্রমবিবর্তনের ধারা একইভাবে প্রবাহমান এবং পরস্পরের রূপায়ন ও উন্নয়নে একে অন্যকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে থাকে। ইতিহাসের এ প্রেক্ষাপটে শিক্ষাই হল মানুষের সর্বাপেক্ষা মূল্যবান উত্তরাধিকার যা বংশ পরম্পরায় হস্তান্তরিত হয়ে আসছে।যুগে যুগে সঞ্চিত অভিজ্ঞতা, নতুন নতুন আবিস্কার ও উদ্ভাবন এ উত্তরাধিকারকে করেছে সমৃদ্ধ- যার
ফলশ্রুতিতে সূচিত হয়েছে সমাজের অগ্রগতি, সংস্কৃতি ও সভ্যতার ক্রমবিকাশ ও ক্রমোন্নতি। আর তারই ধারাবহিকতায় অত্র ফরিদপুর উপজেলার সংস্কৃতি চর্চা, শিক্ষা এবং শিক্ষা সম্প্রসারণে পাবনা জেলার ফরিদপুর উপজেলার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত শতবর্ষ প্রাচীন বিদ্যাপীঠ “বনওয়ারী নগর সি, বি, পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের” অবদান অন্যতম। ঐতিহ্যবাহী বনওয়ারী নগর সি, বি, পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়টি একটি প্রাচীনতম ও অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। উত্তরবঙ্গের সুপ্রসিদ্ধ পাবনার চলনবিল বিধৌত বড়াল নদীর দক্ষিণ পাড়স্থ বিখ্যাত সূফী শাহ ফরিদের নামানুসারে ফরিদপুর উপজেলার প্রাণকেন্দ্রে এই বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯১২ সালে। অত্র বিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তদানিন্তন পাবনা জেলার বিখ্যাত তাড়াশ জমিদার বংশের বড় তরফের ৯ম পুরুষ বাহাদুর বনমালী রায়। বনমালী রায় একজন খ্যাতনামা দানশীল, ধার্মিক ও বিদ্যানুরাগী জমিদার ছিলেন। উল্লেখ্য যে, এই বংশের ৬ষ্ঠতম পুরুষ স্বগীয় রাম সুন্দরের পর বড় তরফ অপুত্রক হয়। এজন্য পরবর্তী চার পুরুষ পর্যন্ত দত্তক গ্রহণ করে বংশের অস্তিত্ব রক্ষা করা হয়েছিল। বনমালী রায় ১৮৬২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে জন্ম গ্রহণ করেন। বনওয়ারী লাল রায় তার প্রথমা স্ত্রীর মেজ ভাই হরিনাথ বংশীয় বনমালীকে পোষ্যপুত্র হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। ১৮৮২ খৃষ্টাব্দে পিতা বনওয়ারী লাল রায় মুত্যুবরণ করলে বনমালী তার বিষয় সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হন। বনমালীর সুশাসনে জমিদারির আয় উন্নতি অনেক বৃদ্ধি পায়। তিনি বনওয়ারী নগর সি, বি, পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়টি ছাড়াও বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও জনহিতকর কাজে বহু অর্থ ও জমিদান করে খ্যাতি লাভ করেন। পাবনা এডওয়ার্ড কলেজের বনমালী ইনস্টিটিউটের ভিত্তি স্থাপন, ইলিয়ট বনমালী টেকনিক্যাল স্কুল, পাবনা মা ও শিশু কল্যাণ হাসপাতাল, তাড়াশে একটি দাতব্য চিকিৎসালয় ও একটি উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, পাবনা দুর্ভিক্ষ ভান্ডার (খাদ্যগুদাম), শ্যামকুন্ডের পঙ্কোদ্ধার, জগন্নাথ দেবের মন্দির সংস্কার, সিরাজগঞ্জের বি.এল স্কুলের প্রতিষ্ঠা ও সাহায্য দান এবং তারই অর্থনুকূল্যে বৈষ্ণব গ্রন্থের প্রকাশ সম্ভবপর হয়। বর্তমান ফরিদপুর রাজবাড়ীর পরিপূর্ণতাদান তার অমর স্মৃতির সাক্ষ্য বহন করে থাকে। তার জনহিতকর কাজের জন্য বৃটিশ সরকার ১৮৯৪ খৃষ্টাব্দে তাকে “রায় বাহাদুর” খেতাবে ভূষিত করেন। তিনি কলকাতার নবদ্বীপের গৌরাঙ্গের পরমভক্ত ছিলেন। এজন্য নবদ্বীপের পন্ডিতমন্ডলী তাকে “রাজর্ষী” উপাধি প্রদান করেন। শেষ জীবনে তিনি কলিকাতা বৃন্দাবনে অবস্থানকালে ১৯১৪ খৃষ্টাব্দের ২৩ নভেম্বর মতান্তরে ২৪ শে নভেম্বর ইহলোক ত্যাগ করেন। ঐতিহ্যবাহী বনওয়ারী নগর করোনেশন বনমালী পাইলট (সি,বি,পি) উচ্চ বিদ্যালয়টির বর্তমান স্থাবর সম্পত্তির পরিমাণ প্রায় ৪.৪৮০০ একর। এর মধ্যে ৩.৪৮০০ একর জমির মধ্যে স্কুলের পাচটি মূল ভবন, পুকুর এবং বিশাল একটি খেলার মাঠ রয়েছে।অবশিষ্ট ০.৩৩০০ একর জমির উপর ফরিদপুর উপজেলা বাজারের প্রাণকেন্দ্রে তিনটি মনোরম মার্কেট স্থাপিত হয়েছে। এবং ০.১৫০০ একর জমির উপর বিদ্যালয়ের শিক্ষক স্টাফ কোয়ার্টার অবস্থিত। বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে ৫৫৪ জন, ৭ম শ্রেণীতে ৪৫২ জন, ৮ম শ্রেণীতে ৪২৫ জন, ৯ম শ্রেণীতে ৩২০ জন এবং ১০ম শ্রেণীতে ২৮৩ জন সহ সর্বমোট ২০৩৫ জন শিক্ষার্থী সাফল্যের সাথে অধ্যয়ন করছে। এ প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠালাভ করার পর দু’বছরের মধ্যেই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক ১৯১৪ খ্রিষ্টাব্দের ৩১ শে জানুয়ারী প্রাতিষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি লাভ করে। প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে শুধুমাত্র মানবিক শাখার অনুমোদন ছিল। এরপর ষাটের দশকের মধ্য ভাগে বিজ্ঞান শাখা চালু করা হয় এবং ঐ সময়ের হেডমাস্টার জনাব সাইদুর রহমান সাহেবের জোড়ালো প্রচেষ্টায় ১৯৬০ খ্রিষ্টাব্দের ১ লা জানুয়ারী বিজ্ঞান শাখাটি তদানিন্তন শিক্ষা বোর্ড কর্তৃক স্বীকৃতি লাভ করে। উল্লেখ্য যে, এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি জন্মলাভ করার পর থেকে সরকারি অনুদান না পাওয়া পর্যন্ত তাড়াশ জমিদার পরিবার থেকে বার্ষিক চব্বিশশত টাকা সাহায্য পেতো। ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দে জমিদারি প্রথা উচ্ছেদের পর তাড়াশ জমিদার পরিবার কলকাতা চলে যান। এ সময় এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি কিছু সরকারি অনুদান এবং ছাত্রের বেতনের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে বলে জানা যায়। এরপর ১৯৮৪ খ্রিষ্টাব্দে দেশের সকল স্বীকৃতি প্রাপ্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়ভাবে এম.পি.ও ভুক্ত হয়- যা ১৯৮৫ খ্রিষ্টাব্দ থেকে কার্যকরী হয়। অলোচ্য বনওয়ারী নগর সি, বি, পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়টিও একই নিয়মে এম.পি.ও ভুক্ত হয়। জন্মলগ্ন থেকেই এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি শিক্ষার গুণগত মানের ক্ষেত্রে গৌরবের শীর্ষে অবস্থান করে, যা অদ্যাবধি সেই ঐতিহ্য ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। উদাহরণ স্বরূপ ১৯১৬-১৯১৭ এবং ১৯২১-১৯২২ শিক্ষাবর্ষে বৃহত্তর পাবনা জেলার শীর্ষ পর্যায়ের ১৮ টি অনুদানবিহীন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ফলাফল সম্পর্কে জানা যায় যে, ১৯১৬-১৯১৭ শিক্ষাবর্ষে বনওয়ারী নগর সি, বি, পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে সর্বমোট ১২ জন পরীক্ষার্থী এন্ট্রাস পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে।এদের মধ্যে ৬ জন প্রথম বিভাগ এ ৪ জন দ্বিতীয় বিভাগে পাস করে।পাসের হার শতকরা ৮৩.৩৩%। ১৯২১-১৯২২ শিক্ষাবর্ষে অত্র প্রতিষ্ঠান থেকে ১৮ জন পরীক্ষার্থী এন্ট্রাস পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে ৬ জন প্রথম বিভাগ, ৯ জন দ্বিতীয় বিভাগ এবং ১ জন তৃতীয় বিভাগে পাশ করে।পাশের হার ছিল ৮৮.৮৮%। প্রতিষ্ঠানটি ফলাফলের দিক থেকে বর্তমানে পূর্বের সেই ধারা বজায় রেখে অত্র বিদ্যালয়ের গৌরব উত্তোরত্তর বৃদ্ধি করে চলেছে। বর্তমানে কৃতকার্য শিক্ষার্থীদের সকল তথ্য "বিগত ৫ বছরের সমাপনী/পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল" অপশনে পাওয়া যাবে। পরিশেষে বলা যায় যে, উল্লেখিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি একটি সুন্দর ও মনোরম পরিবেশে অভিজ্ঞ শিক্ষকমন্ডলী এবং সুদক্ষ পরিচালনা কমিটি দ্বারা পরিচালিত হয়ে আসছে। ফলে প্রতিষ্ঠানটি অত্র জেলার মধ্যে একটি শ্রেষ্ঠ ও ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ হিসেবে পরিগণিত।