01/07/2022
কলাম
মতামত
প্রথম উর্দু সংবাদপত্রের দ্বিশতবর্ষের অনুষ্ঠানে নানা প্রশ্ন
শুভজিৎ বাগচী
------------------
যে ভাষার প্রথম সংবাদপত্র প্রকাশের প্রধান ভূমিকা দুই হিন্দু এবং এক খ্রিষ্টানের, সেই ভাষা নাকি এক বিশেষ সমাজের
যে ভাষার প্রথম সংবাদপত্র প্রকাশের প্রধান ভূমিকা দুই হিন্দু এবং এক খ্রিষ্টানের, সেই ভাষা নাকি এক বিশেষ সমাজেরছবি : সংগৃহীত
ঠিক ২০০ বছর আগে, ১৮২২-এর গ্রীষ্মে, কলকাতায় প্রকাশিত হয়েছিল উপমহাদেশের তো বটেই, সম্ভবত বিশ্বের প্রথম উর্দু সংবাদপত্র জাম-ই-জাহাঁন নুমা (জগতের আয়না)। আরবি ও ফারসি শিক্ষার বহু শতাব্দী প্রাচীন ধারাতেই উর্দু পৌঁছেছিল বাঙালির দরবারে। সেই ভাষা-সমাজের গল্প তুলে ধরতে সচেষ্ট হয়েছিলেন যাঁরা, তাঁদের কেউ-ই মুসলমান ছিলেন না। সম্পাদক ছিলেন লালা সদা শুখলাল, প্রকাশক হরিহর দত্ত। দক্ষিণ এশিয়ার বিশিষ্ট আরবি, ফারসি ও উর্দু পণ্ডিতদের বড় অংশ এই কারণেই কাজ করেছে কলকাতায়। জাম-ই-জাহাঁন নুমার মুদ্রক ছিলেন খ্রিষ্টান, উইলিয়াম হপিন্স। এসব তথ্যই সম্প্রতি উঠে এল কলকাতার সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান উর্দু একাডেমির তিন দিনের অনুষ্ঠানে, যেখানে জড়ো হয়েছিলেন দেশ-বিদেশের উর্দু বিশেষজ্ঞরা জাম-ই-জাহাঁন নুমার দ্বিশতবর্ষ উদ্যাপনে।
ব্রিটিশরা ১৭৭২ সালে কলকাতায় রাজধানী স্থাপন করে এবং প্রায় দেড় শ বছর সেখানেই ছিল ইউরোপীয়দের রাজধানী। আর যা বর্তমানের কলকাতায় খুব একটা হয় না, তা হতো সেই সময়ে। অর্থাৎ, বহু ভাষার চর্চা। এর পেছনে ইউরোপীয়দের অর্থ, পরিকাঠামো এবং প্রশাসনিক সাহায্য ছিল, যা আজ নেই।
জাম-ই-জাহাঁন নুমার দ্বিশতবর্ষ পূর্তি অনুষ্ঠানের গোড়াতেই উদ্বোধনী ভাষণে উর্দু ভাষার বিশেষজ্ঞ এবং দিল্লির জামিয়া মিলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামিক স্টাডিজের প্রফেসর ইমেরিটাস আক্তারুল ওয়াসি বলেন, ‘আমি ভাবি ইংরেজি, বাংলার প্রসঙ্গে তো বটেই, কিন্তু অন্য ভাষার চর্চাতেও কি ভাগ্যবান এই শহর, যেখানে একাধিক ভাষার চর্চা হয়েছে। ফারসির কথাই যদি বলি, তবে দেখা যাবে শুধু উর্দু সংবাদপত্র নয়, প্রথম ফারসি সংবাদপত্র মিরাত-উল-আখবার প্রকাশ করেছিলেন আর কেউ নন, স্বয়ং রাজা রামমোহন রায়।’
অথচ আজ বারবার বলা হচ্ছে, উর্দু নাকি মুসলমানের ভাষা। মুসলমানের দুর্ভাগ্য হলো, যা জোর দিয়ে বলা হয়, তা-ই বিশ্বাস করে। যে ভাষার প্রথম সংবাদপত্র প্রকাশের প্রধান ভূমিকা দুই হিন্দু এবং এক খ্রিষ্টানের, সেই ভাষা নাকি এক বিশেষ সমাজের, এক বিশেষ সম্প্রদায়ের। আজ বলতে হচ্ছে, ভাষার কোনো ধর্ম হয় না, বরং ধর্মেরই ভাষাকে প্রয়োজন হয় বক্তব্য ছড়ানোর জন্য।
জাম-ই-জাহাঁন নুমার প্রসঙ্গে শান্তিরঞ্জনের পুত্র ও উর্দু ভাষাবিদ হারাধন ভট্টাচার্য বলেন, ‘১৮২২ সালের ৪ মার্চ কলকাতার কলুটোলা নিবাসী হরিহর দত্ত রেজিস্ট্রারের কাছে আবেদন করেন তারপরে ওই মাসের ২৭ তারিখে ইতিহাস সৃষ্টি করে প্রকাশিত হয় উর্দু ভাষার প্রথম সংবাদপত্র। প্রতি বুধবার সাপ্তাহিকটি প্রকাশিত হতো। অর্থাৎ মাসে চারবার। দাম ধার্য হয়েছিল মাসে মোট দু’টাকা। কাগজের মাপ ছিল ২০ ইঞ্চি বাই ৩০ ইঞ্চি।’
তিন দিনের আলোচনায় এ বিষয়টিই বারবার ফিরে এসেছে। কেন উর্দুকে মুসলমান সমাজের ভাষা বলে চিহ্নিত করা হচ্ছে, বিশেষ করে উত্তর ভারতে? অসংখ্য হিন্দু লেখক, কবি, সাহিত্যিক, অনুবাদক উর্দু নিয়ে কাজ করেছেন, উর্দুতে লিখেছেন। এমনকি হিন্দুদের বিভিন্ন ধর্মীয় বই যেমন রামায়ণ, মহাভারত, গীতা প্রভৃতি উত্তর প্রদেশসহ গোটা উত্তর ভারতে বহু বছর ধরে উর্দুতে অনূদিত হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে।
উর্দুকে দূরে ঠেলে দেওয়ার জন্য ভারতে বর্তমানে ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টির পাশাপাশি কংগ্রেসের দায়ও কম নয়। ভারতের যে ‘সিনক্রেটিক’ (মিশ্র) সংস্কৃতি, কংগ্রেস আমলে তা তুলে ধরার কোনো চেষ্টাই হয়নি। ভারতের স্বাধীনতার পর ১৯৪৮ সালে প্রথম শিক্ষা কমিশন গঠিত হয়। ভারতবর্ষে শিক্ষা কীভাবে পরিচালিত হবে তার দিকনির্দেশনা দিতেই এক সদস্যের এই কমিশন গঠিত হয়েছিল। সেই সদস্য ছিলেন ভারতের দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতি এবং প্রথম উপরাষ্ট্রপতি ড. সর্বপল্লি রাধাকৃষ্ণন। তিনি বলেছিলেন, স্নাতক স্তরের নিচে পাঠ্যক্রমে অবশ্যই বিশ্ব ধর্ম (ওয়ার্ল্ড রিলিজিয়ন) পড়ানোর ব্যবস্থা করা উচিত। ভারতের মিশ্র সংস্কৃতির পাশাপাশি হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে বিবাদের ইতিহাসও রয়েছে। তবে সেই বিবাদ একসঙ্গে মিলেমিশে থাকার মিশ্র সংস্কৃতির তুলনায় সামান্যই। যে কারণে পশ্চিমবঙ্গের মন্দিরে ইসলামিক স্থাপত্য এবং মসজিদে দেবদেবীর মূর্তির কাঠামো দেয়ালে পাওয়া যায়। কিন্তু পরস্পরের ধর্ম এবং সংস্কৃতি সম্পর্কে ধারণা তৈরি না হলে পরবর্তী সময়ের বিবাদের ইতিহাসই মূল ইতিহাস হয়ে ওঠে, যা এখন হচ্ছে।
মুদ্দাসার আহমেদ নামে হুগলি জেলার এক স্কুলশিক্ষক বলেন, এসবই তো স্কুল সিলেবাসে থাকার প্রয়োজন ছিল, যে সুপারিশ করা হয়েছিল কমিশনের রিপোর্টে। বলার প্রয়োজন ছিল, প্রথম উর্দু সংবাদপত্রের প্রকাশক ও সম্পাদক দুজনেই মুসলমান ছিলেন না, ছিলেন হিন্দু। ওই শিক্ষকের প্রশ্ন, ‘তবে কি বাংলাকেও একদিন মুসলমানের ভাষা বলা হবে, যেহেতু এই ভাষা যাঁরা বলেন, তাঁদের ৭০ শতাংশ মুসলমান সম্প্রদায়ের?’
স্বাধীনতার পরবর্তী পর্যায়ে পশ্চিমবঙ্গে এমন অসংখ্য উর্দু লেখক, সাহিত্যিক, ভাষাবিদ কাজ করেছেন, যাঁরা ভারতে তো বটেই, গোটা বিশ্বেই স্বনামখ্যাত। তাঁদের অন্যতম শান্তিরঞ্জন ভট্টাচার্য। স্বাধীনতার পরবর্তী পর্যায়ে ভারতে এবং পশ্চিমবঙ্গে উর্দুর প্রচার এবং প্রসারে কেন্দ্রীয় সরকারের সংবাদ বিভাগের অফিসার শান্তিরঞ্জন ভট্টাচার্যের ভূমিকা অনস্বীকার্য। একদিকে, সাতের দশকে কংগ্রেসের মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থ শংকর রায় এবং পরবর্তীকালে বামফ্রন্ট সরকারের আমলে, রাজ্য সরকারের সঙ্গে সহযোগিতায় এবং ভাষাবিদ সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে উর্দু একাডেমি গড়ে তোলা থেকে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় অল ইন্ডিয়া রেডিওর উর্দু সংবাদ চালু করার ক্ষেত্রে শান্তিরঞ্জনের ভূমিকার তিনি নানা সরকারি সম্মান পেয়েছেন। ভারতের বার্তা পাকিস্তানের বাঙালিদের কাছে পৌঁছাতে অল ইন্ডিয়া রেডিওর উর্দু খবরের বিশেষ ভূমিকা ছিল। এ ছাড়া শান্তিরঞ্জনের বই ‘বাঙালি হিন্দুয়ো কি উর্দু খিদমত’ (উর্দুর সেবায় বাঙালি হিন্দু) তাঁকে রবীন্দ্র পুরস্কার এনে দিয়েছিল, তাঁকে চিঠি পাঠিয়ে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন খাইবার পাখতুনের (অতীতে নর্থ ওয়েস্ট ফ্রন্টিয়ার প্রভিন্স) স্বাধীনতা সংগ্রামী খান আবদুল গফফর খান থেকে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি জাকির হোসেন।
জাম-ই-জাহাঁন নুমার প্রসঙ্গে শান্তিরঞ্জনের পুত্র ও উর্দু ভাষাবিদ হারাধন ভট্টাচার্য বলেন, ‘১৮২২ সালের ৪ মার্চ কলকাতার কলুটোলা নিবাসী হরিহর দত্ত রেজিস্ট্রারের কাছে আবেদন করেন তারপরে ওই মাসের ২৭ তারিখে ইতিহাস সৃষ্টি করে প্রকাশিত হয় উর্দু ভাষার প্রথম সংবাদপত্র। প্রতি বুধবার সাপ্তাহিকটি প্রকাশিত হতো। অর্থাৎ মাসে চারবার। দাম ধার্য হয়েছিল মাসে মোট দু’টাকা। কাগজের মাপ ছিল ২০ ইঞ্চি বাই ৩০ ইঞ্চি।’ হারাধন ভট্টাচার্য্য বলেন ব্রিটিশবিরোধী গণ-আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যেতে মৌলানা আবুল কালাম আজাদের উর্দু পত্রিকা অল-হিলালের কথা। তিনি বলেন, ‘ব্রিটিশ সরকারের বিরোধিতার জন্য তাঁর কাগজ ১৯১৪ সালে বন্ধ হয়ে যায় এবং ২ হাজার টাকা জরিমানাও হয়। ভারতের স্বাধীনতাসংগ্রামের আরও এক নায়ক নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আজাদ হিন্দ বাহিনীতে উর্দু সংবাদপত্র রাখতেন এবং তার মাধ্যমে তিনি প্রচারও করতেন।’
কিছুটা এই সুরেই তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্যসভার সংসদ এবং ভারতের সাবেক সংস্কৃতিসচিব জহর সরকার বলেন, ‘মুসলমান সমাজকে তাদের দেশপ্রেমের প্রমাণ দিতে হচ্ছে। অথচ ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে আন্দামানে ১৮৫৭ সালের লড়াইয়ের পর যাদের পাঠানো হয়েছিল, তাদের ৬০ শতাংশ ছিল মুসলমান সমাজের। এখন প্রশ্ন করা হচ্ছে, তাদের দেশপ্রেম নিয়ে।’ ‘এই ভাষা আবার নতুন করে মানুষকে মানুষের সঙ্গে জুড়বে, ধর্ম এবং বিভাজনের বাইরে গিয়ে’, বলেন তৃণমূলের রাজ্যসভার সংসদ সদস্য নাদিমুল হক। যিনি উর্দু একাডেমির ভাইস চেয়ারম্যানও বটে।
‘উর্দু একাডেমির শতবর্ষ উপলক্ষে এই ভাষা-সংস্কৃতিসহ পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া উর্দু একাডেমির অন্যতম প্রধান কাজ হবে’, বলেন নাদিমুল হক। সেই লক্ষ্যে বিশ্বের উর্দুপণ্ডিতদের দিয়ে ভাষা ও সংস্কৃতিবিষয়ক একটি বই প্রকাশ করার কথাও ভাবছে পশ্চিমবঙ্গের উর্দু একাডেমি। তাৎপর্যপূর্ণভাবে কলকাতার সাধারণ মানুষ তিন দিনের এই অনুষ্ঠানে বিশেষ অংশ নেয়নি, রাজ্যের পত্র-পত্রিকাতেও কলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গের ভাষা-সংস্কৃতির এই বিস্তৃত ঐতিহ্য নিয়েও খুব একটা লেখালেখিও চোখে পড়েনি।
শুভজিৎ বাগচী প্রথম আলোর কলকাতা সংবাদদাতা।
অথচ আজ বারবার বলা হচ্ছে, উর্দু নাকি মুসলমানের ভাষা। মুসলমানের দুর্ভাগ্য হলো, যা জোর দিয়ে বলা হয়, তা-ই বিশ্বাস করে। য...