11/10/2025
জাতীয় বেতন কমিশন ২০২৫ ও চাকুরিজীবীর চাওয়া
বিগত ২০১৫ সালে বাংলাদেশে সরকারি চাকুরিজীবীদের জন্য সর্বশেষ ৮ম পে স্কেল ঘোষিত হয়। এরপর ১০ বছর পার হলেও দ্রব্য মূল্যের উর্ধগতিতে নাভিশ্বাস উঠা নিম্ন বেতনের চা চাকুরিজীবীদের নুন আনতে পান্তা ফুরায় অবস্থা। এর প্রেক্ষিতে বাংলাদেশে শিক্ষকদের ৯ম পে স্কেল সার্কভুক্ত দেশগুলোর সাথে সামঞ্জস্য রেখে কেমন হওয়া উচিত তা নিয়ে আমার মতামত
সার্কভুক্ত দেশগুলোর শিক্ষকদের প্রারম্ভিক বেতনের তুলনামূলক তালিকা
দেশ স্তর বেতনের ধরন প্রারম্ভিক মাসিক বেতন (BDT-তে আনুমানিক) বেতনের গ্রেড ও মন্তব্য
বাংলাদেশ প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক সর্বসাকুল্যে ≈ ১৭,৯৫০ - ১৯,৫০০ টাকা ১৩তম গ্রেড (মূল বেতন ≈ ১১,০০০ টাকা)। দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন বেতনের মধ্যে একটি।
বাংলাদেশ সরকারি মাধ্যমিক সহকারী শিক্ষক সর্বসাকুল্যে ≈ ২৬,০০০ টাকা দশম গ্রেড।
বাংলাদেশ এমপিওভুক্ত মাধ্যমিক সহকারী শিক্ষক সর্বসাকুল্যে ≈ ১৭,৫০০ - ২০,০০০ টাকা ১১তম গ্রেড (মূল বেতন ≈ ১২,৫০০ টাকা + ভাতা)। শুধুমাত্র মূল বেতন সরকারি স্কেল অনুযায়ী।
ভারত প্রাথমিক শিক্ষক (পশ্চিমবঙ্গ) সর্বসাকুল্যে ≈ ৩৫,০০০ টাকা রাজ্য ও পদভেদে ভিন্নতা রয়েছে। এটি বাংলাদেশের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ।
ভারত মাধ্যমিক শিক্ষক (পশ্চিমবঙ্গ) সর্বসাকুল্যে ≈ ৪০,০০০ টাকা বা তার বেশি রাজ্য ও পদভেদে ভিন্নতা রয়েছে।
মালদ্বীপ প্রাথমিক শিক্ষক মাসিক গড় ≈ ৬৩,০০০ টাকা (≈ ৯৫৩ USD) দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। জীবনযাত্রার ব্যয়ও বেশি।
মালদ্বীপ মাধ্যমিক শিক্ষক মাসিক গড় ≈ ৯০,০০০ টাকা
নেপাল প্রাথমিক/মাধ্যমিক সহকারী শিক্ষক মাসিক গড় ≈ ৩৫,০০০ টাকা (≈ ৪৬৭ USD)
ভুটান প্রাথমিক/মাধ্যমিক শিক্ষক মাসিক গড় ≈ ৩৩,০০০ - ৩৯,০০০ টাকা (≈ ৩৪৩ - ৪৬৭ USD) ভুটানে চিকিৎসক ও শিক্ষকদের বেতনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
শ্রীলঙ্কা প্রাথমিক শিক্ষক মাসিক গড় ≈ ২৭,০০০ টাকা (≈ ২৫০ USD)
শ্রীলঙ্কা মাধ্যমিক শিক্ষক মাসিক গড় ≈ ৩২,০০০ টাকা
পাকিস্তান প্রাথমিক শিক্ষক মাসিক গড় ≈ ৩০,০০০ টাকা (≈ ২০৬ USD)
পাকিস্তান মাধ্যমিক শিক্ষক মাসিক গড় ≈ ৩০,০০০ টাকা
বেতন কাঠামোর বিশ্লেষণ ও মূল্যায়ণ
তালিকাটি থেকে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে, বেতন-ভাতা ও মর্যাদার দিক থেকে বাংলাদেশের শিক্ষকরা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক পিছিয়ে আছেন।
বৈষম্য: প্রাথমিক শিক্ষকের বেতনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে সর্বনিম্নে অবস্থান করছে। মালদ্বীপের শিক্ষকদের মাসিক গড় বেতন বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষকদের বেতনের প্রায় চার থেকে পাঁচ গুণ। এমনকি ভারত, নেপাল, ভুটান ও পাকিস্তানেও বাংলাদেশের তুলনায় বেতন অনেক বেশি।
মর্যাদার ঘাটতি: বাংলাদেশে প্রাথমিক সহকারী শিক্ষকরা এখনো ১৩তম গ্রেডে (তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীর মর্যাদা) বেতন পান, যেখানে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীরা এই পদে নিয়োগ পান। অন্যদিকে, অনেক দেশে শিক্ষকদের পদকে উচ্চতর গ্রেডে রাখা হয়।
এমপিওভুক্তির সমস্যা: বাংলাদেশের মাধ্যমিক স্তরের বেশিরভাগ শিক্ষকই (এমপিওভুক্ত) শুধু মূল বেতন পান। বাড়ি ভাড়া ও অন্যান্য ভাতা অপ্রতুল। সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষকদের সাথে তাদের বেতনে বড় ধরনের বৈষম্য রয়েছে।
এই পরিস্থিতি বিবেচনায়, ৯ম পে স্কেলে কেবল দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নয়, বরং শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা ও আঞ্চলিক বেতনের সাথে সামঞ্জস্য রেখে একটি যৌক্তিক ও উচ্চতর বেতন কাঠামো প্রণয়ন করা জরুরি।
(দ্রষ্টব্য: এই পরিসংখ্যানগুলি শিক্ষকদের বেতন সংক্রান্ত তথ্যের উপর ভিত্তি করে দেওয়া হয়েছে, যা প্রায়শই সরকারি কর্মচারীদের সামগ্রিক বেতন কাঠামোর নিম্ন স্তরের একটি ইঙ্গিত বহন করে। )
৯ম পে স্কেল কেমন হওয়া উচিত
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক তুলনার ভিত্তিতে নবম পে স্কেল নির্ধারণে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো বিবেচনা করা উচিত:
১. সর্বনিম্ন বেতনের যৌক্তিকতা:
প্রস্তাবিত সর্বনিম্ন বেসিক: বর্তমান জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় সর্বনিম্ন গ্রেডের (গ্রেড-২০) মূল বেতন কমপক্ষে ২০,০০০ টাকা থেকে ২৫,০০০ টাকার মধ্যে নির্ধারণ করা উচিত।
যুক্তিসঙ্গত কারণ: ২০১৫ সাল থেকে জীবনযাত্রার ব্যয় শহরের ক্ষেত্রে (বিশেষ করে খাদ্য, বাসা ভাড়া ও পরিবহন) প্রায় ১৫৩% এবং গ্রামের ক্ষেত্রে ১৪২% পর্যন্ত বেড়েছে বলে বিশ্লেষণে দেখা যায়। নিম্ন আয়ের কর্মচারীদের জীবনধারণের ন্যূনতম প্রয়োজন মেটাতে বর্তমানের সর্বনিম্ন বেতন খুবই অপ্রতুল। তাই কমপক্ষে ২০,০০০ টাকা বা তার কাছাকাছি একটি অঙ্ক থেকে সর্বনিম্ন মূল বেতন শুরু করা উচিত।
২. সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন বেতনের অনুপাত (Ratio):
বর্তমান: ২০১৫ সালের বেতন স্কেলে সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন বেতনের অনুপাত ছিল প্রায় ১০:১।
প্রস্তাবিত: পে-কমিশনের পর্যালোচনায় প্রতিবেশী দেশগুলির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এই অনুপাতটি ৮:১ থেকে ১০:১-এর মধ্যে রাখার কথা বলা হয়েছে। তবে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে কম অনুপাত (যেমন ৮:১ বা ৯:১) নির্ধারণ করা উচিত, যাতে বেতন বৈষম্য হ্রাস পায় এবং নিম্ন আয়ের কর্মচারীরা বেশি সুবিধা পান।
৩. বেতন বৃদ্ধি (ইনক্রিমেন্ট) এবং অন্যান্য ভাতা:
বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট: বর্তমানে বছরে ৫% হারে ইনক্রিমেন্ট দেওয়া হয়। দ্রব্যমূল্যস্ফীতির সাথে সামঞ্জস্য রাখতে এর হার বাড়ানো অথবা নির্দিষ্ট সময় পরপর উচ্চতর গ্রেড নিশ্চিত করার ব্যবস্থা রাখা উচিত।
চিকিৎসা ভাতা: বর্তমানে কর্মচারীরা চাকরির শুরু থেকে অবসর পর্যন্ত মাসে ১,৫০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা পান। এই ভাতাটি কয়েক গুণ বাড়ানো এবং অবসরোত্তর সময়ে আরও বেশি সুবিধা রাখার সুপারিশ করা হচ্ছে।
শিক্ষা ভাতা: কর্মচারীদের সন্তানদের শিক্ষা ভাতাও বাড়ানোর সুপারিশ করা যেতে পারে।
বাড়ি ভাড়া: বাড়ি ভাড়া মূল বেতনের একটি যৌক্তিক অংশ (যেমন ৬০%) নির্ধারণ করা উচিত, যাতে গ্রাম ও শহরের বৈষম্য দূর হয় এবং কর্মচারীরা সব স্থানে সম্মানের সাথে বসবাস করতে পারে।
৪. মহার্ঘ ভাতা (Dearness Allowance - DA):
মূল্যস্ফীতির কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে গেলে কর্মচারীদের সাময়িক সুবিধা দিতে মহার্ঘ ভাতা বা বিশেষ প্রণোদনা দেওয়ার প্রচলন আছে। ৯ম পে স্কেল চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত বা এর কার্যকারিতার পরেও মূল্যস্ফীতি যদি উচ্চ থাকে, তবে নিয়মিত বিরতিতে মহার্ঘ ভাতা বা বিশেষ সুবিধা চালু রাখা উচিত।
উপসংহার:
নতুন পে স্কেল এমনভাবে নির্ধারণ করা উচিত যাতে তা কেবল মূল্যস্ফীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়ে, নিম্ন বেতনের কর্মচারীদের জন্য একটি মর্যাদাপূর্ণ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবন নিশ্চিত করতে পারে। একই সাথে, সার্কভুক্ত অন্যান্য দেশের সরকারি কর্মচারীদের বেতন কাঠামোর তুলনায় যেন বাংলাদেশের অবস্থান উন্নত হয় এবং দেশের অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় থাকে, সেদিকে নজর দিয়ে জাতীয় বেতন কমিশন ২০২৫ একটি যোক্তিক বেতন কাঠামো প্রকাশ করবে এ আশাবাদ কামনা করছি।
মোঃ রফিকুল ইসলাম
সিনিয়র শিক্ষক
পাবনা সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়, পাবনা।