28/07/2025
আমি আল্লাহর গোলাম, আল্লাহই আমার জন্য যথেষ্ট
মাওলানা মাসুম বিল্লাহ....
মানুষের জীবনে কিছু কি যেছু অধ্যায় থাকে, যেগুলো শুধু ইতিহাস নয়—আত্মার গভীর কষ্ট, ত্যাগ আর প্রত্যয়ের প্রতিচ্ছবি। আমি এ জীবনে যা দেখেছি, যা হারিয়েছি, আর যা পেয়েছি—সবকিছুই ছিল আল্লাহ প্রদত্ত তকদীরের অংশ। এই সাক্ষাতে আমি স্মরণ করতে চাই আমার জীবনের সেইসব অধ্যায়, যেগুলো আমাকে নির্মাণ করেছে, ভেঙেছে, আবার গড়ে তুলেছে। আমি সাক্ষ্য দিই, আমি আল্লাহর গোলাম, এবং তিনি-ই আমার জন্য যথেষ্ট।
প্রারম্ভিক খেদমত ও স্বপ্নের শুরু
২০০৩ সাল। সদ্য দাওরায়ে হাদীস শেষ করেছি। তখনো চোখে স্বপ্ন, অন্তরে তাজা ঈমানের উত্তাপ। শাইখুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক (রহঃ)–এর নির্দেশে খুলনার সাজিয়াড়া মাদ্রাসায় হাদীসের খেদমতের মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করি। তিন বছরের নিষ্ঠাপূর্ণ খেদমতে ছাত্রদের ভালোবাসা, ওস্তাদদের প্রশ্রয় এবং এলাকাবাসীর শ্রদ্ধা পাই। ভেবেছিলাম, এভাবেই দ্বীনের পথে আমৃত্যু কাজ করে যাব।
কিন্তু হঠাৎ করেই সবকিছু ভেঙে যায়। সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ, যাকে নিজের আত্মার অংশ মনে করতাম, তার হাত থেকেই আসে আঘাত। সেই প্রতিহিংসার আগুন আমার সব ইখলাসকে পোড়াতে চেয়েছিল, কিন্তু আল্লাহর রহমতে ঈমান জ্বলতে থাকে অন্তরে।
নতুন যাত্রা ও নতুন পরীক্ষা
২০০৫ সালের শেষ দিকে নোয়াপাড়ার ঐতিহ্যবাহী মাদ্রাসায় খেদমতের আহ্বান আসে। বহু সুপারিশের পর রাজি হই। সাজিয়াড়া ছেড়ে নতুন যাত্রা শুরু করি। কিন্তু বিধি ছিল ভিন্ন। যাদেরকে কলিজা থেকেও বেশি ভালোবেসেছি, তাদের কারো কারো অনভিপ্রেত আচরণ আমাকে ভেতর থেকে ভেঙে দেয়। দ্বীনী মাদ্রাসায় খেদমতের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলি। বেছে নেই ব্যবসার পথ। তবুও দ্বীনী দায়বদ্ধতা থেকে মসজিদের ইমামতি ও খতীবের দায়িত্ব পালন অব্যাহত রাখি—বিনা পারিশ্রমিকে।
জীবনের নতুন অধ্যায়: জামিয়া ইসলামিয়া আমেনা
২০০৭ সালে একজন অভিভাবকতুল্য উস্তাদের অনুরোধে একটি মহিলা মাদ্রাসার দায়িত্ব গ্রহণ করি। দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে দিনরাত্রি এক করে তিল তিল করে গড়ে তুলি "জামিয়া ইসলামিয়া আমেনা"। যখন প্রতিষ্ঠানটি আলোর মুখ দেখতে শুরু করে, তখনই সহকর্মীদের মধ্যে কিছু হিংসুক, চাটুকার, ক্ষমতালোভীর ষড়যন্ত্র শুরু হয়। অসুস্থতার সুযোগে তারা আমাকে আই সি ইউ তে থেকে যে কষ্ট পেয়েছি তার থেকে বেশি কষ্ট দেয় ,আমি সব কিছু আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিয়ে ইস্তেফা দেই—হৃদয়ে আঘাতের রক্তক্ষরণ নিয়ে।
হজের সফর: আল্লাহর ঘরে চোখের পানি
২০১০ সাল। আর্থিক সংকট ও ঋণের বোঝা নিয়েই হঠাৎ করে হজে যাওয়ার সুযোগ হয়। আল্লাহর ঘরের প্রতিটি রোকন আদায়ের সময়, মিনা, মুজদালিফা, আরাফাহ—প্রত্যেক স্থানেই চোখের পানি ফেলেছি, দু’আ করেছি, কেঁদেছি। হয়তো আল্লাহ সেই কান্না কবুল করেছেন। এরপর থেকে বারবার হজের সৌভাগ্য অর্জন করেছি। আল্লাহ তায়ালা আলেম-ওলামা, ইমাম-মুআজ্জিন—অনেককে বিনা খরচে হজ্ব করানোর তাওফীক দান করেছেন আলহামদুলিল্লাহ।
নতুন প্রজন্ম ও নতুন স্বপ্ন
২০১৭ সালে স্বপ্নবাজ কিছু তরুণ, যোগ্য, সন্তানতুল্য উলামায়ে কেরামকে নিয়ে একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেছি। আল্লাহর মেহেরবানী, সংশ্লিষ্ট সকলের সহযোগিতা- আন্তরিকতা ও উস্তাদ- ছাত্রদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় স্বল্প সময়ে দাওরা হাদীস মাদরাসায় উন্নীত হয়েছে আলহামদুলিল্লাহ। সাধারণ, স্কুলগামী এবং বয়স্কদের দ্বীন ও সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত করতে আরও কিছু প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলি। পূর্বের অভিজ্ঞতা আমাকে শিখিয়েছে—সবচেয়ে আপনজনও একদিন শত্রু হতে পারে। তাই এখনকার খেদমত করছি পূর্ব কষ্ট চেপে, পাথরহৃদয় নিয়ে, কিন্তু লক্ষ্যচ্যুতি ছাড়াই।
আন্দোলন, নির্যাতন ও বাতিলের ষড়যন্ত্র
২০০১ সালে যখন হক্কানী ওলামায়ে কেরাম নির্যাতনের শিকার হন, তখন আমি সামর্থ্য অনুযায়ী দ্বীনি আন্দোলনে অংশ নেই। এর প্রতিফলনস্বরূপ পুলিশি হয়রানি, চক্রান্ত, হুমকি সহ্য করি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, তখনও কেউ কেউ বাতিলের সহযোগী হয়ে কষ্ট দেয়। তবুও আমি আদর্শচ্যুতি ঘটাইনি।
আজকের বাস্তবতা ও ভবিষ্যতের দ্বিধা
৫ আগস্ট ২০২৪-এর পর, সারাদেশে হক্কানী আলেমদের জন্য একটি সম্মিলিত প্ল্যাটফর্ম গঠিত হচ্ছে। ইসলামী নেতৃত্বের প্রয়োজনে আমীরে মজলিস আল্লামা মামুনুল হক (হাফিঃ)-এর পক্ষ থেকে যশোর-৪ আসনে আমাকে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে। আমি চাইনি, প্রস্তুতও ছিলাম না, তবুও না বলতে পারিনি। আবারো নিজের কিছু আপনজনের বিরূপ প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করছি।
শেষ কথা।আমি এখনো বলি:
আমি আল্লাহর গোলাম। আল্লাহই আমার জন্য যথেষ্ট।
মানুষের বিশ্বাসঘাতকতা, হিংসা, ষড়যন্ত্র—সবই সাময়িক। কিন্তু হক, ইখলাস ও সবর—এই তিনটি কখনো পরাজিত হয় না। আমি আল্লাহর উপর ভরসা করি, হকের পথে অটল থাকতে চাই। এই স্মৃতিচারণ আমার নয়, একজন গোলামের—যিনি সবকিছুর পরেও বলে, "আমার রবই আমার জন্য যথেষ্ট।"
আমরা মাওলানা মাসুম বিল্লাহ সাহেবের ছাত্র বৃন্দের পক্ষ থেকে হযরতের সাথে সাক্ষাৎ করতে গেলে তিনি অনেক কষ্টের কথা ও স্মৃতির বর্ণনা দেন । সাক্ষাৎকারের কিছু অংশ তুলে ধরা হলো,২৮ জুলাই সোমবার ২৫ ঈসায়ী