13/05/2022
মদিনাকে আমি খুব করে অনুভব করতে চেয়েছি।
মদিনার আলো-হাওয়া-জলে আমাদের সোনালি প্রজন্মের মানুষদের যে স্মৃতি ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, যদিও তা দৃশ্যমান নয় কোথাও, তবুও আমি চেষ্টা করেছি মস্তিষ্কের কোষাগারে সেসব স্মৃতিকে পুনরুজ্জীবিত করে, সেগুলোকে হৃদয় দিয়ে কাছ থেকে অনুভব করার।
মদিনা আমাদের কাছে বিশেষভাবে ভাস্বর হয়েছে হিজরতের দিন থেকে। দিনটাকে যখনই অনুভব করতে গেলাম, আমার সামনে স্মৃতির পাতা থেকে উঠে এসেছে কয়েকটা মনোরম দৃশ্য!
উটে চড়ে মদিনায় প্রবেশ করছেন নবিজী সাল্লাললাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। সাথে আবু বাকার রাদিয়াল্লাহু আনহু। চারপাশে মদিনার লোকজন দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানাচ্ছে আল্লাহর রাসুল সাল্লাললাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে। সকলে প্রত্যাশা করে আছে— কার আঙিনায় এসে দাঁড়াবেন আল্লাহর রাসুল! কার আঙিনায় পড়বে বারাকাহর পদযুগল! কার উঠোন ধন্য হবে নববী পদচারণায়! সকলের মনে সে এক দারুন উত্তেজনা! সে মহা সৌভাগ্যের অধিকারী হতে সকলেই তখন উন্মুখ হয়ে আছে যেন!
মদিনার মানুষদের এই উত্তেজনাকে আঁচ করলেন নবিজী সাল্লাললাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। সকলের পরম ভালোবাসায় সিক্ত নবিজী হতাশ করতে চাইলেন না কাউকেই। তিনি ঠিক করলেন— তাঁর বাহন যার আঙিনায় গিয়ে দাঁড়াবে, তার ঘরের মেহমান হবেন তিনি।
সকল জল্পনা আর কল্পনার অবসান ঘটিয়ে নবিজী সাল্লাললাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উট এসে থামলো আবু আইয়ুব আনসারী রাদিয়াল্লাহু আনহুর উঠোনে। আমি কল্পনায় আঁকতে চাইলাম আবু আইয়ুব আনসারী রাদিয়াল্লাহু আনহুর সে মুহূর্তের চেহারা। অনাবিল আর অপার্থিব আনন্দে কেমন উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিলো তার মুখাবয়ব? এ যে স্বপ্নের অধিক কিছু!
মদিনার মাটিতে দাঁড়িয়ে আমি অভিনন্দন জানালাম আবু আইয়ুব আনসারী রাদিয়াল্লাহু আনহুকে, এবং ঈর্ষা করলাম তার ভাগ্যকেও। ইশ! কেমন সৌভাগ্যের অধিকারী হলে মদিনায় নবিজী সাল্লাললাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রথম প্রহরগুলোর মেহমানদারির দায়িত্ব পাওয়া যায়!
মদিনায় দাঁড়িয়ে আমি অনুভব করতে চাইলাম সালমান আল ফারসি রাদিয়াল্লাহু আনহুকেও। সেই সাহাবা যিনি সত্য দ্বীনের খোঁজে ইরানের ইস্পাহান নগরী থেকে একদিন পাড়ি জমিয়েছিলেন। বরণ করেছিলেন নিশ্চিত বিপদ আর ত্যাগ করেছিলেন রাজকীয় জীবন। সালমান আল ফারসি— আমার জীবনে এক বড় অনুপ্রেরণার নাম!
তিনি ছিলেন অগ্নিপূজক। ঘটনাক্রমে একদিন দেখা পান খিস্টান ধর্মের এক পাদ্রীর। পাদ্রীর বলা কথাগুলো এবং তাদের ধর্মাচার তাঁর এতো ভালো লেগে যায় যে, তিনি বিশ্বাস করতে শুরু করলেন— অগ্নিপূজা অবশ্যই সঠিক ধর্ম হতে পারে না। সঠিক ধর্ম হলো খ্রিস্টান ধর্ম।
সেই খ্রিস্টান পাদ্রীর সাহচর্য পেতে তিনি গৃহত্যাগী হলেন। পাড়ি জমালেন দূরের পথ। নিবিড়ভাবে লেগে রইলেন সেই পাদ্রীর সাহচর্যে। একদিন পাদ্রীর দুনিয়ার আয়ু ফুরিয়ে এলে, সালমান আল ফারসি রাদিয়াল্লাহু আনহু তাকে বললেন, 'আপনি তো জীবনের ক্রান্তিলগ্নে চলে এসেছেন। আপনি জানেন আমি এক মহাসত্যের খোঁজ করে চলেছি। আপনি আমাকে কি বলবেন আপনার মৃত্যুর পর আমি কার কাছে গেলে সেই সত্যের দেখা পাবো?'
পাদ্রী তাঁকে অন্য আরেক পাদ্রীর সন্ধান দিলেন। বললেন, 'ওর কাছে যাও। সে তোমাকে পথ দেখাবে'।
সালমান আল ফারসি রাদিয়াল্লাহু আনহু এক পাদ্রীর কাছে যায়, সে পাদ্রী মৃত্যুর আগে অন্য পাদ্রীর সন্ধান দেয়। এভাবে চলতে চলতে, পাদ্রীদের সাহচর্যের খোঁজ করতে করতে একদা সালমান আল ফারসি কোন এক বণিকদলের হাতে ধরাশায়ী হয় এবং বণিকদল তাঁকে মদিনার কোন এক ব্যক্তির কাছে দাস হিশেবে বিক্রি করে দেয়। সর্বশেষ যে পাদ্রীর সাহচর্য তিনি পেয়েছিলেন, সেই পাদ্রী তাঁকে জানিয়েছিলেন সেই মহাসত্যের কিছু নিদর্শন। সেই মহাসত্যের ধারক, আল্লাহর প্রেরিত সর্বশেষ রাসুল কোন অঞ্চলে আসবেন, কী কী থাকবে তাঁর নিদর্শন— এসবকিছুই।
বণিকদলের কাছে ধরাশায়ী হয়ে মদিনায় এসে সালমান আল ফারসি রাদিয়াল্লাহু আনহু চিনতে পারলেন সেই অঞ্চলকে। পাদ্রীর বাতলানো সেই অঞ্চলেই যে তাঁর ভাগ্য তাঁকে টেনে নিয়ে এসেছে, সেটা বুঝতে তাঁকে কোন বেগ পেতে হয়নি। বাদবাকি নিদর্শনের দেখা পাওয়ার অধীর অপেক্ষায় দিন কাটাতে লাগলেন তিনি।
মদিনার যে লোক সালমান আল ফারসি রাদিয়াল্লাহু আনহুকে কিনেছিলো, তার খেঁজুর বাগানে মালির কাজ করতেন তিনি। প্রত্যেকদিনের মতো সেদিনও খেঁজুর গাছে উঠে কাজ করছিলেন তিনি। তার মনিব অদূরেই দাঁড়ানো ছিলো। সালমান আল ফারসি শুনতে পেলেন— কেউ একজন তাঁর মনিবের কাছে এসে বলছে, 'শুনেছেন, আমাদের এলাকায় অমুক জায়গা থেকে এক লোক এসেছে। তার অনেক ভক্ত-সমর্থক জুটেছে চারদিকে। লোকটা বলছে, সে নাকি আল্লাহর প্রেরিত রাসুল। তাঁর ওপরে নাকি আল্লাহ ওহি নাযিল করে'।
এই সংবাদটুকুর জন্যেই তো সালমান আল ফারসি রাদিয়াল্লাহু আনহুর জনম জনমের অপেক্ষা! কথাগুলো শুনার পর একটা ঠান্ডা শিরশিরে অনুভূতি যেন তাঁর শিঁরদাঁড়া বেঁয়ে নেমে গেলো। মুহূর্তে তাঁর কী যে হলো— চোখের পলকে খেঁজুর গাছ থেকে নেমে তিনি চলে এলেন মনিবের সামনে। এসে সোজা সংবাদ বহনকারী সেই লোককে জিগ্যেশ করে বসলেন, 'আপনি কার কথা বলছেন? কোথায় এসেছেন তিনি? তিনি কোন ধরণের কথা বলেন?'
নিজের ক্রয়কৃত দাসের এমন আস্কারা দেখে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন মনিব। একটা কড়া ধমক দিলেন সালমান আল ফারসিকে। বললেন, 'যাও, নিজের কাজ করো। কোথায় কী ঘটেছে তা জেনে তোমার কাজ কী?'
কাজে তিনি ফিরে গেলেন বটে, কিন্তু অন্তরটা যেন পড়ে রইলো ওই সংবাদেই। যে মহামানবের আগমন বাণী তিনি শুনেছিলেন পাদ্রীদের কাছে, যার আগমনে ধরণীতে প্রতিষ্ঠিত হবে সত্য-ধর্ম, যার ওপর নাযিল হবে সেই সর্বশেষ মহাগ্রন্থ, তবে কি তিনি চলেই এলেন?
কাজ শেষ করে সন্ধ্যায় খোঁজ করতে করতে তিনি চলে এলেন নবিজী সাল্লাললাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে। দেখলেন নবিজীর চারপাশে বেশ অনেক মানুষের সমাগম। আসার সময় তিনি কিছু খেঁজুর নিয়ে এসেছিলেন নবিজীর জন্যে। নবিজীকে খাওয়াতে নয়, পরীক্ষা করতে।
সর্বশেষ যে পাদ্রীর কাছে তিনি ছিলেন, মৃত্যুর আগে সেই পাদ্রী সালমান আল ফারসি রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বলেছিলেন, 'সেই মহামানব মরুভূমি অঞ্চল থেকে আবির্ভূত হবে। তাঁকে যদি সাদাকার কোন বস্তু দেওয়া হয়, সেই বস্তু তিনি খাবেন না। তবে— সাদাকার বস্তু না দিয়ে যদি হাদিয়ার কোনোকিছু তাঁকে দেওয়া হয়, সেটা তিনি সানন্দে খাবেন। এবং— তাঁর ঘাঁড়ে নবুয়াতের একটা সিলমোহর থাকবে। এসব নিদর্শন যার মাঝে দেখতে পাবে, বুঝে নিবে সে-ই আল্লাহর প্রেরিত সর্বশেষ মহামানব। জগতসংসারজুড়ে তাঁর জন্যেই সকলের অধীর অপেক্ষা'।
পাদ্রীর কথামতো, নবিজীকে পরীক্ষা করতেই সালমান আল ফারসি রাদিয়াল্লাহু আনহু খেঁজুরগুলো নিয়ে এসেছেন সাথে। খানিক বাদে নবিজীর সাথে কথা বলার সুযোগ হলো তাঁর। নিজের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দিয়ে তিনি বললেন, 'সাদাকার এই খেঁজুরগুলো আপনার জন্যে এনেছি। যদি গ্রহণ করেন কৃতার্থ হবো'।
তিনি দেখলেন, নবিজী সাল্লাললাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর হাত থেকে খেঁজুরগুলো নিলেন বটে, তবে খেলেন না। সেগুলো সাহাবাদের মাঝে বিলিয়ে দিলেন।
একটা নিদর্শনের মিল পেয়ে বুকের ধুকপুকানি বেড়ে গেলো সালমান আল ফারসি রাদিয়াল্লাহু আনহুর।
পরেরদিন তিনি আবারও খেঁজুর সমেত উপস্থিত হলেন নবিজীর সামনে। বললেন, 'হাদিয়ার এই খেঁজুরগুলো আপনার জন্যে। গ্রহণ করলে খুশি হবো'।
হাত বাড়িয়ে খেঁজুরগুলো গ্রহণ করলেন নবিজী। এবং, সাহাবাদের সাথে ভাগাভাগি করে সানন্দে খেতে লাগলেন সেই খেঁজুর।
এই দৃশ্য দেখে সালমান আল ফারসি রাদিয়াল্লাহু আনহুর হৃদয়ে যে কী তোলপাড় শুরু হলো তা বর্ণনাতীত! সেই মহাসত্যের খুব কাছাকাছি তিনি যে মহাসত্যের জন্য তিনি ছেঁড়েছেন রাজকীয় জীবন, পরিবার, সমাজ আর দেশ। আর কেবল একটা নিদর্শন। নিজেকে আল্লাহর নবি দাবি করা এই লোকটার ঘাঁড়ে নবুয়াতের সিলমোহর!
কিন্তু কীভাবে সেটা দেখবেন তিনি? তিনি পিঁছু নিলেন নবিজী সাল্লাললাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের। আকুপাকু করছেন সর্বদা। এদিক থেকে তাকান, ওদিক থেকে তাকান, কিন্তু দেখতে পান না কোনোভাবে। কাপড়ে আবৃত সেই জায়গা।
কীভাবে নবিজী সাল্লাললাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আঁচ করলেন তাঁর মনের অবস্থা। সালমান আল ফারসি রাদিয়াল্লাহু আনহু যাতে সহজে দেখতে পায় সেজন্যে নিজের ঘাঁড়ের কাপড়টুকু একটু সরিয়ে দিলেন নবিজী সাল্লাললাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। মুহূর্তেই নবিজীর ঘাঁড়ে থাকা নবুয়াতের সেই সিলমোহর দৃশ্যমান হয়ে উঠলো সালমান আল ফারসি রাদিয়াল্লাহু আনহুর সামনে।
আনন্দে আত্মহারা সালমান আল ফারসি দৌঁড়ে এসে মুঠোবন্দি করলেন নবিজীর হাত। চুমুতে চুমুতে ভরিয়ে দিলেন নবিজীর হস্তদ্বয়। এ যে কী এক পরম প্রাপ্তি, জীবনের কী যে এক অর্জনের এই মুহূর্ত— তা বোঝানোর ভাষা কোথায় পাবেন সালমান আল ফারসি রাদিয়াল্লাহু আনহু? এই আনন্দ, এই খুশিকে কীভাবে প্রকাশ করবেন তিনি?
মদিনায় যখনই কোন খেঁজুর গাছ দেখেছি, আমার খুব কর মনে পড়েছে সালমান আল ফারসি রাদিয়াল্লাহু আনহুর কথা। মনে পড়েছে সত্যের জন্য তাঁর ত্যাগ-তিতীক্ষার কথা। এই মদিনারই কোন এক প্রান্তে, মাসজিদ আন নববীর কোন এক কোণায় একদিন তাঁর সাথে প্রথম দেখা হয়েছিলো নবিজী সাল্লাললাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের। আমি হাতড়ে বেড়িয়েছি সেই স্মৃতি। খেঁজুর হাতে আসা একজন লোক, একটা নিদর্শনের দেখা পেতে নবিজীর পিঁছু নেওয়া একজন ব্যক্তি— যেন মদিনার বাতাসে এখনও ঘ্রাণ পাওয়া যায় সেই খেঁজুরের। নবিজীকে চিনতে পেরে সালমান আল ফারসি রাদিয়াল্লাহু আনহুর বুকে যে ধুকপুকানি তৈরি হয়েছিলো, গভীরভাবে কান পাতলে বাতাসে এখনও যেন সেই ধুকপুকানির শব্দ শুনতে পাওয়া যায়।
ইয়া রাব্বাল কা'বা, আপনি আবু আইয়ুব আনসারী রাদিয়াল্লাহু আনহুকে, সালমান আল ফারসি রাদিয়াল্লাহু আনহুকে সহ সমস্ত সাহাবাকে জান্নাতের সবচেয়ে মনোরম নিয়ামতগুলো দিয়ে বরণ করে নিন।
'আমার উমরাহ সফরের ডায়েরি-০৭'।
আয়িশা
30/12/2021