03/06/2026
রাষ্ট্র কি এই মেধাবীদের কোনোদিন মূল্যায়ন করবে না?
গত শনিবারে এক ভাইয়ের স্ত্রীর ডেলিভারি হয়, রাজশাহী মেডিকেল কলেজে। ফুটফুটে সুন্দর এক ছেলে সন্তান হয়েছে। লেবার রুমের বাইরে আমি প্রায় ৪ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে ছিলাম। সন্ধ্যা ৬টার দিকে বাচ্চা পৃথিবীর আলো দেখে।
উনি যখন ভাবিকে মেডিকেলে নিয়ে যান, তখন ডাক্তাররা (এফসিপিএস ট্রেইনি; দুপুর ২টার পর হওয়াতে সিনিয়র কাউকে পাওয়া যায়নি) প্রথম চেকআপ করেন। ভাবীর যেহেতু প্রথম বাচ্চা, সেহেতু ভাই-ভাবী দুজনেই বেশ ভয় পাচ্ছিলেন। ওনারা ডাক্তারদের সাথে কথা বলতেও কিছুটা ইতস্তত বোধ করছিলেন। পরে আমি গিয়ে কথা বললাম; কর্তব্যরত ডাক্তার আমাকে অভয় দিলেন এবং আবার চেক করলেন। বললেন, "সব ঠিক আছে, কিছুক্ষণের মধ্যেই ডেলিভারি হয়ে যাবে।"
আলহামদুলিল্লাহ, কোনো জটিলতা ছাড়াই বেশ সুন্দরভাবে নরমাল ডেলিভারি হলো। ডাক্তারের খরচ কত হয়েছে জানেন? একটা টাকাও না! একজন দাই (আয়া) যিনি ডেলিভারিতে সাহায্য করেছিলেন, উনি কিছু টাকা চাইলেন, সাথে আনসার সদস্যরাও। কিন্তু টাকা চায়নি কে জানেন? ওই এফসিপিএস ট্রেইনি চিকিৎসক। আমার পরিচিত একজনের মাধ্যমে খোঁজ নিয়েছিলাম যে ট্রেইনিদের কিছু দিতে হবে কি না। এক কথায় না! এমনকি টাকা অফার করলে ওনারা অনেক ক্ষেত্রে মাইন্ডও করেন।
সেখানে বেডের দ্বিগুণেরও বেশি রোগী থাকলেও, ওনারা সাধ্যমতো সেবা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন (অন্তত আমার কাছে সেটাই মনে হয়েছে)। সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা ভালো পাওয়া যায় না, এটা সত্যি, অস্বীকার করব না। তবে আমার অভিজ্ঞতা এখন পর্যন্ত বেশ অন্যরকম।
চট্টগ্রামে থাকার সময়ও বেশ কয়েকবার মেডিকেলে যেতে হয়েছিল। সিরিয়াল পেতে সময় লেগেছে ঠিকই, কিন্তু কোনোবারই ওনারা আমাকে হতাশ করেননি। একবার সিলেটে গিয়ে দুর্ঘটনায় পড়লাম, পা কেটে চৌচির অবস্থা। ওসমানী মেডিকেলে গেলাম; দায়িত্বে থাকা ইন্টার্নরা চমৎকার ব্যবহার করলেন এবং পরম দায়িত্বে সব বুঝিয়ে দিয়ে সেবা দিলেন।
এই ছেলেমেয়েগুলো দেশের সবচেয়ে মেধাবী সন্তান। প্রতিদিন কত ঘণ্টা পড়াশোনা করলে একজন ডাক্তার হওয়া যায়, তা বাংলাদেশের কোনো নাগরিকের অজানা নয়। দেশের সবচেয়ে ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্টরাই ডাক্তারি পেশায় যায়, এটা কি কেউ অস্বীকার করবেন? তাহলে তাদের সম্মানটাও তো অন্যরকম হওয়া উচিত। কিন্তু কেন এই অবহেলা?
অথচ দেখুন, কী নিদারুণ কষ্ট তাদের! আপনারা যারা জানেন না, তাদের উদ্দেশ্যে বলি, অনেকেই ভাবেন শুধু প্রশাসন, আর্মি, পুলিশ বা এই ধরনের সার্ভিসে যারা আছেন, তারাই বুঝি ফ্যামিলির সাথে ঈদ করতে পারেন না। কিন্তু আপনার এটাও জানা দরকার যে, একজন ট্রেইনি চিকিৎসককেও ঈদে রোস্টার ডিউটি করতে হয়। এক ঈদ হাসপাতালে কাটলে, অন্য ঈদে হয়তো পরিবারের কাছে যাওয়ার সুযোগ মেলে। দিন নেই, রাত নেই, ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপারেশন থিয়েটারে দাঁড়িয়ে থাকা, রাউন্ড দিয়ে রোগী দেখা এবং তাদের সেবা দেওয়া। অথচ কিছু হলেই এই ডাক্তারদের গায়ে হাত তোলা হয়, মারধর করা হয়।
শুনলাম ১০০০তম পর্যন্ত নাকি ভাতা দেওয়া হবে! তাহলে বাকিরা কী করবে? বাইরে তো আবার ওনাদের প্রাইভেট চেম্বার বা প্র্যাকটিস করাও নিষেধ। তাহলে কি তারা সালোকসংশ্লেষণ করে নিজের খাবার নিজে তৈরি করবে? রাষ্ট্র কি এই মেধাবীদের কোনোদিন সঠিকভাবে মূল্যায়ন করবে না?