05/09/2026
আমাদের প্রতিষ্ঠানের আরেক গর্ব, অভিনন্দন তার এই যাত্রায়।
ক্রিকেট মাঠে তাঁর পথচলা শুরু হয়েছিল স্বপ্ন নিয়ে। একের পর এক দল বদলেছে, বদলেছে জার্সি, বদলেছে মাঠ ও শহর। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের হয়ে খেলেছেন জাতীয় পর্যায়ে, সুযোগ পেয়েছেন জাতীয় দলের ক্যাম্পে। কিন্তু ক্রিকেটের ব্যস্ততার মধ্যেও থেমে থাকেনি আরেকটি স্বপ্ন—পড়াশোনা ও গবেষণার জগতে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা।
বাংলাদেশের পেশাদার নারী ক্রিকেটার ফারজানা আক্তার ববি এবার সেই দুই জগতের অভিজ্ঞতাকে সঙ্গে নিয়েই পা রাখছেন যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চশিক্ষার নতুন অধ্যায়ে। ২০২৬ সালের ফল সেমিস্টারে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব কানেকটিকাটে (UConn) কাইনেসিওলজি বিষয়ে পিএইচডি শুরু করেছেন। তাঁর বিশেষায়ন এক্সারসাইজ সায়েন্সে।
ফারজানার ক্রিকেট ক্যারিয়ার শুরু ২০১৩ সালে। এরপর দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় নিয়মিত অংশ নিয়েছেন তিনি। ঢাকা উইমেন্স প্রিমিয়ার ক্রিকেট লিগে খেলেছেন দেশের পরিচিত কয়েকটি ক্লাবের হয়ে। চারবার প্রতিনিধিত্ব করেছেন মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব লিমিটেডের। এ ছাড়া রূপালী ব্যাংক, বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপি, খেলাঘরসহ বিভিন্ন দলের হয়ে মাঠে নেমেছেন তিনি। সর্বশেষ ক্লাব লিগেও মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের প্রতিনিধিত্ব করেছেন।
শুধু ক্লাব ক্রিকেটেই নয়, জাতীয় পর্যায়ের বিভাগীয় ক্রিকেটেও রয়েছে তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা। ২০১৩ সাল থেকে জাতীয় নারী বিভাগীয় ক্রিকেট লিগে তিনি প্রতিনিধিত্ব করেছেন খুলনা, রাজশাহী, ঢাকা, বরিশাল ও সিলেট বিভাগের হয়ে। তিনবার সুযোগ পেয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের ক্যাম্পে। খেলেছেন উইমেন্স বাংলাদেশ ক্রিকেট লিগেও (WBCL), যেখানে প্রতিনিধিত্ব করেছেন ইস্ট জোনের হয়ে।
ক্রিকেট ছিল তাঁর পরিচয়ের বড় অংশ, কিন্তু পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ কখনো কমেনি। খেলাধুলার ব্যস্ত সূচি সামলানোর পাশাপাশি একাডেমিক জীবনেও তিনি ধরে রেখেছেন ধারাবাহিকতা। মাধ্যমিক পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জনের পর উচ্চমাধ্যমিকে পান জিপিএ ৪.১০।
এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য ভর্তি হন যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বর্তমানে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়) ফিজিক্যাল এডুকেশন অ্যান্ড স্পোর্টস সায়েন্স বিভাগে। সেখান থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর—দুই পর্যায়েই প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হওয়ার কৃতিত্ব অর্জন করেন তিনি।
একই সঙ্গে ধীরে ধীরে গড়ে তুলেছেন গবেষণার পথচলাও। এখন পর্যন্ত তাঁর গবেষণা প্রকাশনার সংখ্যা ৩৬। খেলাধুলা, শারীরিক শিক্ষা ও এক্সারসাইজ সায়েন্সের সঙ্গে একাডেমিক গবেষণাকে যুক্ত করে নিজেকে তৈরি করেছেন উচ্চশিক্ষার পরবর্তী ধাপের জন্য।
স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার পর ২০২৪ সালে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন ফারজানা। ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে লেকচারার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন তিনি। পরবর্তীতে পদোন্নতি পেয়ে হন সিনিয়র লেকচারার।
তবে তাঁর লক্ষ্য ছিল আরও বড়—গবেষণাভিত্তিক উচ্চশিক্ষায় নিজেকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া। সেই লক্ষ্য থেকেই শুরু হয় পিএইচডির প্রস্তুতি।
উচ্চশিক্ষার এই যাত্রায় তাঁর প্রোফাইলও ছিল বেশ শক্তিশালী। আইইএলটিএসে পেয়েছেন ৭.৫ এবং টোফেলে ১০০ স্কোর। জিআরইতে তাঁর রিডিং স্কোর ১৬১ এবং কোয়ান্টিটেটিভ স্কোর ১৬৭। অ্যানালিটিক্যাল রাইটিংয়ে পেয়েছেন ৩.৫।
এই প্রোফাইল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্পূর্ণ অর্থায়নসহ পিএইচডির সুযোগ পান তিনি। একই সঙ্গে নিউজিল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব ওটাগো থেকেও পান সম্পূর্ণ অর্থায়নসহ পিএইচডির অফার।
চারটি আন্তর্জাতিক সুযোগের মধ্য থেকে শেষ পর্যন্ত তিনি বেছে নেন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব কানেকটিকাটকে। সেখানে কাইনেসিওলজি বিষয়ে পিএইচডি করছেন তিনি, যেখানে তাঁর গবেষণার মূল মনোযোগ এক্সারসাইজ সায়েন্স।
ক্রিকেট মাঠের অভিজ্ঞতা এবং এক্সারসাইজ সায়েন্সের গবেষণা—ফারজানার জীবনের এই দুই পথ যেন এক জায়গায় এসে মিলেছে। একজন পেশাদার ক্রীড়াবিদ হিসেবে শরীর, ফিটনেস, পারফরম্যান্স ও প্রশিক্ষণের বাস্তব অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। অন্যদিকে একাডেমিক ও গবেষণার মাধ্যমে তিনি সেই অভিজ্ঞতাকে নতুনভাবে বুঝতে এবং বিশ্লেষণ করতে চাইছেন।
বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটে এক দশকের বেশি সময় ধরে মাঠে খেলা, জাতীয় দলের ক্যাম্পে সুযোগ পাওয়া, দেশের বিভিন্ন বিভাগ ও শীর্ষ ক্লাবের প্রতিনিধিত্ব করা—এর পাশাপাশি স্নাতক ও স্নাতকোত্তরে প্রথম হওয়া, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করা এবং ৩৬টি গবেষণা প্রকাশনা নিয়ে আন্তর্জাতিক গবেষণার অঙ্গনে প্রবেশ—ফারজানা আক্তার ববির পথচলা তাই শুধু একজন ক্রিকেটারের গল্প নয়।
এটি একই সঙ্গে একজন ক্রীড়াবিদ, শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও গবেষকের গল্প।
ক্রিকেট মাঠ থেকে শুরু হওয়া সেই যাত্রা এবার পৌঁছেছে যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণাগারে। আর নতুন এই অধ্যায়ে ফারজানা আক্তার ববির লক্ষ্য—খেলাধুলা ও এক্সারসাইজ সায়েন্সে গবেষণার মাধ্যমে নিজেকে আরও সমৃদ্ধ করা এবং ভবিষ্যতে সেই জ্ঞানকে দেশের ক্রীড়া ও শিক্ষাক্ষেত্রের উন্নয়নে কাজে লাগানো।