07/08/2026
শির্ক! যে পাপের ক্ষমা নেই।
শির্কের শাব্দিক অর্থ: অংশিদার বা সমকক্ষ বানানো।
পারিভাষিক অর্থ: মহান আল্লাহ তা‘আলার জাত-সত্ত্বা ও সিফাত তথা গুণাবলীতে অন্য কাউকে অংশীদার করা।
শির্কের প্রকার: শির্ক দুই প্রকার। এক. বড় শির্ক দুই. ছোট শির্ক।
বড় শির্ক: শির্রকে আকবর তথা বড় শির্ক হলো; কথা বা কাজে সরাসরি ও সুস্পষ্টভাবে কোনো কিছুকে আল্লাহর সমকক্ষ বানানো। যেমন, আল্লাহ ছাড়া অন্য যে কোনো কিছুর ইবাদত করা, পশু কুরবানি করা, অন্য কোনো কিছুর জন্য মানত করা, অন্য যে কোনো শক্তিকে নিজের ভালো-মন্দের মালিক মনে করা, কোনো বিপদ-মুসিবত থেকে বাঁচার জন্য আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া অন্য কোনো অলৌকিক শক্তির কাছে সাহায্য প্রার্থনা করা, অন্য কোনো অলৌকিক শক্তির আশ্রয় গ্রহণ করা ইত্যাদি। উল্লেখিত কাজগুলোর সমপর্যায়ের অন্যান্য শির্কি কথা ও কার্যকলাপও শির্কে আকবর বা বড় শির্ক বলে গণ্য হয়।
শির্কে আকবর একজন মুসলমানের সব আমলের সওয়াব নষ্ট করে দেয় এবং তাকে ইসলামের গণ্ডি থেকে বের করে দেয়। এ ধরণের শির্কে লিপ্ত ব্যক্তি যদি তওবা করে পুনরায় ইসলাম গ্রহণ না করে মৃত্যু বরণ করে তাহলে আখেরাতে সে চিরস্থায়ী জাহান্নামি হবে।
ছোট শির্ক এমন নয়। তবে তা কবীরা গুনাহ অপেক্ষা আরো জঘন্যতম।
ছোট শির্ক শুধু সে আমলকেই বিনষ্ট করে যে আমলে এ জাতীয় শির্কের সংমিশ্রণ রয়েছে। অন্য আমলকে নয়।
ছোট শির্কের একটি প্রকার হলো মুনাফিকী। অর্থাৎ কোন বান্দা তার ইবাদতের মাধ্যমে পার্থিব সুবিধা যেমন,প্রতিপত্তি অর্জন, পদমর্যাদা লাভের উদ্দেশ্য রাখা। মহান আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন: সুতরাং যে তার রবের সাক্ষাৎ কামনা করে, সে যেন সৎকর্ম করে এবং তার রবের ইবাদতে কাউকে শরীক না করে। (সুরা আল-কাহফ;১১০) এ বিষয়ে রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
মাহমুদ ইবনু লাবীদ রা. হতে বর্ণিত। রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : আমি তোমাদের জন্য যে ব্যাপারে সর্বাপেক্ষা বেশি আশঙ্কা করছি তা হলো ছোট শির্কের। লোকেরা প্রশ্ন করল, হে আল্লাহর রসূল! ছোট শির্ক কি? তিনি সা. বললেন, লোক দেখানো ‘আমল’।
(মুসনাদে আহমাদ)
আর ইমাম বায়হাকী রহ. শুআবূল ঈমানে অতিরিক্ত বর্ণনা করেছেন যে, বান্দাদের আমালের বিনিময়ের দিন আল্লাহ তা’আলা ঐ সমস্ত লোকেদেরকে বলবেন, যাও তোমরা সেই সমস্ত লোকদের কাছে, যাদেরকে দেখিয়ে দুনিয়াতে আমল করেছিলে। আর লক্ষ্য করো তাদের নিকট থেকে কোন বিনিময় বা কোন কল্যাণ পাও কি না? । (হাদীসটি সহীহ)
শির্ক থেকে বাঁচতে চাইলে অবশ্যই তাওহীদের কিছু মৌলিক বিষয় স্মরণ রাখতে হবে, যা নিম্নে তুলে ধরা হলো।
তাওহীদ (توحيد)শব্দের শাব্দিক অর্থ একত্ববাদ, এক করা বা কোনো কিছুকে একক ও অদ্বিতীয় বলে বিশ্বাস করা।
ইসলামি পরিভাষায়: আল্লাহ তা‘আলাকে সত্তাগত ও গুণগতভাবে এক এবং অদ্বিতীয় হিসেবে বিশ্বাস করা এবং সমস্ত ইবাদত কেবল তাঁরই জন্য নির্দিষ্ট করাকে তাওহীদ বলে। আর নাফী (না বোধক) ও ইসবাত (হ্যাঁ বোধক) বাক্যের সমন্বয় ব্যতীত তাওহীদ কখনো প্রকৃত তাওহীদ হিসেবে গণ্য হবে না। যেমন; লা-ইলাহা-কোন ইলাহ নেই; ইল্লাল্লাহ- আল্লাহ ছাড়া।
তাওহীদের প্রকার:
১.তাওহীদে রুবূবিয়্যাহ।
তাওহীদে রুবূবিয়্যাহ হচ্ছে: আল্লাহ তা‘আলাকে তাঁর কাজের ক্ষেত্রে একক বলে মেনে নেওয়া যেমন: মহাবিশ্বের সৃষ্টি, মহাবিশ্বের মালিকানা এবং পরিচালনা, জীবন প্রদান, রিজিক প্রদান ও মৃত্যু প্রদান ইত্যাদিকে শুধু রবেই কর্ম বলে মেনে নেয়া, অন্য কাউকে তারঁ সাথে শরিক না করা।
২.তাওহীদে উলূহিয়্যাহ।
তাওহীদে উলূহিয়্যাহ হলো: সকল প্রকার ইবাদতে তথা জাহেরী বা বাতেনী, বাচনিক বা কর্মগত ইবাদতে আল্লাহর একত্ব সাব্যস্ত করা এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য সব কিছুর ইবাদতকে নাকচ করা, সে যে-ই হোক না কেন।
৩.তাওহীদুল আসমা-ওয়াস-সিফাত।
তাওহীদুল আসমা-ওয়াস-সিফাত হলো: আল্লাহর নাম ও গুণাবলি কেবল তার জন্য এককভাবে সাব্যস্ত করা। বান্দা এই বিশ্বাস করবে যে আল্লাহর নাম ও গুণাবলিতে তাঁর সদৃশ কেউ নেই। এই প্রকার তাওহীদ দুটি ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত:
এক: সাব্যস্তকরণ। অর্থাৎ আল্লাহ নিজের জন্য তাঁর কিতাবে কিংবা নবী সা. তার বাণীতে যে সকল সুন্দর নাম ও পরিপূর্ণ গুণাবলি সাব্যস্ত করেছেন সেগুলোকে এমনভাবে সাব্যস্ত করা যা আল্লাহর মর্যাদা ও মহত্ত্বের সাথে মানানসই। তবে কোন প্রকার বিকৃতি, অপব্যাখ্যা, হাকীকতকে নাকচকরণ কিংবা আকৃতি নির্ধারণ ব্যতিরেকে।
দুই: পবিত্রকরণ। সকল দোষ-ত্রুটি থেকে আল্লাহর পবিত্রতা সাব্যস্ত করা এবং তিনি নিজের জন্য যে সমস্ত দোষ নাকচ করেছেন সেগুলোকে নাকচ করা।
জরুরী জ্ঞাতব্য: মহান আল্লাহ তা‘আলার সিফাতসমূহ যে সমস্ত আয়াত দ্বার প্রমানিত তা দুই প্রকার:
১. মুহকাম তথা স্পষ্ট গুণাবলীর আয়াতসমূহ।
২. মুতাশাবিহ তথা অস্পষ্ট গুণাবলীর আয়াতসমূহ।
অস্পষ্ট সিফাত যেমন: ১.আল্লাহ তা‘আলা আরশে ইস্তিওয়া আছেন। ২. তোমরা যেখানেই থাকোনা কেন আল্লাহ তোমাদের সাথে আছেন। কোরআন সুন্নার অস্পষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা খোঁজা নিষেধ। এগুলোর পিছনে তারাই পরে যাদের দিলে বক্রতা ও কুটিলতা রয়েছে। তাই আয়াতে মুতাশাবিহাত বা সিফাতে মুতাশাবিহাতের ক্ষেত্রে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের স্বীকৃত নীতি মেনে চলা ওয়াজিব। আল্লাহ তা‘আলার সীফাত সমন্বিত অস্পষ্ট আয়াতের ক্ষেত্রে আমাদের এই নীতি অবলম্বন করতে হবে। যেমন, আল্লাহ তা‘আলা আরশে ইস্তিওয়া আছেন।(একটি আয়াত) এক্ষেত্রে আমাদের আক্বীদা হবে:
১.আল্লাহ তা‘আলা আরশে ইস্তিওয়া আছেন এটা আমাদের জানা।(কারণ, এটা কোরআনে বর্ণিত একটি বিষয়)
২. এর প্রকৃত অবস্থা আমাদের অজানা।(কারণ, আয়াতটি অস্পষ্ট)
৩. এবং এর উপর ঈমান আনা আমাদের ওয়াজিব।
৪. আয়াত নিয়ে কোন ধরণের প্রশ্ন করা বিদআত।
শির্ক থেকে নিরাপদ থাকার দুআ: اَللّٰهُمَّ اِنِّی اَعُوْذُ بِكَ اَنْ اُشْرِكَ بِكَ وَاَنَا اَعْلَمُ وَاَسْتَغْفِرُكَ لِمَا لاَ اَعْلَمُ
(আল্লা-হুম্মা ইন্নী আ‘ঊযু বিকা আন উশরিকা বিকা ওয়া ‘আনা আ‘লামু ওয়া আস্তাগফিরুকা লিমা লা আ‘লামু)। হে আল্লাহ! আমি জ্ঞাতসারে আপনার সাথে শির্ক করা থেকে আপনার নিকট আশ্রয় চাই এবং অজ্ঞতাসারে (শির্ক) হয়ে গেলে তার জন্য ক্ষমা চাই। (মুসনাদে আহমাদ; ইমাম বুখারীর আল-আদাবুল মুফরাদ)
প্রকাশনায়: জামিয়া কুরআনিয়া ইমদাদুল উলূম পাঁচশিশা উত্তর পাড়া,গুরুদাসপুর,নাটোর।