05/08/2026
পাঁচই আগস্ট ২০২৪। সমসাময়িক যুগে এক অভূতপূর্ব ইতিহাসের সাক্ষী। মনে পড়ে সেদিন আমরা মাসিক আত-তাহরীকের পূর্বনির্ধারিত ‘ফৎওয়া বোর্ড’-এ উপস্থিত ছিলাম। বুকে দুরু দুরু আশঙ্কা, মনে এক প্রবল ঝড়ের সংকেত! দেশ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা নিয়ে সবার চেহারাতেই দুশ্চিন্তার ছাপ। বোর্ডে ফৎওয়া নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা চললেও মন পড়েছিল অন্যদিকে। সকাল ৯/১০টা বাজতেই ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট। তখনও সরকার পতন ঘটতে পারে, এমন কোন ধারণা অবান্তর মনে হচ্ছিল। শুধু ছিল কোন এক অজানা দুঃসংবাদের আশঙ্কায় রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষা...
যোহরের ছালাতের পর পরই এলো সেই প্রায় অবিশ্বাস্য সংবাদটি। সুবহানাল্লাহ! তখনও নেটওয়ার্ক তখনও পুরোপুরি সচল হয়নি, কিন্তু রক্তক্ষয়ী এক মহাসংকট থেকে দেশ রক্ষা পেল, রক্তের প্লাবন থেকে বেঁচে গেল জাতি-এই প্রশান্তিতে হৃদয় জুড়িয়ে গেল। আমরা পরম করুণাময়ের দরবারে আদায় করলাম সিজদায়ে শুকুর।
এরপরের তিনটি দিন ছিল পুলিশহীন এক অভিনব, থমথমে ও আতঙ্কজনক পরিস্থিতি। চারদিকে ভাঙচুর আর অনিয়ন্ত্রিত লুটপাট। অবশেষে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর ধীরে ধীরে অনিশ্চয়তার কুয়াশা কাটতে শুরু করল। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বেশ উন্নতি হলো, দীর্ঘ বন্দিদশা পেরিয়ে মানুষ মুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নিতে শুরু করল। উপভোগ করতে লাগল মন খুলে কথা বলার স্বাধীনতা।
আমরা গভীরভাবে আশাবাদী হয়ে উঠেছিলাম। মনে হচ্ছিল, দেশকে এবার একটি আদর্শিক অবস্থানে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে। ইসলামী খেলাফতের আদলে দেশ গড়ার আহ্বানের সাথে সাধারণ মানুষও মানসিকভাবে একাত্ম হচ্ছিল। আমাদের বার্তা ছিল, একটি ছোট্ট অনির্বাচিত অন্তর্বর্তী সরকার যদি দেশ সামলাতে পারে, তবে এই পথ ধরেই একটি সত্যকার ইসলামী শাসন ব্যবস্থার প্রবর্তন তো অসম্ভব নয়। জনমতও সেই অনুকূলে তৈরী হয়েছিল অনেকটাই।
কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর কায়েমী স্বার্থ আর সংকীর্ণ রাজনৈতিক হিসেব-নিকেশের কারণে সেই সম্ভাবনা পথ হারাল। তাদের কাছে দলীয় ক্ষমতাই মুখ্য হয়ে উঠল। তথাকথিত ‘গণতান্ত্রিক সরকার’ ছাড়া নাকি স্থায়িত্ব আসবে না-এই ভাঙা রেকর্ডে ভর করে পুরোনো গণ্ডিতেই ফিরতে হলো জাতিকে।
আজ দু’বছর পর পেছনে ফিরে তাকালে স্পষ্ট উপলব্ধি করা যায়, আমরা কোথায় পৌঁছাতে চেয়েছিলাম, আর আজ কোথায় দাঁড়িয়ে আছি। দুর্নীতি, বিশৃঙ্খল রাজনীতি আর আইন-শৃঙ্খলার অবনতির ডামাডোলে ফিঁকে হয়ে গেছে জুলাইয়ের নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন।
তবে আশার প্রদীপ একেবারে নিভে যায়নি। ইতিবাচক পররাষ্ট্রনীতি, প্রধানমন্ত্রীসহ কিছু দায়িত্বশীলের ব্যক্তিগত সদিচ্ছা এবং সেনাবাহিনী প্রধানের সাম্প্রতিক সংস্কারমূলক বক্তব্য (বিশেষ করে বিশুদ্ধ ইসলামী শিক্ষা ও সমাজব্যবস্থার প্রবর্তনের কথা ও উদ্যোগ) আমাদের হৃদয় ছুঁয়ে গেছে এবং আশা জিইয়ে রেখেছে।
সামনে কী অপেক্ষা করছে জানি না, তবে জুলাই জাগরণের ফল হিসেবে মানুষ যে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিল, সেই স্বপ্ন আজও মুছে যায়নি। একদিন ব্যর্থ ছাত্র রাজনীতি, অপরাজনীতি, দুঃশাসন আর সীমাহীন দুর্নীতির জাতাকল থেকে অবসান ঘটবে এবং মানুষ নৈতিক অবক্ষয়ের পথ থেকে ইসলামী আদর্শের দিকে ফিরে আসবে, এই প্রত্যাশাই আমাদের স্বপ্নের বাতিঘর।
আর এ লক্ষ্যে নবীদের তরীকায় জনগণের কাছে সেই সত্যের দাওয়াত নিরন্তর পৌঁছে দেওয়াই আমাদের মূল কর্তব্য। স্বস্তির বিষয় হলো, আমাদের তরুণ সমাজের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আজ এ পথে অতীতের চেয়ে অনেক বেশী সচেতন ও সচেষ্ট। ফালিল্লাহিল হামদ। আল্লাহ আমাদের এই দেশ ও জাতিকে রক্ষা করুন। আমাদেরকে তাঁর দ্বীনের প্রকৃত অনুসারী হওয়া এবং এই দেশকে একটি আদর্শ ইসলামী দেশে রূপান্তরিত করার তাওফীক দান করুন। আমীন!