04/07/2026
বাংলাদেশে এখন বড় দুশ্চিন্তা চলছে।
অনেক শিক্ষার্থী নাকি এইচএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে না।
খবরটা শুনে আমি খুব চিন্তিত হলাম। তারপর আরও চিন্তিত হলাম এই ভেবে যে, এখনো এত শিক্ষার্থী পরীক্ষা দিতে যাচ্ছে কেন।
আমাদের দেশে পরীক্ষা এক আশ্চর্য জিনিস।
পরীক্ষা দিলে কী হয়, কেউ জানে না। না দিলে কী হয়, সেটাও কেউ জানে না। তবে পরীক্ষা দিতে হয়। কারণ পরীক্ষা না দিলে সমাজ কষ্ট পায়।
সমাজের কষ্ট বড় কষ্ট।
একজন ছাত্র বারো বছর স্কুলে যায়। তারপর দুই বছর কলেজে যায়। তারপর চার বছর বিশ্ববিদ্যালয়ে যায়। চার বছর সাধারণত ছয় বছরে শেষ হয়। এরপর সে চাকরি খোঁজে। চাকরি তাকে খোঁজে না।
তারপর সে বুঝতে পারে, শিক্ষা তাকে মানুষ করেছে। শুধু বাজারযোগ্য মানুষ করেনি।
এটা অবশ্য ছোটখাটো সমস্যা।
আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার সৌন্দর্য হলো, এখানে সবাই খুব ব্যস্ত। ছাত্র ব্যস্ত, শিক্ষক ব্যস্ত, কোচিং সেন্টার ব্যস্ত, গাইড বই ব্যস্ত, অভিভাবক ব্যস্ত, মন্ত্রণালয় ব্যস্ত। শুধু শিক্ষাটা একটু অবসরপ্রাপ্ত অবস্থায় আছে।
শিক্ষা এখন আর শেখার ব্যাপার না। শিক্ষা এখন প্রস্তুতির ব্যাপার।
ক্লাসের প্রস্তুতি। পরীক্ষার প্রস্তুতি। বোর্ড পরীক্ষার প্রস্তুতি। ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি। চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতি। জীবনের প্রস্তুতি নিতে নিতে জীবনটা শেষ হয়ে যায়।
তারপর একদিন দেখা যায়, যার জন্য এত প্রস্তুতি নেওয়া হলো, সে জিনিসটা আর বাজারে নেই।
একসময় বাবা-মায়েরা ভাবতেন, ছেলে পড়াশোনা করলে চাকরি পাবে। এই বিশ্বাসটা খুব সুন্দর ছিল। বাংলাদেশের অনেক সুন্দর জিনিসের মতো এটাও এখন জাদুঘরে রাখা উচিত।
গ্রামের কৃষক তার ছেলেকে মাঠ থেকে তুলে স্কুলে দিয়েছে। কারণ মাঠে কাজ করা সম্মানের না। ছেলে যদি পড়াশোনা করে, সে একদিন কোট-টাই পরে অফিসে যাবে।
সমস্যা হলো, কোট আছে। টাই আছে। অফিস নেই।
আর অফিস থাকলেও দরজার সামনে লেখা থাকে: অভিজ্ঞতা চাই।
ছেলেটি ভাবে, আমি তো জীবন দিয়েছি। এটা কি অভিজ্ঞতা না?
রাষ্ট্র বলে, না। এটা সিলেবাস।
আমরা এমন এক শিক্ষা ব্যবস্থা বানিয়েছি, যেখানে একজন ছাত্র বারো বছর ইংরেজি পড়ে ইংরেজিতে নিজের নামের বাইরে আর কিছু বলতে ভয় পায়। বারো বছর বাংলা পড়ে একটা পরিষ্কার আবেদনপত্র লিখতে পারে না। বারো বছর গণিত পড়ে দোকানের লাভ-ক্ষতি বুঝতে পারে না।
তবু সে পাস করে।
কারণ পাস করা আমাদের জাতীয় ঐতিহ্য। শেখা ঐচ্ছিক।
এই দেশে মূল বই পড়া একধরনের বিলাসিতা। সাজেশন আছে, শর্টকাট আছে, ফাইনাল সাজেশন আছে, শতভাগ কমন আছে। কমন না পড়লে ছাত্রের দোষ। কমন পড়লে শিক্ষার জয়।
তারপর আমরা অবাক হয়ে বলি, শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা দিচ্ছে না কেন।
কারণ তারা হয়তো প্রথমবারের মতো অঙ্কটা মিলিয়ে দেখছে।
এইচএসসি পাস করলে কী হবে?
তারপর অনার্স।
অনার্স করলে কী হবে?
তারপর মাস্টার্স।
মাস্টার্স করলে কী হবে?
তারপর বিসিএস কোচিং।
বিসিএস না হলে?
তারপর হতাশা।
হতাশা না হলে?
মধ্যপ্রাচ্য।
মধ্যপ্রাচ্য না হলে?
হ্যালো বাইক।
হ্যালো বাইক না হলে?
পরিবারের কাছে প্রতিদিন ছোট হয়ে যাওয়া।
এখন প্রশ্ন হলো, এই ব্যবস্থায় ছাত্র যদি পরীক্ষা না দেয়, সে কি ব্যর্থ? নাকি সে খুব অল্প বয়সে বাস্তববাদী হয়ে গেছে?
আমি শিক্ষা ব্যবসার মানুষ। তাই কথাটা আমার আরও সাবধানে বলা উচিত।
কোচিং সমস্যা না। এডটেক সমস্যা না। সমস্যা হলো—যে শিক্ষা নিজে দাঁড়াতে পারে না, তাকে টিউশন, কোচিং, গাইড, সাজেশন, মডেল টেস্ট আর মোটিভেশন দিয়ে কাঁধে করে বহন করতে হয়।
সমস্যা হলো, আমরা শিক্ষাকে দক্ষতায় পরিণত করতে পারিনি।
সমস্যা হলো, আমরা সার্টিফিকেট দিয়েছি, কিন্তু সক্ষমতা দিইনি।
সমস্যা হলো, আমরা ছাত্রকে বলেছি পড়ো, জীবন বদলাবে।
তারপর জীবন না বদলালে বলেছি তুমি যথেষ্ট ভালো করে পড়োনি।
এই কথাটা বড় অন্যায়।
সব ছাত্র ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার-ব্যাংকার হবে না। দরকারও নেই। কিন্তু সব ছাত্রের হাতে একটা বাস্তব দক্ষতা থাকা দরকার। কেউ ভাষায় দক্ষ হবে, কেউ প্রযুক্তিতে, কেউ কারিগরি কাজে, কেউ কৃষি-ব্যবসায়, কেউ কনটেন্টে, কেউ সেলসে, কেউ ডিজিটাল অপারেশনে, কেউ ছোট ব্যবসায়।
এইচএসসি যদি শুধু আরেকটা পরীক্ষার নাম হয়, তাহলে প্রশ্ন থাকবে কেন দেবে?
কিন্তু এইচএসসি যদি জীবনের পরবর্তী দরজা খুলে দেয়, তাহলে কেউ পালাবে না।
মানুষ শিক্ষা থেকে পালায় না।
মানুষ পালায় প্রতারণা থেকে।
তাই ৩৬% শিক্ষার্থী পরীক্ষা দেয়নি, এটা শুধু শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান না।
এটা একটা নীরব গণভোট।
বিষয়: বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর আস্থা আছে কি না।
ফলাফল এখনো প্রকাশ হয়নি।
তবে গ্রামের চায়ের দোকানে, শহরের বেকার মেসে, বিশ্ববিদ্যালয়ের হলরুমে, বাবার ঋণের খাতায় এবং মায়ের দীর্ঘশ্বাসে ফলাফল বহুদিন আগেই টানানো আছে।