22/10/2022
মদিনার উপকন্ঠে যেদিন প্রথম প্রবেশ করি, আমার মনে হয়েছে যেন আমি এক অতি-আশ্চর্য স্বপ্ন রাজ্যের মধ্যে ঢুকে পড়েছি।
মদিনা শহরের চোখ ঝলসে দেওয়া আভিজাত্য নেই। গাড়ির ভেতর থেকে যতোদূর চোখ যায় কেবল নিঃসীম অন্ধকার এবং তার মাঝে স্তুপাকার হয়ে থাকা কালো কালো পাহাড় ছাড়া দৃষ্টিসীমার মাঝে আর কিচ্ছু দেখা যায় না। তবু— গাড়ির শাদা গ্লাসের কাঁচ গলে আমার দৃষ্টি বারবার সেই অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছে। যেন সেই অন্ধকারের সাথে আমার কী এক গভীর মিতালী! সে মিতালী বড় আদিম, বড় প্রাচীন!
প্রশস্ত রাস্তা। দু'পাশে উঁচু-নিঁচু পাথুরে পাহাড়। আমি ভাবি— এই পাহাড়গুলো কতো আগের? কতো যুগ-যুগান্তর ধরে তারা এখানে দাঁড়িয়ে আছে? এরা কি মুহাম্মাদ সাল্লাললাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখেছে? মক্কার সেই বালককে যিনি একদা রাখাল হয়ে চষে বেড়িয়েছেন এই দেশেরই কোন এক পাহাড়ি প্রান্তর? এরা কি সেই বালককে দেখেছে যিনি চাচার সাথে ব্যবসা করতে সিরিয়া গিয়েছেন এই মরুভূমি পথ পাড়ি দিয়ে? মাথার উপরের এই আকাশ, এই তারা আর নক্ষত্ররাজি— এরা সকলেই তো আদিম প্রত্যক্ষদর্শী।
পথ এগোতে থাকে আর বাড়তে থাকে আমার বুকের ভেতরের ব্যঞ্জনা। আহা! এই সেই মদিনা শহর, যে শহর সবার আগে আপন করে নিয়েছিলো আমার প্রিয় রাসুল সাল্লাললাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে। যখন সবদিকে তিরস্কার আর তাচ্ছিল্যের ছড়াছড়ি, যখন আমার নবিজীর জন্য দুনিয়াটা খুব সংকীর্ণ, তখন হৃদয়ের সব ক'টা দুয়ার খুলে দিয়ে, অনুপম ভালোবাসার পসরা সাজিয়ে এই শহর এবং এই শহরের মানুষগুলো আপন করে নিয়েছিলো তাঁকে। সাল্লাললাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।
আর কিছুদূর যেতেই আমার মনে পড়লো মদিনার কিশোর-কিশোরীদের সেই দলটার কথা যারা প্রিয় হাবিবের আগমন দিনে কোরাস ধরে গেয়েছিলো, 'তা’লা আল বাদরু আলাইনা, মিন ছানি’য়া তিল –ওয়া’দা। ওজাবাশ শুক’রু আলাইনা, মা দা আ লিল্লাহি দা...
মনে হলো বাতাসে সেই সুর এখনো গুনগুন করে বেজে চলেছে। এখনো গভীরভাবে কান পাতলে শোনা যায় সেই আগমনী-গানের ধ্বনি-ব্যঞ্জনা।
হে আমার রব! মদিনার কিশোর-কিশোরীদের সেই দলটাকে, মদিনার সেই মানুষগুলোকে জান্নাতে সুউচ্চ মাকাম আপনি দান করুন।
আমি তখন মদিনার মাটি-হাওয়া-জল-বাতাসে ডুবে আছি, হঠাৎ করে আমার এক বন্ধু বলে উঠলেন, 'আরিফ ভাই, ওই যে মাসজিদ আন নববীর একটা মিনার দেখা যাচ্ছে'।
তার কথাটা শোনামাত্র আমার যে কী হলো, মনে হলো আনন্দের আতিশয্যে আমি মাটিতে লুটিয়ে পড়বো! বিস্ময়-বিহ্বল চোখে তাকাতেই দেখলাম মাসজিদ আন নববীর সবুজ-রঙা একটা মিনার আমাদের ঠিক অদূরেই। থঁ হয়ে তাকিয়ে থাকলাম খানিক্ষণ! এই সেই জায়গা যেখানে আছেন আমার প্রিয় রাসুলে আরাবী! সাল্লাললাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। চোখের কোথায় যেন জমাট হয়ে ছিলো অনেক অশ্রু। তারা কী আর বাঁধ মানতে চায়! অশ্রু জলে উচ্চারিত হলো ভালোবাসার গীতখানা— 'আল্লাহুম্মা সাল্লি 'আলা মুহাম্মাদ।'
হোটেলে নিজেদের জিনিসপত্র রেখে ছুটে চলে এলাম মাসজিদ আন নববীতে। সবুজ গম্বুজের একেবারে খুব নিকটে। সবুজ গম্বুজের পাশে দাঁড়াতেই আমার মনে পড়ে গেলো অনেক স্মৃতি, অনেক ঘটনা।
আমার মনে হলো— আবু জাহেল, আবু লাহাব, উতবা আর শাইবারা কতো অপমান-অত্যাচার, কতো আঘাতই না করেছে আমার নবিজীকে। দেখতে পেলেই পাথর ছুঁড়ে মারতো, সালাতে সিজদায় গেলে গায়ের ওপর তুলে দিয়ে আসতো উটের নাঁড়িভুড়ি। একদিন ঘরে ফেরার পথে মুশরিকেরা ধুলো আর বালি দিয়ে মাখামাখি করে দেয় নবিজী সাল্লাললাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুখ। সাথে ছিলো তাঁর এক কিশোরী কন্যা। সে হাউমাউ করে কান্না করতে থাকে আর বাবার গা থেকে সরাতে থাকে ধুলোর আস্তরণ। তাঁকে অবিশ্রান্তভাবে কাঁদতে দেখে নবিজী সাল্লাললাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন, 'কেঁদো না, মা। আল্লাহ অবশ্যই আমাদের সহায় হবেন।'
আমার মনে পড়ে যায় হিজরতের দিনের কথা। ভয়ে কাঁপা-কাঁপি অবস্থায় থাকা আবু বাকার রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বলা সেই উত্তর কানের কোথায় যেন ভীষণভাবে বাজতে শুরু করেছে— 'ভয় পেয়ো না। আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন'।
আমার মনে পড়ে তায়েফবাসীর বর্বরতার সেই দিনগুলো। রক্তাক্ত শরীর নিয়ে এই রুক্ষ কঠিন পাথুরে পাহাড় পার হতে কতো কষ্টই না জানি হয়েছে আমার রাসুলের! সাল্লাললাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।
এইসব ভাবতে ভাবতে যখন আমার চোখ ফেঁটে কান্নার ফোঁয়ারা নেমে এলো, আমি তখন মুখ তুলে আকাশের দিকে তাকালাম। নক্ষত্রের আলোতে আলোকিত গোটা আকাশ। দু'হাত উঠিয়ে এই আকাশ, এই নক্ষত্র, এই মহাজাগতিক সকল সৃষ্টির সৃষ্টিকর্তার কাছে অশ্রুসিক্ত নয়নে আরেকবার নিবেদন করলাম আমার সেই ভালোবাসার গীত— আল্লাহুম্মা সাল্লি 'আলা মুহাম্মাদ!