04/05/2025
তাসাউফ, রাজনীতি ও পুঁজিবাদ: এক পুনর্জাগরণমূলক তাত্ত্বিক অন্বেষণ
আমি বা আমরা কেমন বাংলাদেশ চাই প্রশ্নে তাসাউফকে এড়িয়ে যাওয়ার এর সুযোগ আছে কি-না? নাই। তবে চলেন একটা ভিন্নপাঠ শুরু করি।
ভূমিকা
তাসাউফ—যা বহুলাংশে আত্মিক অনুশীলন ও নৈতিক পরিশুদ্ধির পথ হিশেবে পরিচিত— তবে আমি মনে করি তাসাউফ হাল জামানায় এক নতুন পটভূমিতে পুনঃপাঠযোগ্য। একে কেবলই অভ্যন্তরীণ অনুশীলন হিশেবে দেখলে আমাদের জাতীয়, কথিতদের ভাষায় রাজনৈতিক ও আর্থ-সামাজিক, সাংস্কৃতিক বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়। বাস্তবে, তাসাউফ কেবলই ব্যক্তিকেন্দ্রিক নয়; সমষ্টিকে রূপান্তরের একটি ঐতিহাসিক শক্তি, একটি নৈতিক পন্থা ও ফাসাদের বিপরীতে এক ইসলাহী প্রকল্প। বর্তমান পৃথিবীতে যেখানে নৈতিকতার সংকট, আত্মার অবক্ষয়, সমাজের বিচ্ছিন্নতা এবং পুঁজিবাদের চরম স্বার্থপরতা আমাদের ঘিরে ধরেছে, সেখানে তাসাউফ আমাদের জন্য একমাত্র সম্ভাব্য মুক্তি, পরিত্রাণের পথ হতে পারে।
কেন? আমরা বিদ্যমান যত ব্যক্তিকেন্দ্রিক, পারিবারিক ও সামাজিক অবক্ষয়, পদস্খলন দেখতে পাই, তার সূচনা হয়, ব্যক্তির ভিতর থেকে। অর্থাৎ অবক্ষয়ের সূচনা বা শুরুটা আভ্যন্তরীণ। অথচ আমরা সম্মানিত কোরআন হাদীস শরীফ থেকে পাই, যে তার নফসকে পরিশুদ্ধ করল, সেই সার্থক বা সফলকাম।
তাসাউফের ইসলামি দিকটা ব্যক্তির আভ্যন্তরীণ অবস্থার মধ্যে দিয়ে শুরু হয়। তা গিয়ে কোথায় ঠেকবে?
ইসলাহ শব্দখানা ফাসাদের বিপরীতে। অর্থাৎ অবশ্যই তার কাজকর্ম সকল ফাসাদ: এটা হোক সামাজিক বা আন্তর্জাতিক, যেকোনো পরিমন্ডলের অবক্ষয়, পদস্খলন ফাসাদ মোকাবেলায় একমাত্র পথ তাসাউফ। তাসাউফ চর্চার মধ্য দিয়ে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও উম্মাহ ইসলাহের পথ ধরে ঐক্যবন্ধ হওয়ার জারি রাখবে। এবং ঐক্যবদ্ধ জাতী হিশেবে নিজেদের হাজির করবে।
এখানে একটা কথা বলি, কেউ কেউ জিজ্ঞেস করেন, তাসাউফ কী তবে সম্মানিত ইসলাম উনার বাইরের কিছু? পশ্চিমা তাত্ত্বিকদের কাজটাই ছিল, তাসাউফকে সম্মানিত ইসলাম উনার বাইরের কিছু হিশেবে হাজির করা। এর জের ধরেই তারা সুফিজম সুফিবাদ, মিস্টিসিজম ইত্যাদি টার্ম বা পরিভাষার আবিস্কার করেছে।
এটা তারা জ্ঞানের জায়গা থেকে করেছে ব্যাপারটা তা নয়৷ বরং তাদের কাফেরী কুকৌশলের অংশ হিশেবেই তা করেছে।
তাসাউফের মূল দর্শন: আত্মশুদ্ধি, ন্যায়ের স্থাপনা ও সমষ্টিগত পুনর্জাগরণ ও ঐক্যবদ্ধ জাতী হিশেবে জমিনে খিলাফত আলা মিনহাজিন নবুয়াত শরীফ প্রতিষ্ঠা করা।
তাসাউফ হলো অন্তরযাত্রার এক চরম পরিশীলন, যা কেবল ব্যক্তির নিজের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নয় বরং ইসলামি দুনিয়ার সামগ্রিক সভ্যতাবোধের প্রাণরস।
এই দিকে নির্দেশ করে সাইয়্যিদুনা ইমামুস সাদিস মিন আহলে বাইতি রসূলিল্লাহ আলাইহিস সালাম ইরশাদ মুবারক করেন—
عَنْ جَعْفَرِ بْنِ مُحَمَّدٍ الصَّادِقِ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ، أَنَّهُ قَالَ: «مَنْ عَاشَ فِي ظَاهِرِ الرَّسُولِ فَهُوَ سُنِّيٌّ، وَمَنْ عَاشَ فِي بَاطِنِ الرَّسُولِ فَهُوَ صُوفِيٌّ». وَأَرَادَ جَعْفَرٌ بِبَاطِنِ الرَّسُولِ ﷺ أَخْلَاقَهُ ⦗٢١⦘ الطَّاهِرَةِ، وَاخْتِيَارَهُ لِلْآخِرَةِ، فَمَنْ تَخَلَّقَ بِأَخْلَاقِ الرَّسُولِ ﷺ، وَتَخَيَّرَ مَا اخْتَارَهُ، وَرَغِبَ فِيمَا فِيهِ رَغِبَ، وَتَنَكَّبَ عَمَّا عَنْهُ نَكَبَ، وَأَخَذَ بِمَا إِلَيْهِ نَدَبَ، فَقَدْ صَفَا مِنَ الْكَدَرِ، وَنُحِّيَ مِنَ الْعَكَرِ، وَنُجِّيَ مِنَ الْغِيَرِ، وَمَنْ عَدَلَ عَنْ سَمْتِهِ وَنَهْجِهِ، وَعَوَّلَ عَلَى حُكْمِ نَفْسِهِ وَهَرَجِهِ، وَسَعَى لِبَطْنِهِ وَفَرْجِهِ، كَانَ مِنَ التَّصَوُّفِ خَالِيًا، وَفِي التَّجَاهُلِ سَاعِيًا، وَعَنْ خَطِيرِ الْأَحْوَالِ سَاهِيًا
حلية الأولياء وطبقات الأصفياء - ط السعادة ١/٢٠ — أبو نعيم الأصبهاني
অর্থ: যে ব্যক্তি রাসুলুল্লাহর ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উনার বাহ্যিক অনুসরণ করে, সে সুন্নি। আর যে ব্যক্তি রাসুলুল্লাহর ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উনার অন্তরঙ্গ বাস্তবতা বা গভীর সত্তার অর্থাৎ বাতেনি অনুসরণ করে, সে সুফি।
জাফর আলাইহিস সালাম এখানে রাসুলুল্লাহ উনার বাতেনির রসূল বলতে তাঁর পবিত্র চরিত্র ও আখলাক এবং আখিরাতকে অগ্রাধিকার দেওয়াকে বোঝাতে চেয়েছেন। সুতরাং, যে ব্যক্তি রাসুলুল্লাহর ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উনার চরিত্র ধারণ করে, তাঁর পছন্দকে গ্রহণ করে, যা তিনি ভালোবেসেছেন তা ভালোবাসে, যা থেকে দূরে থেকেছেন তা থেকে দূরে থাকে এবং যেসব বিষয়ের প্রতি তিনি আহ্বান করেছেন তা অনুসরণ করে— সে ব্যক্তি কলুষতা থেকে মুক্ত হয়, মলিনতা থেকে পরিশুদ্ধ হয় এবং বিপদের হাত থেকে রক্ষা পায়।
আর যে ব্যক্তি তাঁর পথ ও কর্মপদ্ধতি থেকে সরে যায়, নিজের প্রবৃত্তির সিদ্ধান্ত ও বিশৃঙ্খলতার উপর নির্ভর করে, নিজের উদর ও কামনা-বাসনার পেছনে ছুটে— সে তাসাউফ থেকে বিচ্ছিন্ন, অজ্ঞতার দিকে ধাবিত এবং ভয়ংকর অবস্থা সম্পর্কে গাফিল হয়ে থাকে।
(সূত্র: ‘হিলইয়াতুল আওলিয়া ও তাবাকাতুল আসফিয়া’, আবু নুয়াইম আল-আসবাহানি, ১/২০, দারুস সা’আদাহ প্রকাশনা)
আখলাকে রসূলিল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আশলে কী? আমরা হাদীস শরীফ থেকে জানতে পারি, সম্মানিত পুরো কোরআন শরীফই, আখলাকে রসূলিল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। অতএব তাসাউফ কেবলই যে আভ্যন্তরীণ চর্চার বিষয় ময়, এর বৈশ্বিক ও সার্বজনীন বাস্তবতা আছে, তা এই জায়গা থেকে অনুমেয়। কারণ, কোরআন শরীফে কী নেই? সবই আছে।
আমি মূল আলোচনায় ফিরে যাই, তাসাউফের মূলভিত্তি হলো 'তাযকিয়াতুন নাফস' (تَزْكِيَةُ النَّفْسِ)—অর্থাৎ নফসের পরিশুদ্ধি। কোরআন শরীফ এবং হাদীস শরীফ উনাদের স্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে যে, যাঁরা নিজেদের পরিশুদ্ধ করেন, তাঁরাই সফল। এ সফলতা কেবল আমাদের চেনাজানা দুনিয়াবি বা আখিরাতভিত্তিক নয়; বরং এ এক সার্বিক সফলতা, যার ফলশ্রুতি সমাজে ন্যায়, করুণা ও ভ্রাতৃত্বের প্রতিস্থাপন। অর্থাৎ তাজকিয়াতুন নফসের মাধ্যমে পারিবারিক, সামাজিক সাংস্কৃতিক আন্তর্জাতিক পরিশুদ্ধর ফলাফল হিশেবে চুড়ান্ত সার্থকতা সম্মানিত খিলাফত আলা মিনহাজিন নবুয়াত শরীফে এসে পৌঁছায়।
যার কারণে আমরা দেখতে পাই, পশ্চিমারা, বিশেষ করে প্রাচ্যবিদ্দের অনেকেই তাসাউফের উৎসবিন্দু নিয়ে বিতর্ক তৈরি করেছে।
প্রাচ্যবিদদের ষড়যন্ত্র: তাসাউফকে ইসলাম থেকে বিচ্ছিন্ন করা
আমরা দেখতে পাই, ঔপনিবেশিক যুগে পশ্চিমা প্রাচ্যবিদেরা তাসাউফকে ইসলামি শরিয়তের মূল কাঠামো থেকে বিচ্ছিন্ন করতে সচেষ্ট হয়। তারা একে হিন্দু যোগব্যায়ামের ধারাবাহিকতা, গ্রীক গনোস্টিসিজমের ছায়া কিংবা পারস্যের মাযদাকি মতবাদের উত্তরসূরী প্রমাণে উদ্যোগী হয়। উদ্দেশ্য ছিল স্পষ্ট: ইসলামকে খণ্ডিত করা এবং আত্মিকতা ও বিধানকে পৃথক করে একটি অসার, বুদ্ধিবিবর্জিত আধ্যাত্মিক রিচুয়ালভিত্তিক অবকাঠামো উপস্থাপন করা।
এই কৌশলগত বিভাজনের প্রভাব আজও বিদ্যমান। অনেক মুসলিমই মনে করেন তাসাউফ মানেই ফকিরি, নির্জনতা এবং সামাজিক কার্যক্রম থেকে মুক্তি। অথচ ইতিহাসে দেখা যায়, সত্যিকার তাসাউফচর্চাকারী ওলী পীর মুরশিদ আউলিয়ায়ে কেরাম রহমাতুল্লাহি আলাইহিম উনারা jiহ|দ থেকে শুরু করে সামাজিক সাংস্কৃতিক নেতৃত্ব দিয়েছেন। এমনকি খেলাফত কায়েম করেছেন, এমন নজীরও আমাদের সামনে আছে। যেমন, সাইয়্যিদুনা শহীদ আহমদ বেরলভী আলাইহিস সালাম। তিনি একাধারে একজন পীর মুরশিদ সুফী ওলী ও খলিফা ছিলেন।
তাসাউফের সূচনাবিন্দু বা উৎস নিয়ে মুখর এক বিতর্ক চলমান ইসলামি বিশেষজ্ঞ ও অমুসলিম প্রাচ্যবিদদের মাঝে। তবে প্রাচ্যবিদ অর্থাৎ ওরিয়েন্টালিস্টদের দেওয়া বক্তব্য বয়ান ইসলামি ঐতিহ্যে কখনো স্বীকৃতি পায় নি৷ কেউ দাবী করছে, তাসাউফ গ্রিক দর্শনের প্রভাবে জন্ম নেওয়া একটা মরমী দর্শন। কেউ বলছে, নিউপ্লেটোনিজম থেকে তাসাউফ এসেছে। আবার কেউ বলছে, ভারতীয় দর্শন থেকে তাসাউফের জন্ম।
কোনো কোনো প্রাচ্যবিদ ভয়ংকর কথা বলেছে যে, তাসাউফ ইরানীয় সভ্যতায় বিদ্যমান আধ্যাত্মিকতার সাথে ইসলামের যে মনস্তাত্ত্বিক লড়াই চলমান ছিল, সেই লড়াইয়ের ফলাফল।
তবে তাসাউফের উৎসবিন্দু নিয়ে বিতর্ক কেন? এটা কী প্রাচ্যবিদ্দের জ্ঞানের দাবী থেকে? না। অধিকাংশ প্রাচ্যবিদ তাদের জ্ঞানের জায়গায় সৎ ছিল না। তারা অত্যন্ত কুকৌশলে, পরিকল্পনা মাফিক ইসলাম থেকে তাসাউফকে খারিজ করার জন্যই, তার উৎস নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। তাসাউফের উৎস নিয়ে বিতর্ক তৈরি করা, তাসাউফকে মিস্টিসিজম বা মরবীবাদ কিংবা রহস্যবাদী একটা আলাদা ইজম বা বাদ হিশেবে দেখানোর প্রবণতা মূলত তাসাউফকে ইসলাম থেকে খারিজ করার নিমিত্তেই খাড়া হয়েছে। অর্থাৎ তাসাউফের উৎস নিয়ে বিতর্ক তৈরি করা ও তাকে রহস্যবাদ বৈরাগ্যবাদ, মরমীবাদ হিশেবে পেশ করা— এটা তাসাউফকে সেকুলারকরণের একটা প্রসেসও হতে পারে।
যার দরুন আমরা দেখতে পাই, প্রাচ্যবিদ্দের কাছে তাসাউফ সুফীজম সুফিবাদ রহস্যবাদ ইত্যাদি। অথচ তাসাউফ আর সুফীজম এক নয়। যেমন, নারী আর নারীবাদ এক নয়। তাসাউফ আলাদা কোনো বাদমতবাদ না। ইসলামে বাদমতবাদের কোনো জায়গা নেই।
তাসাউফ ইসলামের এক বিশেষ অনুষদ।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট: চেতনার বিপর্যয় ও জাতীয় মেরুদণ্ডহীনতা
আপনারা জানেন, বাংলাদেশ আজ এক সাংস্কৃতিক ও নৈতিক সংকটের যুগে উপনীত। তরুণ সমাজ ‘সেলফ-মেইড’, ‘লাইফ-স্টাইল’, ‘ব্যক্তি-সুখ’-এর মোহে বিভ্রান্ত। তাদের কাছে জাতীয় চিন্তা, ঐতিহ্য, ওলী-আউলিয়ার দিকনির্দেশনা, হক্কানী ওলামায়ে কেরামের সংলগ্নতা সহবত — সবকিছুই পুরোনো all seem outdated। আফশোস যে এই বিচ্ছিন্নতাই জাতীকে করে তুলেছে আত্মহীন, ইতিহাসবিমুখ এবং চিন্তাবিচ্ছিন্ন।
যে জাতি ওলী-আউলিয়াদের প্রতি সম্মান হারায়, তার হৃদয়ে আর কোনো মহান আদর্শ জন্ম নেয় না। তাই দেখা যায়, আমাদের দেশে ‘নেতা’ নেই—আছে শুধুই ক্ষমতাকামী, ব্যক্তি-মুনাফাভিত্তিক এক শ্রেণি। তারা তাসাউফকে ভয় পায়, কারণ তারা জানে—তাসাউফ মানেই ন্যায়ের প্রতি অবিচল, মজলুমের পাশে, বাতিলের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যাওয়া। তারা জানে, তাসাউফ তাদের আত্মমগ্নতার দুনিয়ায় আলো হিশেবে উপস্থিত হবে, তারা জানে, ভোগবাদী দুনিয়ার সবচেয়ে বড়ো প্রতিদ্বন্দ্বীই হলো তাসাউফ।
পুঁজিবাদ বনাম তাসাউফ: দুটি বিপরীত দর্শনের সংঘাত
আমরা জানি, পুঁজিবাদ এক আত্মকেন্দ্রিক আদর্শিক দর্শন বা মতবাদ । এটি বলে—“আমিই শেষ সত্য, আমিই সবার আগে। নিজের সুখ, নিজের আয়, নিজের নিরাপত্তা।” পুঁজিবাদ শুধু আমি আমি আমি। অন্য কেউ না, আমি আগে আমি সব ভোগ করব, সবকিছুই আমার। অন্যদিকে, তাসাউফ বলে—“তুমি নিজের জন্য যা পছন্দ করো, অন্যের জন্য তা-ই পছন্দ করো।
তাসাউফের একখানা মূলনীতি হলো 'ঈসার' অন্যকে নিজের ওপর তাকওয়ার ভিত্তিডে প্রাধান্য দেওয়া। পুঁজিবাদের মূল চালিকাশক্তি হলো 'ইগোইজম' (স্বার্থবাদ)। ফলে এই দুটি বিপরীত অবস্থানের সংঘাত অবশ্যম্ভাবী। পুঁজিবাদ বলে—“যার পুঁজির জোর, সেই আধিপত্যের হকদার।” বর্তমান দুনিয়ায় আমরা এর ব্যতিক্রম দেখছি না।
তাসাউফ বলেন—“তোমার মাল আছে, মহান আল্লাহ পাক উনার হক দাও, গরীবের হক দাও।” পুঁজিবাদ বলে—“এই মাল আমি কামিয়েছি, এ আমার একচ্ছত্র অধিকার।”
তাসাউফ: জাতীয় পুনর্গঠনের তাত্ত্বিক কাঠামো
আমরা যদি সত্যিকার অর্থে জাতীয় পুনর্জাগরণ চাই, তবে তা কোনো রাজনৈতিক শ্লোগান, উন্নয়ন পরিকল্পনা কিংবা এনজিওর দাতব্যকর্মে সম্ভব নয়। আমাদের দরকার এক অন্তর্গত বিপ্লব—যার শুরু হবে আত্মশুদ্ধি দিয়ে, সমাজে ওলী-উলামা ও মুরশিদদের হক্ব স্থান নিশ্চিত করে, তরুণদের মানসগঠনে তাসাউফভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করে।
তাসাউফ মানে ফকিরি নয়, অনেকে ভাবে এটা বুঝি ঘরে বসে বসে বা পাহাড়ে ঘুরে ঘুরে আবেদী করা। কেউ তো ফকীহ বা ইমাম মুজতাহিদদের তাসাউফ চর্চাকারী হিশেবে কল্পনা করতে চায় না৷
যাইহোক তাসাউফ মানে মহান আল্লাহ পাক সুবহানাহু ওয়াতাআ'লা তিনি ও উনার রসূল হাবীবুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উনাদের প্রতি সর্বোচ্চ মহব্বত, উনাদের সন্তুষ্টি, উনাদের নিসবত । এবং আত্মবিশ্বাস, আদর্শিক দৃঢ়তা। যে তাসাউফ আমরা আমাদের সাইয়্যিদ উনাদের থেকে জানেছি , পেয়েছি, পাচ্ছি—তা গভীর চর্চার মাধ্যমেই আমরা পৃথিবী গঠনের নেতৃত্ব দিতে পারব।
তাসাউফই একমাত্র মুক্তির পথ
আজকের বৈশ্বিক পটভূমিতে যেখানে মানুষ আত্মিকভাবে শূন্য, সমাজে শ্রদ্ধাবোধ লুপ্তপ্রায়, এবং নেতৃত্ব সংকট তীব্র—সেখানে তাসাউফ কেবল একটি বিকল্প নয়, বরং একমাত্র বিকল্প হিশেবে হাজির হয়েছে।
তাসাউফ মানেই নৈতিকতা, ন্যায়, করুণা ও আত্মত্যাগের সুশৃঙ্খল পন্থা। এটি কেবল রুহানিয়াত নয়; এটি উম্মাহ, নেতৃত্ব ও জনশক্তিকে রূপান্তরের তাত্ত্বিক কাঠামোও। যে জাতি তাসাউফকে ধারণ করে, তার পক্ষে পুঁজিবাদের দানবীয় থাবা রুখে দাঁড়ানো সম্ভব। যে জাতি তাদের মুরশিদ ওলী-উলামা উনাদের সম্মান করে, তাদের হৃদয় থেকে জাতি নির্মিত হয় এবং হবে।
তাই বলি: তাসাউফ মানে আত্মগঠন, পুঁজিবাদ মানে আত্মবিকৃতি।
এখন আমাদের সময় এসেছে—তাসাউফকে শুধু কেবলই ব্যক্তির আভ্যন্তরীণ চর্চার বিষয় না ভেবে বরং জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসার। যুবক তরুণ অর্থাৎ সর্বস্তরের মুসলমানদের হৃদয়ে ও চিন্তায় এর পুনঃস্থাপন ছাড়া কোনো সত্যিকার পরিবর্তন সম্ভব নয়।
#ইসলাম #পথ #তাসাউফ #ছল্লাল্লাহু_আলাইহি_ওয়াসাল্লাম #ওহাবী #ভাইরাল #ইমাম #মাওলানা #রাজনীতি #রাজনৈতিক #জ্ঞান #সালাফিজম #ব্রিটিশ
©সত্বাধীকারঃ বিশিষ্ট ইসলামি চিন্তাবিদ, লেখক, গবেষক, বক্তাঃ জনাব আছেমী নামদার