10/06/2023
কবি ফররুখ আহমদ : আমাদের অনুপ্রেরণার বাতিঘর
‘যেখানে উত্তাল স্রোতে দিশাহারা মত্ত এ নাবিক
সমুদ্রের ঘন বনে নাহি খুঁজে পায় তার দিক
শুধু দেখে বহু দূরে জোনাকির উজ্জ্বল প্রদীপ
জ্বলিয়া মাটির মেয়ে মরীচিকা তালে পরে টীপ,
যার লাগি প্রতি রগে জেগে উঠে টান
মৃত্তিকা সে নাবিকের প্রাণ।’
কবি ফররুখ আহমদ কথাগুলো তার গ্রন্থ ‘হে বন্য স্বপ্নেরা’ সমগ্র শিরোনামে লিখেছেন। বইটি প্রকাশিত হয় নভেম্বর ১৯৭৬ সালে।
কবি ফররুখ আহমদ ১০ই জুন ১৯১৮ সালে মাগুরা জেলার শ্রীপুর উপজেলায় জন্ম গ্রহণ করেন। তার মৃত্যু হয়েছিল ১৯শে অক্টোবর ১৯৭৪ সাল। বাংলা সাহিত্যের রোমান্টিক কবি ফররুখ আহমদ। যদিও তাকে অনেকে মুসলিম রেনেসাঁর কবি হিসাবে তাঁর কিছু সমালোচকও আছেন।
আলোচ্য বিষয় হচ্ছে, মাইকেল যদি মহাভারত, রামায়ণ নিয়ে তার কাব্য রচনার মূল বিষয় নির্ধারণ করতে পারেন, তবে ফররুখ কেন আলিফ লায়লা, হাতেম তাই বা মুসলিম সাহিত্যের গভীর বিষয় নির্ধারণ করতে পারবেন না!
সমালোচকদের এক কেন্দ্রীক চিন্তা এখানে যুক্তিতে মোটেই টিকে না। প্রথম দিকে কবি ফররুখ বামপন্থী রাজনীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন। পরবর্তীতে ধীরে ধীরে তিনি মুসলিম রেনেসাঁর সমর্থক হয়ে পড়েন।
ফররুখ তার লেখনিতে ‘মুহূর্তের কবিতায়’ বলেন,
‘যখন শুনেছি আমি মৃত্যু আছে সূর্যেরও সমান
অগণন জ্যোতিষ্কের ভাগ্যলিপি মৃত্যু দিয়ে ঘেরা,
তখনি হয়েছে মনে এ আকাশ রহস্যের ডেরা,
তখনি হয়েছে মনে এ জীবন ক্ষণিকের গান।’
কবি নজরুলের যখন সাহিত্য জীবনের সমাপ্তি তখন কবি ফররুখের আগমন। নজরুল এসেছিলেন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অস্থিরতা, খেলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনের সময়।
ফররুখ এসেছিলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা, পাকিস্তান আন্দোলন ও দুর্ভিক্ষের করুণ অভিজ্ঞতা নিয়ে।
কবি ১৯৫২ সালে মাতৃভাষা আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। ভাষার উপর তার কবিতা আজও পাঠকে মোহিত করে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি কবির অকুন্ঠ সমর্থন জাতিকে উদীপ্ত করে।
আল্লামা ইকবালের ভাবশিষ্য নিজ জাতির সমস্যাকে চোখে আঙুল দিয়ে ফররুখ আমাদের দেখিয়ে তার লেখনির মাধ্যমে বলেছিলেন,
‘হে মাঝি এবার তুমিও পেয়ো না ভয়
তুমিও কুড়াও হেরার পথিক তারকার বিস্ময়
ঝরুক এ ঝড়ে নারঙ্গী পাতা তবু পাতা অগণন
ভিড় করে সেথা জাগছে আকাশে হেরার রাজতোরণ।’
কবি ফররুখ ছিলেন সাম্যের কবি, দরিদ্রের কবি নিপীড়িত মানবতার কবি। স্বধর্ম আর স্বজাতির প্রতি ভালবাসা কবিকে কখনও বিশ্বমানবতার কল্যাণ কামনায় বিরত করেনি।
সাম্যবাদ কিংবা গণতন্ত্রেও চরম উদ্দেশ্য সামাজিক শান্তি ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা থেকে কবিকে বিরত করেনি। ফররুখ কবি জীবনে নিঃশ্বাসের মধ্যে সমস্যার মূল সমাধান খুজে পেয়েছিলেন।
তাই তার কলম ও কন্ঠে বার বার অভাব, অভিযোগ, অত্যাচার, নিপীড়নের বিরুদ্ধে ধ্বনিত হয়েছে। বিশ্ব মানবতার কন্ঠে কবি কন্ঠ বলে উঠে-
“লোহুতে পার্থক্য নাই বণি আদমের
শিরায় শিরায় আর ধমনীতে দেখি বহমান
এক রক্ত ধারা।”
ফররুখ ছিলেন অতি উঁচু মাপের আধুনিক কবি। পশ্চিমা আধুনিক কবিদের রচনার আঙ্গিক ও বিশুদ্ধতা ফররুখের কবিতায় দৃশ্যমান।
কবি হাসান হাফিজুর রহমান ‘আধুনিক কবি ও কবিতা’ বই ১৯৯৩ সালে কবি সম্পর্কে বলেন, “ফররুখ আমাদের কাব্য সাহিত্যে আধুনিক উত্তোলণে প্রকৃত সাহায্যটা করেছেন তার কাব্যভাষা এবং অঙ্গিকের প্রয়োগে।”
চিত্রকল্প ও প্রতীকের ব্যবহারে ফররুখ ছিলেন অনন্য। তাই কবির ভাষায়-
“রাত্রির অগাধ বনে ঘোরে একা আদম-সুরত
তীব্রতর দৃষ্টি মেলে তাকায় পৃথিবী
জাগো জনতার আত্মা ওঠো। কথা কও।
কতোকাল আর তুমি ঘুমাবে নিসাড় নিস্পন্দ।”
কবি ফররুখ আহমদ ছিলেন শোষণের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ কন্ঠস্বর। ১৯৫২ ভাষা আন্দোলন, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ, আইয়ুব শহীর বিরুদ্ধের গণআন্দোলন প্রভৃতি সকল স্তরে তিনি ছিলেন সোচ্চার। তার লেখনি আমাদের সেই সময় অনেক বেশী অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে।
কিন্তু তিনি রাষ্ট্রের সকল সম্মান পেয়েছেন। একুশে পদক, বাংলা একাডেমী পদক, স্বাধীনতা পদক, আমজীপদ, ইউনেস্কো পদক সহ সকল মর্যাদাবান সম্মানে তিনি ভূষিত হয়েছিলেন।
কিন্তু স্বাধীনতাযুদ্ধ ও পরবর্তী তার লেখনির মাধ্যমে যে তরুণ সমাজ সৃষ্টি করতে চেয়ে ছিলেন তাতে বেশ বেগ পেতে হয়। তিনি তখন আর সমাজের সঙ্গে কেন যেন মিলিয়ে বলে নিজকে ধরে রাখতে হোঁচট খেয়েছেন।
অর্থনৈতিক দৈন্যতা সকল কবি, সাহিত্যিকদের জীবনে থাকে। নজরুলের সবচেয়ে বেশী ছিল। কবি ফররুখও জীবনের শেষ অভাবের তীব্রতা বেশ অনুভব করেছিলেন।
কিন্তু তিনি ছিলেন স্বাধীনচেতা, আত্ম মর্যাদাবান ব্যক্তিত্ব, শির উঁচু করে পুরো জীবন কাটিয়েছেন। তখনকার সরকার ও সাহিত্যমোদী ব্যক্তিগণ ও তেমন কবিকে সহযোগীতা করে নাই।
তবুও কবি আমাদের প্রিয়, তার সৃষ্টি বাংলা সাহিত্যে অমর। কালজয়ী। আমাদের ভবিষ্যত গড়ার অনুপ্রেরণার বাতিঘর।
জন্মদিনে কবি ফররুখ আহমদ এর প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি।
[দৈনিক যুগান্তর থেকে সংগৃহীত ও সংকলিত]