02/09/2019
কমরেড শান্তি দত্ত। পারিবারিক নাম শান্তি ভট্রাচার্য।হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ থানার মান্দারকান্দি গ্রাম।বৃটিশ আমলে এই মান্দারকান্দি গ্রামে ছিল কমিউনিষ্ট পার্টির গোপন শক্তিশালী ঘাটি। মান্দারকান্দি গ্রামকে বলা হতো কমিউনিষ্ট পার্টির গ্রাম। কমরেডের গ্রাম বলা হতো। মান্দারকান্দি গ্রামকে ১২০ জন কমরেডের গ্রাম বা ছয়কুড়ি কমরেডের গ্রাম বলা হতো। মান্দারকান্দি গ্রামে এত কমরেড ছিল, কোন মহকুমায় এত কমরেড ছিল না। বৃটিশ পুলিশের সব সময় নজর রাখতো মান্দারকান্দি গ্রামের দিকে।
১৯২৬ সালের ২ সেপ্টেম্বর শান্তি দত্ত মান্দারকান্দি গ্রামে জন্মগ্রহন করেন।পিতা হলেন পোষ্টমাষ্টার কুমারানন্দ ভট্রাচার্য। শান্তি লেখাপড়া করেন সিলেট কিশোরীমোহন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে। শান্তি দত্তের বড় ভাই অপুর্ব কুমার ভট্রাচার্য ছিলেন মান্দারকান্দি গ্রামের কমিউনিষ্ট পার্টির সেক্রেটারী।
যুগান্তর,অনুশীলন পার্ট,ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন, সাংস্কৃতিক সংগঠনের কর্মকান্ড মান্দারকান্দি গ্রাম থেকে পরিচালনা হতো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়।শান্তি দত্ত মান্দারকান্দি গ্রামে গঠন করেন বিশাল কিশোর বাহিনী। যুদ্ধের প্রশিক্ষন সেখান থেকে দেয়া হতো। গননাট্য সংঘের একজন সক্রিয় কর্মী ছিলেন শান্তি।
১৯৩৯ সালে শান্তি দত্ত সিলেট কিশোরী মোহন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী থাকা অবস্থায় বৃটিশ বিরোধী মিছিলের নেতৃত্ব দেন।বহুকাজ করার পর মাত্র তের বছর বয়সে শান্তি দত্তকে কমিউনিষ্ট পার্টির প্রাথমিক সদস্য পদ দেওয়া হয়।
১৯৪২ সালে সিলেট কিশোরী মোহন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে প্রথম বিভাগে মেট্রিক পাশ করেন।
১৯৪৩ সালে বৃটিশ সরকরের সি,আই ডি পুলিশ শান্তি দত্ত ও তার ছোট বোন লক্ষীকে গ্রেফতার করে সিলেট কারাগারে দুমাস বন্দী করে রাখেন।
১৯৪৪ সালে সিলেট সরকারি মহিলা কলেজ থেকে আই এ পাশ করেন।
১৯৪৫ সালে শান্তি শিলচর গিয়ে কমিউনিষ্ট পার্টির রাজনীতি শুরু করেন।
১৯৪৬ সালে শিলচর কলেজ থেকে বি এ পাশ করেন।
১৯৪৯ সালে সিলেট জেলা কমিউনিষ্ট পার্টির সদস্যপদ দেয়া হয়।
১৯৫০ সালে শান্তি দত্ত বিয়ে করেন হবিগঞ্জ জেলার লাখাই থানার স্বজনগ্রামের ঐতিহাসিক দত্ত বংশের সন্তান রায় বাহাদুর এডভোকেট সতীশ চন্দ্র দত্তের ছেলে কমিউনিষ্ট পার্টির নেতা কমরেড বারীন দত্তকে। কমরেড বারীন দত্তকে বিবাহ করার পর শান্তি ভট্রাচার্য থেকে শান্তি দত্ত হয়ে গেলেন।
১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় ভুমিকা পালন করেন।
১৯৫২ সালে স্বামী কমরেড বারীন দত্তের সাথে সিলেট থেকে ঢাকায় চলে যান।কমিউনিষ্ট পার্টির রাজনীতিতে স্বামী স্ত্রী দুজন সক্রিয় হন। ঢাকার আসার পর পাকিস্তান সরকার দুজনের বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি করেন।ঢাকা শহরে শান্তি দত্তকে থাকতে হয়েছে অনেক কষ্টে। অনেক বস্তিতে রাত্রি যাপন করেছেন।
১৯৭১ সালে ২৫ মার্চ রাতে মহিলাদের নিয়ে ঢাকায় গোপন মিটিং করেন। এই বৈঠকে কমিউনিষ্ট পার্টির ভুমিকা নিয়ে বিশদ আলোচনা করা হয়। ৬ এপ্রিল কমিউনিষ্ট পার্টির কজন হুলিয়াদারী কমরেডসহ ভারতের উদ্দেশ্য রওয়ানা দেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের অন্যতম সংগঠকের দায়িত্ব পালন করেন । মুক্তিযুদ্ধের সময় শরনার্থী ক্যাম্পে খাবার ও বস্ত্র বিতরন করেন। রাশিয়া ও সমাজতান্ত্রিক দেশ থেকে আসা খাবার ও বস্ত্র ক্যাম্পে ক্যাম্পে গিয়ে নিজ হাতে বিতরন করে প্রশংসনীয় হয়েছেন। তিনি নিজের হাতে রান্না করে শরনার্থী শিবিরে নিয়ে যেতেন।
১৯৭২ সালে স্বাধীনতার পর কমরেড শান্তি দত্ত ঢাকা শহরের মগবাজারে বস্তিবাসী ছিন্নমুল ছেলেমেয়েদের জন্য একটি বিদ্যালয় খুলেন। সেই সময় ইস্কাটনের একটি অবাংগালীর বাড়ী ইস্পানী কলোনীর উলটো দিকে অবস্থিত বংগবন্ধু শেখ মুজিব কমরেড শান্তি দত্তকে দান করেন। শান্তি দত্ত বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনা নিয়ে বিদ্যালয় দাঁড় করানোর কাজে আদাজল খেয়ে নামেন। সাংবাদিক লায়লা সামাদ বিদ্যালয় করার জন্য অনেক আর্থিক সহযোগিতায় করেন।
১৯৭৫ সালে ১৫ আগষ্ট বংগবন্ধুকে হত্যার পর কমরেড শান্তি দত্ত আত্নগোপনে চলে যান।শান্তি দত্তের পক্ষে সে সময় প্রকাশ্য থাকা সম্ভব ছিল না। তাঁকে গ্রেফতার করার জন্য সামরিক সরকার অনেক চেষ্টা চালায়।
ঢাকা মগবাজার শান্তি দত্তের দীর্ঘ অনুপস্থিতির কারনে তাঁর নিজের হাতে গড়া বিদ্যালয়টি বেহাত হয়ে যায়। রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও বিদ্যালয়ের পরিবেশের টানাপোড়নের ছাত্রছাত্রীরাও একে একে ঝড়ে পড়া শুরু করে।ফলে বিদ্যালয়টি নষ্ট হয়ে যায়।
কমরেড শান্তি দত্ত সব সময় শ্রমজীবি মানুষের ভাগ্য উন্নয়নের স্বপ্ন নিয়ে কাজ করতেন। অসহায় মানুষের পাশে গিয়ে দাড়াতেন। নিজস্ব উদ্যেগে মগবাজারে মহিলা পরিষদের একটি শাখা গঠন করেন। দরিদ্র নারীদের সংগঠিত করে একটি সমবায় সমিতি করে তাদের হাতের কাজ শেখানো শুরু করেন।
১৯৯৬ সালে তার একমাত্র পুত্র কিশোর কুমার দত্ত ভারতের কলকাতায় থাকায় সেখানে চলে যান। কলকাতায় গিয়েও কমিউনিষ্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া ( সিপি আই) রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন।
২০০১ সালের ২২ ডিসেম্বর কলকাতায় মৃত্যুবরন করেন। একমাত্র ছেলে কলকাতা প্রবাসী কিশোর দত্ত বাবুল এবং একমাত্র মেয়ে মালয়েশিয়া প্রবাসী ডঃ কুমকুম দত্ত লিলি সহ অনেক আত্নীয় স্বজন রেখে গেছেন।
কমরেড শান্তি দত্ত ছিলেন একজন আজীবন কমিউনিষ্ট। সরলপ্রাণ, উদার,বিশ্বাসের স্থির এক নির্ভিক অসাধারন মানবদরদী ব্যক্তিত্ব শান্তি দত্ত। একজন আজীবন কমিউনিষ্ট নেত্রীকে আমরা হারালাম।