23/04/2024
গাছও হতে পারে ক্ষতিকর ও পরিবেশ বিধ্বংসী
নওরীন ওশিন
গাছ পরিবেশের বন্ধু, প্রকৃতির অমূল্য সম্পদ; কিন্তু স্থান ও সময় ভেদে অনেক গাছই হতে পারে পরিবেশ বিধ্বংসী। কিছু বিদেশি গাছের প্রজাতি এমন ক্ষতিকর ও পরিবেশ বিধ্বংসী হতে পারে যা স্থানীয় গাছসমূহের স্বাভাবিক জীবনধারণের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। যেমন- ইউক্যালিপটাস, একাসিয়া, কচুরিপানা, পাইনের মতো কিছু বিদেশি গাছ যারা দ্রুত বাড়ে ও ছড়িয়ে পড়ে এবং স্থানীয় উদ্ভিদের স্বাভাবিক জীবনধারণে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। এসব পরিবেশ ঘাতক গাছ দুর্ঘটনাবশত বা উদ্দেশ্যমূলকভাবে মানুষের কাছে সাধারণ গাছ হিসেবে পরিচিত হয়েছে। বাংলাদেশে মূলত অস্ট্রেলিয়ান দুইটি প্রজাতি ইউক্যালিপটাস ও একাসিয়া (আকাশমনি) ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। বাংলাদেশে দেড়শতক বছর ধরে সেগুন ও কচুরিপানা
সবচেয়ে উল্লেখ্যযোগ্য দুইটি বিদেশি উদ্ভিদ। অতি সম্প্রতি বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন উষ্ণমণ্ডলীয় দেশে ইউক্যালিপটাস, একাসিয়া, পাইন ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। ১৯৭০ সালের মাঝামাঝি সময়ে United Nations Development Programme (UNDP)-এর মাধ্যমে এই বিদেশি প্রজাতির গাছ আমাদের দেশে আসে। এশিয়ান ডেভলপমেন্ট ব্যাংকের অর্থায়নে উপজেলা পর্যায়ের 'সামাজিক বনায়ন কর্মসূচি' এবং সরকারের বন বিভাগের বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশে ১৯৮০ সালের মাঝামাঝি সময়ে ইউক্যালিপটাস, আকাশমনি, পাইন ইত্যাদি বিদেশি গাছ ব্যাপকভাবে পরিচিত হয়েছে। এর মধ্যে ইউক্যালিপটাস ও আকাশমনি- এই দুইটি গাছ অনেকের কাছে এখন স্থানীয় গাছ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। বাংলাদেশের বৃহত্তর দিনাজপুর, রংপুর, বগুড়া, পাবনা, যশোর, কুষ্টিয়া এবং পাহাড়ি অঞ্চলের অনেক জায়গা এখন বিদেশি গাছের বনে পরিণত হয়েছে। এমনকি রংপুর, দিনাজপুর, টাঙ্গাইল, গাজীপুরের শালবন এবং বৃহত্তর সিলেট ও চট্টগ্রামের
পাহাড়ি এলাকার অনেক প্রাকৃতিক বনাঞ্চল খুব দ্রুত
ইউক্যালিপটাস ও একাসিয়ার বনে পরিণত হয়েছে।
এক জরিপে দেখা গেছে, শুধু বৃহত্তর রংপুরেই বিদেশি প্রজাতির এসব ঘাতক গাছ লাগানো হয়েছে এক বিলিয়নের বেশি। সাধারণ জনগণের মধ্যে প্রচার করা হয়েছিল যে, এসব বিদেশি গাছ খুব দ্রুত বাড়ে, ফলে একদিকে এরা যেমন জ্বালানি ঘাটতি পূরণ করতে সক্ষম, অন্যদিকে এসব গাছের কাঠ ঘরবাড়ি নির্মাণের উপযোগী। ফলে ফসলের জমিতে, পাহাড়ের ঢালে খালি জায়গায়, বাড়ির আশেপাশে এবং বড় রাস্তার দুইপাশে ব্যাপকভাবে এসব বিদেশি গাছ লাগানো হয়েছে। এখন এসব গাছ স্থানীয় অন্যান্য গাছের উপর এবং জীববৈচিত্র্যের উপর মারাত্মক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করছে। মূলত কাগজের মণ্ড তৈরি করার জন্যই ইউক্যালিপটাস গাছ আমাদের দেশে প্রচলন করা হয়েছিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব বিদেশি গাছের ক্ষতিকর বৈশিষ্ট্যের পরিমাণ বেশি। উপরন্তু এসব গাছের বহুমাত্রিক ব্যবহার খুব একটা দেখা যায় না। এসব গাছের কাঠ বাড়িঘর নির্মাণের জন্য তেমন উপযোগী নয় এবং এসব গাছ থেকে যথেষ্ট জ্বালানিও পাওয়া যায় না। এদের পাতা গো-খাদ্য হিসেবেও উপযোগী নয় এবং এরা জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকিস্বরূপ। গাছটির মূল ১৫ মিটার
বা তারও বেশি গভীরে যেয়ে পানি শোষণ করে। সাধারণত কঠোর পরিস্থিতিতে গাছ বেঁচে থাকার জন্য নিজেদের মাঝে প্রতিযোগিতা করে। বেঁচে থাকার জন্য, কখনও কখনও সেরা প্রতিরক্ষা হয় অপরাধ। অনেক গাছ অ্যালিলোপ্যাথি নামে পরিচিত একটি প্রতিরক্ষামূলক প্রক্রিয়া উদ্ভাবন করেছে, যেখানে তারা প্রতিবেশী উদ্ভিদের বিকাশ এবং বৃদ্ধিকে দমন করার জন্য প্রতিষেধক রাসায়নিক নির্গত করে। অ্যালিলোপ্যাথি শব্দটি গ্রীক শব্দ অ্যালেলন থেকে উদ্ভূত হয়েছে যার অর্থ 'একে অপরের', এবং প্যাথোস যার অর্থ 'কষ্ট হওয়া', যা একত্রিত হলে আক্ষরিক অর্থ 'একে অপরের থেকে কষ্ট পাওয়া'। ইউক্যালিপটাস জাতীয় গাছগুলো এই রাসায়নিক বেশি নির্গত করে।
অ্যালেলোপ্যাথিকে কার্যকরভাবে দেখতে হলে বেশিরভাগ ব ইউক্যালিপটাস গাছের নীচে দেখতে হবে। অধিকাংশ ন ইউক্যালিপটাস গাছের গোঁড়ায় কোন ঘাস বা আগাছা জন্মে না। এটা ছায়ার কারণে ঘটে না, কারণ বেশিরভাগ ইউক্যালিপ্ট ক্যানোপিগুলি বেশ বিক্ষিপ্ত এবং খুব কম ছায়া দেয়।
উপরন্ত আক্রমণাত্মক ইউক্যালিপ্টের শিকড়গুলি জলের জন্য অনেক গাছপালাকে ছাড়িয়ে যেতে পারে এবং এই প্রভাবটি তখনও ঘটে যখন জলের কোন অভাব থাকে না। শিকড়, পাতা এবং শাখা থেকে নির্গত অ্যালিলোপ্যাথিক রাসায়নিক প্রাকৃতিক হার্বিসাইড হিসাবে কাজ করে, তাদের নীচের মাটি পরিষ্কার করে। প্রাপ্ত বয়স্ক ইউক্যালিপটাস গাছ কেটে ফেললেও তাদের শেকড় থেকে নতুন গাছ জন্ম নেয়। ফলে একবার ইউক্যালিপটাস গাছ লাগালে সেটি নির্মূল করাও কঠিন। উদ্ভিদ জগতে, অ্যালিলোপ্যাথিক রাসায়নিকগুলি পাতা, ফুল, শিকড়, ফল বা কাণ্ডের পাশাপাশি আশেপাশের মাটিতে পাওয়া যায়। এই বিষয়গুলি তাদের লক্ষ্যকে বিভিন্ন উপায়ে প্রভাবিত করে যেমন: - অঙ্কুর এবং শিকড় বৃদ্ধি বাধা, পুষ্টি গ্রহণের বাধা এবং - পুষ্টির উৎস ধ্বংস করার জন্য প্রাকৃতিকভাবে ঘটমান সিম্বিওটিক সম্পর্ককে আক্রমণ করা
সাধারণভাবে, ইউক্যালিপটাস প্রজাতির শাখা এবং ডালপালাসহ তাদের শিকড়, পাতা এবং কাণ্ডে অ্যালিলোপ্যাথিক রাসায়নিক থাকে, যা আমরা ইউক্যালিপটাস বা সমজাতীয় গাছের কাছে গেলে সহজেই বুঝতে (গন্ধ নিয়ে) পারি।
অতিরিক্ত পানি ও খনিজ শোষণ করার ফলে যে জায়গায় গাছটি লাগানো হয়, সে স্থানটি হয়ে পড়ে পানিশূণ্য ও কমে যায় মাটির উর্বরতা শক্তি। এতে পানির স্তর নিচে নামাসহ অন্য প্রজাতির গাছের স্বাভাবিকতা নষ্ট হয়ে পরিবেশ হুমকির মুখে পড়ে। এমনকি এ অঞ্চল ধীরে ধীরে মরু অঞ্চলে পরিণত হতে পারে।
জমির আইল, কৃষিজমি ও পতিত জমিতে লাগানো এ গাছ উপকারের পরিবর্তে ক্ষতিই বেশি করে। ইউক্যালিপটাসের পাতা ও ডালপালা অজৈব পদার্থের মতো কাজ করে কৃষিজমিকে অনুর্বর করে। ফলে ফসলের উৎপাদন কমে যায়। আবাদি জমিতে এই গাছ লাগানোর ফলে মাটির উর্বরতা শক্তি কমে যাচ্ছে। এ গাছের পাতায় একধরনের পেট্রোলিয়াম জাতীয় পদার্থ থাকে, যা জমির দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি করে। কোনো পাখি এসব গাছের ফল খেতে পারে না। এমনকি এসব গাছে পাখিরা বাসা ও বাঁধতে পারে না। এসব গাছের পাতা সহজে মাটিতে মিশে না- ফলে মাটির উর্বরতা কমে যায়। আরো ভয়ংকর ব্যাপার হলো- এসব গাছের ফুলের পরাগরেণু মানুষের বিভিন্ন এলার্জি ও এজমাজনিত রোগ সৃষ্টি করে। বিভিন্ন গবেষণা থেকে আরো দেখা যায় যে, এসব ঘাতক গাছ মাটি থেকে প্রচুর পানি শোষণ করে। ফলে এসব গাছের আশেপাশের মাটি শুষ্ক হয়ে ফসল উৎপাদনের অনুপযোগী হয়ে পড়ে এবং পানির স্তর অনেক নিচে নেমে যায়। তাই বলা যায় যে, এসব বিদেশি প্রজাতির বৃক্ষ আমাদের দেশের জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি সাধন করছে। অপরদিকে বাংলাদেশের স্থানীয় গাছ 'শাল' অর্থনৈতিক ভাবে এবং পরিবেশের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের অনেক মানুষের জীবিকা নির্ভর করে শালবনের উপর। শালগাছের কাঠ খুব শক্ত যা ঘরবাড়ি নির্মাণের জন্য বিশেষ উপযোগী। স্থানীয় লোকজন শালগাছের শুকনো ডাল ও পাতা সংগ্রহ করে তাদের জ্বালানি ঘাটতি পূরণ করে। শালবীজ থেকে তেল পাওয়া যায় এবং শাল গাছের ফুল থেকে মৌমাছি উন্নতমানের মধু সংগ্রহ করে। দেশীয় বিভিন্ন ফলদ, বনজ, ঔষধি গাছ ও আয়ের উৎস হতে পারে। ঔষধি গাছের মধ্যে নিম অন্যতম। নিম গাছের গুণকীর্তন করতে গেলে বলতে হয়- বাড়িতে থাকলে নিম গাছ, সুস্বাস্থ্য বারো মাস। নিম গাছ পরিবেশ এবং গণস্বাস্থ্যের জন্য খুব ভালো।
তাছাড়া নিমের ডাল, পাতা, ফুল, ফল, বীজ বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে। বর্তমানে ভারত, ঘানা, সোমালিয়া এমনকি মধ্যপ্রাচ্যেও নিমের ফুল, ফল, বীজ, পাতা বিভিন্ন রোগের প্রতিষেধক তৈরিতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে নিমের ডাল ব্যবহৃত হয় আধুনিক টুথপেস্ট ও টুথব্রাশের বিকল্প হিসেবে। অন্যান্য ঔষধি গাছের মধ্যে রয়েছে- অর্জুন, বাসক, হিজল, অশক, বট ইত্যাদি। এসব দেশীয় গাছের প্রতিটি অংশ নানা রকম ঔষধি গুণে সমৃদ্ধ। এসব গাছের কাঠের বাজারমূল্যও অনেক। দেশীয় ফলদ বৃক্ষের মধ্যে রয়েছে আম, আতা, নারকেল, বড়ই, জাম, কামরাঙ্গা, তেঁতুল, আমলকি ইত্যাদি। এসব দেশি ফল মানুষের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং এসব ফল ভিটামিনে ভরপুর; কিন্তু পরিতাপের বিষয়, আমাদের দেশে বাজারে ফলের দোকানগুলোতে এসব দেশি ফল নেই বললেই চলে।
পরিশেষে বলা যায়, ইউক্যালিপটাস, পাইন, আকাশমনির
মতো বিদেশী প্রজাতির ঘাতক গাছের সংখ্যা উল্লেখ্যযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং আমাদের স্থানীয় গাছের সংখ্যা কমে যাওয়ায়, বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্য ও প্রকৃতি আজ -- বিপন্ন। তাই অচিরেই এসব বিদেশী গাছের বনায়ন বন্ধ ব করা উচিত এবং তার পরিবর্তে বেশি করে দেশীয় ফলজ, - বনজ ও ঔষধি গাছের বনায়ন বৃদ্ধি করা উচিত। বাংলাদেশ ■ সরকারের আইন করা উচিত ক্ষতিকর বিদেশী গাছের বনায়নের বিরুদ্ধে এবং একই সাথে নার্সারীগুলোতে এ নজরদারী রাখা উচিত, যেন এসব ক্ষতিকর বিদেশী ■ গাছের চারা উৎপাদন ও বিক্রি হতে না পারে। বর্তমানে এসব ক্ষতিকর গাছের উল্লেখ্যযোগ্য দুটি ব্যবহার হলো অফসেট পেপার এর মন্ড এবং প্লাই উড তৈরীর কাচামাল হিসেবে। আমরা যদি একটু সচেতন হয়ে এই অফসেট পেপার এবং প্লাই উডের ব্যবহার কমাতে পারি বা বিকল্প কাঁচামালের উৎস খুঁজে বের করতে পারি, তাহলে এসব বিদেশী গাছের প্রয়োজন অনেক কমে যাবে, সেই সাথে রক্ষা পাবে আমাদের জীববৈচিত্র ও পরিবেশ।
(লেখক: বিজ্ঞান আন্দোলন মঞ্চের পরিবেশ বিষয়ক লেখক)