03/10/2025
গান ও বাদ্যযন্ত্র : ইসলামী দৃষ্টিকোণ
▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬
সমসাময়িক ফেৎনার মাঝে অন্যতম একটি ফেৎনা হলো গান ও বাদ্যযন্ত্র।
১৪০০ বছর আগে রাসুল (সা.) বলেছেনঃ আমার উম্মতের মধ্যে এমন কিছু লোক সৃষ্টি হবে, যারা ব্যভিচার, রেশম, মদ ও বাদ্যযন্ত্রকে হালাল সাব্যস্ত করবে।
এই হাদিসটি আজ বাস্তবে রুপ নিয়েছে এখন অনেকেই গান ও বাদ্যযন্তকে জায়েজ বলে এমন
একজন আলেমের সাথে ঘটে যাওয়া
একটি ঘটনা হুবুহু তুলে ধরা হলোঃ
[একদিন আমার এক ছাত্র এসে বলল, উস্তাদ! গান শোনা তো জায়েয হয়ে গিয়েছে। এই বলে সে একটি মাসিক পত্রিকার রেফারেন্স দেখাল। আরেক ছাত্র বলল, উস্তাদ! ড. ইউসুফ কারযাভী তো বাদ্যসহ গানকে জায়েয বলেছেন! গান-বাজনার পক্ষে কেউ এই যুক্তি দেন যে, দফ ছিল তৎকালীন আরবের বাদ্যযন্ত্র। আধুনিকতার ছোঁয়ায় এখন তা আরো উন্নত হয়েছে। এমনকি কেউ কেউ এমন কথাও বলেন যে, বিয়ে-শাদিতে গান-বাজনা করা সুন্নত।]
▬▬▬▬▬▬
গান ও বাদ্যযন্ত্র সম্পর্কে কোরআনের আয়াতসমুহে আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ
আর একশ্রেণীর লোক আছে, যারা অজ্ঞতাবশত খেল-তামাশার বস্তু ক্রয় করে বান্দাকে আল্লাহর পথ থেকে গাফেল করার জন্য।
(সূরা লুকমান:৬)
এই আয়াত সম্পর্কে সাহাবী ও তাবেয়ীদের ব্যাখ্যাঃ
[হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. কে উক্ত আয়াতের ‘লাহওয়াল হাদীস’-এর ব্যাখ্যা জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, ‘তা হল গান।’ আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা., আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. একই কথা বলেন। তাবেয়ী সায়ীদ ইবনে যুবাইর থেকেও অনুরূপ মত বর্ণিত হয়েছে। বিখ্যাত তাবেয়ী হাসান বসরী রাহ. বলেন, উক্ত আয়াত গান ও বাদ্যযন্ত্রের ব্যাপারে নাযিল হয়েছে, যা বান্দাকে কুরআন থেকে গাফেল করে দেয়।-তাফসীরে ইবনে কাসীর ৩/৪৪১]
কুরআন মজীদের অন্য আয়াতে আছে, ইবলিস-শয়তান আদম সন্তানকে ধোঁকা দেওয়ার আরজী পেশ করলে আল্লাহ তাআলা ইবলিসকে বললেন,
তোর আওয়াজ দ্বারা তাদের মধ্য থেকে যাকে পারিস পদস্খলিত কর।
(সূরা ইসরা : ৬৪)
[এ আয়াতের ব্যাখ্যায় আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, যে সকল বস্তু পাপাচারের দিকে আহ্বান করে তাই ইবলিসের আওয়াজ। বিখ্যাত তাবেয়ী মুজাহিদ রাহ. বলেন, ইবলিসের আওয়াজ বলতে এখানে গান ও বাদ্যযন্ত্রকে বোঝানো হয়েছে। আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম রাহ. বলেন, এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, যেসব বস্তু পাপাচারের দিকে আহ্বান করে তার মধ্যে গান-বাদ্যই সেরা। এজন্যই একে ইবলিসের আওয়াজ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে।-ইগাছাতুল লাহফান ১/১৯৯]
▬▬▬▬▬▬
হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী
গান ও বাদ্যযন্তঃ
গান-গায়িকা এবং এর ব্যবসা ও চর্চাকে হারাম আখ্যায়িত করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
তোমরা গায়িকা (দাসী) ক্রয়-বিক্রয় কর না এবং তাদেরকে গান শিক্ষা দিও না। আর এসবের ব্যবসায় কোনো কল্যাণ নেই। জেনে রেখ, এর প্রাপ্ত মূল্য হারাম।
(জামে তিরমিযী হাদীস:১২৮২
ইবনে মাজাহ হাদীস:২১৬৮)
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও ইরশাদ করেন, আমার উম্মতের কিছু লোক মদের নাম পরিবর্তন করে তা পান করবে। আর তাদের মাথার উপর বাদ্যযন্ত্র ও গায়িকা রমনীদের গান বাজতে থাকবে। আল্লাহ তাআলা তাদেরকে যমীনে ধ্বসিয়ে দিবেন।
(সুনানে ইবনে মাজাহ হাদীস:৪০২০ সহীহ ইবনে হিব্বান হাদীস:৬৭৫৮)
রাসুল (সা.) বলেছেনঃ আমার উম্মতের মধ্যে এমন কিছু লোক সৃষ্টি হবে, যারা ব্যভিচার, রেশম, মদ ও বাদ্যযন্ত্রকে হালাল সাব্যস্ত করবে।
(সহীহ বুখারী হাদীস:৫৫৯০)
▬▬▬▬▬▬
সাহাবারা গান ও বাদ্যযন্ত্রকে কিরুপ ভাবে দেখতেনঃ
বিখ্যাত তাবেয়ী হযরত নাফে’ রাহ. থেকে সহীহ সনদে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার চলার পথে আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. বাঁশির আওয়াজ শুনলেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি দুই কানে আঙ্গুল দিলেন। কিছু দূর গিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, হে নাফে’! এখনো কি আওয়াজ শুনছ? আমি বললাম হ্যাঁ। অতঃপর আমি যখন বললাম, এখন আর আওয়াজ শোনা যাচ্ছে না তখন তিনি কান থেকে আঙ্গুল সরালেন এবং বললেন, একদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চলার পথে বাঁশির আওয়াজ শুনে এমনই করেছিলেন। -
(মুসনাদে আহমদ হাদীস:৪৫৩৫ সুনানে আবু দাউদ হাদীস:৪৯২৪)
[একটু ভেবে দেখুন তো, যে আওয়াজ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সাহাবায়ে কেরাম মুহূর্তের জন্যও কানে তুলতে রাজি ছিলেন না সেই ইবলিসী আওয়াজ আর আমরা এটাকে শুনতে এটাকে জায়েজ বলেতে দিদা বোধ করি না 'আপসোস']
বাজনাদার নুপুর ও ঘুঙুরের আওয়াজও সাহাবায়ে কেরাম বরদাশত করতেন না। তাহলে গান ও বাদ্যযন্ত্রের প্রশ্নই কি অবান্তর নয়? নাসাঈ ও সুনানে আবু দাউদে বর্ণিত আছে, একদিন হযরত আয়েশা রা.-এর নিকট বাজনাদার নুপুর পরে কোনো বালিকা আসলে আয়েশা রা. বললেন, খবরদার, তা কেটে না ফেলা পর্যন্ত আমার ঘরে প্রবেশ করবে না। অতঃপর তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
যে ঘরে ঘণ্টি থাকে সেই ঘরে রহমতের ফেরেশতা প্রবেশ করে না।-সুনানে আবু দাউদ হাদীস : ৪২৩১; সুনানে নাসাঈ হাদীস : ৫২৩৭ সহীহ মুসলিমে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ঘণ্টি, বাজা, ঘুঙুর হল শয়তানের বাদ্যযন্ত্র।
(সহীহ মুসলিম হাদীস:২১১৪)
মৃদু আওয়াজের ঘণ্টি-ঘুঙুরের যদি এই অবস্থা হয় তাহলে আধুনিক সুরেলা বাদ্যযন্ত্রের বিধান কী হবে তা খুব সহজেই বুঝা যায়।
▬▬▬▬▬▬
সাহাবী ও ওয়ালামাদের গান নিয়ে কিছু কথাঃ
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলেন, পানি যেমন (ভূমিতে) তৃণলতা উৎপন্ন করে তেমনি গান মানুষের অন্তরে নিফাক সৃষ্টি করে।-ইগাছাতুল লাহফান ১/১৯৩; তাফসীরে কুরতুবী ১৪/৫২
আবু বকর রা. গানবাদ্যকে শয়তানের বাঁশি বলে আখ্যায়িত করেছেন।
সাহাবী ও তাবেয়ীদের ভাষ্য অনুযায়ী বহু গুনাহর সমষ্টি হল গান ও বাদ্যযন্ত্র। যথা :
১) নিফাক এর উৎস
২)ব্যভিচারের প্রেরণা জাগ্রতকারী
৩)মস্তিষ্কের উপর আবরণ
৪)কুরআনের প্রতি অনিহা সৃষ্টিকারী ৫)আখিরাতের চিন্তা নির্মূলকারী
৬)গুনাহের প্রতি আকর্ষণ সৃষ্টিকারী ৭) জিহাদী চেতনা বিনষ্টকারী।
ইগাছাতুল লাহফান ১/১৮৭ বস্তুত গান বাজনার ক্ষতিকর প্রভাব এত বেশি যে, তা নাজায়েয হওয়ার জন্য আলাদা কোনো দলীল খোঁজার প্রয়োজন পড়ে না।
ইমাম ইবনুল কায়্যিম (রহিঃ)বলেনঃ
গান অন্তরকে ধ্বংস করে ফেলে
আর অন্তর ধ্বংস হয়ে গেলে তাতে মুনাফীকি চলে আসে।
(ইগাসাতুল লাহফান ১/৪৪৮)
▬▬▬▬▬▬
চার ইমামের মতে গান ও বাদ্যযন্ত্রঃ
ইমাম মালেক রাহ. কে গান-বাদ্যের ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, কেবল ফাসিকরাই তা করতে পারে।-কুরতুবী ১৪/৫৫
ইমাম শাফেয়ী রাহ. বলেছেন যে, গান-বাদ্যে লিপ্ত ব্যক্তি হল আহমক। তিনি আরো বলেন, সর্বপ্রকার বীণা, তন্ত্রী, ঢাকঢোল, তবলা, সারেঙ্গী সবই হারাম এবং এর শ্রোতা ফাসেক। তার সাক্ষ্য গ্রহণ করা হবে না।-ইগাছাতুল লাহফান ১/১৭৯; কুরতুবী ১৪/৫৫
হাম্বলী মাযহাবের প্রখ্যাত ফকীহ আল্লামা আলী মারদভী লেখেন, বাদ্য ছাড়া গান মাকরূহে তাহরীমী। আর যদি বাদ্য থাকে তবে তা হারাম।-আহসানুল ফাতাওয়া ৮/৩৮৮
ইমাম শাফেয়ী রাহ. শর্তসাপেক্ষে শুধু ওলীমা অনুষ্ঠানে দফ বাজানোর অবকাশ আছে বলে মত দিয়েছেন। কেননা বিয়ের ঘোষণার উদ্দেশ্যে ওলীমার অনুষ্ঠানে দফ বাজানোর অবকাশের বর্ণনা হাদীসে রয়েছে।-জামে তিরমিযী হাদীস : ১০৮৯; সহীহ বুখারী হাদীস : ৫১৪৭, ৫১৬২ মনে রাখতে হবে, এখানে দফ বাজানোর উদ্দেশ্য হল বিবাহের ঘোষণা, অন্য কিছু নয়।-ফাতহুল বারী ৯/২২৬
▬▬▬▬▬▬
দফ এর পরিচয়ঃ
যারা সরাসরি আরবে দফ দেখেছেন, তাদের বর্ণনা থেকে জানা যায়, দফ-এর এক পাশ খোলা। বাজালে ঢ্যাব ঢ্যাব আওয়াজ হয়। প্লাস্টিকের গামলা বাজালে যেমন আওয়াজ হবে তেমন। আসলে দফ কোনো বাদ্যযন্ত্রের পর্যায়ে পড়ে না।
আওনুল বারী গ্রন্থে দফ-এর পরিচয় দিতে গিয়ে লেখা হয়েছে যে, এর আওয়াজ স্পষ্ট ও চিকন নয় এবং সুরেলা ও আনন্দদায়কও নয়। কোনো দফ-এর আওয়াজ যদি চিকন ও আকর্ষণীয় হয় তখন তা আর দফ থাকবে না; বাদ্যযন্ত্রে পরিণত হবে।-আওনুল বারী ২/৩৫৭
▬▬▬▬▬▬
ইসলামিক নাশিদ নিয়ে কিছু কথাঃ
ইসলামিক নাশীদ শোনা হালাল তবে এখন ইউটিউবে ভিবিন্ন নাশীদ থেকে থাকে যার বেকগ্রাউন্ডে সফ্ট মিউজিক ব্যবহার করা হয়, আর যে নাশীদে সফ্ট মিউজিক ব্যবহার করা হয় তা শোনা হারাম এটাকে নেক সুরতে ধোকা বলতে পারেন।
(শাইখ আহমাদুল্লাহর একটি ভিডিও থেকে নেয়া)
▬▬▬▬▬▬
শেষ কথাঃ
কোনো মুমিন কখনো কোনো হারামকে হালাল বলে চালিয়ে দিতে পারে না। আর এখন বিষাক্ত ফেৎনার সময় চলছে আমাদের সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে পদে পদে ফেৎনা থেকে বেচে থাকতে হবে।