07/11/2023
একটি সত্য ঘটনা
প্রায় এক'শ বছর আগে ঘটনাটি ঘটে সৌদি আরবের এক প্রত্যন্ত অঞ্চলে। রেডিওতেও ঘটনাটি প্রচার করা হয়। ঘটনাটা ইব্ন জাদ‘আঁন নামক এক ব্যক্তির। তার ছিল অনেকগুলো মোটা-তাজা উট। এই উটগুলোর ওলান এতই পূর্ণ ছিল যে, দেখে মনে হতো ভারে ফেটে যাবে।
ইব্ন জাদ‘আঁন নিজের কথায় বর্ণনা করেন যে, আমার পাশেই দরিদ্র এক প্রতিবেশী ছিল। সেই প্রতিবেশীর ছিল সাতটি কন্যা সন্তান। আমি আমার উটের পালের একটা উটনি বাচ্চাসহ তাকে সাদাকাহ হিসেবে দিয়ে দেওয়ার জন্য মনস্থির করলাম। আমি তখন এই আয়াতটি আবৃত্তি করলাম যেখানে আল্লাহ বলেছেন,
لن تنالوا البر حتى تنفقوا مما تحبون
“যতক্ষণ না তোমরা তোমাদের পছন্দের জিনিস থেকে ব্যয় করবে, ততক্ষণ তোমরা পুণ্য অর্জন করতে পারবে না।” [আলি ‘ইমরান, ৩:৯২]
আমার উটের পালের মধ্যে আমার সবচেয়ে প্রিয় হচ্ছে উটনিগুলো। আমি আমার উটের পাল থেকে ভালো একটি উটনি তার বাচ্চাসহ নিয়ে গেলাম আমার প্রতিবেশীর কাছে। তাকে বললাম, “আমার পক্ষ থেকে উপহার হিসেবে এটা গ্রহণ করুন।” এটা শুনে আনন্দে তার চোখ-মুখ যেন জ্বলজ্বল করে উঠল—কী বলবে ভাষা খুঁজে পাচ্ছিল না।
উটনির দুধ থেকে আমার প্রতিবেশী ভালোই উপকার পাচ্ছিল। সে ওটার পিঠে কাঠ বহন করাত। ওটার বাচ্চাটা বড় হওয়ার জন্য সে অপেক্ষা করতে লাগল, যাতে সেটা ভালো দামে বিক্রি করতে পারে। এভাবে অনেক কল্যাণই সে পেতে লাগল।
বসন্তের পরে শুষ্ক গ্রীষ্ম তার অনাবৃষ্টি নিয়ে হাজির হলো। পানি ও ঘাসের খোঁজে আমি বেরিয়ে পড়লাম। পানির জন্য আমি দুহূলের খোঁজ করতে লাগলাম। দুহূল হচ্ছে এমন এক গর্তের মুখ যেটা ভূগর্ভস্থ পানির সন্ধান দিতে পারে। এসব গর্তের মুখগুলো মাটির উপরেই থাকে। আমরা আরব বেদুইনরা এগুলো ভালোভাবেই চিনতে পারি।
পানি নিয়ে আসার জন্য আমি এ রকম এক গর্তের মধ্যে প্রবেশ করলাম...
ইন জাদ‘আঁনের তিন ছেলে গর্তের বাইরে অপেক্ষা করছিল। কিন্তু তাদের বাবা ফিরে আসছিল না। তারা একদিন, দুদিন, তিনদিন পর্যন্ত অপেক্ষা করল। কিন্তু তখনো তার বাবার ফেরার কোনো নামগন্ধ নেই। আশাহত হয়ে পড়ল তারা। ভাবল তাদের বাবাকে হয়তো সাপে কেটেছে, কিংবা গর্তের ভেতরে হারিয়ে গেছে। তারা তার মৃত্যুর প্রহর গুনছিল। কেন? যাতে তারা ই জাদ‘আনের উত্তরাধিকার সম্পদের ভাগ-বাটোয়ারা করে নিতে পারে।
তারা বাড়ি ফিরে এল। নিজেদের মধ্যে সম্পত্তি ভাগ-বাটোয়ারা করে নিল। তাদের হঠাৎ মনে পড়ল, তাদের বাবা পাশের এক প্রতিবেশীকে একটা উটনি দান করেছিলেন। তারা সেই প্রতিবেশীর কাছে গিয়ে বলল, ভালোয় ভালোয় সে যেন সেই উটনি দিয়ে দেয় এবং এর পরিবর্তে অন্য একটা উটনি নেয়। না হলে তারা জোর করে সেই নিয়ে নেবে। তখন আর তার কাছে কিছুই থাকবে না ।
প্রতিবেশী তখন বলল, সে তাদের বাবাকে এই কথা জানাবে। ছেলেরা বলল, তাদের বাবা মারা গেছে। প্রতিবেশী জিজ্ঞেস করল কীভাবে এবং কোথায় ইবন জাদ' আঁন মারা গেছে। তাকে এখনো জানায়নি কেন। ছেলেরা তখন তাকে বলল যে, তাদের বাবা মরুভূমির একটা গর্তে প্রবেশ করেছিল পানি আনার জন্য; কিন্তু আর ফিরে আসেনি।
প্রতিবেশী বলল, “আল্লাহর কসম, তোমরা আমাকে সেই জায়গায় নিয়ে যাও, আর তোমাদের উটনিও নিয়ে নাও। এটা দিয়ে যা খুশি কর গে, আমি আর তোমাদের উটনি চাই না।”
ছেলেরা তাকে সেই গর্তের প্রবেশমুখে নিয়ে গেল। সে একটা দড়ি আনল এবং আলো জ্বালাল। দড়িটা সে গর্তের বাইরে বাঁধল। এরপর হামাগুড়ি দিয়ে গর্তের মধ্যে প্রবেশ করল। যেতে যেতে এমন এক পৌঁছাল, যেখানে সে কোনোমতে গড়িয়ে গড়িয়ে চলতে লাগল। অবশেষে এক পর্যায়ে সে ভেজা মাটির গন্ধ পেল। তখন হঠাৎ সে শুনতে পেল পানির ধারে কোনো একজনের গোঙানির শব্দ।
শব্দ শুনে শুনে সে উৎসের কাছে যেতে লাগল, খুঁজতে লাগল চারপাশে হাত বিছিয়ে। এবং একসময় হাতড়ে হাতড়ে কাউকে যেন খুঁজে পেল। লোকটার দম আছে কি না দেখল। অবাক বিস্ময়ে আবিষ্কার করল যে, এক সপ্তাহ পরেও সেই লোকের এখনো দম আছে। তাকে বের করে নিয়ে এল। সূর্যের আলো থেকে রক্ষা করার জন্য তার চোখের সামনে হাত দিয়ে তাকে বের করে আনল। সে তার সাথে কিছু খেজুর নিয়ে গিয়েছিল। এগুলো পানিতে ভিজিয়ে খেতে দিল লোকটিকে। সেই লোকটি আর কেউ নয়; ইব্ন জাদ‘আঁন!
বেদুইন প্রতিবেশী তাকে পিঠে করে বয়ে তার বাসায় নিয়ে এলো। ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠল ই জাদ‘আঁন—তার ছেলেরা জানতেও পারল না। প্রতিবেশী তখন ই জাদ‘আঁনকে জিজ্ঞেস করল, “কীভাবে এক সপ্তাহ আপনি বেঁচে ছিলেন?”
ইব্ন জাদ‘আঁন বলা শুরু করলেন, “সে এক আজব ঘটনা। নিচে আমি হারিয়ে গিয়েছিলাম। অন্ধকারে কিছুই ঠাওর করতে পারছিলাম না। যেখানে পৌঁছেছিলাম সেখানে পানি ছিল। ভাবলাম, এই পানির কাছাকাছিই থাকি।
কাজেই পানি খেয়ে দিন পার করতে লাগলাম। কিন্তু ক্ষুধা না মানে অন্য কিছু। পানি খেয়ে আর পারছিলাম না। তিন দিন পর ক্ষুধা আরও তীব্রতর হলো। চারপাশ থেকে যেন চেপে ধরল ক্ষুধা। শুয়ে শুয়ে নিজেকে আল্লাহর কাছে সঁপে দিলাম। তাঁর হাতেই নিজেকে ছেড়ে দিলাম।
এরপর হঠাৎ টের পেলাম আমার মুখের উপর গরম দুধ ঝরছে। আমি অন্ধকারের মাঝে উঠে বসলাম। দেখলাম একটা পাত্র আসছে আমার কাছে। পাত্রটা থেকে দুধ খাওয়া শুরু করলাম। যতক্ষণ না খেয়ে পেট ভরছে, ততক্ষণ খেতাম। এরপর এটা চলে যেত। দিনে তিনবার এমনটা হতো। কিন্তু শেষ দুদিন আর এমনটা হয়নি। জানি না কেন এমন হলো।”
তার প্রতিবেশী তখন তাকে জানাল,
“এর কারণ জানলে আপনি আরও বেশি আশ্চর্যান্বিত হবেন। আপনার ছেলেরা ভেবেছিল আপনি মারা গেছেন। তারা আমার কাছে এসে আপনি আমায় যে উটনি দিয়েছিলেন সেটা নিয়ে যায়। সম্ভবত আল্লাহ এই উটের দুধই আপনাকে খাওয়াচ্ছিলেন।”
সাদাকাহ এভাবেই একজন মুসলিমকে বিপদে ছায়া দিয়ে রাখে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
“আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার জন্য (সংকট থেকে) বের হওয়ার একটা পথ করেই দেবেন। আর তাকে এমন জায়গা থেকে জীবিকার ব্যবস্থা করবেন, যা সে ধারণাও করে না। যে আল্লাহর উপর ভরসা করে তার জন্য তিনিই যথেষ্ট।” [আত-তালাক, ৬৫ঃ২-৩]
উপরোক্ত সত্য ঘটনাটা বর্ণনা করেছেন ড. সালিহ আস-সাঁলিহ। আল্লাহ তাআলা তাঁর উপর রহমাত বর্ষণ করুন।