09/07/2023
হাসপাতালে রোগী দেখতে যাওয়া ও রোগীর স্বজন দের জন্য দু একটি কথা। যারা রোগী দেখতে হাসপাতালে যান তাদের জন্য কিছু পরামর্শ আমার ক্ষুদ্র ডাক্তারী জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে লিখছি।
১. আপনারা যারা হাসপাতালে রোগী দেখতে যাবেন তারা এমন একটা সময়ে যাবেন যখন প্রফেসর দের রাউন্ড থাকে না। সাধারণত সকাল বেলায় সব স্যার- ম্যাডাম দের ওয়ার্ডে রাউন্ড থাকে। ( রাউন্ড বলতে, যে সময়ে স্যার ম্যাডাম রা একজন একজন করে রোগী দেখে আলোচনা করে রোগ নির্নয় ও চিকিৎসা নির্ধারন করেন সেই সময় কে বোঝানো হয়) এই সময় অযাচিত ভীড় এড়ানোর জন্য আপনারা ওয়ার্ডের বাইরে অবস্থান করবেন। এতে রোগী দেখতে অনেক অনেক সুবিধা হয়। সবাই দল বেধে এক সাথে চলে আসবেন না। বিকাল বা সন্ধ্যায় ভর্তি রোগী দের দেখার জন্য আসলে সব চেয়ে ভালো হয়।
২. আপনারা যারা রোগীর সাথে আসেন তাদের মাঝে এমন কেও রোগীর সাথে থাকবেন যে তুলনামূলক বুঝমান, কথা বললে সেই অনুযায়ী কাজ টা করতে পারবে। সবার বাড়িতে যে এমন লোক থাকবেই তা নয়। সেক্ষেত্রে আত্মীয় স্বজন এর মাঝে সহযোগীতা নেন। বিশ্বাস করেন, এক কথা ১০ বার না বলে, ১ -২ বার বলেই যদি বুঝিয়ে ফেলা যায় তাহলে অনেক দ্রুত রোগীর কাজ গুলো এগিয়ে যায়।
৩. আপনারা যারা রোগী দেখতে যাবেন, দয়া করে তারা হাসপাতালে গিয়ে খাওয়া দাওয়া করা, অপ্রয়োজনীয় গল্প দীর্ঘায়িত করা, বাচ্চাদের নিয়ে যাওয়া ইত্যাদি পরিহার করবেন। এগুলো পরোক্ষ ভাবে অসুবিধার সৃষ্টি করে। বাচ্চারা যে কোনও সময় সহজেই ইনফেকশন এ আক্রান্ত হয়ে যায়, তাই না নেয়াই শ্রেয়।
৪. আপনারা দয়া করে দালাল এর খপ্পরে না পড়ার চেষ্টা করবেন। সরকারি হাসপাতালের টেস্ট ই ভালো। যদি বাইরে কোথাও করতেই চান তবে খোজ নিবেন সবচেয়ে ভালো কোনটা সেখানে যাবেন। একটা অতি জরুরী রোগীর রিপোর্ট গুলো যদি এলোমেলো হয় মানহীন কোনও জায়গায় টেস্ট এর কারণে আমাদের রোগ ধরতে বা নিশ্চিত করতে বা ফলো আপ করতে খুব ঝামেলায় পড়তে হয়।
৫. আপনারা রোগী দেখার জন্য বের হলে একটা নিয়ত করে বের হবেন, আজ কোনও একটা ছোট /বড় উপকার করার চেষ্টা করবো। যেমন, একটা মেডিসিন কিনে দেয়া, একটা টেস্ট করানোর ব্যবস্থা করা, কিংবা বাসা থেকে খাবার নিলে যদি উপকার হয় সেটা নেয়া কিংবা রোগীর কাগজ নিয়ে অন্য বিভাগে যাওয়ার দরকার হলে সেটা করে দেয়া। আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না, এতে রোগির এবং রোগীর সাথে ২৪ ঘন্টা থাকা মানুষ গুলোর অনেক উপকার হয়। তারা সাহস পায়, একটু বিশ্রাম পায়। একটু ভরসা পায়। এমনি ই গিয়ে ঘুরলাম দেখলাম সেটা না করে কিছু একটা হেল্প করলে সব দিক দিয়েই ভালো।
৬. যারা রোগীর সাথে থাকবেন, তারা একটু কৌশলী হবেন। ধরেন ডাক্তার কিংবা সিস্টার খুব ব্যস্ত। অনেক গুলো রোগি একসাথে সামাল দিচ্ছে তখন আপনি গিয়ে বললেন, দুপুরের মেডিসিন তো খাওয়ালাম, রাতে কোন মেডিসিন গুলো দিবো? এই সময় আপনি কি আশা করেন আপনার সাথে সময় নিয়ে কথা বলতে পারবে?
তার চেয়ে একটু নিরিবিলি হলে, রোগীর চাপ কমলে আপনি জিজ্ঞেস করেন। আপনাকে খুব ভালো করেই বুঝিয়ে দিবে। আপনার প্রশ্ন টা গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু, এই মুহুর্তে ইমার্জেন্সী নয়। এরকম ব্যপার অহরহ ঘটে। একটু কৌশলী হলে এত এত রোগীর মাঝেও আপনি পুরো সেবা নিয়েই বাড়ি ফিরতে পারবেন ইনশাআল্লাহ।
৭. যারা রোগির সাথে থাকেন, তারা টিপ টপ, পরিস্কার পরিচ্ছন্ন থাকার চেষ্টা করবেন। এটা করতে তো ডাক্তার লাগে না। বিছানায় ময়লা পড়লে ঝেড়ে নিলেন, বিছানার আশে পাশে কফ, থুতু, ময়লা, কাগজ এগুলো ফেলবেন না, রোগীকে পরিস্কার কাপড় পড়াবেন ( যতটা সম্ভব), বেড এর উপরে তারের মাঝে কাপড় ঝুলিয়ে রাখবেন না। এগুলো রোগীর সুস্থতার জন্য পরোক্ষ ভাবে কাজ করে। ডাক্তার রাউন্ডে আসলো আর আপনি তখন ই খেতে বসলেন তাহলে সুন্দর হলো? রোগী খেতে পারে। সেটা আলাদা বিষয়। আর যারা রোগির সাথে থাকেন তাদের ও খেতে হবে। কিন্তু, বুদ্ধী করে ডাক্তার আসার আগে বা পরে খেয়ে নিবেন।
৮. হাসপাতালে গিয়ে আমি অমুকের অই, আমি তমুকের সেই, আমার নানা সেটা ছিলেন, আমার বাবা ওটা ছিলেন এই ধরনের রেফারেন্স দিতে শুরু করবেন না। একটা কথা জেনে নিবেন, এই ধরনের পরিচয় / ক্ষমতা জানানোয় কোনও ভাবেই ম্যানেজমেন্ট সুন্দর হয় না। তার চেয়ে আপনি বিনয়ের সহিত নিজের পরিচয় টা দিন।আপনি অনেক ভালো সেবা পাবেন। ইনশাআল্লাহ। নিজের পরিচয় এ পরিচয় দিবেন। এটাই সুন্দর এবং স্বাভাবিক। তবে, মুক্তিযোদ্ধা হলে অবশ্যই একদম শুরুতেই জানাতে পারেন। সাথে সরকার প্রদত্ত যে সার্টিফিকেট সেটা দেখাবেন। আমাদের সর্বোচ্চ প্রাধান্য থাকে মুক্তিযোদ্ধা দের জন্য।
৯. আপনারা যারা রোগী নিয়ে যাবেন, তারা দয়া করে পুরাতন মেডিকেল সম্পর্কিত কাগজ পত্র সাথে নিয়ে আসবেন। যে কোনও সময় ডাক্তার রা চাইলে যেনো দেখাতে পারেন। যেই মুহুর্তে ভর্তি হবেন সেই মুহুর্তে না পারলেও পরের বার বাসায় গেলে বা কেও আসলে সেগুলো নিয়ে আসবেন।
যদি সম্ভব হয়, রোগীর সমস্যা গুলো মনে মনে গুছিয়ে রাখবেন। মূল সমস্যা গুলো কি কি, কত দিন ধরে সমস্যা, কিসের পর কি হলো ইত্যাদি। এতে সময় অনেক বেচে যায়। আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, হাসপাতালে আসা অনেক অনেক রোগী তার মূল সমস্যা টা ই গুছিয়ে বলতে পারে না। এটা তাদের দোষ না, হয়তো অপারগতা। কিন্তু, সময় তো এসব বুঝে না। যখন আমাকে ১০ জনের জায়গায় ৩০ জন রোগি দেখতে হয় তখন আমার ২ টা মিনিট বাচালেও লাভ, আরেকটা রোগি দেখতে পারবো।
১০. আজ শেষ করবো। শেষ টায় একটু অন্য রকম ভাবনা শেয়ার করবো। হয়তো সবার ভালো নাও লাগতে পারে। সবাই মিলে খালি ফল মূল, আপেল কমলা জুস, ডাব কিনে রোগির বিছানা টেবিল ভরিয়ে ফেলার তো কিছু নাই। বরং এগুলা বেশীর ভাগ সময়েই রোগি খেতে পারে না কিংবা নিষেধ থাকে। কিন্তু, আমাদের দেশে কেও রোগি দেখতে গেলে ফল না নিলে যেনো চলেই না। কি হবে এগুলা দিয়ে? এগুলা শেষ মেষ যারা পরে দেখতে আসে, সুস্থ মানুষ তাদের পেটে যায়। তাই কেও কেও মাঝে মাঝে একটু ভিন্ন ভাবে সহযোগিতা করেন অসুবিধা কি। যেমন, কেও একজন একটা ইঞ্জেকশন পায় ৪০০ টাকা দাম। আপনি নাহয় একদিনের দুইটা ইঞ্জেকশন কিনে দিয়ে আসলেন। রোগীর হয়তো, প্রতিদিন লবণ পরীক্ষা করতে হয় আজকের পরীক্ষার খরচা টা আপনি দিয়ে দিলেন। হয়তো স্ট্রোকের রোগী। তার একটা বাতাস এর বিছানা কেনা লাগে। দুই জন মিলে সেটা কিনে দেন। রোগি টা পিঠের ঘা হওয়া থেকে বেচে যাবে। আর কিছুই না পারলে, সুন্দর করে রোগির ছেলে বা মেয়ে কিংবা ভাই বোন কারো হাতে নিরবে ৫০০/১০০০ টাকা গুজে দিয়ে বললেন কিছু খেয়ে নিও। কি মনে হয়, সে কি চকলেট খাবে এই টাকা দিয়ে? না। সে এই টাকাটাও চিকিৎসা র কাজে লাগাবে। একটা রোগী হাসপাতালে থাকলে কোথা দিয়ে কিভাবে পানির মত টাকা খরচা হয়ে যায় কে না জানে। এই ছোট ছোট কাজ গুলো আপনাকে আর কিছু দিক আর না দিক শান্তি দিবে আর পাবেন অনেক অনেক দোয়া। আমার অন্তত তাই মনে হয়।
শেষ করি। অন্য কোনও দিন অন্য কিছু নিয়ে লিখব। যা বলেছি তা একটাও মন গড়া নয়। প্রতিদিন যা দেখছি সেই সব অভিজ্ঞতা থেকেই লিখা। মানতে পারলে লাভ আছে।
সবাই সুস্থ থাকুক। ভালো থাকুক। কাউকেই যেনো রোগী হয়ে হাসপাতালে না যেতে হয় এই দোয়া রইলো।
লিখেছেন: Sabab Ahmed Rizu